ট্রাম্পকে অভিশংসন সহজ নয়

Send
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৬:২২, অক্টোবর ০৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:০০, অক্টোবর ১০, ২০১৯

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী২০১৭ সালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকে অভিশংসনের সম্মুখীন হওয়ার কথা শুনে আসছি। কিন্তু এ যাবৎ কখনও ইমপিচমেন্টের সম্মুখীন হননি। এবার কিন্তু ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে ফোনালাপের সূত্র ধরে প্রতিনিধি পরিষদ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিশংসন প্রক্রিয়ার কাজ শুরু করেছে। ক্ষমতায় থাকলে জানা-অজানাভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার হতে পারে, তা কখনও অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয় না। কিন্তু কোনও প্রেসিডেন্টের যদি ক্ষমতা প্রয়োগের কারণে জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তবে তখন তা অভিশংসনযোগ্য অপরাধ বলে বিবেচিত হতে অসুবিধা থাকে না।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ফোনালাপে এমন একটা বিষয় জড়িয়ে গেছে বলে ডেমোক্র্যাটদের ধারণা, তাই তারা প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্টের প্রস্তাব এনেছেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করেছে ছদ্মনামে হুইসেল-ব্লোয়ার। অনেকে বলেছেন হুইসেল-ব্লোয়ার আসলে ছদ্মনামে সিআইএ’র একজন কর্মকর্তা।

অবশ্য ট্রাম্প বলেছেন, যে বিতর্ক হচ্ছে এটি পুরোটা ডেমোক্র্যাটদের একটা চাল। টুইটারে তিনি লিখেছেন, ‘ভুয়া খবর ছড়ানো গণমাধ্যম বলছে আমি নাকি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টকে টেলিফোনে কমপক্ষে আটবার চাপ দিয়েছি। যার কাছ থেকে এসব কথা এসেছে, তিনি আলাপের বিষয়ে সরাসরি কিছু বলতে পারেননি। এটি ডেমোক্র্যাট আর গণমাধ্যমের পাতানো চাল।’ গোয়েন্দা সংস্থার যে একজন এসব তথ্য ‘ফাঁস’ করেছেন, তার দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মি. ট্রাম্প।

আগামী ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প প্রার্থী। তার প্রার্থীপদ চূড়ান্ত, কারণ তাকে মনোনয়নের জন্য প্রাইমারি নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে হবে না। ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট যদি পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করতে ইচ্ছুক হন, তবে তাকে দলীয় মনোনয়নের জন্য প্রাইমারি নির্বাচনে অংশ নিতে হয় না, তিনি ইচ্ছা করলেই মনোনয়ন নিশ্চিত হয়ে যায়। ট্রাম্প ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী। ডেমোক্র্যাট দলীয় প্রার্থী এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তাদের প্রার্থী হিসেবে প্রাক্তন ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনসহ অনেকে আছেন। তবে অনেকের ধারণা জো বাইডেনই চূড়ান্ত পর্যায় ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মনোনয়ন পাবেন।

১৯৭৪ সালে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রস্তাব প্রক্রিয়াধীন ছিল। যখন তিনি বুঝলেন সামগ্রিক পরিস্থিতিতে তার বিরুদ্ধে আনীত অভিশংসন প্রস্তাব পাস হবে, তখন তিনি প্রেসিডেন্টের পদ থেকে পদত্যাগ করে তার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ডকে ক্ষমতা হস্তান্তর করে চলে গিয়েছিলেন। তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগকে ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি বলে অভিহিত করা হয়। ওয়াটারগেট একটি হোটেলের নাম। ওই হোটেলে ছিল রিচার্ড নিক্সনের প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্র্যাট দলীয় প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর নির্বাচনী প্রচারণা সদর দফতর। প্রেসিডেন্ট নিক্সন সুকৌশলে তার ওয়াটারগেট দফতরে যন্ত্র বসিয়ে তার নির্বাচনি কৌশল অবগত হওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। পরবর্তী সময় নিক্সন দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর এই তথ্য ফাঁস হয়ে যায়। তখন ডেমোক্র্যাটরা তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের প্রস্তাব এনেছিলেন। অবশ্য অভিশংসন প্রস্তাব পাস হওয়ার আগেই তিনি অবস্থা বুঝে পদত্যাগ করেছিলেন। মার্কিন নির্বাচনের ইতিহাসে এটি বিখ্যাত ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি নামে প্রসিদ্ধ হয়ে আছে।

ইউক্রেনের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির সঙ্গে ট্রাম্পের কিছুদিন আগে ফোনে আলাপ হয়েছিল। এই ফোনালাপের ভিত্তিতে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের প্রস্তাব এসেছে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রেসিডেন্ট সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও তার ছেলে হান্টার বাইডেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টকে চাপ দিয়েছিলেন। সামরিক সহায়তা বন্ধের হুমকি দিয়েছেন। বাইডেনের ছেলে ইউক্রেনে এক গ্যাস কোম্পানিতে চাকরি করতেন।

তদন্ত শুরুর ঘোষণা দেওয়ার পর গত ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ফোনালাপের বিস্তারিত প্রকাশ করেছে হোয়াইট হাউস। এতে দেখা গেছে ঠিকই ট্রাম্প ২৫ জুলাই ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট সঙ্গে কথা বলেছেন এবং জো বাইডেনের বিষয়টা তদন্তের জন্য চাপ দিয়েছেন। এর কয়েকদিন আগেই ট্রাম্প ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। ফোনালাপে জেলেনস্কিও সামরিক সহায়তা প্রত্যাহারের বিষয়ে কোনও কথা বলেননি, আর ট্রাম্পও এ বিষয়ে কোনও কিছু উত্থাপন করেননি।

ইউক্রেনে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে রয়েছে। যদি দেখা যায় রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারের জন্য জাতীয় নিরাপত্তা হুমকিতে পড়েছে, সেক্ষেত্রে এটি প্রেসিডেন্টের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে। ট্রাম্পকে অভিশংসন করতে এই ফোনালাপই যথেষ্ট হবে। এখন ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে যে তদন্ত চলছে তার মূল কথা হলো প্রেসিডেন্ট রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে বিদেশি শক্তির সাহায্য নেওয়ার চেষ্টা করেছেন, যা অপরাধ বলে গণ্য হতে পারে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে পূর্ব থেকে আরো ছয়টি অভিযোগের তদন্ত চলছে। এর আগের নির্বাচনে জেতার জন্য ‘রাশিয়ার সঙ্গে আঁতাত’ করেছিলেন বলে যে অভিযোগ উঠেছিল, সেই ঘটনাটিকে এখানে অবশ্যই মনে করিয়ে দিচ্ছে নতুন এই অভিযোগ। রাশিয়ার সঙ্গে আঁতাত প্রসঙ্গে দুই বছর ধরে বিচার বিভাগীয় তদন্ত চলেছে। ২০১৬ সালে ট্রাম্পের প্রচারণা বিষয়ক কর্মকর্তা ও তার ছেলের সঙ্গে কয়েকজন রাশিয়ানের সম্পৃক্ততার বিষয়ে তদন্তে বিস্তারিত উঠে এসেছে। যদিও শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল হয়নি। তবে সব অভিযোগের মাঝে এই অভিযোগটি গুরুতর।

প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি বলেছেন, ট্রাম্প আইন ভঙ্গ করেছেন এবং তিনি সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন। অভিশংসনের বিষয়টি তদন্ত শেষ করে অভিযোগ আকারে চার্জ গঠনের পর তা প্রতিনিধি পরিষদে পাস হয়ে যাবে, কারণ প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ, কিন্তু সিনেটে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। আবার দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে সিনেটে অভিশংসন প্রস্তাব পাস হতে হয়। এটি সাংবিধানিক নিয়ম। সুতরাং এই প্রস্তাব পাস হতে ৬০ ভোটের প্রয়োজন। ডেমোক্র্যাটসহ বিরোধী সিনেটর হচ্ছে ৪৯ জন। এমন পরিস্থিতিতে সিনেটর থেকে ১১ জন রিপাবলিকান সিনেটর যদি অভিশংসন প্রস্তাব সমর্থন না করেন, তবে অভিশংসন প্রস্তাব পাস হবে না।

ব্রিটিশ পার্লামেন্টে সরকারি হোক বিরোধী হোক, অপরাধকে অপরাধ বলার এমপিদের একটা ঐতিহ্য রয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে এই ঐতিহ্য নেই। সুতরাং অভিযোগ শতাংশে সত্য হলেও আর সংবিধান ভঙ্গের অপরাধ সংগঠিত হলেও, তা চূড়ান্তভাবে পাস হওয়ার সম্ভাবনা আছে বলে মনে হয় না। সুতরাং অভিশংসন সম্পর্কে শেষ কথা বলা গেলো না।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

bakhtiaruddinchowdhury@gmail.com


/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ