কোটিপতি ক্লাব

Send
তুষার আবদুল্লাহ
প্রকাশিত : ১৪:৪২, অক্টোবর ০৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৫৭, অক্টোবর ০৫, ২০১৯

তুষার আবদুল্লাহচারদিকে কোটিপতি। ইদানীং আশপাশের সবাইকে কোটিপতি বলে সন্দেহ হচ্ছে। যিনি রাজকীয় ফ্ল্যাট থেকে নেমে আসছেন, তাকে তো বাজি না ধরেই বলতে পারি কোটিপতি। কিন্তু বাজার থেকে হাতে দুটো সাদা মুলা নিয়ে বাড়ি ফিরছেন যিনি, তাকেও সন্দেহের চোখে রাখতে হচ্ছে। কারণ দেশে মুলার মতোই কোটিপতির বাম্পার ফলন হয়েছে। ব্যাংকের হিসাবেই ৭৬ হাজার। তিন মাসে কোটিপতি বেড়েছে ৯৪৩ জন। ব্যাংকের নজরদারির বাইরে কোটিপতির সংখ্যা নাকি কমপক্ষে দুইগুণ। আশপাশে কোটিপতির শ্বাস-প্রশ্বাস পাওয়া সুখের।
দেশের অর্থনীতি এখন আর কৃষিনির্ভর নয়। অনেকটাই শিল্পনির্ভর হয়ে উঠেছে। আপাতত মিশ্র অবস্থানে। কৃষিভিত্তিক শিল্পও প্রসারমান। তাছাড়া মুদ্রা ও মূল্যস্ফীতিজনিত কারণে কোটিপতির সংখ্যার প্রবৃদ্ধি হওয়াটা অনেকটাই যৌক্তিক। সমস্যা হলো সবাই কি যৌক্তিকভাবেই কোটি টাকার মালিক হয়েছেন? কোটি টাকা ছুঁয়েছেন এমন মানুষের অনেকেই মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্তের সিঁড়িতেই আছেন। পৈত্রিক সম্পত্তি,  ছোটোখাটো ব্যবসা, অবসরের টাকা কিংবা চাকরির বেতন, সুযোগ-সুবিধা পেয়েও একটি অংশ কোটির কোঠা ছুঁতে পেরেছেন। এরা হয়তো কেবলই কোটিপতি। এদের বড় অংশই কোটির চৌকাঠের এপার-ওপার আসা যাওয়ার মধ্যে থাকেন। আরেকটি বড় অংশ কেবলই কোটিতে আটকে থাকছেন না।

তাদের খায়েশ মিটছে না শত ও হাজার কোটিতেও। এই গোত্রের পকেটে এলো কী করে? ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে টাকা হাপিস করে দিচ্ছেন। চলে যাচ্ছে দুই গোলার্ধের নানা দেশে। শিল্প-কারখানা করার নামে একটি নয়, চার-পাঁচটি ব্যাংককে তারা দেউলিয়া করে দিতে পেরেছেন। ব্যাংক অসহায়ের মতো হাপিত্যেশ করলেও টাকা ফেরে না। লোপাটের সঙ্গে ব্যাংকের ঘরের লোকও আছেন। এই ঘরের লোকেরাও শত না হলেও দশ-বিশ কোটি টাকার মালিক তো হয়েছেনই। দেশে অবকাঠামো উন্নয়ন দৃশ্যমান। সড়ক ছাড়াও নানা দফতরে উন্নয়নের জোয়ার বইছে। সেই জোয়ারে ভেসে ওঠা খড়কুটো যারা ধরতে পারেন, তারাও পলকে শত, সহস্র কোটি টাকার মালিক হয়ে যাচ্ছেন। আর আছে ক্ষমতার বুদবুদ। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, তার সঙ্গে লেপ্টে যেতে পারলেই হলো। অতি নিকট থেকে শুরু করে, ক্ষমতার গন্ধ এক ফোঁটা গায়ে মাখাতে পারলেই কোটির নিশান নিশ্চিত।

সরকারি প্রকল্পের খরচ বেড়ে দ্বিগুণ, তিনগুণ হচ্ছে। বালিশ, বালিশের কভার, স্টেথিসকোপ মেশিন কেনা হচ্ছে যে বিস্ময়কর দামে, সেই টাকা যাদের পকেটে যাচ্ছে তারাও পেয়ে যাচ্ছেন কোটিপতির মর্যাদা। উগান্ডা প্রশিক্ষণে যাওয়া, লিফট দেখতে বিদেশ ভ্রমণ, এসব কিছুই আসলে কোটিপতি হওয়ার বাসনা। কোনও নেতা বা আদর্শকে ভালোবেসে রাজনীতি করার দিন ফুরিয়েছে। জনগণের সেবার জন্য জনপ্রতিনিধি হওয়ার প্রতিশ্রুতি এখন আষাঢ়ে গল্প। আট সহস্র কোটিপতির দেশে সবকিছুই এখন বাণিজ্যের চোখে দেখা হয়। সব কথা, সেবাই আর্থিক লাভ প্রাপ্তির বিনিয়োগ। সরকারি-বেসরকারি কোনও খাতই এর বাইরে নয়। ঠিকাদার থেকে শুরু করে চিকিৎসক, শিক্ষক, সাংবাদিক, লেখক-কবি সবাই এই বাণিজ্যিক চক্রে নিজেকে সঁপে দিচ্ছেন। কেউ জায়গা করে নিতে পেরেছেন, অনেকে সুযোগের অভাবে পারেননি। সরকারি কর্মকর্তা, কর্মচারী ও রাজনীতির মানুষদের ঠেলেঠুলে জায়গা করে নেওয়াটাও মুশকিল।

এই যে শত সহস্র কোটি টাকার ঘূর্ণি, সেখান থেকে আম কুড়োনোর মতো দুয়েকটি সাধারণ মানুষের বরাতে যে জুটবে, সেই সুযোগও নেই। কারণ টাকা দেশে থাকছে না। মুনাফার টাকা, চুরির টাকার বড় ভাগটি চলে যাচ্ছে বিদেশে। এই টাকা যদি দেশের আকাশে-বাতাসে উড়তো,  তাহলে অবশিষ্ট মানুষেরা তার কানাকড়ি পেতো। অর্থাৎ ওই টাকার প্রদর্শিত বিনিয়োগ হলে কর্মসংস্থান তৈরি হতো, টেকসই ব্যবসার ক্ষেত্র বেড়ে যেতো। তাতে  সমাজে টাকাটির এক প্রকার পরোক্ষ বণ্টন হতো। সেটা এখন হচ্ছে না। অতি আশ্চর্যজনক মুনাফা ও চুরি-ডাকাতি, কমিশনের টাকায় রাষ্ট্রের মাথাপিছু আয়ের যে অঙ্ক দাঁড়াচ্ছে, সেখানে বৈষম্য তৈরি হয়েছে। গড় টাকার ডাইনোসার ভাগটিই তো ৭০ হাজার মানুষের পকেটে। বাকিদের পকেট বাড়ন্ত!

মুশকিল হলো কে যে কখন কোটিপতি হয়ে যাচ্ছেন বা গেছেন, দেখে আঁচ করা যাচ্ছে না। ছাতাধরা মানুষ, বালু বিক্রেতা, কারো নাইটগার্ড-বডিগার্ডও কার স্পর্শে কখন যে কোটিপতি হচ্ছেন, সমাজ রাষ্ট্র টের পাচ্ছে না। আচমকা তারা খবর হয়ে উঠছেন। তাই আশপাশে যাকেই দেখি, যেমনই দেখি তাকে, তাদের দিকে সমীহ করেই তাকাই। আদব-কায়দা মেনে। কারণ আমার আপনার পাশের মানুষটিই যে কোটিপতির ক্লাবে ঢুকে পড়েছেন, তা হয়তো এখনও আমাদের অজানা। জেনে যেতে পারি কোনও সুন্দর সকাল বা পূর্ণিমা রাতে!

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ