সম্রাট আর আইনের ‘সরকারি’ গতি

Send
রুমিন ফারহানা
প্রকাশিত : ১৬:২৬, অক্টোবর ০৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:২৫, অক্টোবর ০৫, ২০১৯

রুমিন ফারহানাসম্রাট কোথায় আছেন? তিনি কি এখনও কাকরাইলে তার কার্যালয়ে আছেন? নাকি কোনও প্রভাবশালী নেতার বাসায় তার আশ্রয়ে আছেন? তিনি কি দেশে আছেন নাকি বিদেশে? সম্রাট কি গ্রেফতার হবেন? নাকি এরমধ্যেই তিনি গ্রেফতার হয়ে আছেন কিন্তু এখনও সেটা ঘোষণা করা হয়নি? তাকে গ্রেফতারের জন্য প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করা হচ্ছে? প্রধানমন্ত্রী বিদেশ থেকে ফেরার পর কি সম্রাটের গ্রেফতারের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে? আর যদি তিনি গ্রেফতার হয়েই থাকেন তাহলে সেটি প্রকাশ করতে দ্বিধা কেন? ঢাকার চাঁদাবাজি আর জুয়ার সবচেয়ে বড় হোতাদের একজন সম্রাটের টাকার ‘বখরা’ কারা কারা পেতো? রাজনীতিবিদ, পুলিশ, প্রশাসন, সাংবাদিক ছাড়া আর কারা? তাদের আড়াল করতেই কি সম্রাট আড়ালে? দেশের পত্রিকাগুলো এখন এমন সব প্রশ্নে একেবারেই পরিপূর্ণ হয়ে আছে।
সম্রাটের ঘটনায় ফিরে আসার আগে খুব সম্প্রতি ঘটে যাওয়া আরেকটি বিষয় নিয়ে কিছু কথা বলা যাক। সরকার সরকারি চাকরি আইন ২০১৮ কার্যকর করেছে। এই আইনের ৪১(১) ধারা বলছে–‘কোনো সরকারি কর্মচারীর দায়িত্ব পালনের সহিত সম্পর্কিত অভিযোগে দায়ের করা ফৌজদারি মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র গৃহীত হইবার পূর্বে, তাহাকে গ্রেফতার করিতে হইলে, সরকার বা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি গ্রহণ করিতে হইবে।’

একই ধরনের ধারা রেখে দুদক আইন করার পর এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট সেই আইনের ধারাটিকে বাতিল করেছিলেন। আমরা সবাই জানি, সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।’ সংবিধান দেশের সর্বোচ্চ আইন এবং কোনও আইন যা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, তা বাতিল বলে গণ্য হবে। সাদা বাংলায় এর অর্থ দাঁড়ায় সংবিধানের কোনও অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনও আইন দেশে হতে পারে না। কিন্তু হাইকোর্টের রায়ের পর আবারও একই ধারা রেখে আরেকটি আইন করা হয়েছে। ঘটনাটি দুঃখজনক, যার অর্থ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বিচারালয়ের প্রতি ভয়ঙ্কর অশ্রদ্ধা প্রদর্শন।

২০১৪ ও ২০১৮ সালে দেশে নির্বাচনের নামে যা হয়েছে, তার প্রধান কুশীলব ছিল প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আর দলীয় ক্যাডার। যা একইসঙ্গে অনৈতিক ও বেআইনি।  তখন থেকে তারা প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে, আকারে-ইঙ্গিতে-কথায় কাজে বুঝিয়ে ছেড়েছে দেশের মূল মালিক তারা। আর এজন্যই সংবিধান-বহির্ভূতভাবে সরকার তাদের সুবিধা নিশ্চিত করতে চায়।

এই আইন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখালো—দেশে এমন আইন থাকতে পারে এবং আছে যেটা, এই রাষ্ট্রের কিছু মানুষকে সংবিধানের বাইরে সুবিধা দিতে চাইছে। অর্থাৎ একই দেশে একই অপরাধে অভিযুক্ত হওয়ার পরও ভিন্ন ভিন্ন মানুষের জন্য ভিন্ন ভিন্ন আইন থাকতে পারে, যা বিশেষ কিছু মানুষকে বিশেষ সুবিধা দেবে।

আবার এই দেশে বসবাস করে আমরা এটাও জানি—আইনের বাইরেও এই দেশে রাষ্ট্রীয় মদদে ঘটে আরও অনেক কিছুই। এই যেমন সম্রাটের ঘটনায় আমরা বুঝলাম, দেশে গ্রেফতারের ‘অলিখিত আইনও’ আছে, যেটা সময় সময় ‘লিখিত আইনের’ চাইতেও বেশি শক্তিশালী।

কিছুদিন আগে বাংলা ট্রিবিউন সম্রাটের গ্রেফতারের আলোচনার মধ্যে রিপোর্ট করেছে ‘সম্রাটকে ধরতে গ্রিন সিগন্যালের অপেক্ষায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী?’ শিরোনামে। একই ধরনের বিষয় নিয়ে প্রথম আলোর সংবাদের শিরোনাম—‘সম্রাটকে আটকের ব্যাপারে সরকারের সবুজ সংকেতের জন্য অপেক্ষা।’

উল্লিখিত একটি রিপোর্টের একটি অংশ এরকম—‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছেন, সম্রাট ঢাকায় আছেন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারিতেই আছেন। সম্রাটকে আটকের ব্যাপারে তারা সরকারের সবুজ সংকেতের অপেক্ষায় রয়েছেন।’

সেই ‘সবুজ সংকেত’ এসে পৌঁছায়নি বলেই সম্রাটকে আজও  গ্রেফতার করা হয়নি। ক্যাসিনো কাণ্ড উন্মোচিত হওয়ার পর ১৭টি মামলা করা হয়েছে। অথচ মজার বিষয় এর একটিতেও সম্রাটের নাম নেই। এরমধ্যেই আমরা জেনে গেছি ক্যাসিনো কাণ্ডের মূল হোতাদের একজন সম্রাট। আর ঢাকা শহরের একটা বড় অংশের সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির প্রাথমিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন সম্রাট। যার চাঁদাবাজির প্রমাণ আছে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর কথায়ও—‘আমি ও রেহানা জাকাতের টাকা আঞ্জুমান মুফিদুলে দেই, আর সম্রাট সেখানে চাঁদা দাবি করে’। কিন্তু সম্রাট এখনও আছেন বহাল তবিয়তেই, অনেক মূলধারার পত্রিকাতেই এই খবর এসেছে তিনি সরকারি দলের কোনও খুব প্রভাবশালী নেতার আশ্রয়ে আছেন এবং সেখান থেকে সরকারের ‘সর্বোচ্চ পর্যায়’কে ম্যানেজ করার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

ক্ষমতাসীন দলের একটি সহযোগী সংগঠনের একটি সাংগঠনিক জেলা, ঢাকা দক্ষিণের সভাপতিকে ধরতে সবুজ সংকেত দেওয়া হয় না কিন্তু দাবি করা হয়, একটা শুদ্ধি অভিযান চলছে, যেটা দলের ভেতরে দুর্নীতিবাজদের বিচারের আওতায় আনবে। এই প্রহসনটুকু বোঝার মতো বুদ্ধি এই দেশের জনগণের আছে।

সম্রাটরা কেন গ্রেফতার হয় না, বা হলেও কেন এত গড়িমসি করা হয় তার কারণ আমাদের জানা। প্রথম আলোর রিপোর্টে একজন যুবলীগের নেতার বয়ানেও সেটা খুব চমৎকারভাবে এসেছে। সেটা এরকম—সম্রাট থেকে সুবিধাভোগীর তালিকায় মন্ত্রী, রাজনীতিবিদ, সংগঠনের সুবিধাভোগী, পুলিশ ও সাংবাদিক রয়েছেন। এ কারণে তাকে গ্রেফতারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ইতস্তত করছে।

এই দেশে আসলেই এক ‘মাফিয়াতন্ত্র’ কায়েম হয়েছে এই সরকার প্রথমবার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই। ২০১৪ সালে জনগণের ম্যান্ডেটহীন ক্ষমতায় থাকা এই মাফিয়াতন্ত্রের প্রকোপ এবং ব্যাপ্তি বাড়িয়েছে বহুগুণে। আর ২০১৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর যা হয়েছে, তারপর এটা হয়েছে সর্বব্যাপী। খুব সাধারণ কান্ডজ্ঞান বলে সরকারি দলের বড় নেতা, প্রশাসনের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং অনেক ক্ষেত্রেই মিডিয়ার সরাসরি সংযোগ না থাকলে এমন মাফিয়াতন্ত্র কায়েম করে হাজার হাজার কোটি টাকার লুটপাট কোনোভাবেই হতে পারে না।

এই মাফিয়াতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ এক অংশ সম্রাট তাই গ্রেফতার হন না। কিংবা গ্রেফতার হলেও আগে এটা ঠিক করে নেওয়া হবে, সম্রাট কী বলবেন, কাদের কথা বলবেন, কতটুকু বলবেন। আর সেই খুব গুরুত্বপূর্ণ অংশ কতটুকু বলা হবে আর কতটুকু হবে না সেটা ঠিক করতে কালক্ষেপণ তো কিছুটা হবেই, তাই না?

দেশের সচেতন মানুষ সম্রাটের নাম খুব ভালোভাবেই জানতো। সাম্প্রতিক ক্যাসিনো কাণ্ডে তার নাম আসায় তার এই দিকটি সামনে এসেছে, কিন্তু তার চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজির ঘটনা মানুষ খুব ভালোভাবেই জানতো। তিনি তো অনেকবার সংবাদ শিরোনামও হয়েছেন। আঞ্জুমান মফিদুলের কাছে চাঁদা চাওয়ার ঘটনা তো বেশ আগের। পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের মাধ্যমে আমরা এই তথ্য তো জানি—তখন তিনি দেশ থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন। পরে তিনি ‘সর্বোচ্চ মহল’ ম্যানেজ করে দেশ ফিরে এসে আবার স্ব-মূর্তিতে আবির্ভূত হয়েছিলেন। পত্রিকায় খবর এসেছে—বিদেশে পালাতে পারেননি তিনি, তবে এবারও তিনি এক বড় নেতার বাসায় বসে ‘সর্বোচ্চ মহল’ ম্যানেজ করার চেষ্টায় আছেন।

আইন তার ‘নিজস্ব গতিতে চলবে’ ধরনের এক আপ্তবাক্য সরকারের নানা মহল থেকে আওড়াতে দেখা যায় নানা প্রসঙ্গে। কিন্তু সম্রাটদের ঘটনা প্রমাণ করে, আইনের অবশ্যই একটা গতি আছে, আর সেটা হচ্ছে, যে ক্ষেত্রে সরকার যেমন গতি চাইবে সেটা। বর্তমান বাংলাদেশে আইনের গতি মানেই সরকারি গতি।

এই গতির কারণেই একজন সম্রাটকে গ্রেফতার করা নিয়ে আমরা এমন অবিশ্বাস্য নাটক দেখি, এই গতির কারণেই সম্পূর্ণ নির্দোষ হওয়ার পরও, যেকোনও গ্রাউন্ডে এখনই জামিনের হকদার হওয়ার পরও তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রী খালেদা জিয়াকে দিনের পর দিন জেলে আটকে রেখে ঠেলে দেওয়া যায় মৃত্যুর মুখে।

লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট। জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে বিএনপির দলীয় সংসদ সদস্য

 

/এসএএস/এমএনএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ