দুর্গা এলো

Send
শান্তনু চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৪:৪৯, অক্টোবর ০৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৪৯, অক্টোবর ০৬, ২০১৯

শান্তনু চৌধুরীশিশিরে শারদের আকাশ জেগে উঠেছে বেশ আগেই। ভোরের আগমনী জানান দিয়ে গেছে দুর্গাপূজা এলো বলে। আকাশে রোদের রঙ পাল্টে যাচ্ছে। সন্ধ্যার দিকে হাওয়ারা শিরশিরানি দিচ্ছে। বাতাসে কেমন একটা পুজো পুজো গন্ধ। এই সময়টা এলেই মনে হতো বুঝি পূজা আসছে। এসব বলছিলাম ছেলেবেলার গল্পই। এখনও যতবারই দুর্গাপূজা আসে, সেই অতীতে ফিরে যায় সেই ছেলেবেলা। সেই দুরন্ত কিশোর বেলা। সেই মণ্ডপে ঘুরে ঘুরে নতুন প্রতিমা দেখা। ভাবি, ছেলেবেলার পূজার যে আনন্দ, সেটার যেন কোনও তুলনা নেই। কথাটার কোনও বিকল্পও নেই। আমাদের অনেকের হয়তো সেই কিশোরবেলাতেই পূজাটা আটকে আছে। সেখান থেকে ইচ্ছে করেই হয়তো বের হইনি।

পূজার এই সময়টার পরপরই স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা। ক্লাসে তাই কিছুটা কড়াকড়ি। স্কুলের ক্লাসঘর বা ফেরার পথে খোলা মাঠে, বাড়ির জানালার পাশে শিউলি ফোটার ফাঁক দিয়ে দেখতে পেতাম বাইরের আকাশ কী ঝকঝকে নীল হয়ে উঠেছে। সেই তীব্র নীল রঙের মাঝে নিজেকে সঁপে দিয়েছে অতি শুভ্র ঘন মেঘ। কাশফুল দেখিনি তখনও। শুধু বইপুস্তকে পড়েছি, ‘একধারে কাশবন ফুলে ফুলে সাদা’। কল্পনায় কাশফুলের নরম ছোঁয়ার বিছানায় হঠাৎ ঢাকের শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। ঘুম ভেঙে জেগে উঠেছে পুরো গ্রাম। হঠাৎ করেই যেন ফুরিয়ে গেছে বর্ষাকাল। আমিও জেগে উঠতাম। শিশির মাখা ঘাসে খোলা পা রাখি। সেখানে খেলা করে সোনারোদ। সেই রোদ ছড়িয়ে পড়ে এখানে সেখানে। নারিকেল ফেটে বের হওয়া সদ্য চারাগাছে, আয়েশি ভঙ্গিতে শুয়ে থাকা গৃহস্থ বাড়ির কুকুরের গায়ে, সদ্য বিবাহিতার সকালে স্নান শেষে শুকাতে দেওয়া শাড়িতে, কিশোরীর তুলতুলে নরম গালে খেলা করে সোনারোদ। একটি ঘাসের ডগার ওপর একটি শিশির বিন্দু দেখি। নানা রঙের প্রজাপতির উড়োউড়ি দেখি। এরপর আকাশটা দেখব বলে মাথা উঁচু করি। হাওয়াই মিঠাইয়ের মতো মেঘ। মনে হয় এই বুঝি টান দিয়ে চকলেটের মতো খাওয়া যাবে। কানে বাজে বীরেন্দ্রকৃষ্ণের গভীর মদিরা কণ্ঠের সুর তোলা আগমনী গান—‘আশ্বিনের শারদ প্রাতে বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জরি-ধরণীর বহিরাকাশে অন্তরিত মেঘমালা...।’ তাহলে কি এই হাওয়াই মেঘ কৈলাস থেকে নিয়ে এসেছে দুর্গাপূজার আগমনী চিঠি। শুরু হলো দেবীপক্ষ। এ-বাড়ি ও-বাড়ি ঘুরে খবর নেওয়া প্রতিমা বানানোর কাজ কতদূর এগোলো। আর কদিন পরেই স্কুল বন্ধ! সারাদিন টোটো কোম্পানির ম্যানেজারি করে সাঁঝ বেলায় ঘরে ফেরা। সাঁঝের বাতাসে হিমেল পরশ। হালকা কুয়াশা। বাড়ির সামনের তালগাছে ভূতের ভয়! কিন্তু আজ ভয় কেটে গিয়ে ওর জন্য করুণা হয়। কেমন যেন দাঁড়িয়ে আছে। একাকী! নিঃসঙ্গ!

এরপর একদিন আসে বোধন। মাইকে বেজে ওঠে, ‘যদি হই চোরকাঁটা ওই শাড়ির ভাঁজে...।’ সন্ধ্যা, লতা, সতীনাথ, হেমন্ত একের পর এক বাজতে থাকে। বাজে গায়কি মন্ত্র। বাজে ‘অয় গিরি নন্দিনী নন্দিত মেদিনী বিশ্ব বিনোদিনী নন্দনুতে’। মাইক বন্ধ হওয়ার পরও কানে জঁ জঁ শব্দ। বিলের জলে দুলুনি উঠলে যেমন স্থির থাকতে পারে না গঙ্গা ফড়িং, মনও তেমনি স্থির থাকে না। আন্ডারগার্মেন্টসের জিপার লাগানো পকেট থেকে জমানো টাকাগুলো বের করি। গুনে দেখি বারবার। দু’এক টাকা বাড়লো নাকি! কয়েকদিন থেকে দুর্গা বানানোর কারিগর বাবুল পটিয়া থেকে আসি আসি করছেন, ব্যাপক উৎসাহ সবার মাঝে। মনে হচ্ছে সম্ভব হলে কোলে করে উঠিয়ে আনেন তাকে। পুরো গ্রামে চৌধুরী বাড়ি, খাস্তগীর বাড়ি, হাঙর কূল, দক্ষিণ পাড়া এসব বাড়িতেই দুর্গাপূজা হয়। সব বাড়ির দুর্গা মূর্তি বাবুল কারিগরই বানান। কিন্তু টাকার তারতম্যের কারণে একেকটা মূর্তি ভিন্ন হয়। আর আমরা তা দেখে ভাবি, কারা এবার বেশি টাকা দিলো। পাড়ায় পাড়ায় খবর নিচ্ছি কোন পাড়ায় খড়ের মূর্তি তৈরি হয়েছে। বাবুল কারিগর এখনও এলো কিনা! মাটির ব্যাংকে টাকা জমছে, পকেট মারা টাকা, বাজার মারা টাকা, কুড়িয়ে পাওয়া টাকা, বড়লোক আত্মীয়দের দেওয়া টাকা। নানানভাবে জমে সব টাকা এক হয়ে যাচ্ছে। ঠেলাগাড়িতে করে আসছে প্যান্ডেল সাজানোর বাঁশ, নারকেল দড়ি, নানা রঙের কাপড় আসে। লুঙ্গিতে কোঁচ মেরে আসে ভীম দেহের কর্মচারী। আমরা পেছনে পেছনে দৌড়াই। চোখের সামনেই একটু একটু করে তৈরি হতো পূজামণ্ডপ। বাড়িতে মন ঠেকে না। ছটফটানি বাড়ে। মন ছুটে যেতে চায় বাঁশে পেরেক ঠোকার শব্দের কাছে।

...একদিন দুদিন করে মহাপঞ্চমীর দিন আসে। পরেই মহাষষ্ঠী। পূজামণ্ডপের মূর্তিগুলো যদি আগেই দেখা হয়ে যায়, তাই কাউকে কাছে ঘেঁষতে দেওয়া হচ্ছে না। ‘অমুক’ কাকু চৌধুরী বাড়িতে পূজামণ্ডপ সামলানোর দায়িত্ব পেয়েছেন। নতুন পাড়ের ধুতি পরেন, গায়ে পরিষ্কার সাদা জামা, কোমরে লাল গামছা পেঁচিয়ে হাতে লাঠি নিয়ে মণ্ডপের চারদিকে ঘুরছেন। মাঝে মাঝে পানের পিক ফেলছেন। কিছুক্ষণ পরপর হুংকার ছাড়ছেন। চেনা লোকটাকে কেমন যেন অচেনা মনে হচ্ছে। ত্রিপলের ঘেরার মধ্যে তুলির হয়তো শেষ আঁচড় দিচ্ছেন কারিগররা। কারিগরের ছোট ছেলের বাথরুম এলে ঢেকে দেওয়া কাপড়টা আলতো ফাঁক করে বের হচ্ছে। আর তখনই আমরা ঝাঁপিয়ে পড়ছি তার ওপর। প্রায় সমবয়সী সেও ‘ভাব’ নিচ্ছে। একটা চকলেট ঘুষ দিলে হয়তো বলছে, এখনো ঢের বাকি। আমরা সে খবরটিই প্রচার করে দিচ্ছি পাড়ায় পাড়ায়। আবার অন্য পাড়ার খবর নিচ্ছি যেখানে কারিগরের সাগরেদরা মূর্তি বানাচ্ছেন। এবার যেহেতু বাবুল কারিগর নিজে চৌধুরীপাড়ায়, তার মানে এখানকার মূর্তিটাই আমাদের বিচারে সেরা হবে। পূজা শুরু হয়ে গেলো। দিনের প্রতিটা ক্ষণে ক্ষণে পূজার রঙ বদলায়। প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে বন্ধুদের সঙ্গে ঘোরাঘুরি।  চেয়ার, ঢোল দখল নিয়ে মন খারাপ করা, আবার ভাব করা। দৌড়াতে গিয়ে হাঁটুতে, হাতের কনুইয়ে চোট পাওয়া। এসব ঘটনায় যেন বাড়িয়ে দিতো আনন্দের মাত্রা। গ্রামে গ্রামে সাজ সাজ রব। চোখ ধাঁধানো আলোর বর্ণিল ছটা। সন্ধ্যাবেলায় শুরু হতো আরতি। ধুনুচি নাচ। পূজার ঠাকুর ডান হাতে প্রদীপ আর বাম হাতে ঘণ্টা নেড়ে নেড়ে আরতি করেন। ঢোল বাজে। ঢোলের ওপর কাঠির প্রতিটা আঘাত লক্ষ করি। শত শত দর্শকের মতো আমি চেয়ে আছি নির্ণিমেষ নেত্রে। কী মায়াবী মনে হয়। কী অজস্রতায় তিনি বিম্বিত হয়েছেন ভাস্কর্যে, চিত্রে, সঙ্গীতে ও বচন-রচনায়। ঋগবেদে বলা হয়েছে, ‘ওই তো তিনি আলোক বিচ্ছুরণ করতে করতে আসছেন দশটি বাহুর বেষ্টনে মণ্ডিত হয়ে।’ সিংহবাহনটি কোথাও শুধুমাত্র আসন, কোথাও অসুরত্রাসন। শরতের মতো শুভ্র রঙ, কতো সুন্দর পোশাক, স্টাইল করে কাটা চুল, পায়ে নূপুর, গলায় সোনালি আভা, যেন একেকজন দেবী। সুনীলের মতো আমার দিকে তারা ফিরেও চায়নি একথা ঠিক নয়, তবে সেটা জেনেছি অসময়ে। যখন জীবনটা বেশ এগিয়েছে। 

সময় গড়িয়ে যায়, জীবনের অনেক শরৎ পেরিয়ে এখন মল্লিকা সেনগুপ্তের কন্যাশ্লোক কবিতাটি মনে পড়ে।

‘আশ্বিনের এক প্রাগৈতিহাসিক সকালে শ্রীরামচন্দ্র যে দুর্গার বোধন করেছিলেন

স্বর্গের দেবপুরুষগণ যুদ্ধে পরাজিত হয়ে যে রণদেবীকে অসুর নিধনে পাঠিয়েছিলেন। সেই দুর্গাই একুশ শতকে নারীর ক্ষমতায়ন।

তাঁর মহাতেজ চিরজাগরূক আগুন হয়ে জ্বলে উঠুক

মাটির পৃথিবীর প্রতিটি নারীর মধ্যে।’

কিন্তু আমরা মুখে নারীর ক্ষমতায়নের কথা বললেও এখনো প্রতিটি নারীর অধিকার বা মর্যাদা তেমনভাবে নিশ্চিত হয়নি। এখন হয়তো অনেক নারীই অর্গল ভেঙে বেরিয়ে এসেছে, কিন্তু নির্যাতনের মাত্রাও বেড়েছে বহুগুণ। ১১ অক্টোবর পালিত হবে জাতীয় কন্যা শিশু দিবস। কিন্তু আমাদের কন্যারা সত্যিই নিরাপদ নয় এদেশে। ‘বাংলাদেশে সাইবার অপরাধের প্রবণতা’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইন্টারনেট ব্যবহার করতে গিয়ে প্রায় ৬৮ শতাংশ নারী সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা সুলতানা কামাল মন্তব্য করেছেন, নারী নির্যাতনের পরিস্থিতি ভয়াবহ বললেও কম হবে। তার কথা যে মিথ্যা নয়, সেটি গেলো পনেরো দিনের সংবাদমাধ্যম ঘাঁটলেই বোঝা যাবে। নারীর ক্ষমতায়ন যেমন একদিকে বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে বৈষম্যও। এ যেন বৈপরীত্য। আমরা যে শাস্তিমূলক সমাজ চাই, তা নয়। কিন্তু সমাজে ন্যায়বিচার দেখতে চাই। যার ওপর অন্যায় করা হয়েছে, সেই ব্যক্তি বা তিনি বেঁচে নেই, কিন্তু তার পরিবার মনে করবে, তিনি সঠিক বিচার পেয়েছেন। এর দায়িত্ব চূড়ান্তভাবে রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। ওই যে শুরুতে বলেছিলাম, এখন পূজায় আর সেই আনন্দ নেই। সন্ধ্যার পর নারীরা যে পূজার আরতি দেখতে যাবে, তাতেও কাজ করে ভয়। মেয়েটা ঠিকমতো বাড়ি ফিরতে পারবে তো?

নানা থিম দিয়ে আড়ম্বর করে পূজা হচ্ছে। আয়োজনও বেশ। কিন্তু সেই যে ঢাকের ডাকে পূজাবাড়িতে ছুটে আসা, সেটি হচ্ছে কী? দুর্গাকে বলা হয় মহিষাসুর মর্দিনী। তিনি অসুর দমন করেন, আবার শান্তি স্থাপন করেন। বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে পূজা শেষ হয়ে যায়। দুর্গা মা আসবে বলে যতো আলো জ্বালা হয়, নবমীর রাত পোহাতেই নিভিয়ে দেওয়া হয় সব আলো। কিন্তু পূজা শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও কাশফুলেরা থেকে যায়। আকাশে ভেসে বেড়ায় তীব্র নীলের মাঝখানে জেগে ওঠা শ্বেতশুভ্র স্তূপমেঘ। এই সমাজেই কত মুখোশ ঢাকা মহিষাসুরকে প্রতিদিন সামলাতে হয়। ধর্মের নামে আজ দেশে দেশে চলছে হিংসা ও দ্বেষ, হানাহানি। উগ্রবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। শক্তিধর দেশ নাক গলাচ্ছে অন্য দেশে, পরমাণু অস্ত্র বিপদ ডেকে আনছে। জলবায়ু পরিবর্তনে গলছে হিমবাহ। তাই এ সময়ে রণরঙ্গিনী দেবী দুর্গাকে বেশ প্রয়োজন। কবি সুব্রত পালের  ‘তোমার দুর্গা আমার দুর্গা’ কবিতার মতো বলতে হয়,

‘তোমার দুর্গা দশভুজা হয়ে অসুরের মাথা কাটে

আমার দুর্গা অপুষ্টি নিয়ে ধুঁকতে ধুঁকতে হাঁটে।

আমার দুর্গা কবে বলো আর তোমার দুর্গা হবে?

আমার আকাশ ভরবে তোমার উৎসবে উৎসবে!’

 

লেখক: সাংবাদিক ও সাহিত্যিক

 

/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ