আবার আলোচনায় খালেদা জিয়ার মুক্তি

Send
বিভুরঞ্জন সরকার
প্রকাশিত : ১৫:২১, অক্টোবর ০৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:২২, অক্টোবর ০৬, ২০১৯

বিভুরঞ্জন সরকারএক বছর আট মাসের মতো হলো বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া জেলে আছেন। তার বিরুদ্ধে ৩৭টি মামলা। তবে দু’টি দুর্নীতির মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে তিনি কারাভোগ করছেন। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপির মতো একটি বড় দলের চেয়ারপারসন। তিনি একজন জনপ্রিয় নেত্রী। তাকে জেলে থাকতে হবে, তার মুক্তির দাবিতে দেশে প্রবল গণআন্দোলন হবে না—এটা বিএনপির বিবেচনায় ছিল না। বরং বিএনপি ভেবেছিল খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করলে, জেলে পুরলে দেশে বড় ধরনের আন্দোলন গড়ে উঠবে। দরকার হলে সহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে বাধ্য করা হবে বিএনপি নেত্রীকে মুক্তি দিতে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি।
সরকারের সঙ্গে কৌশলের খেলায় বিএনপি সব সময় পরাজিত হয়েছে। খালেদা জিয়ার ইস্যুতেও তাই হয়েছে। বিএনপি নির্বাচন প্রতিহত করা এবং সরকার পতনের সহিংস আন্দোলন করে দেশবাসীর যেমন বিরাগভাজন হয়েছে, তেমনি নিজেদের সাংগঠনিক সামর্থ্যেরও চরম অপচয় করেছে। সরকার দৃঢ়তার সঙ্গে বিএনপি এবং তার সহযোগী জামায়াতের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড মোকাবিলা করে নিজেদের সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে, আর বিএনপি-জামায়াত নিজেদের অক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে। বিএনপির শক্তি যখন তলানিতে, তখনই সরকার খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপে অগ্রসর হয়েছে।

বিএনপি ভেবেছিল, আর যাই হোক, খালেদা জিয়াকে জেলে দেওয়ার সাহস সরকার দেখাবে না। কিন্তু তারা সরকারের সবলতার জায়গাগুলো বিবেচনা না করে কতগুলো পুরনো ধারণার ওপর বিশ্বাস করে বড় বড় কথা বলেছে। রাজনৈতিক দল এবং আন্দোলন সম্পর্কে মানুষের মনে যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে, তার জন্য দায়ী মূলত বিএনপি। বিএনপির ধ্বংসাত্মক নেতিবাচক রাজনীতির কারণে মানুষের মনে প্রচলিত ধারার রাজনীতি নিয়েই যে বড় রকমের বিরূপতা তৈরি হয়েছে, সেটা আওয়ামী লীগ বুঝলেও বিএনপি বুঝতে পারেনি। বিএনপির সহজ হিসাব ছিল, বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা একবার আওয়ামী লীগের হাতে গেলে পরেরবার অবধারিতভাবেই যাবে বিএনপির কাছে। তাছাড়া বিএনপি এটাও ধরে নিয়েছিল, দেশের মানুষ বিএনপির প্রতি উদারতা দেখালেও আওয়ামী লীগের প্রতি তাদের মনোভাব ক্ষমাহীন। তাই তারা নতুন করে কোনও কৌশলের কথা ভাবেনি। হুমকিধমকির মধ্যেই নিজেদের আবদ্ধ রেখেছে।

অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ মানুষের সামনে নিয়ে এসেছে দিনবদলের বার্তা। রাজনৈতিক নীতি-কৌশলের ক্ষেত্রেও এনেছে পরিবর্তন। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদবিরোধী যে নতুন বাস্তবতা বিশ্বব্যাপী তৈরি হয়েছে, সেখানে আওয়ামী লীগ নিজেদের দ্রুত খাপ খাইয়ে নিয়েছে। সন্ত্রাস- জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে আন্তর্জাতিক আনুকূল্য অর্জনে সক্ষম হয়েছে। আর বিএনপি ওই অপশক্তির পৃষ্ঠপোষক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার শুদ্ধতা নিয়েও এখন নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। গণতন্ত্রের সঙ্গেও যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন শর্ত। ভোট নিয়ে আদিখ্যেতার চাইতে অর্থনৈতিক স্বার্থের দিকেই এখন বড় বড় দেশের বেশি আগ্রহ। আওয়ামী লীগ এসব কিছুই বিবেচনায় নিয়েছে। নির্বাচনি বৈতরণী পার হওয়ার ক্ষেত্রে একমুখী নীতি না নিয়ে তারা বহুমুখী কৌশল নিয়ে সুফল পেয়েছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায়—এই প্রচারণা আওয়ামী লীগের সরকার চালানোর জন্য বড় অন্তরায় হচ্ছে না। আওয়ামী লীগকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ার মতো রাজনৈতিক শক্তি এখন কার্যত দেশে দেখা যাচ্ছে না।
ফলে সব দিক দিয়েই দেশের রাজনীতিতে বিএনপির চেয়ে আওয়ামী লীগ সুবিধাজনক অবস্থায় আছে।

এই অবস্থায় বিএনপি দলীয় প্রধানকে কারামুক্ত করাকে দলের মুখ্য টার্গেট হিসেবে নির্ধারণ করলেও টার্গেট পূরণের কোনও দাওয়াই তাদের কাছে নেই। সরকারের সঙ্গে কোনও ধরনের সমঝোতা ছাড়া যে খালেদা জিয়ার মুক্তি সম্ভব নয়, এটা এখন সবাই বোঝেন। বিএনপি নেতারাও বোঝেন। কিন্তু কীভাবে এই সমঝোতা হবে বা হতে পারে, সেটাই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

কিছুদিন পরপর খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি সামনে আসে, এনিয়ে তুমুল আলোচনা হয়। তারপর আবার সব থিতিয়ে পড়ে। মাস কয়েক আগে গুজব রটেছিল, প্যারোলে মুক্তি নিয়ে খালেদা জিয়া ‘উন্নত’ চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাচ্ছেন। কিন্তু না, সেটা হয়নি। খালেদা জিয়া প্যারোলে মুক্তি চান না। তিনি চান জামিন। সরকারের কথা হলো, জামিন দেওয়া, না-দেওয়ার মালিক আদালত। সরকারের এক্ষেত্রে কিছুই করণীয় নেই। আইনি প্রক্রিয়াতেই খালেদা জিয়াকে জেল থেকে বের হতে হবে।

খালেদা জিয়ার অসুস্থতা নিয়েও বিএনপি শুরু থেকেই আতঙ্ক ছড়িয়ে আসছে। কিন্তু চিকিৎসকরা তার শারীরিক অবস্থাকে উদ্বেগজনক বলছেন না। ফলে অসুস্থতাজনিত কারণে খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টিও তেমন সাড়া পাচ্ছে না।
সম্প্রতি বিএনপির সাত জন সংসদ সদস্য পালাক্রমে বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থানরত খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করে সাংবাদিকদের কাছে তার মুক্তির বিষয়ে কথা বলায় আবার ইস্যুটি সামনে এসেছে। বিএনপির সংসদ সদস্য হারুনুর রশীদ বলেছিলেন, খালেদা জিয়া জামিনে মুক্তি পেলে পরের দিনই বিদেশে চলে যাবেন। তার শারীরিক অবস্থা খুব খারাপ বলেও জানানো হয়। আবার সেই একই প্রশ্ন সামনে আসে মুক্তি, কিন্তু কোন প্রক্রিয়ায়? জামিন, না প্যারোল? এই প্রশ্নে বিএনপির মধ্যেও মতভিন্নতা আছে। বিএনপির কেউ কেউ যেকোনও উপায়ে খালেদা জিয়ার মুক্তির পক্ষে। এমপিরা সম্ভবত এই পক্ষে। আবার দলের কট্টর অংশ প্যারোলে নয়, জামিনে মুক্তি চান।

সরকার খালেদা জিয়ার মুক্তির ব্যাপারে নমনীয় বলে মনে হয় না। গণমাধ্যমে খবর এসেছে, প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ব্যাপারে ‘নো কম্প্রোমাইজ’ অবস্থানেই আছেন। প্রধানমন্ত্রীর এই মনোভাব জেনেই হয়তো বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘কারও অনুকম্পায় খালেদা জিয়া মুক্ত হবেন না। জামিন পাওয়া তার হক, ন্যায্য অধিকার, সেই অধিকারেই মুক্ত হবেন।’ দেখা যাক, এই অধিকার আদায়ে বিএনপি সক্ষম হয় কিনা!

লেখক: যুগ্ম সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ