‘রাখাল বালক’ সম্রাটের জন্য দুঃখগাথা

Send
ডা. জাহেদ উর রহমান
প্রকাশিত : ১৬:৫২, অক্টোবর ০৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৫৫, অক্টোবর ০৭, ২০১৯

ডা. জাহেদ উর রহমানসম্রাট গ্রেফতার হয়েছেন—বাংলাদেশ এবার সোনার বাংলা হবেই হবে। এতদিন হতে পারেনি, কারণ সম্রাট নামের এক দানব আমাদের সব শুভ কাজে, শুভ ইচ্ছায় বাধা দিয়ে আসছিল। সেই দানবের জন্যই দেশের সব সমস্যা হতো। তার জন্যই হতো সব খুন-ধর্ষণ, ব্যাংক লুট, শেয়ারবাজার লুট। তার জন্যই মেগা প্রকল্পের নামে হয়েছে বীভৎস সব লুটপাট, যাবতীয় টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, জুয়া, এমনকি ম্যাসাজ পার্লারের নামে যৌনব্যবসা হয়েছে তার কারণেই। সম্রাট গ্রেফতার হয়েছেন, এবার আমাদের যাবতীয় সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
আমরা যখন কারও সঙ্গে যোগাযোগ করি তখন সেই যোগাযোগের ৭ শতাংশ, হ্যাঁ মাত্র ৭ শতাংশ হয় আমরা যেসব শব্দ এবং বাক্য ব্যবহার করি তার মাধ্যমে। এর সঙ্গে কণ্ঠের স্ট্রেস ও ইন্টোনেশন (এককথায় ইনফ্লেকশন) যোগ করলে যোগাযোগের পরিমাণ হয় ৪৫ শতাংশ। আর নন ভার্বাল কমিউনিকেশন (ফেসিয়াল এক্সপ্রেশন, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ) এগুলোতে থাকে বাকি ৫৫ শতাংশ যোগাযোগ।
গতকাল সম্রাট গ্রেফতার হওয়ার পরে, টিভি চ্যানেলগুলোর লাইভ, রিপোর্টিংয়ের ধরন, টিভি ক্যামেরার সামনে আওয়ামী লীগের নেতাদের প্রতিক্রিয়া এবং সর্বশেষ রাতে আওয়ামী ‘নিরপেক্ষ’ বুদ্ধিজীবীদের বিশ্লেষণ দেখে আমার শুরুর প্যারাগ্রাফের কথাগুলোই মনে হয়েছে। বলাবাহুল্য, এই কথাগুলো তারা একেবারে আক্ষরিক অর্থে বলেননি, আমি তাদের যোগাযোগের অন্যান্য বিষয় (ইনফ্লেকশন, নন-ভার্বাল কমিউনিকেশন) যোগ করে এটাই বুঝতে পেরেছি। 

এই শহরে চোখ-কান খোলা রাখা মানুষ মাত্রই সম্রাট সম্পর্কে জানে দীর্ঘদিন থেকেই। ঢাকা দক্ষিণ সিটির চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজির নেতৃত্ব সম্রাট দিতেন বলেই মানুষ জানতো। এমনকি কয়েক মাস আগে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের কাছে চাঁদা চেয়ে পত্রিকায় খবরও হয়েছিলেন তিনি। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজি নিয়ে আপাতদৃষ্টিতে সম্রাটের কোনও সমস্যা হচ্ছিল না। এরপর সম্রাট বিদেশে চলে যান। সেখান থেকে সরকারের ‘সর্বোচ্চ মহল’ ম্যানেজ করে দেশে ফিরে এসে আবার তার কাজ করে যেতে থাকেন। লক্ষণীয়, দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাধর মানুষটির বিরক্তির পরও সম্রাট তখন গ্রেফতার হননি।

সম্রাট কী করছেন, সেটা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের জানা ছিল দীর্ঘদিন থেকেই। সেটার প্রমাণ পাওয়া গতকাল‌ও। সম্রাটকে নিয়ে বিবিসি বাংলার একটি রিপোর্টে  কৃষিমন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের বেপোরোয়া কর্মকাণ্ড নিয়ে তাদের নেত্রী দীর্ঘ সময় ধরে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নিয়েছেন। এখানে কোনও সন্দেহ বা প্রশ্নের সুযোগ নেই। এক বছর আগেও প্রধানমন্ত্রী আমাকে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন সম্রাটের ব্যাপারে সজাগ থাকার জন্য। প্রধানমন্ত্রী বেশ কিছুদিন যাবতই এটি ওয়াচ করছিলেন। আমাদের বৈঠকে তিনি সুপরিকল্পিতভাবে বিষয়টি নেতাদের জানাতে চেয়েছিলেন বলে আমার কাছে মনে হয়েছে। সেই বৈঠকে তিনি কঠোর অবস্থান তুলে ধরেছিলেন।’

তবে, খুব মজার বক্তব্য আছে, বিবিসিকে দেওয়া কৃষিমন্ত্রীর  সাক্ষাৎকারের শেষাংশে। তিনি বিবিসি’র কাছে দাবি করেছেন, ‘দলে বা সহযোগী সংগঠনগুলোয় সম্রাটের পৃষ্ঠপোষক কেউ নেই এবং সম্রাটের মতোও আর কেউ নেই।’

ফেসবুকে এক অবিশ্বাস্য কাণ্ড করছেন কিছু ‘শিক্ষিত’ মানুষ। কিছুটা হেঁয়ালি করে হলেও তারা সম্রাটকে তুলনা করছেন কলম্বিয়ান ড্রাগ লর্ড পাবলো এস্কোবারের সঙ্গে। জেনে অথবা না জেনে তারা একটা মারাত্মক ভুল করছেন। এস্কোবার তার মাদক ও সন্ত্রাসের সম্রাজ্য নিজেই তৈরি করেছিলেন। তার উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষকে ঘুষ দিয়েছেন। কিন্তু তার সাম্রাজ্যে তিনি ছিলেন সর্বোচ্চ ব্যক্তি, সম্রাট। রাষ্ট্র তাকে ধরার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে, জেলে নিয়েছে, এস্কোবার আবার জেলে থেকে পালিয়েছেন, শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতেই  হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। সেখানে সম্রাট বাংলাদেশের মাফিয়াতন্ত্রের সম্রাট তো ননই, মাঝারি পর্যায়ের একজন মানুষ মাত্র।

আব্দুর রাজ্জাকের বক্তব্যে এটা স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, সরকারও প্রমাণ করতে চাইছে, সম্রাট বাংলাদেশের পাবলো এস্কোবার। তিনি স্বাধীন, সর্বোচ্চ, তার ওপরে আর কেউ নেই। 

গতকাল যখন সম্রাটকে গ্রেফতার করা হয়, তখন তার জায়গায় দাঁড়িয়ে পরিস্থিতিটা দেখার চেষ্টা করেছি। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যেসব সদস্য তাকে গ্রেফতার করেছেন, তাকে নিয়ে তার অফিসে, বাসায় অভিযান পরিচালনা করেছেন, সম্রাট তাকিয়ে দেখেছেন তাদেরই তো বটেই, তাদের অনেক বড় কর্তাকেও তিনি নিয়মিত মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়ে যেতেন কিছুদিন আগেও। পত্রিকা পড়ার বা টিভি দেখার সুযোগ থাকলে সম্রাট দেখতে পেতেন, এমন সাংবাদিকরা তার বিরুদ্ধে লাইভ করছেন, কথা বলছেন, রিপোর্ট করছেন, যাদের অনেকেই তার কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা পেতেন। সম্রাটের সবচেয়ে কষ্টের জায়গা হবে, তিনি যদি জানতেন, যে সহযোগী সংগঠনের নেতা ছিলেন তিনি, তার প্রধান ও মূল সংগঠনের আরও বড় নেতারা তার বিরুদ্ধে বিষোদগার করছেন। তার কষ্ট এই জন্যই যে, তাদের জন্যই সম্রাট কাজ করছিলেন। বেশুমার টাকা তিনি কামিয়েছিলেন সন্দেহ নেই, কিন্তু যে টাকা তার হাত দিয়ে সংগৃহীত হয়েছে, সেটার একটা ছোট ভগ্নাংশই তার কাছে ছিল। বাকি টাকা বাঁটোয়ারা হয়েছে বিভিন্ন জনের কাছে।

গোটা দেশে এই যে মাফিয়াতন্ত্র কায়েম হয়েছে, সরকারি আমলা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সরকারি দল, পুঁজিপতি, সাংবাদিক—সবাই মিলে একটা চক্র তৈরি না হলে সেটা হতে পারে না। এটুকু বোঝার জন্য খুব সামান্য কাণ্ডজ্ঞানই দরকার। 

একটি রাখাল বালক যখন গরুর পাল দিয়ে মাঠে যায়, খাওয়ায়, আবার নিয়ে ফিরে আসে, এটা দেখে তথ্য না জানা মানুষের ভুলক্রমে মনে হতেও পারে, ওই রাখাল বালকই বুঝি গরুর মালিক। জানাশোনা মানুষ জানে, রাখাল বালক একটা চাকরি করছে, গরুর পালকে আগলে রাখা, পরিচালনা করা তার দায়িত্ব, যার বিনিময় সে টাকা পাবে। 

চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজি করা মাস্তান-সন্ত্রাসীদের যে দলকে নেতৃত্ব দিতে সম্রাটকে দেখা যায়, সে দলটির মালিক সম্রাট নন। এর মালিক এই রাষ্ট্রের কায়েম হওয়া মাফিয়াতন্ত্রের অনেক উঁচু পর্যায়ের মানুষ। তাদের প্রাথমিক দায়িত্বে সম্রাট আছেন, সেই বিবেচনায় সম্রাট একজন ‘রাখাল বালকে’র চেয়ে বেশি কিছু নন। এরকম অনেক রাখালবালকই আছে বর্তমান মাফিয়াতন্ত্রে। হ্যাঁ, এটি সত্য— সম্রাটের পালটি অনেক বড় ছিল। সম্রাট একজন দক্ষ ও গুরুত্বপূর্ণ ‘রাখাল বালক’ ছিলেন। 

সম্রাট অপরাধী, খুব বড় অপরাধী—তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা এখন চেষ্টা করছে সম্রাটকে দেশের সবচেয়ে সর্বোচ্চ অপরাধী এবং দেশের প্রায় সব সংকটের মূল হিসেবে দেখাতে। এটি ভীষণ রকম ভ্রান্ত অভিযোগ। জানি না, এসব অভিযোগে সম্রাট খুশি হচ্ছেন কিনা, কারণ তিনি যা নন, তার চেয়ে অনেক বড় করে তাকে দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু তার জন্য আমার এই দুঃখ আছে—যে আকারের দানব তিনি নন, তার কপালে ঘৃণাটা কিন্তু জুটছে তার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে।

সম্রাট গান গাইছেন, এমন একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। জানি না, তিনি কবিতা পড়েন কিনা, পড়লে ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতাটা পড়া আছে কিনা। না থাকলেও তিনি শুনে থাকবেন হয়তো সেই কবিতার বিখ্যাত পঙ্‌ক্তিটি। সেই কবিতার উপেন নিরপরাধ হলেও তার গায়ে দেওয়া হয়েছিল চোরের তকমা। কিন্তু সম্রাট নিজে ‘চোর’, তার গায়ে সেই তকমা উঠলো, বাকি চোর ও মহাচোররা থেকে গেলো ‘সাধু’। তাই জানা থাকলে তার মনে এখন মাঝে মাঝেই ভেসে ওঠতে পারে সেই পঙ্‌ক্তিটি—‘‘তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ, আমি আজ চোর বটে।’

লেখক: সদস্য, স্টিয়ারিং কমিটি, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, নাগরিক ঐক্য

 

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ