স্মরণের স্বর্গে আবরার

Send
আহসান কবির
প্রকাশিত : ১৭:১৩, অক্টোবর ১০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:১৪, অক্টোবর ১০, ২০১৯

আহসান কবিরশেষ দেখা হলো আজ মর্গে!
আবরার ভাই আমার যা কিছু দুঃখভার
আমারই থাকুক
মানুষেরা তোর কথা হৃদয়ে রাখুক।
জানি না তো এরপর কোথায় বাঁধবি ঘর
কার কাছে যাবি
বিধাতার কাছে আর নেই কোনও দাবি
আমরাই রাখবো তোকে স্মরণের স্বর্গে
আবরার ভাই আমার
শেষ দেখা হলো আজ  মর্গে!

বাবার যে চওড়া কাঁধ ছোটকালে খুব প্রিয় ছিল আবরারের,শেষযাত্রায় সেই ‘প্রিয় কাঁধ’ই বেছে নিতে হলো তাকে। বাবার কাঁধ ছুঁয়ে তার হয়তো আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন জেগেছিল একদিন। শেষযাত্রায় আবরার আকাশের দিকে গেলো কিনা জানি না। গেলেও স্বপ্নময় যুবক আবরারের ভার তার বাবা বরকতউল্লাহ কাঁধে বইতে পেরেছিলেন কিনা সেটা আমাদের না জানলেও চলবে। কারণ, আমরা অন্তত কয়েক হাজার বছর ধরে জানি, সবচেয়ে ‘বেশি ভার’ বাবার কাঁধে সন্তানের লাশের। আবরারকে হারানো তার বাবার কান্নার ছবি ছড়িয়ে গেছে যোগাযোগমাধ্যমে,ছড়িয়ে গেছে মানুষের হৃদয়ে। এই ভগ্নহৃদয় সব হারানো বাবার কাছে আসেননি বুয়েটের ভিসি ড.সাইফুল ইসলাম। ড.সাইফুল ইসলাম যাননি আবরারের জানাজায়। আবরারের বাবার কাঁধে রাখেননি কোনও সহমর্মিতার হাত। কারণ, তিনি দায়িত্বশীল বাবা হতে পারেননি। (যদিও পরে তিনি আবরারের বাড়িয়ে গিয়েছিলেন। দেখা করতে পারেননি কারও সঙ্গেই।)

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হওয়ার আগে এখন ‘বাবা’ হওয়াটা জরুরি। (যদিও আবরার নিহত হওয়ার চল্লিশ ঘণ্টা পর ভিসি ড.সাইফুল ইসলাম বুয়েট ক্যাম্পাসে এসে ছাত্রদের দাবি দাওয়া আপাতত নীতিগতভাবে মেনে নিয়েছেন)।

মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত এই বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী দল আওয়ামী লীগের সমর্থক বরকতউল্লাহ। অথচ তার ছেলে আবরার ফাহাদকে মরতে হয়েছে ‘শিবির’ অপবাদ নিয়ে। শেক্সপিয়রের সেই কথাটাই মনে পড়ে দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে। কোনও হত্যা জাস্টিফাই করতে হলে তাকে অপবাদ দাও,তারপর খুন করো! (গিভ হিম আ ব্যাড নেম অ্যান্ড কিল!)। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের করা চুক্তি নিয়ে স্ট্যাটাস দেওয়ার কারণে ক্রিকেট খেলার স্ট্যাম্প দিয়ে আবরারকে নির্মমভাবে পেটানো হয়। আবরারের চিৎকারে এগিয়ে আসেনি কেউ। ‘ভাই আমি শিবির না,ভাই আমার পরিবারের সবাই আওয়ামী লীগ’-আবরারের এই আকুতি শোনেনি কেউ। মৃত্যুর আগে তাকে কেউ একফোঁটা জল খেতে দেয়নি! হত্যার পর তার লাশ ফেলে রাখা হয়েছিল সিঁড়িতে! হয়তো লাশটা গুম করে ফেলার ইচ্ছে ছিল হত্যাকারীদের। দুই-একজন দেখে ফেলায় লাশটা সিঁড়িতেই ফেলে রাখা হয়। এ দেশে মানবতা বহুদিন ধরে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে সিঁড়িতে! মানবতার কান্না তাই সহসা থামে না।

সন্তান হারানো বাবা ও মায়ের কান্নাও এ দেশে সহসা থামে না। কান্না চেপে রেখে নিজেদের এই পৃথিবী থেকে বিদায়ের প্রতীক্ষায় থাকতে হয়। দুই একদিন মিডিয়া হত্যাকাণ্ড নিয়ে সরব থাকলেও নিত্য নতুন ঘটনার ভিড়ে চাপা পড়ে যায় একদিন। যারা স্বজন হারায়, স্বপ্নভঙ্গের বেদনা আর কান্না নিয়ে বেঁচে থাকতে হয় তাদের। দীর্ঘস্থায়ী এই বেদনার কোনও উপশম নেই। আবু বকরের মা, যিনি কিনা কখনও মাথায় তেল দেননি,ডিম খাননি,গাছের নারকেল আর মুরগির ডিম বেচে টাকা পাঠাতেন আবু বকরকে,স্বপ্ন ছিল তার আবু বকর একদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবে,সেই মার স্বপ্ন ধুলোয় মিশিয়ে দেয় ছাত্রলীগের অন্তর্দ্বন্দ্ব,খুন হতে হয় আবু বকরকে। বছরের পর বছর আমরা এসব সহ্য করে আসছি!কেউ বলছে না আমাদের স্বপ্নগুলো হল দখল,খুনোখুনি আর টেন্ডারবাজির মাধ্যমে শেষ করে দেওয়া হচ্ছে,বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষাকে পণ্যে পরিণত করা হয়েছে।গত ১১ বছরে ছাত্রলীগের খুনখারাবির কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনার চুম্বক অংশ–

২০১০ সালে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে শাহ মখদুম হলের ছাদ থেকে ফেলে দেওয়া হলে ছাত্রলীগ নেতা নাসিম নাসরুল্লাহ মারা যান।১৪ জুলাই ২০১৩-তে দলীয় কোন্দলে খুন হন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাঈমুল ইসলাম। ৩১ মার্চ,২০১৪ সালে খুন হন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের আশরাফুল হক হল শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সায়াদ ইবনে মমতাজ। একই বছর ৪ এপ্রিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক রুস্তম আলি আকন্দ নিজরুমে খুন হন। তালিকার এই রিলে রেসে আরও আছেন চট্টগ্রামের লোহাগড়া উপজেলা ছাত্রলীগের নেতা তৌকির ইসলাম (ট্রেন থেকে ফেলে তাকে হত্যা করা হয়), ঢাকা মেডিক্যালের আবুল কালাম আসাদ,সিলেট মেডিক্যালের উদয়েন্দু সিংহ,জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জুবায়ের আহমেদ,রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আবদুল্লাহ আল হাসান সোহেলসহ অনেকে। ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে শিশুরাও রেহাই পায়নি। ২০১৩ সালের ১৪ জুন চট্টগ্রামের রেলওয়ের টেন্ডারবাজি নিয়ে সংঘর্ষে শিশু আরমান ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নিহত হয় শিশু রাব্বি।

ছাত্রলীগ এমন ঘটনা ঘটালেই অনেকে অতীত টেনে আনেন। আবরার হত্যাকাণ্ডের পর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেতু ও  সড়কমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ছাত্রলীগ অনেক ভালো কাজও করেছে। নিঃসন্দেহে ছাত্রলীগ অনেক ভালো কাজ করেছে। কিন্তু বর্তমান ছাত্রলীগ যদি সেসব ভালো কাজের উত্তরাধিকারীই হয় তাহলে মাত্র কয়েকদিন আগে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে তাদের পদ হারাতে হতো না। গুরুজনরা বলতেন স্নেহের মতো ভালো এবং সন্ত্রাসের মতো খারাপ দুটো জিনিসই উত্তরাধিকারের মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পরিবাহিত হয়।ভালো যা কিছু ছাত্র সংগঠনের,তা এখন সোনালি অতীত।১৯৪৭-এর দেশ বিভাগের পর থেকে স্বাধীনতার সময়কাল পর্যন্ত আন্দোলনের মাধ্যমে যা কিছু মহৎ অর্জন তার সিংহভাগ ছাত্রদের কল্যাণেই হয়েছে। শেষমেশ নব্বইয়ের গণআন্দোলন এবং এরশাদের পতনের মূলে ছিল ছাত্র সংগঠনগুলোর মিলিত সফলতা। ছাত্র আন্দোলনের এই সোনালি সময়ে কখনও কখনও তাদের স্বতন্ত্র সিদ্ধান্ত মূল দল কিংবা সরকারকেও কাঁপিয়ে দিতো,ভাবিয়ে তুলতো। সেই সময়কার স্মৃতি এখন অনেকটা শাহ আবদুল করিমের গানের মতো– আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম…।

স্বাধীনতার পর থেকেই আর ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনগুলোর ভেতর এই ‘উত্তরাধিকার’-এর প্রবণতা থাকেনি। দেশ বা সামগ্রিক লাভের চেয়ে ব্যক্তিগত লাভ বা সম্পদ অর্জন এবং ক্ষমতার হালুয়া রুটিই মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়।

১৯৭২ সালে সরকারের পক্ষে দাঁড়ায় যে ছাত্রলীগ,তার পরিচিতি হয়ে যায় মুজিববাদী ছাত্রলীগ হিসেবে।আর সরকারবিরোধী ছাত্রলীগ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)গঠন করলে দেশের রাজনীতিতে পরিবর্তন আসে। এই পরিপ্রেক্ষিতে স্বাধীনতা পরবর্তীকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হলে একসঙ্গে সাত জন ছাত্র খুন হয়েছিলেন। এই সাত খুন সারাদেশে সমালোচনার ঝড় তুলেছিল,হত্যাকাণ্ডের দায়ে জেলে যেতে হয়েছিল শফিউল আলম প্রধানকে (প্রয়াত জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক পার্টি-জাগপার নেতা। জিয়াউর রহমানের সময় তিনি মুক্তি পান।পরে বিএনপি জোটের নেতা হয়েছিলেন)। আসলে আইয়ুব খানের ছাত্র সংগঠন এনএসএফ (ন্যাশনাল স্টুডেন্ট ফেডারেশন-এর পাচপাত্তুর খোকাদের মতো পান্ডারা ক্ষমতাসীন দলকে নিরাপদ রাখতে নিজেদের যেমন লাঠিয়ালে পরিণত করেছিল,স্বাধীনতার পরে ছাত্র সংগঠনের নেতারা ক্রমশ সেই চরিত্রের দিকে ধাবিত হওয়া শুরু করেন।জিয়াউর রহমান সাহেবের সময়ে গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহার করে সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনের জন্য ছাত্রদলের নেতাদের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়া হয়েছিল। এই ধারা ক্রমশ সংগঠনগুলোকে ফ্রাংকেনস্টাইনে পরিণত করে। লেখক গবেষক মহিউদ্দীন আহমদ তার এক বইতে লিখেছেন, প্রতিষ্ঠার পর ছাত্রদল যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রথম মিছিল বের করে তখন তাদের সাহায্য করেছিল সে সময়কার ছাত্রলীগের তুমুল আলোচিত ‘মাসলম্যান’ প্রয়াত হেমায়েতউল্লাহ আওরঙ্গ,তার সহযোগী ‘মুরগি’ মিলন ও খোকন প্রমুখ। আওরঙ্গের এই নীরব সাহায্য খুব কম লোকই জানতেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, ১৯৯০ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে একসময়ের ছাত্রদলের প্রাণপুরুষ খ্যাত মাহবুবুল হক বাবলুর সহোদর সানাউল হক নীরু এবং গোলাম ফারুক অভির বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে এরশাদের সঙ্গে হাত মেলানোর এবং অভি সরাসরি অস্ত্রশস্ত্র ক্যাডার নিয়ে ছাত্র তথা জনতার মুখোমুখি দাঁড়ায় এবং ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত হয়। অভি মডেল তিন্নি হত্যা মামলায় জড়িয়ে এখন বিদেশে আছে।

আমাদের দুর্ভাগ্য স্বাধীনতা উত্তরকালে ছাত্র সংগঠগুলো দেশ আর মানুষের বিপরীতে হেঁটেছে আর মূল দল দুটো ছাত্র সংগঠনের সব ধরনের অপকর্মের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে। ফলাফল হচ্ছে শিক্ষা নামের জিনিসটা পণ্যে পরিণত হয়েছে,সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের।

যদিও আবরার হত্যার পর খুব কম সময়ের ভেতরেই অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা হয়েছে,বিচারের আওতায় আনার কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।

বিশ্ব যখন এগিয়ে চলেছে,সরকার যখন নিজেদের ডিজিটাল ঘোষণা করছে তখন ছাত্রলীগ বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বাজেট থেকে চাঁদা চাচ্ছে,ক্রিকেটের স্ট্যাম্প দিয়ে পিটিয়ে মারছে আবরারদের। গত ত্রিশ বছরে কোনও ছাত্র সংগঠনের কর্মসূচিতে কোনও স্বপ্ন পাওয়া যায়নি। কেউ বলেনি মহাশূন্যে রকেট পাঠাতে হবে। কেউ বলেনি যুদ্ধবিমান কিংবা জাহাজ আমরাই কেন তৈরি করি না। কবি শামসুর রাহমান আর মুহম্মদ জাফর ইকবাল শিখিয়েছিলেন অভিশাপ দিতে!অভিশাপেও কাজ হয় না আজকাল!

আবরারের বাবা ভরসা রেখেছেন প্রধানমন্ত্রীর ওপর। আমরাও আশা করছি সুষ্ঠু বিচারের।

লেখক: রম্যলেখক

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ