তারা কি ‘খুনি’ হতে এসেছিল?

Send
হারুন উর রশীদ
প্রকাশিত : ১২:৩৭, অক্টোবর ১১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৫৫, অক্টোবর ১১, ২০১৯

হারুন উর রশীদআবরারের জন্য শোক এখন সবখানে। আবরার হত্যার বিচারের দাবিতে উত্তাল বুয়েট ক্যাম্পাস। সারাদেশে প্রতিবাদ। খুনির ফাঁসির দাবিতে মাঠে আছেন আবরারের বন্ধুরা-সহপাঠীরা। বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরারের খুনি কারা? কাদের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ? কারা তাকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করেছে? তারা দূরের কেউ নয়। তারা কোনও ভাড়াটে খুনি নয়। নয় কোনও পেশাদার অপরাধী। তারা এই বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েটের ছাত্র। তারাও মেধাবী। আবরার যেমন সবচেয়ে ভালো সাবজেক্ট ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের (ট্রিপল-ই) ছাত্র ছিল, হত্যায় অভিযুক্তদের মধ্যেও ট্রিপল ই-এর ছাত্র আছে। আছে একই হলে আবরারের পরিচিত ছাত্র, সহপাঠী, শিক্ষার্থী। এক মেধাবীকে হত্যা করেছে কতিপয় মেধাবী। এক বিশ্ববিদ্যালয়েরই পাঠ নিচ্ছিলো নিহত আবরার ও ঘাতকরা। এই যাত্রাই ভিন্ন ফল। একজনকে পাঠানো হয়েছে পরপারে আর কয়েকজন গেছে কারাগারে। বিচারে অপরাধ প্রমাণ হলে দেশের প্রচলিত আইনে হয়তো তাদেরই কাউকে কাউকে পরপারে যেতে হবে। কিন্তু এরা সবাই দেশের শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়েছিল সেরা প্রকৌশলী হতে। দেশকে, দেশের মানুষকে, পরিবারকে কিছু দেবে বলে।

আবরার নেই। তাকে হারিয়ে পরিবার কতটা কষ্টে আছে সেটা কেবল তারাই বুঝতে পারছে। যার যায় সে-ই তা বুঝতে পারে। একটি পরিবারের স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে। দেশ আর দেশের মানুষ সম্ভাবনাময় একজন মেধাবীকে হারিয়েছে।

কিন্তু যে ১৯ জন আসামি, যারা হত্যার সঙ্গে জড়িত, যারা গ্রেফতার হয়েছে, তাদের জীবনও কিন্তু শেষ। একটি হত্যার ঘটনায় ১৯টি জীবনের সম্ভাবনাও শেষ হয়ে গেলো। তাদের পরিচয় এখন ‘খুনি’। তারা হত্যা মামলার আসামি। তারা অপরাধী। তাদের মেধাবী পরিচয় মুছে গেছে। তাদের প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে।

পরিবারও অনেক আশা নিয়ে বুয়েটের মতো শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাদের সন্তানদের পড়তে পাঠিয়েছিল। তাদেরও স্বপ্ন ছিল সন্তান প্রকৌশলী হয়ে দেশের সেবা করবে। পরিবারের হাল ধরবে। মানুষের কাজে লাগবে। তাদেরও সেই স্বপ্ন চুরমার হয়ে গেছে।

আবরারের বাবা- মা, পরিবারের সবাই যেমন শোকার্ত, বুয়েটের ওই ১৯ আসামি ছাত্রের বাবা-মাও কিন্তু এখন আশাভঙ্গের বেদনায় বেদনার্ত। তাদেরও সবকিছু এখন ফাঁকা হয়ে গেছে। তাদের সামনেও শূন্যতা। বেদনার শূন্যতা।

তারা কি খুনি হতে এসেছিল?

আবরার লাশ হওয়ার জন্য বুয়েটে ভর্তি হয়নি। আর ওই ১৯ জনও ‘খুনি’ হতে বুয়েটে ভর্তি হয়নি। তারা সবাই প্রকৌশলী হতে বুয়েটে ভর্তি হয়েছিল। কিন্তু কেন আবরার খুন হলো। ওরা খুনি হলো? ওদের মধ্যবিত্ত পরিবার তো অনেক কষ্টে তাদের এখানে পাঠিয়েছে। আর ওরাও তো ধাপে ধাপে মেধার স্বাক্ষর রেখে বুয়েটে ভর্তি হয়েছে। ওরাও তো মেধাবী। তাহলে কারা ওদের খুনের ‘শিক্ষা’ দিলো। ওদের প্রতিষ্ঠান? ওদের সংগঠন না সামাজিক কাঠামো? হবু প্রকৌশলী কেন খুনি হলো, কেন লাশ হলো? এই প্রশ্নের জবাব খোঁজা দরকার। এই প্রশ্নের মীমাংসা হওয়া দরকার। তাহলে আমরা জানতে পারবো আড়ালের খুনি কারা।

নিহতের প্রতি সহানুভূতি আর খুনির প্রতি ঘৃণা আমাদের স্বাভাবিক মানবিক অনুভূতিরই প্রকাশ। কিন্তু আবরারের জন্য আমরা যতটা কষ্ট পাচ্ছি ঠিক ততটাই কষ্ট বুয়েটের ওই ১৯ তরুণ আসামির জন্য। আবরারের পরিবারের জন্য আমার যতটা কষ্ট, ওই ১৯ তরুণের পরিবারের জন্যও আমার ততটাই কষ্ট। আসলে এখানে আবরার একা নয়, আমার কাছে মনে হয় আবরারসহ ২০ জন খুন হয়েছেন। ২০টি পরিবার খুন হয়েছে। এই খুনের দায় কাদের? তারা কি চিহ্নিত হবে? তারা কি শাস্তির আওতায় আসবে? তারা কি তাদের খুনি বানানোর কারখানা বন্ধ করবে?

কারা তাদের খুনি বানায়?

এ পর্যন্ত সংবাদমাধ্যমে যা তথ্য এসেছে তাতে একটি ফেসবুক পোস্টের কারণে আবরারকে হত্যা করা হয়েছে। আর সেই পোস্টে আবরার ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ও চুক্তির কয়েকটি বিষয় নিয়ে সমালোচনা করেছেন। সাধারণ বিবেচনায় এটা কি হত্যার কোনও কারণ হতে পারে? পারে না। কিন্তু এটাই কারণ হয়েছে। বুয়েট ছাত্রলীগের যারা তাকে হত্যা করেছে তারা এটাকে ‘মহা অপরাধ’ হিসেবে বিবেচনায় নিয়েছে। তাই তারা তার ‘বিচারের দায়িত্বও’ তাদের হাতে তুলে নিয়েছে। এই মানসিকতা নিশ্চয়ই তাদের জন্মগত নয়। তারা তাদের ‘রাজনৈতিক চর্চার’ মাধ্যমেই এটা শিখেছে। তারা হয়তো জেনেছে এর মাধ্যমে তাদের আরও ক্ষমতায়ন হবে। সংগঠনে তাদের কদর আরও বাড়বে।

আমি মনে করি না এটাই প্রথম। এর আগেও তারা আধিপত্যের কারণেই আরও অনেক নির্যাতনের ঘটনা ঘটিয়েছে, যা এখন প্রকাশ পাচ্ছে। এখন হত্যার ঘটনায় তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে। কিন্তু আমি নিশ্চিত এর আগে নির্যাতন করে বড়দের কাছ থেকে তারা বাহবা পেয়েছে। তাদের ক্ষমতা বেড়েছে। সাহস বেড়েছে। তারা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। যদি আবরার বেঁচে যেত, যদি সাধারণ ছাত্ররা সংগঠিত হতে না পারতো, তাহলে তারা ‘হিরো’ হতো।

সেই ব্যবস্থা তারা করেও রেখেছিল। পুলিশকে খবর দিয়েছিল ‘শিবির’ ধরা হয়েছে বলে। লাশ সরিয়ে ফেলার পরিকল্পনা করেছিল। পুলিশকে ঢুকতে বাধা দিয়েছিল। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ গায়েবের পাঁয়তারাও ছিল। তারা এতকিছু করার সাহস পেয়েছে ছাত্রলীগের নেতা বলেই। তারা মনে করেছেন তারাই ক্ষমতার কেন্দ্রে । তারা যা করতে চাইবে তা-ই হবে। এই ধারণার জন্ম হয়েছে বাস্তবতার কারণেই। অলীক কোনও কল্পনা থেকে নয়।

আর হল প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কী করলো? তারাও ছাত্রলীগ নেতাদের অনুগামী ছিল যতক্ষণ না সাধারণ ছাত্রদের চূড়ান্ত চাপের মুখে পড়েছে। এখানেও ওই রাজনীতি। ভিসি সাহেব তো ৩৮ ঘণ্টার আগে ঘটনাস্থল বা ক্যাম্পাসে আসার সুযোগই পেলেন না। পাওয়ার কথা নয়। কারণ, তিনি তো রাজনীতির কারণেই পদ পেয়েছেন। ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতি না করলে তো আর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হওয়া যায় না। এখানেও সেই রাজনীতির অন্ধ চক্র।

নির্যাতনের সময় সাধারণ ছাত্ররা ভীত হয়ে পড়েন। তারাও সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন। তারাও জানেন প্রতিকার পাওয়া যাবে না। কারণ, যারা নির্যাতনকারী, হত্যাকারী তারা রাজনীতির বলে বলীয়ান। আর যাদের কাছে অভিযোগ করবেন সেই শিক্ষকরাও ক্ষমতার রাজনীতি করেন। তারাও ছাত্রলীগেরই সহযোগী।

গণিত তাহলে সোজা। হিসাবে কোনও ঝামেলা নেই। আমরা সহজেই বলতে পারি কারা ছাত্রদের খুনি বানায়। কাদের কারণে ছাত্র খুন হয়। যে ছাত্রদের হাতে ছাত্ররাই খুন হয় তাদের ওপর কারা ভর করে। কিন্তু তাদের নাম আমরা বলতে পারি না। বলার সাহস অনেকেরই নেই। আমারও নেই।

লেখক: সাংবাদিক

ইমেইল:swapansg@yahoo.com

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ