নোবেলজয়ী পেটার হান্ডকে: বন্ধুকে অভিনন্দন

Send
দাউদ হায়দার
প্রকাশিত : ১৫:২২, অক্টোবর ১২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:২৪, অক্টোবর ১২, ২০১৯

দাউদ হায়দারযদি বলি বন্ধু, নিশ্চিত বাড়াবাড়ি। যদি বলি ঘনিষ্ঠ, তাও অতিরিক্ত। যদি বলি পরিচিত, কিছুটা মানানসই হয়তো। পেটার হান্ডকের সঙ্গে প্রথম আলাপ ২৮ জুলাই ১৯৮৭ সালে, পশ্চিম বার্লিনের অ্যাকাডেমি ড্যের কুনস্টের প্রেসিডেন্ট সাহিত্যিক পেটার হার্টলিঙের অফিস ঘরে। আরও কয়েকজন উপস্থিত। অ্যাকাডেমির সাহিত্য বিভাগের পরিচালক কবি কারিন কিভুস যে-বয়ানে, পরিচয় করিয়ে দেন, হুবহু মনে নেই, মর্মার্থ এই, ‘বাংলাদেশের নির্বাসিত কবি, ইন্ডিয়ায় ছিলেন, এখন আমাদের এখানে, এক বছরের জন্য গেস্ট রাইটার। আমরা অবশ্য ওঁর কোনও লেখা পড়িনি, কবিতাও নয়। অ্যাকাডেমির গেস্ট হাউজে থাকবেন।’ চিত্রকলা (আর্ট তথা ‘কুনস্ট’) বিভাগের ডিরেক্টর ভোলফগাং ফন ট্রটভাইন জানালেন, ‘এখানে থাকবেন না, গ্যুইয়েন্ট গ্রাসের বাড়িতে চলে যাবেন।’
পেটার হান্ডকে প্রত্যেককে চমকিয়ে বললেন, ‘আমি ওঁর কবিতা পড়েছি। ফোলক উন্ড ভেল্ট (পূর্ব জার্মানির প্রকাশন) থেকে প্রকাশিত ad libitum SAMMLUNG ZERSTREUUNG (১৯৮৬) দশটি কবিতা সংকলিত। কবিতার সঙ্গে অরি কার্তেয়ো ব্রেইসের ছবি (আলোকচিত্র)।’ শুনে কেউ কেউ বিস্মিত। কবিতার সঙ্গে অরি কার্তেয়ো ব্রেইসের ছবি? অরির নাম জানা ছিল, সত্যজিৎ রায়ের মুখে শুনেছিলুম। সত্যজিতের সার্টিফিকেট, ‘অরি বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফটোগ্রাফার।’

সংকলন তখনও দেখিনি, কোন দশটি কবিতা, মূল থেকে অনুবাদ, নাকি বাংলা থেকে ইংরেজি, ইংরেজি থেকে জার্মান, অনুবাদক কে, অজানা।

অ্যাকাডেমি ড্যের কুনস্টের (পূর্ব বার্লিনেও অ্যাকাডেমি ড্যের কুনস্টে, প্রেসিডেন্ট নাট্যকার হাইনার ম্যুয়েলার) স্থায়ী সদস্য ছয় জন। (যেমন ফরাসি অ্যাকাডেমিতে। কেউ মারা গেলে তাঁর শূন্যস্থানে আরেকজন।)। এঁরা ভোটে নির্বাচিত। পেটার হান্ডকে একজন। তিনি কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, নাট্য পরিচালক, অভিনেতা, সিনেমার পরিচালক, কাহিনিকার, সংলাপ লেখকও। চিত্র পরিচালক ভিম ভেন্ডারের সঙ্গে কাজও করেছেন, করেনও। আরো দুজন সদস্য আমাদের পরিচিত। চিত্রপরিচালক পেটার লিলিয়ানখেল এবং স্যামুয়েল বেকেট (নাটকে নোবেলজয়ী)। জার্মানির বাইরে থেকে একজন সদস্য নির্বাচন করতে পারে অ্যাকাডেমি। ফরাসি নাট্যকার (যদিও আইরিশ) বেকেট নির্বাচিত। একবারই তাঁকে দেখেছিলুম অ্যাকাডেমিতে। (মার্চ ১৯৮৯ সালে)।

পেটার হান্ডকের সঙ্গে কতবার দেখা, হিসেব করিনি। নানা অনুষ্ঠানে (মূলত সাহিত্য সম্মেলনে, বা উৎসবে) মোলাকাত। বছর দশেক আগে ভিয়েনায় একই অনুষ্ঠানে কবিতা পড়ি।

যতবারই দেখা, কুশল বিনিময় এবং মামুলি কথা। বার চারেক (বেশিও হতে পারে) একটু বেশি সময় কাটিয়েছি। ভারতীয় সাহিত্য নিয়ে উৎসাহী নন খুব। একবারই বলেছিলেন, ‘অমিতাভ ঘোষের ‘ক্যালকাটা ক্রোমোজম’ ভালো লেগেছে। সালমান রুশদীকে মনে করেন ভারতীয় লেখক। বৈশ্বিক নন।’

পেটার হান্ডকে রাজনীতি নিয়ে মাথা খামচান না, এই মিথ ঠিক নয়। যখন খামচান, বেশি খামচান এবং ওলোটপালোট কাণ্ড করেন। মাথার চুল ঘাড় অব্দি, ঝাঁকান সজোরে।

প্রকাশ্যে বলেন না ‘রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত’। কিন্তু ‘সোভিয়েট রাশিয়া ঘেঁষা।’ কারণও আছে হয়তো। বিশ্বযুদ্ধের সময়কালে জন্ম (৬ ডিসেম্বর ১৯৪২) ক্যেমটেনের গ্রিফিনে। বিশ্বযুদ্ধের পরে বার্লিনের পাংকোয় বাস (১৯৪৫-৪৮), ভেডিং জেলার পূর্বাংশে। এই পূর্বাংশ ছিল রাশিয়ার দখলে।

মনে রাখি, যুগোশ্লাভিয়ার সার্বিয়ায় বহু বছর কাটিয়েছেন। যুগোশ্লাভিয়ার মার্শল টিটোকে ‘দ্য গ্রেট লিডার’ বলতেন। যুগোশ্লাভ-প্রেম হাড়েমজ্জায়। সার্বিয়ার নরঘাতক স্লোবোদান মিলোসেভিচকে সমর্থন করেছেন। বিবৃতি দিয়েছেন তার পক্ষে। সার্বিয়া-কসোভোয় ন্যাটোর যুদ্ধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন, সবটাই নাকি ‘সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসন।’ রাশিয়া যেমন কয়। এও বাহ্য। মিলোসেভিচের মৃত্যু তাঁর কাছে অসহনীয়, ‘হি ওয়াজ অ্যা গ্রেট ম্যান।’ বলেছেন লেখায়।

পেটার হান্ডকে অস্ট্রিয়ান নাগরিক (মূলত জার্মান), তবে বেশির ভাগ সময় মিউনিখে বাস। জার্মানির নানা শহরে পেটারের নাটক যত মঞ্চস্থ, অস্ট্রিয়ায় নয়।

২০১৪ সালে ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় পেটারের সঙ্গে শেষ দেখা, কফি খেতে-খেতে বললুম, বাংলায় তোমার নাটক ‘কাকতাড়ুয়া’ (অনুবাদক মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। নাকি, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত—মনে পড়ছে না) এবং কবিতার বই ‘যারা কবিতা জানে না তাদের জন্যে কবিতা’ (অনুবাদক মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়) অনূদিত। ‘তাই নাকি? জানি না তো। বই চাই।’ পাঠিয়েছিলুম।

সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন পেটার, ইমেইলে অভিনন্দনপত্র লিখেছি, উত্তর পাইনি। চটজলদি উত্তর দেবেন, আশাও করি না। পেটারের একমাত্র কন্যা ওঁর সেক্রেটারি, মেয়ে নিশ্চয় মহাব্যস্ত এখন।

লেখক: কবি ও সাংবদিক

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ