সাংগঠনিক ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ: অ্যান্টিবায়োটিক সমাধান?

Send
তুষার আবদুল্লাহ
প্রকাশিত : ১৬:৪৮, অক্টোবর ১২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৫২, অক্টোবর ১২, ২০১৯

তুষার আবদুল্লাহএকজন পাঠকপ্রিয় ও প্রতিষ্ঠিত লেখক ফোন দিলেন। বললেন, কিছু হচ্ছে না লিখে। বাদ দেন লেখালেখি। জানতে চাইলাম, কিছুই কি হচ্ছে না? তিনি বলেন, আমরা কম তো লিখলাম না। ব্যক্তি ও সমাজের নৈতিক অবক্ষয়, রাজনীতির পচন, রাষ্ট্রের গণতন্ত্র থেকে কক্ষচ্যুত হওয়া—কী লিখিনি আমরা? কে শুনেছে, কে পড়েছে? বললাম,  পড়েনি, শোনেনি নিশ্চিত হলেন কী করে? তিনি বলেন, শুনলে এমন দুঃসময়ে এসে পড়তাম আমরা? কোথাও কোনও ছন্দ নেই। দেশে সংকট থাকবে না তা নয়। দেশ দুর্নীতিশূন্য হবে এমন স্বপ্নের দেশও আশা করি না। কিন্তু সব কিছুরই পরিমিতিবোধ আছে। সমাজ, রাষ্ট্রের ক্ষুদ্র একটি অংশ হয়তো শৃঙ্খলার বাইরে থাকে। তাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত করতে পারে রাষ্ট্রের আইন। সেই জায়গাটিতে বোধ হয় আমরা নেই। রাষ্ট্র বেচারা নিজেই অসহায় হয়ে পড়েছে। জানতে চাই,  সেটা কেমন?  তিনি অস্ফুট হেসে বলেন,  বুঝেও বুঝতে চাচ্ছেন না। বুয়েটে কী হলো? সেখানে তো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নেই। একপক্ষ। তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ। তারপরও দেখেন এক ব্যক্তির ভিন্নচিন্তাকে সইতে পারলো না। সবাই মিলে ঝাঁপিয়ে পড়লো। হত্যা করলো একটি চিন্তাকে। সংখ্যা গরিষ্ঠ যখন এমন একটি চিন্তাকে ভয় পায়, আতঙ্কিত হয়ে পড়ে, তখন আপনাকে বুঝতে হবে, জাতিগতভাবে আমরা কেমন পুষ্টিহীনতায় ভুগছি। ক্ষয় রোগ দেখা দিয়েছে জাতির প্রতিটি অঙ্গ-প্রতঙ্গে। জাতি হিসেবে আমরা এখন আর সুনাগরিক উৎপাদন করছি না। না পারছি শিক্ষক তৈরি করতে, না অন্য কোনও পেশার মানুষ। স্কুলছাত্র থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়—কোথাও শিক্ষা নেই। শিক্ষকরা বিপণন-কর্মী, শিক্ষার্থীরা প্রতারিত ভোক্তা। প্রতারিত, দিকভ্রান্ত এই ভোক্তারাই হন্তারকে রূপান্তরিত হচ্ছে।

সমাজ , রাষ্ট্রের স্লোগান এখন ‘দখলদার হয়ে যাও। যে যেখানে পারো পদ, পদবি, পুরস্কার, জল-স্থল-বায়ুর দখল নিয়ে নাও। দখল নিতে পারলেই তুমি আসল পুরুষ অথবা নারী।'

বললাম ‘তাহলে আপনি এগুলোর কোনোটি দখল করতে না পেরে বা আসল পুরুষ না হতে পেরেই কি আপনি হতাশ? তিনি হাসলেন, বললেন, বিষয়গুলো এত সহজ বা হালকাভাবে নিলে তো চলবে না। দুঃসময় আরও গাঢ় হচ্ছে। এখন হাত-পা গুটিয়ে বসে থেকে আর হচ্ছে না। তাকে বলি, লিখছেন তো, হাত-পা গুটিয়ে রাখলেন কোথায়? আপনার  কাজ লিখে যাওয়া। লিখে যান। আজ  না হয় আগামী দিন ফল পাবেন। আপনার লেখা তো অপুষ্পক নয়। ফুল ফুটবেই। সেই ঘ্রাণ নাগরিকদের নাসিকায় পৌঁছবেই। তার গলায় উষ্মা,  না রে ভাই। বললাম তো কিবোর্ড আর কলমের সঙ্গে এবার গলাও চড়াতে হবে। হেসে বলি, তাহলে টকশোতে নিয়মিত হচ্ছেন? তিনিও হেসে ফেলেন, মোটেও না। ওটা আরও অকার্যকর। জানতে চাই, তাহলে? তিনি বললেন, ময়দানে নামতে হবে। স্লোগান তুলতে হবে। বললাম, অনেকে তো নেমেছেন। নানা দলে আছেন। আপনি কোন দলে যাচ্ছেন? তার কণ্ঠে রাগ আরও চড়া হয়, ওদের জন্যই তো সর্বনাশ বেশি হচ্ছে। একজন রাজনৈতিক কর্মীর চেয়ে এই দুঃসময়ের জন্য তারা বেশি দায়ী। রাষ্ট্রকে, নাগরিকদের তারা ভুল গল্প শুনিয়ে মজিয়ে রাখে। জানতে চাই, তাহলে আপনি ময়দানে নেমে কী করবেন?  পাঠকপ্রিয় ওই লেখক বলেন, আন্দোলন করবো। বললাম, কার বিরুদ্ধে? তিনি বলেন, দেখুন আন্দোলন শুরু করতে হবে পেশাজীবীদের বিরুদ্ধে। রাষ্ট্রকে অচল ও দুর্নীতিগ্রস্ত করতে দলান্ধ পেশাজীবীদের ভূমিকা বেশি। আপনার, আমার কেউ বন্দনা করলে, আমরা তো খুশি হবোই তাই না? যতই তেল ছাড়া রুটির কথা বলেন, তেলভেজা পরোটা কিন্তু মজা করেই খাই আমরা। সুতরাং তেলে মজেন সবাই। তাই পেশাজীবীদের আচরণ ও বচন যদি তেলমুক্ত করতে পারি, তাহলে সংকটের অনেকটাই কমিয়ে আনা যাবে। এই ধরুন শিক্ষকরাই যদি মুখ থেকে তেল শুষে নেন, দেখবেন তারা সাধারণ ছাত্রমনস্ক হয়ে উঠেছেন। উপাচার্যদের মতো বিশেষ সংগঠন, বা মন্ত্রীমুখী হয়ে থাকবেন না তারা।

জানতে চাই, নামবেন কবে? জানালেন তিনি,  নামা তো দরকার এই মুহূর্তেই।আপাতত সমমনা মানুষ খুঁজছি। বললাম, সমমনা নাকি সহমত? লেখক জোর গলায় বললেন, সহমত ইয়াবার মতোই এক মাদক। ওই মাদকমুক্ত হলে তর্ক করার মানুষ লাগবে, দরকার প্রশ্ন করার মতো মানুষ। অমন মানুষ পেলে জানাবেন। পাঠক প্রিয় লেখক ভাবনায় ফেলে দিলেন। এই মহল্লায় প্রশ্ন করার মানুষ কোথায় পাই?

সেই মানুষ খুঁজতে শুরুর আগেই খবর এলো, বুয়েটে সাংগঠনিক ছাত্র রাজনীতি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সঙ্গে শিক্ষক রাজনীতি। ফিরতি ফোন দিলাম পাঠকপ্রিয় সেই লেখককে। জানতে চাইলাম খবরটি তিনিও পেয়েছেন কিনা? তিনি জানালেন, এটা কোনও সমাধান নয়। বরং ষড়যন্ত্র। ছাত্ররা আদর্শিক রাজনীতি করবেন। তাদের লেজ না বানানোতেই সমস্যা। লেখক বললেন, ছাত্ররা রাজনীতি না করলে নেতা তৈরি হবে কী করে? এই যে দুঃসময়ে আছি, তা তো নেতাহীনতার কারণেই। তিনি জানান,  এটা অ্যান্টিবায়োটিক হলো, সুচিকিৎসা হলো না।

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি

 

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ