কলঙ্ক নয়, ছাত্রলীগের গৌরবের চাঁদে গ্রহণ লেগেছে

Send
প্রভাষ আমিন
প্রকাশিত : ১৪:২৮, অক্টোবর ১৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৫৬, অক্টোবর ১৩, ২০১৯

প্রভাষ আমিনবাংলা ট্রিবিউনে সর্বশেষ প্রকাশিত ‘দল, সরকার, রাষ্ট্র মিলেমিশে একাকার’ শিরোনামের কলামে লিখেছিলাম, ‘এভাবেই একের পর এক ভেঙে পড়ে আমাদের সব প্রতিষ্ঠান। সবাই নিজেদের সীমাটা ভুলে যাই। সে কারণেই রাজনীতিবিদের কাজ করে পুলিশ, পুলিশের কাজ করে ছাত্রলীগ। এই সংমিশ্রণ প্রক্রিয়ায় সরকার আর রাষ্ট্রও এক হয়ে গেছে। রাষ্ট্রের বিরোধিতা করাটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আর সরকারের বিরোধিতা গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু ইদানীং বাংলাদেশে সরকারের বিরোধিতাকেই রাষ্ট্র বিরোধিতার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হচ্ছে। সরকারের বিরুদ্ধে কিছু বললেই রাষ্ট্র বিরোধিতার মামলা হয়। অথচ একসময় এই বাংলাদেশেই রাজনৈতিক বিরোধিতার চমৎকার সব শৈল্পিক নিদর্শন ছিল। এক শিশির ভট্টাচার্য শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া আর এরশাদের কত কার্টুন করেছেন; তার কোনও ইয়ত্তা নেই।’
ভিন্নমতের ব্যাপারে আমাদের যে জিরো টলারেন্স, পুলিশের কাজ যে ছাত্রলীগ করছে; এটা নতুন করে প্রমাণ করতে ছাত্রলীগ কয়েক ঘণ্টা মাত্র সময় নিয়েছে। গত রবিবার রাতেই বুয়েটের ছাত্রলীগ নেতারা ভিন্নমত প্রকাশের অপরাধে আবরার ফাহাদ নামে এক ছেলেকে ডেকে নিয়ে টানা সাত ঘণ্টা পিটিয়ে মেরে ফেলেছে। আবরার ফেসবুকে যা লিখেছে, সেটি অপরাধ কিনা, তা কিন্তু ছাত্রলীগের বিবেচনা করার কথা নয়; সেটা দেখার জন্য পুলিশ আছে। ছাত্রলীগ বড়জোর সেটা পুলিশকে জানাতে পারতো, ছাত্রলীগের কেউ বাদী হয়ে মামলা করতে পারতো। পুলিশ তদন্ত করবে, আদালত বিচার করবে। কিন্তু সেটা না করে ছাত্রলীগ তাকে ধরে নিয়ে তার ফেসবুক-মেসেঞ্জার চেক করেছে, তাকে জেরা করেছে এবং পিটিয়ে মেরেছে। আমার কাছে তার আলোচিত ফেসবুক স্ট্যাটাসটিকে অপরাধমূলক তো নয়ই, বিদ্বেষমূলকও মনে হয়নি। কেউ কেউ বলছেন, আবরারের স্ট্যাটাসের তথ্য সঠিক নয়।

যদি সেটা নাও হয়, তাহলে ছাত্রলীগ বা অন্য কেউ সঠিক তথ্য তুলে ধরে আবরারের মতের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করতে পারতো। কিন্তু মতের সঙ্গে না মিললেই গালি, হামলা, পিটিয়ে মেরে ফেলার যে ভয়ঙ্কর সংস্কৃতি আমরা গড়ে তুলছি, তা সবার জন্যই বিপজ্জনক।

পুলিশ কি নিজেদের বিবেচনা অনুযায়ী কাজ করে, নাকি ছাত্রলীগের নির্দেশে? আবরার হত্যার পর এই প্রশ্নও সামনে এসেছে। রবিবার রাত দেড়টার দিকে খবর পেয়ে পুলিশের একটি টহল দল শেরে বাংলা হলে গিয়েছিলও। ‘শিবির ধরা হয়েছে, নিয়ে যান’—ছাত্রলীগই পুলিশকে এই খবর দিয়েছিল। কিন্তু আবরারের অবস্থা খারাপ হওয়ায় বুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রাসেল পুলিশকে ভেতরে ঢুকতে দেয়নি। অভ্যর্থনা কক্ষে কিছুক্ষণ বসিয়ে রেখে বিদায় করে দেয়। পরে খবর পেয়ে পুলিশ এসে লাশ উদ্ধার করে নিয়ে যায়। পুলিশ যদি ছাত্রলীগের কথা না শুনে রাত দেড়টাতেই ভেতরে ঢুকে তল্লাশি চালাতো, তাহলে হয়তো আবরার বেঁচে যেতো।

ছাত্রলীগ যতদিন নিজেদের কাজটা ঠিকভাবে না করবে, পুলিশ যতদিন ছাত্রলীগের দিকে তাকিয়ে না থেকে নিজেদের দায়িত্বটা নিজেরা পালন না করবে; ততদিন আইনের শাসনে ফিরবে না দেশ।

আবরার হত্যার ঘটনায় বহুমুখী ক্ষতি হয়েছে আমাদের। মেধাবী ছেলেরা ভেতরে ভেতরে কতটা দানব হতে পারে, তা দেখে চমকে উঠেছে গোটা দেশ। দাবি উঠেছে ছাত্র রাজনীতি বন্ধের। বিপুল ঐতিহ্যের ধারক যেই সংগঠন, সেই ছাত্রলীগের ভাবমূর্তি আজ তলানিতে ঠেকেছে। ‘শিবির সন্দেহে পেটানো’, দিনের পর দিন এই যুক্তি সন্ত্রাসী সংগঠন ছাত্রশিবিরের প্রতি একধরনের সহানুভূতি তৈরি করেছে।

এমনকি আবরার হত্যার প্রতিবাদ জানানোর সুযোগে ছাত্রশিবির অনেকদিন পর রাজপথে মিছিল করার সুযোগ পেয়েছে। আবরার হত্যার বিচার, হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি অবশ্যই চাই। দাবি জানানোর আগেই দলের দিকে না তাকিয়ে আসামিদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। তবে আমাদের সাবধান থাকতে হবে, আবরার হত্যার বিচারের দাবির সুযোগে যেন কোনও অপশক্তি নতুন করে মাঠে নামার সুযোগ না পায়।

আবরার হত্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে সরকারের, দেশের আর চলমান শুদ্ধি অভিযানের। টানা তৃতীয়বার ক্ষমতায় থাকায় আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় জমেছে। আওয়ামী লীগ এবং এর বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানের নেতাকর্মীদের অনেকের বিরুদ্ধেই নানান অনিয়মে সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে।

অনেকেই তা জানতেন। কিন্তু সরকারি দলের প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস কারও ছিল না। যার আছে, তিনিই খুলেছেন—প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তিনি দলের ভেতরেই অভাবনীয় এক শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছেন। এ অভিযান আতঙ্ক ছড়িয়েছে দলের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা দুর্নীতিবাজদের মধ্যেও। আর চলমান শুদ্ধি অভিযান শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তাকে আবারও আকাশে তুলে দিয়েছে। সব মহলের মানুষ শেখ হাসিনার এই সাহসী উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন। শেখ হাসিনার এই অভিযান শুরু হয়েছিল চাঁদাবাজির অভিযোগে ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের অপসারণের মধ্য দিয়ে। কিন্তু বুয়েটের শেরেবাংলা হলের ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের এই নিষ্ঠুরতা আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তিকে আবারও ঝুঁকির মুখে ফেলে দিলো। আমার অবাক লাগে, শেখ হাসিনার এই অভিযানের মধ্যেও ছাত্রলীগের ছেলেরা এত বড় সাহস পেলো কোত্থেকে?

ছাত্রলীগের অপকর্ম আর নিষ্ঠুরতা এবারই প্রথম নয়। এর আগে কিছু হলে প্রথমে অস্বীকার করতো। না পারলে নামকাওয়াস্তে বহিষ্কার করতো। এবারই প্রথম ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ বা সরকারের কেউ এ ধরনের কিছু করেননি। সবাই অভিন্ন কণ্ঠে আবরার হত্যার নিন্দা করেছেন এবং দলের ঊর্ধ্বে ওঠে বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন। এর বড় প্রমাণ হলো, আবরার হত্যার ঘটনা জানাজানি হতে না হতেই ছাত্রলীগের ১০ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বিচারের আশ্বাসের পাশাপাশি বলেছেন, ‘গুটিকয়েক লোকের কারণে আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগের অর্জন ম্লান হয়ে যেতে পারে না।’ ওবায়দুল কাদের একসময় ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। তাই ছাত্রলীগের প্রতি তার একটু বাড়তি মমতা থাকতেই পারে। তিনি আরো বলেছেন, ‘ছাত্রলীগ অনেক ভালো কাজ করেছে। চাঁদের গায়েও কলঙ্ক আছে।’ ছাত্রলীগ যে অতীতে অনেক ভালো কাজ করেছে, সেটা আমরা জানি। ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭০-এর নির্বাচন, ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ’৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ছাত্রলীগের ভূমিকা গৌরবের। বলা যায়, ছাত্রলীগের ইতিহাস বাংলাদেশের ইতিহাসের সমান্তরাল। কিন্তু গত ১১ বছরে হত্যা, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, টেন্ডারবাজি হেন কোনও অপরাধ নেই, যা ছাত্রলীগ করেনি।

তাই তাদের অপরাধকে নিছক চাঁদের কলঙ্ক বলে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। একের পর এক অপরাধে ছাত্রলীগের গৌরবের চাঁদে গ্রহণ লেগেছে। রাহুমুক্ত করে ছাত্রলীগকে আবার গৌরবের ধারায় ফেরাতে আরো কঠোর শুদ্ধি অভিযান লাগবে।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ