দুর্নীতি, জুয়া, মাদক ও ব্যভিচারের বিরুদ্ধে লড়াই

Send
মো. জাকির হোসেন
প্রকাশিত : ১৩:৫৮, অক্টোবর ১৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:২৩, অক্টোবর ১৪, ২০১৯

মো. জাকির হোসেনদুর্নীতি, জুয়া, মাদক ও ব্যভিচার বাংলাদেশের অতি পুরনো ও জটিল সমস্যা। ভারতীয় উপমহাদেশের অংশ হিসেবে তৎকালীন পূর্ববাংলায় এ সমস্যা প্রকটভাবেই ছিল। ৪৭-এ উপমহাদেশ বিভক্তির পরও ছিল। আর স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরও লড়াই চলছে দুর্নীতি, জুয়া, মাদক ও ব্যভিচারের বিরুদ্ধে। ভারতের মেকিয়াভ্যালি খ্যাত কৌটিল্য-র কালোত্তীর্ণ গ্রন্থ ‘অর্থশাস্ত্র’-এর বয়ান অনুযায়ী আমাদের দুর্নীতির বয়স কম করে হলেও ২ হাজার ৩১৮ বছর। কৌটিল্য লিখেছেন,‘সব উদ্যোগ নির্ভর করে অর্থের ওপর। সেজন্য সবচেয়ে অধিক মনোযোগ দেওয়া উচিত খাজাঞ্চিখানার দিকে। তহবিল তসরুফ বা অর্থ আত্মসাতের চল্লিশটি পদ্ধতি আছে। জিহ্বার ডগায় মধু বা বিষ রেখে তার স্বাদ আস্বাদন না করে থাকা যেমন অসম্ভব, তেমনি কোনও রাজকর্মচারীর পক্ষে সরকারের অর্থ একটুকুও চেখে না দেখে থাকা অসম্ভব ব্যাপার। পানিতে বিচরণরত মাছ কখন পানি পান করে তা জানা যেমন অসম্ভব, অনুরুপ রাজ কর্মচারীর তহবিল তসরুফ নির্ণয়ও অসম্ভব’। খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০অব্দে সংকলিত মনুস্মৃতির সপ্তম অধ্যায়ে মনু-র আইনের ১২৪ নং বিধিতে দুর্নীতি বিষয়ে বলা হয়েছে ‘রাজার দায়িত্ব হলো, যে সব অপরাধপ্রবণ কর্মচারী মামলার বিভিন্ন পক্ষ থেকে উৎকোচ গ্রহণ করেন, তাদের নির্বাসনে পাঠিয়ে দেওয়া ও তাদের সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা’। ষোলো শতকের কবি মুকুন্দরামের কবিতায় রাজস্ব কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ও মলুয়া লোকগীতিতে কাজির (বিচারকের) দুর্নীতি বিষয়ে উদ্ধৃতি রয়েছে।

যিশু খ্রিষ্টের জন্মের ৩০০০ বছর আগে ইরাক, সিরিয়া, তুরস্কের বিভিন্ন জায়গায় বাজি খেলা ও ছোট ছোট গুটি আকৃতির বস্তু দিয়ে যে জুয়ার প্রচলন, তাই এখন রূপ পাল্টে ক্যাসিনো নাম ধারণ করেছে। অনেকটা গ্রমাঞ্চলের ‘আন্ডা ভাজা’-র শহুরে নাম ‘ওমলেট’ এর মতো। ‘মহাভারত’-এ জানা যায় প্রাচীন ভারতে জুয়া খেলা বেশ জনপ্রিয় ছিল। বর্তমানে আন্তর্জাতিকভাবে জুয়া একটি বড় বাজার দখল করে আছে। একটি পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৬ সালের হিসাব অনুযায়ী বিশ্বে ৪ হাজার ৫০০ কোটি ইউএস ডলার পরিমাণ অর্থ জুয়া খেলায় ব্যবহৃত হয়েছে, যা ২০১৯-এর শেষে ৪ হাজার ৯৫০ কোটি মার্কিন ডলারে এসে দাঁড়াবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এদেশে মাদকের ব্যবহারও অনেক প্রাচীন। আফিম, গাঁজা, ভাং, ভাত পচিয়ে চুয়ানি, খেজুর ও তালের রসের তাড়ি মাদক হিসেবে ব্যবহার করতো মানুষ। কিন্তু এর ব্যবহার ছিল অতি সীমিত। বাণিজ্যিকভিত্তিতে এসবের বাজারজাত-বিপণন হতো না। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সময় এর বিস্তার ঘটে। ইংল্যান্ড থেকে মদ আমদানি করা হয়। ইংরেজদের বদন্যতায় গড়ে ওঠা এ দেশীয় ধনিক, বণিক, আমলা, মুৎসুদ্দী, ভূ-স্বামী, জমিদার শ্রেণি ইংরেজদের জীবনযাত্রার অনুকরণে মদ্যপানে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। ইংরেজরা আইন করে শহর, নগর, বন্দর এলাকায় আ্যালকোহল ও অন্যান্য মাদক উৎপাদন, বাজারজাতকরণ ও বিপণন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে। তৎকালীন পূর্ববঙ্গের কুষ্টিয়ায় কেরু অ্যান্ড কোম্পানি নামে একটি অ্যালকোহল কারখানা প্রতিষ্ঠা করা হয়।

অনেকেই মনে করেন ইংরেজরা এ দেশের মানুষের চরিত্রহননের জন্য মাদকের পাশাপাশি যৌনপল্লি প্রতিষ্ঠা করে। প্রকৃতপক্ষে ইংরেজরা এ দেশে আসার অনেক আগে থেকেই প্রাচীন ভারতে, ধনিক শ্রেণির মধ্যে একটি রীতি প্রচলিত ছিল, তারা ‘নগরবধূদের’ নৃত্যগীতের জন্য আহ্বান জানাতো। আচার্য্য চতুর্সেন বিরচিত ‘বৈশালী কি নগরবধূ’-তে এবং খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় অব্দে শূদ্রক বিরচিত ধ্রুপদী সংস্কৃত নাটক ‘মৃচ্ছকটিক’-এ ওই যুগের যৌনকর্মীদের উদাহরণ মেলে। গৌতমবুদ্ধের শিষ্যা আম্রপালীও শিষ্য হওয়ার আগের জীবনে যৌনকর্মী ছিলেন। তবে, এ কথা সত্য যে, আঠারো শতকের শেষে ও উনিশ শতকের শুরুতে ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন আমলে, ব্রিটিশ সৈন্যদের মাধ্যমে যৌনপল্লির দ্রুত বিস্তার ঘটে। বিবিসি’র একটি নিবন্ধ জানাচ্ছে, ব্রিটিশ সৈন্যরা ভারতের বিভিন্ন শহরজুড়ে  যৌনপল্লি তৈরি করতে সাহায্য করেছিল। অতীতের যৌনকর্মীদের বর্তমান পোশাকি নাম এসকর্ট সার্ভিস, কল গার্ল, সোসাইটি গার্ল, ডেটিং পার্টনার, ডিজে পার্টি পার্টনার, কিছু ক্ষেত্রে স্পা-কর্মী, ম্যাসেজ পার্লারকর্মী ইত্যাদি।

বাঙালির অতল ভালোবাসার মানুষ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে ফিরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা গ্রহণের তিন দিনের মধ্যেই ১৫ জানুয়ারি ১৯৭২ সনে এক সরকারি অদেশের মাধ্যমে দেশে মদ, জুয়া, হাউজি, ঘোড়া দৌড় নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। সরকারি আদেশে মদ, জুয়া নিষিদ্ধ করেই ক্ষান্ত হননি বঙ্গবন্ধু। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানে জুয়া, মাদক, ব্যাভিচার ও দুর্নীতির  বিরুদ্ধে বিধান সংযোজন করেন। সংবিধানের ১৮ (১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘জনগণের পুষ্টির স্তর-উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতিসাধনকে রাষ্ট্র অন্যতম প্রাথমিক কর্তব্য বলিয়া গণ্য করিবেন এবং বিশেষত আরোগ্যের প্রয়োজন কিংবা আইনের দ্বারা নির্দিষ্ট অন্যবিধ প্রয়োজন ব্যতিত মদ্য ও অন্যান্য মাদক পানীয় এবং স্বাস্থ্যহানিকর ভেষজের ব্যবহার নিষিদ্ধকরণের জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন৷’ অন্যদিকে যৌনকর্ম  ও জুয়াখেলা বন্ধ করতে ১৮ (২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘গণিকাবৃত্তি ও জুয়াখেলা নিরোধের জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।’  দুর্নীতির বিরুদ্ধে বাংলাদেশের অবস্থান বিষয়ে সংবিধানের ২০ (১) অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে, ‘‘কর্ম হইতেছে কর্মক্ষম প্রত্যেক নাগরিকের পক্ষে অধিকার, কর্তব্য ও সম্মানের বিষয়, এবং ‘প্রত্যেকের নিকট হইতে যোগ্যতানুসারে ও প্রত্যেককে কর্মানুযায়ী’-এই নীতির ভিত্তিতে প্রত্যেকে স্বীয় কর্মের জন্য পারিশ্রমিক লাভ করিবেন।’ আর একই অনুচ্ছেদে অবৈধ পন্থায় অর্জিত আয়ের বিষয়ে সুস্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্র এমন অবস্থা সৃষ্টির চেষ্টা করিবেন, যেখানে সাধারণ নীতি হিসেবে কোনও ব্যক্তি অনুপার্জিত আয় ভোগ করিতে সমর্থ হইবেন না এবং যেখানে বুদ্ধিবৃত্তিমূলক ও কায়িক-সকল প্রকার শ্রম সৃষ্টিধর্মী প্রয়াসের ও মানবিক ব্যক্তিত্বের পূর্ণতর অভিব্যক্তিতে পরিণত হইবে।’ মাদক, জুয়ার পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু দুর্নীতির বিরুদ্ধেও শক্ত অবস্থান গ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ দুর্নীতিবাজদের খতম করার আহ্বান জানিয়ে জনগণের উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘দুর্নীতিবাজদের বাংলার মাটি থেকে উৎখাত করতে হবে। আইন চালাবো। ক্ষমা করবো না। যাকে পাবো, ছাড়বো না। ঘরে ঘরে আপনাদের দুর্গ গড়তে হবে। সে দুর্গ হবে দুর্নীতিবাজদের খতম করার দুর্গ।’ দুর্নীতর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ হিসাবে বঙ্গবন্ধু নিজ দলের  ২৩ জন গণপরিষদ সদস্যকে (এমসিএ) বহিষ্কার করেন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধের পরিসমাপ্তির আগেই দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নির্মমভাবে নিহত হন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর মদ, জুয়ার নজিরবিহীন বিস্তার ঘটে। ‘মানি ইজ নো প্রবলেম’ রাজনীতির নিয়ামক হয়ে দেশ দুর্নীতির অভয়াঞ্চল হয়ে ওঠে। রাজনীতিবিদদের কেনা-বেছা আর আদর্শের বস্ত্রহরণের রাজনীতির নতুন যুগের সূচনা হয়। রাজনীতি কলুষিত হয়ে রাজনীতিকদের মাঝে লোভ-লালসা জন্ম নেয়। আর এভাবে রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়নের শুরু হয়। রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়নের ধারাবাহিকতায় দুর্নীতিপরায়ণ রাজনীতিবিদদের অনেকেই টাকা দিয়ে পদ-পদবি কিনে বিএনপি, জামায়াত, ফ্রিডম পার্টি হয়ে আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশ করেছে। ছাত্রলীগ-যুবলীগের কতিপয় লোভী নেতার হাত ধরে আওয়ামী লীগের ছাত্র ও যুব সংগঠন এখন হাইব্রিডদের দখলে। বঙ্গবন্ধুর ত্যাগী, আদর্শবান সৈনিকদের বদলে এখন নব্য বঙ্গবন্ধু সৈনিকদের রমরমা বাজার। এদের দুর্বৃত্তপনা ও অপরাধমূলক কার্যকলাপে বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া সংগঠন এখন প্রশ্নবিদ্ধ। বঙ্গবন্ধু-কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাজনীতিতে শুদ্ধাচার ফিরিয়ে আনতে দুর্নীতি, জুয়া, মাদক ও ব্যাভিচারের বিরুদ্ধে বাবার সমাপ্ত লড়াই শুরু করেছেন। এই লড়াই কেবল একজন শেখ হাসিনা, একটি সরকার বা দলের নয়। এ লড়াই ১৬ কোটি মানুষের কল্যাণের জন্য। রাজনীতির শুদ্ধতার জন্য। এ লড়াই বাংলাদেশের জন্য। যারা দাবি করেন, এ দেশের মানুষের জন্য তথা বাংলাদেশের জন্য রাজনীতি করেন, তাদের সবাইকে এ লড়াইয়ে শামিল হতে হবে। যারা নিজেদের বঙ্গবন্ধুর সৈনিক দাবি করেন, তারা বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত যুদ্ধে শামিল না হলে বঙ্গবন্ধুর সৈনিক হবেন কীভাবে?

দুর্নীতি, জুয়া, মাদকের বিরুদ্ধে চলমান সাহসী যুদ্ধে সমর্থন জোগানোর পরিবর্তে বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি করেছে। দুর্নীতির অভিযোগে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের গ্রেফতারের ঘটনার দায় নিয়ে সরকারের পদত্যাগ দাবি করেছে বিএনপি। ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের দুর্নীতি-অপরাধে সম্পৃক্ততার কারণে বিএনপির পদত্যাগের দাবির নৈতিক অধিকার কতটুকু? বিএনপি শাসনামলে এ দেশ দুর্নীতিতে পর-পর ৫ বার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। বিএনপির সভানেত্রী, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানসহ শীর্ষ নেতাদের অনেকেই দুর্নীতির দায়ে দণ্ডিত। চুরির সম্পদ পুনরুদ্ধার উদ্যোগের (Stolen Asset Recovery Initiative, StAR) আওতায় বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের অপরাধ বিষয়ক সংস্থা UNODC-এর যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত Asset Recovery Handbook-এর ৫৩ ও ১৯৬ পৃষ্ঠায় বিএনপি নেত্রীর সন্তানের ঘুষগ্রহণ ও সিঙ্গাপুরে অর্থপাচারের কথা উল্লেখ রয়েছে।  

উল্লেখ্য, বিএনপি নেত্রীর ছেলেকে ঘুষ দেওয়ার দায়ে জার্মান বহুজাতিক কোম্পানি সিমেন্স এজি যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয়েছে। আর পাচার করা অর্থ রাখা এবং এ বিষয়ে দুর্নীতি তদন্তকারী কর্তৃপক্ষকে না জানানোর অপরাধে সিঙ্গাপুরের আদালত সিঙ্গাপুরের নাগরিক লিম ইউ চ্যাংকে নয় হাজার সিঙ্গাপুরি ডলার অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করেছেন। বাংলাদেশের আদালত ঘুষ ও অর্থপাচারের এ মামলায় খালেদা জিয়ার সন্তানকে ছয় বছরের কারাদণ্ড এবং ৩৮ কোটি ৮৩ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করেন। সিঙ্গাপুরের ইউনাইটেড ওভারসিজ ব্যাংকে জমা হওয়া পাচারকৃত অর্থ দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিতে ফেরতও আনা হয়েছে। সব মিলিয়ে তিন দফায় ২০ কোটি ৮৮ লাখ ৭০ হাজার টাকার সমপরিমাণ বিদেশি মুদ্রা দেশে ফেরত আনা হয়েছে। ঐক্যফ্রন্টের উদ্যোক্তা  বঙ্গবন্ধুর সৈনিক দাবিদার গণফোরাম নেতা ড. কামাল হোসেন ও সুলতান মোহাম্মদ মনসুর তো মদ, জুয়া, দুর্নীতির বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত যুদ্ধে শামিল হতে নৈতিকভাবে দায়বদ্ধ।

ইসলাম ধর্মে মদ, জুয়া, দুর্নীতি, ব্যভিচার কেবল নিষিদ্ধই নয়, এসবের বিরুদ্ধে মারাত্মক হুঁশিয়ারিও উচ্চারিত হয়েছে পবিত্র কুরআন ও হাদিসে। রাসুল (স.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক নেশাদার বস্তুই মদ আর সব ধরনের মদই হারাম।’ (বুখারি, মুসলিম) রাসুল (স.) মানুষকে ভয় দেখিয়ে বলেন, ‘তিন ব্যক্তির ওপর আল্লাহ জান্নাত হারাম করেছেন—এক. মাদকাসক্ত দুই. পিতা-মাতার অবাধ্য, তিন. দাইয়ুস অর্থাৎ যে ব্যক্তি নিজের পরিবারের অশ্লীলতা মেনে নেয়’।(মুসনাদে আহমদ) ইসলামে মদ পান দূরে থাক, মদ পরিবেশনার বৈঠকে বসতেও নিষেধ করা হয়েছে। রাসুল (স.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি বিশ্বাস রাখে সে যেন এমন খাবারের বৈঠকে না বসে যেখানে মদ পরিবেশন করা হয়।’ (মুসনাদে আহমদ) সমাজ থেকে মাদক নির্মূলে সুস্পষ্ট ঘোষণা দিয়ে রাসুল (স.) বলেন, ‘মদ, তা পানকারী, পরিবেশনকারী, বিক্রেতা, ক্রেতা, উৎপাদনকারী ও শোধনকারী, যে উৎপাদন করায়, সরবরাহকারী এবং যার জন্য সরবারাহ করা হয়—এদের সবাইকে আল্লাহ অভিশাপ করেন।’ (আবুদাউদ)। ইসলামে ব্যাভিচারের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত ঘোষণা করা হয়েছে। ব্যাভিচারী ও মদ্যপানকারী মুমিন থাকে না বলে ইসলামে সাবধান করা হয়েছে।  হজরত আবু হুরায়রা (র.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (স.) বলেছেন, ‘জিনাকারী ব্যক্তি জিনারত অবস্থায় মুমিন থাকে না এবং মদ্যপানকারী যখন মদ পান করে, তখন সে মুমিন থাকে না।’ (বুখারি ও মুসলিম)। ইসলামের বিধিবদ্ধ ইবাদত তথা নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত প্রভৃতি কবুল হওয়ার পূর্বশর্তই হলো সৎ পথে উপার্জন। দুর্নীতির বিষয়ে কঠিন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে ইসলামে। হজরত জাবির (র.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, ‘রাসুল (স.) বলেছেন, ‘যে দেহের গোশত হারাম উপার্জনের খাদ্য দ্বারা গঠিত, তা বেহেশতে প্রবেশ করবে না। হারাম খাদ্য উপার্জনের খাদ্য দ্বারা গঠিত দেহের জন্য জাহান্নামের আগুনই উত্তম।’ (মেশকাত)। আমাদের আলেমদের মধ্যে যারা দুর্নীতি, জুয়া, মদ ও ব্যাভিচারের বিরুদ্ধে মানুষকে আল্লাহর পথে আহ্বান করছেন, তাদের ঈমানি দায়িত্ব দুর্নীতি, জুয়া, মাদক আর ব্যাভিচারের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর শুদ্ধি অভিযানে শামিল হওয়া।

নানা অজুহতের ধুয়া তুলে দুর্নীতি, জুয়া, মাদক ও ব্যাভিচারের বিরুদ্ধে চলমান লড়াইয়ের বিরোধিতা না করে আসুন আমরা যে যার জায়গা থেকে সমর্থন জোগাই, শরিক হই। দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতির শুদ্ধিকরণের এ লড়াই মুখ থুবড়ে পড়লে গভীর তিমিরে ডুবে যাবে বাংলাদেশ। আর রাজনীতির শাপমুক্তির এ লড়াই সফল হলে জয়ী হবে বাংলাদেশ। জিতে যাবে এ দেশের মানুষ।

লেখক: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ই-মেইল: zhossain1965@gmail.com

 

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ