সময় এখন চিন্তা সংস্কারের

Send
ড. জেবউননেছা
প্রকাশিত : ১৫:৫৭, অক্টোবর ১৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:০০, অক্টোবর ১৫, ২০১৯

ড. জেবউননেছাএই লেখার শুরুতেই একটু পেছনের দিকে যাবো। এ বছর রাজধানীতে ঈদুল ফিতরের পরদিন মুভি দেখতে গিয়েছিলাম সিনেমা হলে। টিকিট কাউন্টারে যাওয়ার আগেই কানে এলো ৫ টা ৪০ মিনিটের শো’র টিকিট লাগলে নিন। আমরা না শোনার ভান করে টিকিট কাউন্টারে গিয়ে জানতে চাইলাম, ৫ টা ৪০ মিনিটের শো’র টিকিট আছে? তারা জানালো, নেই। তখন ঘড়িতে ৪ টা ২০ মিনিট। আমরা বের হয়ে যে, দুজন টিকিট বিক্রি করছে, তাদের কাছে গিয়ে বললাম, টিকিট আছে? তারা বলল আছে, তবে বেশি মূল্যে কিনতে হবে। কী আর করা। নিরুপায় হয়ে বেশি মূল্যেই টিকিট কিনে হলে ঢুকলাম। এর আগে কাউন্টারের সামনে ইচ্ছে করেই দাঁড়ালাম। দেখলাম অনেক মানুষ টিকিট না পেয়ে ফিরে যাচ্ছে। পাঁচ জন তরুণ ৫টা ৪০ মিনিটের টিকিট না পেয়ে রাত ৮ টায় সিনেমা দেখবে বলে সিদ্ধান্ত নিচ্ছিল। আমি আগ বাড়িয়ে বললাম, প্রবেশপথে টিকিট বিক্রি হচ্ছে কিনতে পারেন। তারা বললো, না আমরা স্বল্প আয়ের মানুষ, অত টাকায় টিকিট কিনতে পারব না। 
সিনেমা শুরুর দিকে জাতীয় সংগীতের প্রতি সম্মান দেখানোর সময় দেখি, সামনের সারিতে তিন জন পায়ের ওপর পা তুলে দিব্যি বসা। আমার স্বামী তাদের দাঁড়াতে বললে, তারা জানালো, সম্মান মন থেকে জানালেই হয়। আমরা দু’জনই তখন ধমক দিয়ে তাদের দাঁড় করালাম। সিনেমা শেষ করে বাসায় ফেরার জন্য বাসের অপেক্ষা করছিলাম। একটি বাস এলো কিন্তু ভাড়া চাইলো দ্বিগুণ। এবারও নিরুপায় হয়ে দ্বিগুণ ভাড়ায় বাসে চড়লাম। বাস থেকে নেমে মোবাইলফোনে ব্যালেন্স রিচার্জ করতে গিয়ে যে কয় টাকা দিলাম, দোকানি নির্ধারিত টাকার চেয়ে বেশি রেখে দিলেন। আমি কারণ জানতে চাইতেই তিনি বললেন, আজ আর টাকা ফেরত দেবো না।

বাসায় প্রবেশ করে এক স্বজন ফোন দিয়ে জানালেন, আপনার তো বাসায় গৃহপরিচারিকা নেই, আমি একজন জোগাড় করেছি, তিনি আগ্রহী। আপনার বাসায় আসতে চান। বললাম, গ্রামে তার কী সমস্যা? তিনি বললেন, ভদ্রমহিলা ঢাকার বাসায় কাজ করে যে কয় টাকা সঞ্চয় করেছিলেন, সে কয়টাকা গ্রামের একজন মহাজনকে দিয়েছিলেন। মহাজন তার টাকাসহ আরও অনেকের টাকা নিয়ে গা ঢাকা দিয়েছেন। ফোন রেখে ভাবছিলাম, এই কোন যুগে এসে পড়লাম!

ক’দিন আগে আমার ছেলের কোচিংয়ে অভিভাবকদের সারিতে আমি বসা। একজন ছাত্র আমার সামনে পায়ের ওপর পা তুলে বসে আছে। তাকে বললাম, বাবা তুমি কি জানো না, মুরব্বিদের সামনে পায়ের ওপর পা তুলে বসা ঠিক না? সে ‘দুঃখিত’ বলে পা নামিয়ে ফেললো।

এই ঘটনায়  মনে পড়ে গেলো অন্য একটি ঘ্টনা। ভারতীয় দূতাবাসে আমার শিক্ষাগুরুকে নিয়ে ভিসার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। একজন যুবক আমাদের সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় আমার শিক্ষাগুরুর পায়ের সঙ্গে ধাক্কা মেরে চলে যাচ্ছিলেন। আমি আগ বাড়িয়ে বললাম, আপনাকে দেখে তো একজন সচেতন মানুষ মনে হচ্ছে, কিন্তু একজন বয়স্ক মানুষের পায়ের সঙ্গে পা লাগলো, আপনি দুঃখিত বলার প্রয়োজন মনে করলেন না?

ক’দিন আগে রাজধানীর একটি গেমস জোনে ছেলের পীড়াপীড়িতে যেতে বাধ্য হয়েছিলাম। গেমস জোনে প্রবেশের জন্য বসে অপেক্ষা করছিলাম।  ১৩ /১৪  বছর বয়সী একটি  দল পাশেই বসা। পায়ের ওপর পা তুলে তারা আলোচনা করে যাচ্ছে। এরমধ্যে একজন তার হাতব্যাগ থেকে পাঁচটি ১,০০০ টাকার নোট বের করে বন্ধুদের  দেখাচ্ছে আর বলছে, এই যে দেখো, কত টাকা আমার কাছে!

ক’দিন আগে কয়েকজন শিক্ষার্থী শিক্ষককে পেছন থেকে আঘাত করেছে। বিষয়টি জাতীয়ভাবে সমালোচিত বিষয় ছিল। ক’দিন আগে বাংলাদেশের একটি জেলায় চায়ের দোকানে কয়েকজন ঝগড়াঝাটিতে লিপ্ত হয়। তাদের ঝগড়া থামানোর জন্য কয়েকজন বয়োজ্যেষ্ঠ চেষ্টা করলে তাদের চাপাতি দিয়ে মাথা ও চোখে আঘাত করে তারা। 

বেশ কয়েকটি ঘটনা এখানে তুলে ধরা হয়েছে যা, সমাজের খণ্ডচিত্র। এই ঘটনাগুলো থেকে বোঝা যায়, আমাদের দেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হচ্ছে। দেশ ডিজিটাল হচ্ছে কিন্তু আমাদের মানসিকতা পরিবর্তন, পারিবারিক শিক্ষার উন্নয়নে পরিপক্বতা এখনও আসেনি।

চলচ্চিত্রের এই দুঃসময়ে যদি কেউ হলমুখী হতে চান, সেখানে গিয়ে যদি বেশি মূল্যে টিকিট কিনতে হয়, তাহলে আর কেউ সিনেমা দেখতে চাইবেন না। জাতীয় সংগীতের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্য ধমক দিয়ে দাঁড় করানো এটা নিশ্চয়ই ভালো কোনও বার্তা বয়ে নিয়ে আনে না।  ১৪/১৫ বছরের বাচ্চার কাছে যদি ৫,০০০ টাকা থাকে, এটাও কোনও ভালো লক্ষণ নয়। ভার্চুয়াল বিশ্বের এই যুগে আমরা যারা বাবা-মা, তারা সন্তানের খবর ঠিকমতো নিচ্ছি তো? ওই যে কোচিংয়ে পায়ের ওপর পা তোলা ছেলেটি হয়তো জিপিএ-৫ পাবে। কিন্তু অন্যকে সম্মান করার যে রেওয়াজ, সেটি  যদি তার জানা না থাকে, সেই জিপিএ-৫-এর কোনও মূল্য নেই। 

সর্বস্তরে যে নৈতিক অবক্ষয়ের মাত্রা বাড়ছে, তার নিরাময় হবে কীভাবে? অথচ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কয়েকটি অনুষ্ঠানে থাকার সুবাদে দেখেছি তিনি তার শিক্ষক ও নেতাদের কতটা সম্মান করেন। শিক্ষকদের জন্য লাল গালিচা ছেড়ে দেন। বিদেশিদের মধ্যে দেখেছি, তারা চিন্তা-চেতনা-আচরণে যথেষ্ঠ সহনশীল ও মার্জিত রুচিবোধসম্পন্ন।

যাই হোক, সর্বস্তরে নৈতিকতার অবক্ষয় হচ্ছে। কিন্তু এর শেষ কোথায়? এই দায়িত্ব শুধু বাবা-মায়ের নয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও আত্মীয়-স্বজনের। যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার, সবার হাতে অ্যান্ড্রয়েড। কারও সঙ্গে কথা বলার সময় নেই। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু একে অন্যের প্রতি সম্মান দেখানোর মানসিকতা দিন দিন কমে যাচ্ছে। বিনয় দেখানোর রীতিনীতিও কমে যাচ্ছে।

আমার ছেলে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ছে। তাকে জিপিএ-৫-এর ইঁদুর দৌড়ে অবতীর্ণ হতে হচ্ছে। তার কোনও পাঠ্যবইয়ে নৈতিকতা ও পরিবার সম্পর্কে কিছু চোখে পড়েনি। কোনও কোনও বিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত—অষ্টম শ্রেণিতে শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ না পেলে বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে পড়তে পারবে না। প্রশ্ন হচ্ছে—একজন শিক্ষার্থী যেকোনও কারণে জিপিএ-৫ নাও পেতে পারে। এজন্য সে বিজ্ঞান বিভাগে পড়ার শত ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও পড়তে পারবে না। এটি কেমন কথা?  জিপিএ-৫-নির্ভর সমাজে এখন জিপিএ-৫-ই সম্বল। আমাদের সময়ে জিপিএ-৫ সংস্কৃতি ছিল না। তাই বলে কি আমরা জীবনের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাইনি? পরীক্ষা এগিয়ে আসছে। আর আমার বাচ্চা অসুস্থ হয়ে পড়েছে। সে এত চাপ নিতে পারছে না। এই এতটুকু বাচ্চার হাতে টেস্ট পেপার তুলে দিয়েছি। তুলে দিয়েছি সৃজনশীল প্রশ্ন এবং অনুধাবনমূলক স্তরের একগাদা প্রশ্ন। জিপিএ-৫ নয়, শিশুদের মানসিকতা বিকাশে পরিবার, দাদা দাদি, চিত্ত বিনোদনের জন্য পার্ক খুব জরুরি।

শিশুরা অ্যান্ড্রয়েডের জগতে প্রবেশ করে গেমস খেলছে। যে গেমসের বেশিরভাগই মারামারি ও যুদ্ধ। এসব গেমস শিশুমনে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। পরবর্তী সময়ে যার প্রভাব সমাজেও পড়বে।

একটি মানবিক সুন্দর সমাজ গড়তে হলে এখন প্রয়োজন পরিবার ও  সমাজের একাত্মতা। বিশ্বায়নের যুগে আমাদের বাচ্চারা এখন অনেকটাই তথ্য-প্রযুক্তিতে এগিয়ে। কিন্তু স্বাধীনতার নামে তাদের অনিয়ন্ত্রিত জীবন-যাপনের দিকে ঠেলে দেওয়া যাবে না। ছেলেবেলা থেকে শেখাতে হবে নৈতিকতা। গৃহপরিচারিকা, ব্যক্তিগত গাড়িচালক, বাসার দারোয়ান, সবজিবিক্রেতা, মুচি ও অন্যান্য প্রান্তিক মানুষের সঙ্গে সহনশীল আচরণের শিক্ষা পরিবার থেকেই দিতে হবে। ধর্মীয় শিক্ষা ও নৈতিক শিক্ষা—দুটোই দিতে হবে। সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে, সে বিষয়ে লক্ষ্য রাখতে হবে। সন্তানের সামনে কোনও ঝগড়া-বিবাদ না করাই ভালো। যে কেউ ভিন্নমতের হলে তার মত-গ্রহণের প্রতি সম্মান দেখানো শেখাতে হবে। নিজের দেশের বদনাম, নিজের দেশের খারাপ দিক নিয়ে আলোচনা থেকে বিরত থাকতে হবে। কোনও কিছু চাইলেই পেতে হবে, না পেলে আত্মহত্যা করতে হবে, মাদক সেবন করতে হবে—এমন ধারণা থেকে সন্তানদের বের করে আনতে হবে। পরিবারের  বয়োজ্যেষ্ঠদের সঙ্গে সম্মান প্রদর্শন করে চলা, সুসংগঠিত পারিবারিক কাঠামো গড়ে তোলা এখন প্রধান কাজ। শুধু ভালো ফল নয়, নৈতিক বিষয়ে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান দেওয়াও শিক্ষকদের দায়িত্ব। যতটুকু সম্ভব অ্যান্ড্রয়েড ফোন থেকে সন্তানদের দূরে রাখা এবং পরিমিত খেলাধুলার সুযোগ দেওয়া  অভিভাবকদের দায়িত্ব। সন্তানের হাতে বই তুলে দিতে হবে। সন্তানকে স্বপ্ন দেখাতে হবে। সন্তানকে সময় দিতে হবে।  ব্যত্যয় ঘটলে অনাচার, অবিচার, অশান্তিতে দেশ একদিন ধ্বংসের স্তূপে দাঁড়িয়ে থাকবে, সেদিন আর সময় থাকবে না।

অনাগত ভবিষ্যৎকে আরও সুচারু ও নির্মল করার জন্য এখনই সময়। নাহলে এমন এক সময় আসবে, যখন মা-বাবার সামনেও সন্তান পায়ের ওপর পা তুলে বসে থাকবে, অভিভাবকদের দেখেও না দেখার ভান করবে। শত্রু-মিত্র যাকে যখন পাবে ঠুনকো কারণে তার গায়ে হাত তুলবে। এজন্য সবস্তরে চিন্তার সংস্কার এনে সমাজকে ঢেলে সাজানো জরুরি।

শিক্ষক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীর জীবনে বিশাল প্রভাব ফেলে। শিক্ষকরা শিক্ষার্থীকে শুধু পুঁথিগত বিদ্যা নয়, মানুষ হওয়ারও দীক্ষা দেবেন। একজন শিক্ষক একজন শিক্ষার্থীর জীবন বদলে দিতে পারে। তাই ঘূণে ধরা এই সমাজে শিক্ষকদেরও হতে হবে জ্ঞানের বাঁশিওয়ালা। যার আদর্শের পেছনে ছুটবে সবাই।

চাকরির ক্ষেত্রে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে সর্বস্তরের নিয়োগ, দেশকে ভালোবাসা, যেখানেই দুর্নীতি, সেখানেই প্রতিবাদ—এই নীতি নিয়ে সবাই একতাবদ্ধ হলে একদিন দেশ হবে স্বপ্নের সোনার বাংলা।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, লোকপ্রশাসন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

 

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ