ফ্রাঙ্কফুর্ট বুকফেয়ার, বাংলা বই কারা দেখে?

Send
দাউদ হায়দার
প্রকাশিত : ১৩:৩০, অক্টোবর ১৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৪৭, অক্টোবর ১৯, ২০১৯

দাউদ হায়দারদেশটি বিশাল, জনসংখ্যা মাত্র পঞ্চাশ লাখ, অর্থাৎ পাঁচ মিলিয়ন। ছোট শহরে এবং নানা দ্বীপে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বাস। বড়ো শহর বলতে অসলো, নরওয়ের রাজধানী। বছর আটেক আগে অপেরা, ফিলহারমোনিক নির্মিত, সমুদ্রতীরে। এখন অন্যতম দ্রষ্টব্য। শান্তি নোবেল পুরস্কারের কার্যালয় এবং প্রদর্শনী হল এমন কিছু আহামরি নয়। ভ্রমণকারীরাই কেবল দেখতে যায়। সবচেয়ে আকর্ষণীয় শহরের পশ্চিমাংশে ফ্রোগনার পার্ক। বিস্তর আধুনিক মূর্তি। নির্মাতা গুস্টাভ ভিগেলান্ড। স্কি-জাম্পারদের কাছে হোলমেনকোলেন স্টেডিয়াম, বাৎসরিক স্কি জাম্প, শীতকালে। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা।
আছে বহুখ্যাত শিল্পী এডভার্ড মুঞ্চের (অনেকে ‘মুন্ক’ উচ্চারণ করেন) চমৎকার মিউজিয়াম। রাজবাড়ি থেকে বেশি দূরে নয়।
নাট্যপ্রেমিকদের কাছে হেনরিক ইবসেনের বসতবাটী, নাট্যালয়, সেন্টার মহা মূল্যবান। মূল অসলো শহর থেকে বেশ দূরে (যদিও বলা হয় শহরের অংশ) নয় চোখ ধাঁধানো বিরাট মসজিদ। গোটা স্ক্যান্ডেনিভিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বড়ো। খোদ রাজধানীর বুকে (উত্তরে) একটি অঞ্চলের নাম ‘লিটল পাকিস্তান’। বিস্তর পাকিস্তানির বাস। বাংলাদেশ,ভারতেরও আছে। এখানে একচক্কর ঘুরলেই উপমহাদেশের গন্ধ ম ম করে।

থাক অসলো নিয়ে অধিক কথা।

জানা আছে আমাদের, নরওয়েজিয়ান ভাষার পরেই ইংরেজি দ্বিতীয় ভাষা। তবে নর্ডিক (ডেনমার্ক, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, আইসল্যান্ড) দেশগুলোর ভাষা প্রায়-প্রত্যেকেই জানে। পড়তে, লিখতে পারে। জনসংখ্যা কম হলে কী হবে, নরওয়ের সাহিত্যের কদর মর্যাদা বহুকালের, বিশ্বব্যাপী। নরওয়ে এবার ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার মূল আকর্ষণ, তথা, কান্ট্রি থিম। নরওয়ের হালের সাহিত্য প্রচারেই বিশেষ আয়োজন। শতাধিক প্রকাশকের অংশগ্রহণ। ছোটবড়ো। বড়ো প্রকাশক অবশ্য বেশি নেই,আঙুলে গোনা। অধিকাংশই মাঝারি ও ছোট প্রকাশক।

জানানো জরুরি, মাঝারি এবং ছোট প্রকাশক সরকারের আর্থিক সহায়তায় টিকে আছে। ৭৫ ভাগ প্রকাশিত বই সরকার ক্রেতা। বিলি করে পাবলিক গ্রন্থাগারে। কবিতার বইয়ের ক্রেতা নেই-প্রায়, সরকারই প্রকাশক ও ক্রেতা। অসলোর একজন কবি বিস্মিত জেনে, বাংলাদেশ-পশ্চিমবঙ্গে বইমেলায় কয়েক হাজার কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত। ক্রেতাও আছে। বলেন, ‘কলকাতায় বা ঢাকায় গিয়ে থাকবো,কবিতা লিখবো,বই প্রকাশিত করবো, মুশকিল একটিই, বাংলা ভাষা শিখতে হবে।’

নরওয়ে কান্ট্রি থিম হলেও নর্ডিক দেশগুলোও সমভাগী। যেন নিজের দেশেরই বইমেলা। নর্ডিক শীতের বদলে উষ্ণতা (বইয়ের) মেলায়।

নরওয়ের বিখ্যাত লেখককূলের অনেকেই হাজির। লোটা এলসটাড। টোমাস এসপেডাল। ইয়োহান হারসটাড। মেটে মারিট। লারস মাইটটিং। ইয়োটাইন গারডার (বহুল পঠিত ‘সোফিস ওয়ার্ল্ড’-এর ঔপন্যাসিক) তো আছেনই। নিজেদের লেখা থেকে পাঠ। আলোচনা। সেমিনার।

২০০৬ সালে ইন্ডিয়া (ভারত) ছিল ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় কান্ট্রি থিম। সাংবাদিক সম্মেলনে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সাংবাদিকরা দাবি জানান, ‘কেবল ভারত কেন? ভারতকে দুইবার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। নয় কেন সার্কভুক্ত দেশগুলো নিয়ে?’ কর্তৃপক্ষ দাবির প্রতি সহানুভূতিশীল, ‘আশ্বাস দেন, দশ বছরের মধ্যেই আয়োজন করবেন।’ কেন করা হয়নি? শুনি একটিই কথা, ‘ভারত-পাকিস্তানের বৈরী সম্পর্ক ঘুচে গেলেই আয়োজনে বাধা নেই।’ আরও শুনি, ‘সার্কভুক্ত সাতটি দেশের মধ্যে মহব্বতে ঘাটতি। তাছাড়া, অনেক দেশই (ভুটান, নেপাল, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, বাংলাদেশ কী বিশাল অঙ্কের টাকায় (ইউরো) একেকটি হল-ভাড়া নেওয়ার সামর্থ আছে?’

–কান্ট্রি থিমের দেশকে মিলিয়ান ইউরো খরচ করে হল ভাড়া নিতে হয়। ছয় ফুট বাই বারো ফুটের স্টলের ভাড়া দশ হাজার ইউরো।

ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলাকে বলা হয়, ‘মক্কার সমাবেশ’। মিথ্যে নয়। গোটা দুনিয়া থেকে ছয় হাজারের বেশি প্রকাশক হাজির (প্রায়-প্রত্যেক দেশ থেকে)। এবার আরও। সাত হাজার থেকে কিছুটা কম। সব দেশই নিজের দেশের সাহিত্য প্রচারে উন্মুখ।

ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় বইয়ের বিক্রিবাট্টা নেই। শুধু কপিরাইট বিক্রি। এজেন্টরা তৎপর। এজেন্টদের জন্যে আলাদা একটি হল আছে।

ভারত থেকে দুই ডজনের বেশি প্রকাশক যোগ দিয়েছেন। নানা ভাষার প্রকাশক। কিন্তু,ইংরেজি প্রকাশকদের স্টলে কপি রাইট কেনার আনাগোনা থাকলেও অন্যান্য ভাষার স্টলে পাঁচজনও যায় কিনা সন্দেহ। বাংলার অবস্থা আরও কাহিল। বাঙালি ছাড়া (তাও মূলত ফ্রাঙ্কফুর্টের) দর্শকও নেই। বিদেশিরা কৌতুকবশতো মাঝে মাঝে। এই দৃশ্য আজকের নয়। বেশি কথা ‘কইবো’ না।

কলকাতার একটি নামী প্রকাশন চার দশকের বেশি যোগ দিচ্ছে,একটি বইয়েরও কপি রাইট বিক্রি করতে পারেনি এখনও। যেমন, পারেনি বাংলাদেশের কোনও প্রকাশক। যদিও ইংরেজি অনূদিত বই নিয়ে হাজির। অনুবাদিত বই ইউরোপের একজন প্রকাশককেও ‘গছানো’ অসম্ভব। অনুবাদ থেকে অনুবাদ বাতিল। চায় মূল থেকে অনুবাদ। অর্থাৎ, তৃতীয় ভাষায় অনুবাদ নয়, সমস্যা আরও। বহুবিধ।

গত তিন বছরে বাংলাদেশ থেকে কয়েকজন প্রকাশক আসছেন। যোগ দিচ্ছেন মেলায়। আর যাই হোক,ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার লিস্টে দেশেরও প্রকাশকের নাম থাকছে। এটাই হয়তো পাওনা, বা, গর্বের। আসছেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকও। কেন? আসছেন ‘অভিজ্ঞতা অর্জন করতে।’ ফ্রাঙ্কফুর্টের বইমেলার ছিঁটেফোটা অভিজ্ঞতাও কী কাজে লাগাতে পারবেন? আদৌ না।

ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় বাংলা বইয়ের উপস্থিতি, এটাই গৌরব, সান্ত্বনা। ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার উদ্বোধন ১৫ (অক্টোবর)। ১৬ থেকে প্রদর্শনী। চলবে ২০ অব্দি। আমরা আছি। 

লেখক: কবি ও সাংবাদিক 

 

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ