রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নষ্ট করছে সম্প্রীতির পরিবেশ

Send
বিভুরঞ্জন সরকার
প্রকাশিত : ১৫:৫০, অক্টোবর ২১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৩১, অক্টোবর ২১, ২০১৯

বিভুরঞ্জন সরকারবাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনায় রাষ্ট্র পরিচালনার যে চার মূলনীতির কথা বলা হয়েছে, সেগুলো  হলো—‘জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা।’ আর সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে এই চার মূলনীতির কথা আলাদাভাবে রয়েছে। অষ্টম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে—‘জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা—এই নীতিসমূহ ও তৎসহ এই নীতিসমূহ হইতে উদ্ভূত এই ভাগে বর্ণিত অন্য সকল নীতি রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি বলিয়া পরিগণিত হইবে।’
বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনার চার মূলনীতির মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষতা একটি। এই নীতি রক্ষা ও বাস্তবায়নে সংবিধানে কিছু রক্ষাকবচও আছে। ধর্মীয় সংখ্যালঘুর অধিকার সংরক্ষণের কথা আছে সংবিধান ও আইনে। ধর্মনিরপেক্ষতার আলাদা কোনও সংজ্ঞা সংবিধানে না থাকলেও সংবিধানের ১২ অনুচ্ছেদে বিষয়টি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। ওই অনুচ্ছেদে ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার বিষয়ে বলা নিয়ে হয়েছে—‘সর্ব প্রকার সাম্প্রদায়িকতা, রাষ্ট্র কর্তৃক কোনও ধর্মকে রাজনৈতিক মর্যাদা দান, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মীয় অপব্যবহার, কোনও বিশেষ ধর্ম পালনকারী ব্যক্তির প্রতি বৈষম্য বা তাহার ওপর নিপীড়ন বিলোপ করা হইবে।’
এখানে লক্ষণীয়, ধর্মকে রাজনৈতিক মর্যাদা দেওয়া এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার ধর্মনিরপেক্ষতার পথে প্রধান বাধা। ধর্মনিরপেক্ষতার প্রধান শর্ত হলো, রাষ্ট্রনীতি ও রাষ্ট্রাচারে কোনও ধর্মকে না রাখা। ধর্মকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে রাখা এবং এই ব্যক্তিগত পর্যায়ে ধর্ম পালনে সব ধর্মের অনুসারীদের সমান অধিকার নিশ্চিত করা। আর এটি করতে হলে সাম্প্রদায়িকতা দূর করতে হবে। রাষ্ট্রীয় নীতি এবং রাষ্ট্রাচারে ধর্মের প্রভাব না থাকলেও একটি দেশে সামাজিক এবং ব্যক্তিপর্যায়ে সাম্প্রদায়িকতা থাকতে পারে। থাকতে পারে রাজনীতিতে। যেমন বাংলাদেশে শুধু ধর্মভিত্তিক দল নয়, সেক্যুলার রাজনৈতিক দলকেও রাজনৈতিক স্বার্থে ধর্মকে ব্যবহার করতে দেখা যাচ্ছে। মুখে যাই বলা হোক না কেন, বাস্তবে ধর্মের প্রশ্ন সামনে এলেই সবাই কৌশলের আশ্রয় নেন।
বাহাত্তরের সংবিধানে রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতার সংযোজন ছিল একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলও নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির উল্টোযাত্রা শুরু হয়। সামরিক স্বৈরশাসক জিয়া ও এরশাদ সংবিধান সংশোধন করে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি বাতিল করেন। সংবিধানের প্রস্তাবনায় ‘বিসমিল্লাহ’ সংযোজন এবং ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণার মধ্য দিয়ে কার্যত দেশ শাসনে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার উদ্যোগকেই বাতিল করা হয়। বাস্তবে রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনায় মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে খারিজ হওয়া দ্বিজাতি-তত্ত্বকে আবার ফিরিয়ে আনা হয়।

ধর্মের নামে, ধর্ম প্রতিষ্ঠার নামে এই অঞ্চলে হানাহানি, বলপ্রয়োগ, রক্তপাত, প্রাণহানির ঘটনা সুদূর অতীতে ঘটেনি, এটা দাবি করা যাবে না। তবে এটাও ঠিক, হাজার বছর ধরে নানা জাতি ধর্মের মানুষ এই ভূখণ্ডে মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে আসছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে এদেশের রয়েছে ঐতিহ্য। পাকিস্তানি আমলে গত শতকের ষাটের দশকে এখানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগানোর অপচেষ্টা রুখে দেওয়া হয়েছিল সম্মিলিত প্রতিরোধের মাধ্যমেই। বাংলাদেশের পরিচিতিও মূলত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ হিসেবে। প্রাচীনকাল থেকেই এদেশের মানুষের প্রধান জীবিকা কৃষি। আর কৃষকের ঘামে ভেজা এ বাংলার মাটি ফসল ফলানোর জন্য উর্বর হলেও কখনোই সাম্প্রদায়িকতার উর্বর ক্ষেত্র ছিল না। তাই এদেশের মানুষ স্ব-স্ব ধর্মে নিষ্ঠাবান হয়েও সাধারণভাবে ভিন্ন ধর্মের প্রতি সহনশীল ছিল। ছিল যত্নশীলও। প্রত্যেক ধর্মের মানুষের নিঃশঙ্কচিত্তে নিজ নিজ ধর্ম পালনে অতীতে সেভাবে সমস্যা হয়নি। ব্রিটিশরা যখন থেকে ‘ভাগ করো এবং শাসন করো’নীতি অনুসরণ করা শুরু করে, তখন থেকেই পরিস্থিতি বদলাতে থাকে। রাজনীতির সঙ্গে ধর্মের মিশেল দিয়েই মানুষের মনে বিষাক্ত বীজ বপন করা হয়েছে। এখন তা থেকে কিছু বিষফল ফলতে দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশে ধর্মীয় এবং জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর এখন এক ধরনের নীরব সাম্প্রদায়িক নিপীড়নের ঘটনা ঘটার অভিযোগ আছে। 

পৃথিবীর সব দেশেই সংখ্যালঘুদের নিয়ে কিছু না কিছু সমস্যা আছে। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুরা সবদেশে সমান অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে বসবাস করতে পারে না। তবে সবদেশে সমস্যা সমান মাত্রার নয়। কোথাও কোথাও সংকট প্রকট, কোথাও বা সহনীয় মাত্রার। ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমার, চীনসহ অনেক দেশে সংখ্যালঘুরা নানা মাত্রায় নির্যাতন, নিপীড়ন, হয়রানির শিকার হচ্ছে। তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। এখানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা না হলেও নীরব সাম্প্রদায়িকতা আছে। আছে নিয়মিত সংখ্যালঘুদের দেশত্যাগের ঘটনা।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার অপচেষ্টা প্রতিরোধে রাষ্ট্র, প্রশাসন ও সচেতন সব মানুষের এগিয়ে আসার নজির অতীতে দেখা গেছে। ইদানীং অবশ্য সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ বাড়ার প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। এদেশে সব ধর্মের মানুষ একে অন্যের সুখে-দুঃখে এগিয়ে আসার যে ঐতিহ্য, সেখানেও আজকাল ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। আক্রান্ত সংখ্যালঘুদের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রেও শিথিলতা দেখা যায়।। কেন এমন হচ্ছে, মানুষের মধ্যে বিদ্বেষ ভাব বেড়ে যাওয়ার কারণ কী—এই বিষয়গুলো গভীরভাবে ভেবে দেখা দরকার।

বাংলাদেশে সব ধর্মমতের মানুষ একযোগে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখছে। ব্যবসা-বাণিজ্য করছে। সব ধর্মের মানুষের মধ্যে এমনতর সম্প্রীতির বন্ধন পৃথিবীর খুব কম দেশেই দেখা যায়।  এছাড়া সব ধর্মের নানা আচার, অনুষ্ঠান, উৎসব বেশ জাঁকজমকের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়। এ দেশে তাই উচ্চারিত হয় ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’। ধর্মীয় উৎসবগুলোতে সব ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণ এবং সৌহার্দে এক অভাবনীয় অবস্থার সৃষ্টি হয়।

সাম্প্রদায়িক পাকিস্তান রাষ্ট্রের মৃত্যু ঘটেছিল মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। পাকিস্তানি ধারা স্বাধীন বাংলাদেশে আর ফিরে না আসাও ছিল কাম্য এবং প্রত্যাশিত। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু ধর্ম ও সম্প্রদায়ভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোকে নিষিদ্ধ করেন। ধর্মনিরপেক্ষ মূলমন্ত্র যে দেশের, সেখানে এই জাতীয় দলের অস্তিত্ব থাকতে পারে না। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সাম্প্রদায়িক শক্তিকে সামনে নিয়ে আসে অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী সামরিক শাসকরা। ধর্ম ব্যবসায়ী ও সাম্প্রদায়িক শক্তিকে রাজনীতিতে পুনর্বহাল করা হয়। তারই ধারাবাহিকতায় মানবতাবিরোধী অপরাধী গণহত্যাকারী সাম্প্রদায়িক শক্তিকে ক্ষমতার অংশীদার করা হয় পরবর্তীকালে। সামরিক শাসকদের তত্ত্বাবধানে দেশে দাঙ্গা-হাঙ্গামা চালানো হয় ১৯৯০ সালে। ২০০১ সালের পর বিএনপি-জামায়াত জোট হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর এমন নিপীড়ন চালায় যে, তাদের অনেকেই দেশত্যাগে বাধ্য হয়। ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটিয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে বিনষ্ট করার চেষ্টা করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ৪ সেপ্টেম্বর জন্মাষ্টমীর শুভেচ্ছা জানাতে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের গণভবনে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সেখানে তিনি মন থেকে সব ধরনের হীনম্মন্যতা ঝেড়ে ফেলতে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এই দেশ, এই মাটি সবার। এই ভূমিতে জন্ম নেওয়া সবাই এই দেশের নাগরিক। কেউ এখানে সংখ্যালঘু নয়। এখানে সবার সমানাধিকার আছে। নিশ্চিতভাবে যার যার ধর্ম সে সে পালন করবে। অস্থিরতার এই সময়ে প্রধানমন্ত্রী যখন সংখ্যালঘুদের আশ্বস্ত করে আশাজাগানিয়া বাণী শোনান, তখন সব সম্প্রদায়ের মানুষের স্বস্তির জায়গাটা প্রসারিত হয়, মানুষ নিরাপদ বোধ করে।

শেখ হাসিনার সরকার দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে নানাবিধ কাজ করে যাচ্ছেন। তবু ঘটনা পরম্পরায় সংখ্যালঘুদের মাঝে নিরাপত্তাহীনতার শঙ্কা বিরাজ করছে না তাও নয়। এই অবস্থা নিরসনে সরকারকে আরও দৃশ্যমান শক্ত অবস্থান নিতে হবে। যেসব কারণে সংখ্যালঘুদের মনে অনিশ্চয়তা বা নিরাপত্তাহীনতা দেখা দেয়, সে কারণগুলো দূর করতে হবে। যারা সম্প্রীতি বিনষ্ট করার অপচেষ্টা চালাবে, তাদের প্রতি কোনও অনুকম্পা দেখানো চলবে না। দুষ্টু লোকদের শাস্তি দিলে, আইনের আওতায় দিলে, মানুষ আস্বস্ত হবে, সবার মনে নিরাপত্তা বোধ ফিরে আসবে। সংখ্যালঘুদেরও সব ধরনের দোদুল্যমান মানসিকতা পরিহার করে যেকোনও পরিস্থিতিতে দেশের মাটি আঁকড়ে থাকার শক্তি অর্জন করতে হবে। দেশত্যাগের মনোভাব পরিহার করতে হবে। ‘ও পারেতে যত সুখ, আমার বিশ্বাস’—এই মনোভাব বর্জন না করলে পায়ের নিচে শক্ত মাটি পাওয়া যাবে না।

লেখক: যুগ্ম সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়

/এমএমজে/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ