রাজনীতি ও দলীয়করণ

Send
আমীন আল রশীদ
প্রকাশিত : ১৫:৫১, অক্টোবর ২১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৪৫, অক্টোবর ২১, ২০১৯

আমীন আল রশীদঅভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় নামে একজন ভারতীয় বংশোদ্ভূত বাঙালি এবার অর্থনীতিতে নোবেল পেয়েছেন। এটি নিশ্চয়ই সারা বিশ্বের বাঙালির জন্য পুলকিত হওয়ার মতো একটি খবর। কিন্তু বাংলাদেশের সোশ্যাল মিডিয়ায় এই পুলকের প্রতিক্রিয়াটি দেখা যাচ্ছে একটু অন্যভাবে। যেমন অনেকেই অধ্যাপক অভিজিতের ছবি দিয়ে সেখানে লিখেছেন, তিনি ছাত্র আন্দোলন করেছেন এবং এজন্য জেলও খেটেছেন।
কথাটি তারা লিখেছেন সম্প্রতি বুয়েটের হলে আবরার ফাহাদ নামে এক শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে হত্যার পর ক্যাম্পাসে দলীয় রাজনীতির পক্ষে-বিপক্ষে বিতর্ক ইস্যুতে। কিন্তু যারা অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছাত্র আন্দোলন করে জেল খাটার উদাহরণ দিয়ে ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতির পক্ষে কথা বলছেন, তাদের কাছে বরং এ প্রশ্নটি রাখা যায়, অভিজিত বন্দ্যোপাধ্যায় কি ছাত্র রাজনীতির নামে ক্যাম্পাসে গুণ্ডামি করেছেন বা সহপাঠীকে পিটিয়ে মেরেছেন? অভিজিত কি ছাত্র রাজনীতি করে কোটিপতি হয়েছিলেন?
আসলে সমস্যাটা রাজনীতির না; প্রক্রিয়ার। সমস্যাটা দলীয়করণের। যে কারণে এখনও আমাদের ছাত্রনেতারা জেলে যান। কিন্তু সেটা রাষ্ট্রের পক্ষে দাঁড়িয়ে আন্দোলনের কারণে নয়। গুণ্ডামি ও সন্ত্রাসের কারণে। সহপাঠীকে পিটিয়ে হত্যার আসামি হিসেবে। সুতরাং অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় ছাত্র আন্দোলন করে জেল খেটেছিলেন, এই উদাহরণ দিয়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্যাম্পাসের কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়া যায় না। অভিজিত আমাদের কথিত ছাত্রনেতাদের মতো বিতর্কিত উপায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হননি বা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থে ভাগ বসাননি। অভিজিত বন্দ্যোপাধ্যায় ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হলেও পড়াশোনাটা ঠিকই চালিয়ে গেছেন। গবেষণা করেছেন। মানুষের জন্য কাজ করেছেন। একসময় যার স্বীকৃতি দিয়েছে নোবেল কমিটি। এরসঙ্গে তার অতীতের ছাত্র আন্দোলনে যুক্ত থাকা না থাকার কোনও সম্পর্ক আছে বলে মনে হয় না।

রাজনীতি চিরকাল ছিল এবং থাকবে। সেটি সরকারে যেমন, তেমনি ক্যাম্পাসেও। রাজনীতি ছিল বলেই টুঙ্গিপাড়ার মতো একটি দূর মফস্বলের শেখ মুজিবুর রহমান একটি জাতির জনক হতে পেরেছিলেন। রাজনীতি ছিল বলেই বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং এর এক দশক পরে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন সফল হয়েছিল। কিন্তু রাজনীতি, রাজনীতির নামে সন্ত্রাস ও গুণ্ডামি, ছাত্র রাজনীতির নামে ক্যাম্পাসে দলীয় দাসত্ব এবং দলীয়করণের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। সেই পার্থক্যগুলো বিবেচনায় না নিয়ে একজন নোবেলজয়ী বাঙালির ছাত্র রাজনীতির ইতিহাস টেনে পুলকিত হওয়ার কোনও মানে হয় না।

আমাদের দেশেও ষাট-সত্তর ও আশির দশকের ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে পরবর্তীকালে ক্যাম্পাসে দলীয় অ্যাসাইনমেন্ট বাস্তবায়ন করতে গিয়ে প্রতিপক্ষের রগ কাটা, হাতুড়ি দিয়ে পেটানো, খুন করে লাশ নর্দমায় ফেলে রাখা, গুলি করে মাথার খুলি উড়িয়ে দেওয়া, ব্রাশফায়ারে শরীর ঝাঁজরা করে দেওয়া কিংবা পিটিয়ে খুন করার তফাৎগুলো সুস্পষ্ট। এগুলো কোনও অর্থেই ছাত্র আন্দোলন, রাজনীতি কিংবা ছাত্র রাজনীতি নয়; এগুলো সন্ত্রাস। ছাত্র রাজনীতির নামে এই সন্ত্রাস ও নৃশংসতার পক্ষে দেশের একজন বিবেকবান মানুষেরও থাকার কথা নয়।

যেখানে প্রকৃত রাজনীতি থাকে, সেখানে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং ভিন্ন মত ও ভিন্ন চিন্তার প্রতি শ্রদ্ধা থাকে। বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি ছিল। কিন্তু সেখানে সব দলের, সব মতের ও সব চিন্তার সহাবস্থান ছিল না। ছিল না বলেই আবরারকে তারই সহপাঠীরা পিটিয়ে হত্যা করেছে। এখানে প্রকৃত রাজনীতি, ভিন্ন মত ও চিন্তার প্রতি শ্রদ্ধার চর্চা থাকলে ফেসবুকে আবরারের  স্ট্যাটাসটা নিয়ে চায়ের দোকানে সহপাঠীদের সঙ্গে তার তর্ক হতে পারতো। উচ্চবাচ্য হতে পারতো। যুক্তি ও পাল্টা যুক্তিতে ক্যাম্পাস মুখর হতে পারতো। কিন্তু আবরারের সহপাঠীরা সেই শিক্ষাটি পায়নি অথবা সেই শিক্ষাটি তারা গ্রহণ করেনি। করেনি বলেই তাকে কথিত টর্চার সেলে নিয়ে ক্রিকেটের স্ট্যাম্প দিয়ে পিটিয়ে মেরেছে। তারা তাদের শক্তি ও ক্ষমতা দেখিয়েছে। তারা আবরারকে এই বার্তা দিতে চেয়েছে, এখানে কোনও ধরনের ভিন্ন মত ও ভিন্ন চিন্তার জায়গা নেই। আমরা যা বলব তাই আইন। তাই মানতে হবে। এরকম একটি কট্টর ও উগ্রপন্থী বিশ্বাস এই মেধাবীদের মধ্যে গেঁথে গিয়েছিল বলেই তারা নৃশংস হয়ে উঠতে পেরেছে। অর্থাৎ তাদের কাছে রাজনীতি মানে একচ্ছত্র আধিপত্য। কোনও প্রতিপক্ষ থাকবে না। আর এটি হয়েছে সর্বস্তরে নির্লজ্জ দলীয়করণের ফলে।

বলাই বাহুল্য, ভিডিও ফুটেজ ছিল বলে আবরারের হত্যাকারীরা ধরা পড়েছে। গণমাধ্যম সোচ্চার ছিল বলে অপরাধীরা পার পায়নি এবং আশা করা যায় দ্রুত এই মামলার রায়ও হবে। কিন্তু ভিডিও ফুটেজ যদি না থাকতো এবং গণমাধ্যম যদি সক্রিয় ভূমিকা পালন না করতো, তাহলে এটি হলফ করে বলা যায়, আবরারের হত্যাকাণ্ডটি আর দশটি খুনের মতোই দুয়েকদিন খবরের শিরোনাম হওয়ার পরে ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যেতো। এ নিয়ে ক্যাম্পাস উত্তপ্ত হতো না। পুরো বুয়েট পরিবার অভিন্ন ছাতার নিচে এসে একটি অভূতপূর্ব অহিংস আন্দোলন গড়ে তুলতে পারতো না। কারণ রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো এই বিশ্ববিদ্যালয়ও দলীয়করণমুক্ত নয়। ভিডিও ফুটেজ না থাকলে এবং গণমাধ্যম সক্রিয় না থাকলে হয়তো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনই ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের নেতাদের বাঁচাতে সর্বাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণ করতো।

এ মুহূর্তে বাংলাদেশের মূল সংকটগুলোর যদি একটি তালিকা করা হয়, তাহলে দেখা যাবে সেখানে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা, উন্নয়ন প্রকল্পে লাগামহীন দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের জন্য কথা বলার সুযোগ হ্রাস, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বিবিধ অন্তরায়ের মতো বিষয়গুলো সামনে আসবে, যার সবকিছুর নেপথ্যে রয়েছে রাজনীতির মোড়কে দলীয়করণ।

আমাদের দেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সবচেয়ে বেশি দলীয়করণ হয়েছে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে। এর থেকে মুক্ত থাকেনি পেশাজীবীদের সব প্রতিষ্ঠান এমনকি জাতির বিবেক বলে পরিচিত সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠনও। দুয়েকটি ব্যতিক্রম বাদ দিলে এসব সংগঠনেও এখন নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলো প্রভাব বিস্তার করে এবং প্রার্থী দেওয়া হয় দলীয় বিবেচনায়। সিনিয়র সাংবাদিকরা কে কোন দলের বা কোন ঘরানার, সেটি আর গোপন বা ব্যক্তিগত বিষয় নয়। সাংবাদিকদের গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনগুলোয় সাধারণ সদস্য নেওয়ার ক্ষেত্রেও দলীয় বিবেচনাই প্রাধান্য পায়। সেখানে সাংবাদিকের ক্যারিয়ার, যোগ্যতা বা পেশাদারিত্ব মুখ্য বিবেচনায় থাকে না। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সদস্য হতে গেলে তাকে হয় আওয়ামী লীগ নয়তো বিএনপি কোরামের হয়ে আবেদন করতে হয়—এমন কথাও প্রচলিত আছে। সুতরাং এখানে যতটা রাজনীতি, তার চেয়ে অনেক বেশি দলীয়করণ এবং এখানে নানারকম বৈষয়িক স্বার্থ তথা পাওয়া-না পাওয়ার হিসাব জড়িত। সেই হিসাবের বাইরের নন আমাদের শিক্ষকরাও। অথচ শিক্ষাকে যদি জাতির মেরুদণ্ড বলা হয়, তাহলে শিক্ষকরা হচ্ছেন সেই মেরুদণ্ডের নির্মাতা। কিন্তু তারাই বৈষয়িক নানা প্রলোভনের ফাঁদে পা দিয়ে নিজেদের মেরুদণ্ড বাঁকা করে ফেলেন। উপাচার্য, প্রক্টর বা প্রভোস্ট হওয়ার জন্য তারাই নাকি ছাত্রনেতাদের কাছে ধরনা দেন। তাহলে এই শিক্ষক তার শিক্ষার্থীদের কী শিক্ষা দেবেন? দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠেও যদি এরকম নির্লজ্জ দলীয়করণের ঘুণপোকা বাসা বাঁধে, তাহলে সেই জাতিকে আলো দেখাবে কে?

আমাদের রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে দলীয়করণ এতটাই ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, কেউ যেত নিরপেক্ষ বা কোনও পক্ষভুক্ত নাও থাকতে পারেন, এটিই অস্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। অথচ জাতীয় নির্বাচনে একজন নাগরিক নৌকা প্রতীকের প্রার্থীকে ভোট দিলেও সেই একই ব্যক্তি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ধানের শীষের প্রতীকের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন। অর্থাৎ তার কাছে প্রতীক নয়, বরং ব্যক্তিই মুখ্য। কিন্তু এই ভাবনাটি ক্রমশ ম্রিয়মাণ হচ্ছে। মানুষ যে একইসঙ্গে রাজনীতিসচেতন এবং নিরপেক্ষ হতে পারে, সেটি যেন আর কেউ বিশ্বাস করতে চায় না। অবস্থাটা এমন দাঁড়িয়েছে, আপনি আমার দলের নন মানে আপনি আমার শত্রু। অথচ বন্ধু ও শত্রুর মাঝামাঝি বলেও একটা ব্যাপার আছে। একজন লোক আওয়ামী লীগ পছন্দ করেন না মানেই তিনি আওয়ামী লীগের শত্রু এবং এ কারণে তিনি মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তি—এই ভাবনাটি যেমন ভয়ঙ্কর, তেমনি একজন লোক বিএনপিকে পছন্দ করেন না বলেই তিনি আওয়ামী লীগ ও ভারতের দালাল, তিনি ইসলামের শত্রু—এই ভাবনাটিও ভয়াবহ। এই ধারণাগুলো তৈরি হয়েছে সর্বস্তরে নির্লজ্জ দলীয়করণের কারণে। যে দলীয়করণের হাত থেকে আমাদের বুদ্ধিজীবীরাও মুক্ত নন।

বলা হয়, একটি রাষ্ট্রে গণতন্ত্র কতটা কার্যকর তার প্রধান সূচক সেখানে ভিন্ন মতের চর্চা কতটা নিরাপদ এবং সেই রাষ্ট্রের বুদ্ধিজীবীরা কতটা নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠভাবে কথা বলতে ও লিখতে পারেন। আমাদের সংবাদমাধ্যমের দিকে তাকালেই এটা স্পষ্ট হবে, আমরা বুদ্ধিজীবী, সমাজ ও রাষ্ট্রের বাতিঘর বলে যাদের চিনি বা বিবেচনা করতে চাই, তারা জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে কতটা নিরপেক্ষভাবে নিজেদের অভিমত ব্যক্ত করছেন, কতটা ইনিয়ে-বিনিয়ে বলছেন। কোনও সমাজে যখন সরাসরি কথা বলার স্পেস সংকুচিত হতে থাকে এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মধ্যে ইনিয়ে-বিনিয়ে বা আকার-ইঙ্গিতে কথা বলার প্রবণতা বাড়ে, তখন বুঝতে হয় সেই সমাজ ও রাষ্ট্রে গণতন্ত্র ঠিক পথে নেই; সেখানে ভয়ের সংস্কৃতি চালু আছে। এটি হয় বুদ্ধিজীবীরাও যদি দলীয় পরিচয়ে ভাগ হয়ে যান তখন। টেলিভিশনের টকশোতে একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, একজন সাংবাদিক, একজন শিল্পী অথবা অন্য কোনও পেশার একজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ যখন কথা বলেন, তখন দূর মফস্বলের চায়ের দোকানে বসে টিভি দেখতে থাকা একজন কৃষকও তার কথা শুনে বুঝতে পারেন, তিনি অমুক দলের পক্ষে কথা বলছেন। অর্থাৎ দুই-চারজন ব্যতিক্রম বাদ দিলে অধিকাংশ বুদ্ধিজীবীই এখন দলীয় বুদ্ধিজীবীতে পরিণত হয়েছেন। বুদ্ধিজীবীরা দলীয় পরিচয়ে বিভক্ত হয়ে গেলে সমাজ ও রাষ্ট্রের এই বাতিঘরদের কাছ থেকে আলো ছড়ায় না; অন্ধকার নেমে আসে।

আমীন আল রশীদ: বার্তা সম্পাদক, চ্যানেল টোয়েন্টিফোর

/এমএমজে/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ