‘শেষ হইয়াও হইলো না শেষ’

Send
প্রভাষ আমিন
প্রকাশিত : ১৫:২৭, অক্টোবর ২৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:২৯, অক্টোবর ২৭, ২০১৯

প্রভাষ আমিনবাংলাদেশ ক্রিকেটে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। প্রায় ৬০ ঘণ্টা পর যেন দম ফেললেন সবাই। মধুরেণ সমাপয়েৎ। একদিন আগেও যারা মুখোমুখি অবস্থানে ছিলেন, তারাই এক টেবিলে বসে মিটিয়ে ফেললেন সমস্যা। বিসিবির সভাপতি নাজমুল হোসান পাপনের কানে কানে কথা বলছেন বিদ্রোহী সাকিব আল হাসান—পত্রিকায় ছাপা হওয়া এমন ছবি স্বস্তি এনেছে সবার মনে। কিন্তু ছবি কি সবসময় সত্যি কথা বলে? এখন নানান ফিসফাস শুনে মনে হচ্ছে, ছবি আসলে সত্যি কথা বলে না। দুই পক্ষের আলোচনায় অচলাবস্থা আপাতত কাটলো। কিন্তু ক্রিকেটের মূল সমস্যা কি মিটলো? আপনারা যে যাই মনে করুন, আমার ধারণা ক্রিকেটের সমস্যা মেটেনি। বরং বলা যেতে পারে ক্রিকেট সমস্যা নতুন মাত্রা পেলো। আর সমঝোতার দু’দিনের মধ্যেই সাকিবকে শর্তভঙ্গের অভিযোগে কারণ দর্শাতে বলে পাপন বুঝিয়ে দিলেন ছবি আসলেই সত্যি কথা বলে না। বাংলাদেশের ক্রিকেট যেন এক টানটান উত্তেজনার ছোটগল্প—শেষ হইয়াও হইলো না শেষ।
খেলোয়াড়দের ১৩ দফা দাবির সঙ্গে সাকিবকে দেওয়া কারণ দর্শানো নোটিশের কোনও সম্পর্ক নেই। আর ব্যক্তিগত সম্পর্ক যাই হোক, কেউ অন্যায় করলে তাকে ছাড় দেওয়া যাবে না, এটাই উচিত। কিন্তু সবসময় এই উচিত-অনুচিতের নিয়ম মেনে চলি না আমরা। তবে সাকিব আল হাসান খুব অনুচিত কাজ করেছেন। ১১ দফা দাবি উত্থাপনের পরদিন তিনি গ্রামীণফোনের সঙ্গে চুক্তি করেছেন; মানে ত্রিকেটাররা যখন ধর্মঘটে, তখন তাদের নেতা একটি টেলিকম কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করছেন। এটা আন্দোলনের নৈতিকতা নিয়েই প্রশ্ন তুলে দেয়। নৈতিকতার চেয়ে বড় কথা হলো, এটা স্পষ্টতই চুক্তিভঙ্গ। কারণ বিসিবির চুক্তিবদ্ধ কোনও খেলোয়াড় কোনও টেলিকম কোম্পানির সঙ্গে ব্যক্তিগত কোনও চুক্তি করতে পারবেন না। এর আগে তামিম ইকবালও ৩ কোটি টাকার চুক্তি করার অনুমতি চেয়ে পাননি। সাকিব তাই অনুমতিরই ধার ধারেননি। কিন্তু আপনি বোর্ডের কাছে পেশাদারিত্ব আশা করবেন, আর নিজে ইচ্ছামতো চলবেন, এটা তো হবে না।

অতি গুরুত্বপূর্ণ ভারত সফরের আগের সপ্তাহে ক্রিকেটারদের এই আন্দোলন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, বিশেষ করে আন্দোলনের ধরন নিয়ে। প্রথম কথা হলো, দুই পক্ষই গণমাধ্যমে সরাসরি নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরেছেন। যেটা আসলে দুই পক্ষকেই ফাঁদে ফেলেছে। কোনও আলটিমেটাম ছাড়া সরাসরি ধর্মঘটের ডাক দিয়ে সাকিব আল হাসানরা ভুল করেছিলেন। কড়া জবাব আর ব্যক্তিগত আক্রমণ করে নাজমুল হাসান পাপনও দেশবাসীর নিন্দা কুড়িয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে একদিনের মধ্যেই দুইপক্ষ নমনীয় হয়ে অচল অবস্থা কাটিয়েছে বটে, কিন্তু এই সময়ে দুই পক্ষই পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করতে গিয়ে এমন অনেক গোপন কথা ফাঁস করে দিয়েছেন, যা সাধারণ মানুষের অগোচরেই ছিল। এই সুযোগে আলো পড়েছে ক্রিকেটের অনেক অন্ধকারেও। তবে গোটা জাতিকে জানিয়ে নিজেদের ঝগড়াটা না করলেই পারতেন ক্রিকেটার ও বিসিবি কর্তারা। ক্রিকেটারদের মাসিক বেতন চার লাখ টাকা শুনে যেমন অনেকের চোখ কপালে উঠেছে; তেমনি বিদেশে গিয়ে খেলোয়াড়রা প্রতিদিন পান ৫০ ডলার আর বিসিবি পরিচালকরা পান ৫০০ ডলার; এটা জেনেও অনেকে অবাক হয়েছেন।

ক্রিকেটারদের মাসিক বেতন ৪ লাখ টাকা শুনে যাদের চোখ কপালে উঠে গেছে, যারা রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তুলনা করে ক্রিকেটারদের তুলাধুনা করছেন; তাদের বোঝায় একটু ভুল আছে। প্রথম কথা হলো, ৪ লাখ টাকা বেতন সবাই পান না; সিনিয়র ৪/৫ জন হয়তো পান। দ্বিতীয়ত, ৪ লাখ টাকা কিন্তু তারা সারাজীবন পাবেন না, যতদিন ফর্ম আছে, ততদিন; খুব ধারাবাহিক হলে ৩৫ বছর বয়স পর্যন্ত। তাই তাদের বেতন আপনার কাছে যত বেশি মনে হচ্ছে; তত বেশি কিন্তু নয়। বরং আমি মনে করি, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের এখন যা আয়, তাতে ক্রিকেটারদের বেতন কাঠামো আরও বাড়ানো উচিত। পাশাপাশি ক্রিকেটারদের অবসর পরবর্তী জীবনের নিশ্চয়তা, চিকিৎসাসহ সব ধরনের ঝুঁকিও বিবেচনায় নেওয়া উচিত। কারণ ক্রিকেটাররা নিজেদের সবধরনের ক্যারিয়ারের সম্ভাবনা বিসর্জন দিয়ে ক্রিকেট খেলতে আসেন। ক্রিকেটারদের বেতনের অঙ্ক শুনে যাদের চক্ষু চড়কগাছ; তাদের একটু বিভিন্ন বেসরকারি ব্যাংক, বিমা, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি, মোবাইল কোম্পানির শীর্ষ কর্তাদের বেতনের খোঁজ নিতে বলি। ক্রিকেটারদের কয়েকগুণ বেশি বেতন পান, এমন অনেক মানুষ আছেন বাংলাদেশেই।

ক্রিকেটারদের দাবির যৌক্তিকতা নিয়ে কোনও প্রশ্ন নেই। তবে তাদের প্রায়োরিটি নিয়ে আমার প্রশ্ন আছে। ক্রিকেটের বিকেন্দ্রীকরণ, কোচ-গ্রাউন্ডসম্যানদের বেতন বাড়ানো, ভালো বল, ঘরোয়া লিগে ফিক্সড ক্যালেন্ডার দাবি করে একধরনের বিভ্রম তৈরি করা হয়েছিল। আরও অনেকের মতো আমিও, ক্রিকেটারদের দাবিগুলোকে যৌক্তিক শুধু নয়, আন্দোলনকেই মহৎ বিবেচনা করেছিলাম, ভেবেছিলাম সত্যিই এ আন্দোলন ক্রিকেটের ভবিষ্যতের জন্য, ভবিষ্যৎ ক্রিকেটারদের জন্য। দাবির যৌক্তিকতা নিয়ে আমার এখনও সংশয় নেই, তবে মহত্ত্ব নিয়ে সন্দেহ জাগছে। নিবিড় বিশ্লেষণে বরং আন্দোলনকে এর নেতা সাকিবের মতোই স্বার্থপর মনে হচ্ছে। বেতন বাড়াতে হবে, ম্যাচ ফি বাড়াতে হবে, টিএ-ডিএ বাড়াতে হবে, ডিল করতে দিতে হবে, পাওনা টাকা দিতে হবে—দফায় দফায় অর্থের ঝনঝনানি, বাণিজ্যের উৎকট গন্ধ। বিসিবি যদি কথামতো দাবিগুলো মেনেও নেয়, তাতে সিনিয়র কয়েকজন ক্রিকেটারই বেশি লাভবান হবে; উঠতি ক্রিকেটাররা, যাদের দর কষাকষি করার মতো শক্তি নেই, তারা বারবার বঞ্চিত হবে। ক্লাবের সঙ্গে ক্রিকেটারদের ডিল করতে দিলে, তারকা ক্রিকেটাররাই ক্লাবের বাজেটের সিংহভাগ নিয়ে নেবে; বঞ্চিত হবে তরুণরা, এমনকি প্রতিশ্রুত অর্থ পাবে কিনা তারও গ্যারান্টি থাকবে না। বিসিবির সঙ্গে সমঝোতার পরপরই তরুণ ক্রিকেটাররা বিপদটা টের পেয়েছেন। বিসিবি প্রধান যেভাবে ক্রিকেটারদের ওপর চড়াও হয়েছেন, তাতে তাদের শঙ্কাটা অমূলক নয়। বিসিবি প্রধানের ব্যক্তিগত আচরণ যাই হোক, বিসিবির প্রাতিষ্ঠানিক ছাতাটা মাথার ওপর থেকে সরে গেলে তরুণ ক্রিকেটারদের বিপদে পড়ার শঙ্কাই বেশি।

বলছিলাম প্রায়োরিটির কথা। ক্রিকেটারদের প্রথম দাবি হলো, কার্যক্রম না থাকায় ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-কোয়াবের বর্তমান নেতৃত্বকে অবিলম্বে পদত্যাগ করতে করতে হবে। এটা তো বিসিবির কাছে জানানোর মতো দাবি নয়। এটা তো ক্রিকেটারদের সংগঠন। তারা তাদের নেতৃত্ব ঠিক করবে এবং কোয়াবের নেতৃত্বেই আন্দোলন হবে। হয়েছে উল্টো। আর যদি সত্যিই ক্রিকেটের স্বার্থে আন্দোলন হতো, তাহলে আমার এক নম্বর দাবি থাকতো পাতানো ম্যাচ বন্ধের। একজন তরুণ ক্রিকেটার যখন ক্লাব কর্তার ইচ্ছায় আউট হয়, তখন তার মধ্যে ক্রিকেট সত্তাটা বিকশিত হয় না। এই ক্রিকেটারের কাছ থেকে ভবিষ্যতে আপনি কী নৈতিকতা আশা করবেন।

তবে বিসিবি প্রধান জবাব দিতে গিয়ে বারবার ক্রিকেটারদের আন্দোলনের যৌক্তিকতা প্রমাণ করছিলেন। তিনি যেভাবে ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস করছিলেন, তাতে ভবিষ্যতে আর কেউ তার কাছে ব্যক্তিগত সমস্যা শেয়ার করবে বলে মনে হয় না। নাজমুল হাসান পাপনের আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতেই বোঝা গেছে, কেন ক্রিকেটাররা কোনও আলটিমেটাম ছাড়াই ধর্মঘটে গেছেন। পাপন যেভাবে বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে বেতন বাড়ানো বা ব্যক্তিগতভাবে বোনাস দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানাচ্ছিলেন; তাতে বিসিবিকে কোনও পেশাদার প্রতিষ্ঠান মনে হয়নি। এই আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে ক্রিকেটের এবং দেশের ভাবমূর্তির। ক্রিকেটার এবং বোর্ডের মধ্যে যে অনাস্থা, অবিশ্বাস, দূরত্ব তৈরি হয়েছে; তা খুব সহজেই দূর হবে বলে মনে হয় না। তবে আমরা যারা দর্শক, দূর থেকে ক্রিকেটকে ভালোবাসি; তারা চাই ক্রিকেটের আকাশ থেকে সব শঙ্কার কালো মেঘ উড়ে যাক। একমাত্র সাফল্যই পারে তা দূর করতে। ভারত সফরেই শুরু হোক, ক্রিকেটের সে নবযাত্রা।

বলছিলাম আন্দোলনের স্বার্থপরতার কথা। ক্রিকেটারদের ১১ নম্বর দাবিটি হলো, ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ দুটির বেশি খেলা যাবে না, এমন নিয়ম তুলে দিতে হবে। এটা আসলে ক্রিকেটারদের দাবি নয়, সাকিবের একার দাবি। কারণ সাকিব ছাড়া আর কারও দুটির বেশি ফ্র্যাঞ্চাইজি খেলার সুযোগ নেই, নিকট ভবিষ্যতে হবেও না। কৌশলী সাকিব ক্রিকেটারদের মাথায় বন্দুক রেখে শিকারটা করতে চেয়েছিলেন। তবে বোর্ড এটা পুরোপুরি মানেনি, ‘কেস বাই কেস’ বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন। বাংলাদেশ ক্রিকেটে মাশরাফি অধ্যায় প্রায় শেষ, কিছু আনুষ্ঠানিকতা মাত্র বাকি। ইতোমধ্যে সাকিব টেস্ট ও টি-২০এর নেতৃত্ব বুঝে নিয়েছেন। সাকিবের পারফরম্যান্স নিয়ে কোনও সংশয় নেই। নিঃসন্দেহে তিনি এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সেরা পারফর্মার। শুধু বর্তমান সময়ের নয়, সাকিব আসলে সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডারদের ছোট্ট তালিকায় থাকবেন। পরিসংখ্যান বিবেচনায়, দলে গুরুত্ব বিবেচনায় সাকিব আসলে সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডার। গত বিশ্বকাপে দলগত পারফরম্যান্সে বাংলাদেশ ছিল তলানিতে। তবে ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সে সাকিব ছিলেন শীর্ষে। দল আরেকটু ভালো করলে ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্টের মুকুটটা সাকিবই পেতে পারতেন। তবে তার নেতৃত্বগুণ, আচরণ, অ্যাটিচুড নিয়ে সমস্যা আছে। একথা বিসিবি সভাপতি একাধিকবার বলেছেন। সমর্থক পিটিয়ে, অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করে বারবার তিনি ক্রিকেটকে কলঙ্কিত করেছেন। দেশের হয়ে না খেলার হুমকি দিয়ে সাকিব একবার নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েছিলেন। বারবার চেষ্টা করেও বোর্ড আসলে তাকে সামলাতে পারছে না। নেতৃত্ব পেলে দায়িত্বশীল হবে, এমন ধারণা থেকেই হয়তো তাকে অধিনায়ক বানানো হয়েছে। তবে আমার উল্টো শঙ্কা। সেদিন একজন ক্রিকেট সংগঠক কয়েকজন সিনিয়র ক্রিকেটারকে বলছিলেন, আপনারা সাকিবের সঙ্গে কথা বলে ঝামেলাটা মিটিয়ে দিন। সিনিয়র ক্রিকেটাররা না না করে উঠলেন। সবার চেহারায় আতঙ্কের ছাপ। সাকিব কখন, কী বেয়াদবি করবেন; পরে সওয়াও যাবে না, কওয়াও যাবে না। ক্রিকেটারদের একজন সেই সংগঠককে বললেন, আপনারা সাকিবের সঙ্গে কথা বলুন। শুনে সেই সংগঠকের চেহারায়ও আতঙ্কের ছাপ, আমি বাপু ওসবে নেই। ছোট মুখে একটা ছোট কথা বলে লেখা শেষ করছি—সাকিব আল হাসানের অধিনায়ককাল যত সংক্ষিপ্ত হবে, বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য ততই মঙ্গল।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ