সাকিবের শাস্তি ও দেশের ক্রিকেটবহির্ভূত ক্ষতি

Send
মো. সামসুল ইসলাম
প্রকাশিত : ১৮:২৪, নভেম্বর ০১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:০২, নভেম্বর ০৩, ২০১৯

মো. সামসুল ইসলামসাকিবকে ক্রিকেট থেকে সাময়িক নির্বাসনে পাঠানো নিয়ে আইসিসির সিদ্ধান্তের চুলচেরা বিশ্লেষণ এখনও বন্ধ হয়নি। এ আলোচনা সহসাই থামবে না। কারণ সাকিবের শাস্তিকে কেউ শুধু দেশের ক্রিকেটের ক্ষতি হিসেবে দেখছেন না, সাকিব তো অনেক আগেই ক্রিকেটীয় উচ্চতাকে অতিক্রম করেছেন। তিনি হয়েছেন লাখো-কোটি তরুণের রোল মডেল। বহুধাবিভক্ত এই সমাজে সাকিব তো ঐক্য ও ভালোবাসার প্রতীকও। সেজন্য এই শাস্তি, ন্যায্য বা অন্যায্য যাই হোক, দেশের অগণিত মানুষের হৃদয়কে করেছে রক্তাক্ত।
বলা বাহুল্য, জুয়াড়ির সঙ্গে সাকিবের কথোপকথন আর এই শাস্তির খবর এমন এক সময়ে সবাইকে শুনতে হলো, যখন  ক্যাসিনো আর জুয়াকে কেন্দ্র করে দেশে শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছে। ধরা পড়ছেন অনেক খ্যাতনামা ব্যক্তি, একে একে অনেকের মুখোশ খুলে পড়ছে। সাকিবকে যারা বছরের পর বছর থেকে দেখছেন, সেই কিছুটা রক্ষণশীল, চরম ভদ্র, মৃদুভাষী, দীর্ঘ ক্যারিয়ারে মোটামুটি স্ক্যান্ডালমুক্ত—সবার অতি প্রিয় সাকিবের নাম জুয়াড়িদের সঙ্গে জড়িয়ে যাবে, সেটা সবার কাছেই অবিশ্বাস্য ঠেকছে। মা-বাবা-স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সুস্থ পারিবারিক জীবনে বিশ্বাসী সাকিব তো চিরায়ত বাঙালি জীবনের এক বড় প্রতিচ্ছবি, আমাদের অতি আপন, যেন সবার পাশের বাড়ির পরিচিত ছেলেটি! 

তরুণরা তাই মানতে পারছেন না তাকে শাস্তির প্রক্রিয়া। সোশ্যাল মিডিয়ায় তারা তুলকালাম করছেন। আইসিসির এ সিদ্ধান্ত কতটুকু যৌক্তিক, তা নিয়ে তারা এমনকি অন্য দেশের খেলোয়াড় বা নাগরিকদের সঙ্গে বিতর্কে জড়িয়ে পড়ছেন। বিসিবির সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, কারণ খুঁজছেন তাদের নির্লিপ্ততার।

মিডিয়ার একজন পর্যবেক্ষক হিসেবে আমি সোশ্যাল মিডিয়ায় তরুণদের অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ গভীরভাবে লক্ষ করি। সবসময় যা দেখি তা হচ্ছে ক্ষয়িষ্ণু পারিবারিক জীবন বা দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত সমাজে তরুণরা আঁকড়ে ধরার মতো রোল মডেল খোঁজেন, সেটা শিক্ষকদের মাঝেই হোক বা রাজনীতিবিদ বা সিনেমা বা অন্য কোনও পেশার সেলেব্রিটিদের মাঝেই হোক। তাই তারা  আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুকে মেনে নিতে পারেননি, আইয়ুব বাচ্চু তো শুধু গায়ক ছিলেন না, তাদের কাছে তিনি ছিলেন উদারতা আর মানবিকতার এক প্রতীক। তাকে হারিয়ে এ প্রজন্ম যেন দিশেহারা হয়ে গিয়েছিল।

আরেকটি ঘটনা আমার মনে পড়ে। অভিনেতা জুটি  মিথিলা-তাহসানের বিয়ে-বিচ্ছেদের পর সোশ্যাল মিডিয়ায় তরুণদের হা-হুতাশ দেখে আমি ফেসবুকে এর ব্যাখ্যা দিয়েছিলাম। দর্শকরা তাদের তো শুধু স্বামী-স্ত্রী হিসেবে দেখেননি। মাত্রাতিরিক্ত ডিভোর্স আর ভেঙে পড়া পারিবারিক সম্পর্কের এই পরিবেশে তাদের তরুণ সমাজ পারিবারিক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার অবলম্বন হিসেবে দেখেছিল। কিন্তু যখন এ সম্পর্ক ভেঙে পড়লো, তারা যেন এরমধ্যে নিজেদের পারিবারিক সস্পর্কের ভবিষ্যৎকেই দেখলো। সমাজের যে চিত্র তাদের পক্ষে মেনে নেওয়া কষ্টকর ছিল।           

কিন্তু সাকিব তো তাদের চেয়েও অনেক অনেক বড় এক সুপারস্টার।  খেলাধুলার বা বিনোদনের জগতে বাংলাদেশে আমরা সাকিব ছাড়া আর কোনও বিশ্বখ্যাত সুপারস্টার পেয়েছি কিনা, আমি এই মুহূর্তে স্মরণ করে পারছি না। সদ্য বিশ্বকাপে দ্যুতি ছড়ানো এ মানুষটি তো প্রতিটি বাংলাদেশিকে করেছিলেন গর্বিত। বিদেশিদের মাঝেও বাংলাদেশি ফ্যান ক্লাব গড়ে উঠেছিল। সম্প্রতি দেশের জন্য এত বড় ব্র্যান্ডিং আর কে করতে পেরেছেন বা অদূর ভবিষ্যতে পারবেন? সাকিবের শাস্তিকে আমরা বাংলাদেশেরই শাস্তি হিসেবে দেখছি, শুধু ক্রিকেটীয় ক্ষতি হিসেবে একে দেখার কোনও সুযোগ নেই।

জনগণ আসলে তাকে নিয়ে অনেক হিসাবেই মেলাতে পারছেন না। আইসিসি বা বৈশ্বিক ক্রিকেট রাজনীতি বা ক্রিকেট জুয়ার গভীরতা বিশ্লেষণে আমরা এই মুহূর্তে যেতে যাচ্ছি না। আমরা গণমাধ্যমে দেখছি যে আকসু কর্মকর্তারা জুয়াড়িদের ব্যাপারে এ বছরই কয়েকবার সাকিবের বক্তব্য শুনেছেন। সুতরাং সাকিব তো জানতেন কিছু একটা ব্যাপার হয়তো ঘটতে যাচ্ছে। তারপরও কেন তিনি ঠিক ভারত সফরের আগেই ধর্মঘটে নেতৃত্ব দিলেন তা পরিষ্কার নয়। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী যেটা বলেছেন, সেটাও তো যৌক্তিক কথা। যেকোনও ধর্মঘটে যাওয়ার আগে তো নিয়ম হচ্ছে দাবি জানিয়ে সময় বেঁধে দেওয়া। সেটা না করে হঠাৎ করেই ধর্মঘটে যাওয়া, সাকিবের শাস্তিসহ পরবর্তী ঘটনা প্রবাহের কারণেই হয়তো এখন অনেকের কাছেই বিস্ময়কর ঠেকছে।    

আমি ফেসবুকে লিখেছি যে বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ফ্রাঞ্চাইজির পক্ষে করপোরেট লিগগুলোয় খেলতে গিয়ে সাকিবকে হয়তো অনেককেই গুড হিউমারে রাখতে হয়েছে। দেখতে হয়েছে নিজের ক্রিকেটীয় ভবিষ্যৎ আর নিজ জীবনের নিরাপত্তা। আর এসব কারণেই হয়তো কোনও এক ফাঁদে তিনি ভুলক্রমে পা দিয়ে ফেলেছিলেন। আর এজন্যই হয়তো এসব বিপত্তি ঘটেছে। আর একজন নিজেই যখন তার নিজের অপরাধ স্বীকার করে নেন, তখন অন্যদের  আর কীইবা বলার আছে! প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও তো সাকিবের সুসম্পর্ক রয়েছে। তেমন ভয়াবহ কিছু ঘটলে তিনি তো প্রধানমন্ত্রীকে জানাতে পারতেন। কিন্তু তিনি তো সেসব পথে পা মাড়াননি।     

তবে বিসিবির প্রাক্তন সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরীসহ অন্যরা বিসিবির দিকে যেসব অভিযোগের তীর ছুড়ছেন তাতে অন্তত একটা জিনিস পরিষ্কার, সাকিব এবং অন্য ক্রিকেটাররা অনেক তরুণের আদর্শ হলেও বিসিবিতে তারা আদর্শ পরিবেশ পাননি। সাকিবের মতো একজন সুপারস্টারকে যথাযথভাবে গাইড করার জন্য সে রকম নৈতিক মানসম্পন্ন কেউ কি ছিলেন বিসিবিতে? খেলার মাঝেই তো দলের কর্মকর্তার ক্যাসিনোতে যাওয়ার ছবি পত্রিকায়ই এসেছে। তাদের কাছ থেকে ক্রিকেটাররা কী শিখবেন?

একথা বলছি এ কারণে যে সাকিবকে নিয়ে যখন দেশি বিদেশি মিডিয়ার কাটাছেঁড়া চলছে তখন কিছু কিছু ব্যাপারে সাকিবের আচরণে অপরিপক্বতা এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। আমার কাছে প্রায়শই মনে হতো কিছু ব্যাপারে তার আরও সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন ছিল। অতিমাত্রায় ব্যবসায়ে জড়িয়ে পড়া বা একজন সুপারস্টার হয়েও সব ধরনের করপোরেট লীগে অংশগ্রহণের জন্য তার পীড়াপীড়ি বা আইপিএলে গিয়ে অতিরিক্ত খেলোয়াড় হিসেবে ম্যাচের পর ম্যাচ বসে থাকা তার নামের সঙ্গে ঠিক মানানসই মনে হয়নি আমার কাছে। 

আমার বাসার কাছাকাছি মিরপুরে এক সাধারণ বিল্ডিংয়ে সাকিবস রেস্টুরেন্ট আমার কাছে সবসময় বিস্ময়কর ঠেকেছে। আশপাশের অনেকে রেস্টুরেন্টে খেতে গেলেও তার রেস্টুরেন্টে যাওয়ার ইচ্ছে আমার কোনও সময় হয়নি। এ রকম একজন বিশ্বখ্যাত ব্যক্তি তার খ্যাতির মধ্যগগনে এরকম সাধারণ এক জায়গায় অতি সাধারণ এক রেস্টুরেন্টের ব্যবসা করবেন এটা আমি কখনও মানতে পারিনি। তিনি অবসর নেওয়ার পরে এ ধরনের ব্যবসা করতে পারতেন। আবার বোর্ডের নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও টেলিকম কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি ইত্যাদিকে অবশ্যই অপরিণত বুদ্ধির প্রতিফলন মনে হয়েছে। তার চেয়েও বড় ব্যাপার বোর্ডের সঙ্গে তার মানসিক দূরত্ব—যার দায়িত্ব অবশ্যই বোর্ডকে নিতে হবে।

সাকিবের সমালোচনা করা মোটেই আমাদের উদ্দেশ্য নয়। ক্রিকেটের বাইরেও তিনি যে কত বিশাল এক ব্যক্তিত্ব সেটিই আমরা স্মরণ করিয়ে দিতে চাইছি মাত্র। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি সাকিব তার হারানো মর্যাদা ফিরে পাবেন। তবে তার ইমেজ ফিরে পেতে তাকে অনেক সতর্ক হতে হবে, অনেক কষ্ট করতে হবে। আমরা দেখেছি অত্যন্ত সম্মানীয় এমসিসি ক্রিকেট কমিটি থেকে তার পদত্যাগকে কমিটির চেয়ারম্যান মাইক গ্যাটিং সঠিক সিদ্ধান্ত বলেছেন। এটা ঠিক যে বাইরের পৃথিবী সাকিব কি বিসিবির সঙ্গে দ্বন্দ্বের বা ক্রিকেটীয় রাজনীতি বা ষড়যন্ত্রের শিকার এসব নিয়ে মাথা ঘামাবে না।

তৃতীয় বিশ্বের ছোট একটি দেশের একজন নেতা বা সেলিব্রিটি চিরাচরিত প্রথাতেই দুর্নীতি করবেন এরকম পূর্বনির্ধারিত ধারণা উন্নত বিশ্বের সবাই পোষণ করেন। মাইকেল ভনসহ পশ্চিমা ক্রিকেটারদের বক্তব্য এ ধারণাকেই সমর্থন করে। সাকিবের ভাবমূর্তি শুধু তার একার নয়, এর সঙ্গে দেশের সম্মানও জড়িত। বিসিবিসহ সরকারের শীর্ষ পর্যায়কে আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসতে হবে সাকিবের শাস্তি লাঘবের ব্যাপারে। আইসিসির সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে সাকিব তথা দেশের ইমেজ রক্ষা করতে হবে।

লেখক: কলামিস্ট

ইমেইল:  shamsulbkk@gmail.com

/এমএনএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ