মধ্যপ্রাচ্যে ধর্ষণের শিকার গৃহশ্রমিকের ক্রন্দন!

Send
সালেক উদ্দিন
প্রকাশিত : ১৫:০৫, নভেম্বর ০২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৪২, নভেম্বর ০২, ২০১৯

সালেক উদ্দিনমধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি নারী গৃহশ্রমিক, নার্স ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের ওপর নিয়োগকর্তারা নির্ভয়ে নির্বিচারে যৌন নির্যাতন চালাচ্ছেন। ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন হাজার গৃহশ্রমিক। অসম্মতিতে অভুক্ত রাখাসহ চলছে অমানবিক শারীরিক নির্যাতন। দেওয়া হচ্ছে না বেতন। শুধু তাই নয়, নারী কর্মীদের সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যে যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ‘হামিল’ বা গর্ভবতী হয়ে দেশে ফিরছেন বাংলাদেশের নারীকর্মীরা। যারা নিজের সম্ভ্রমটুকু বাঁচানোর জন্য প্রতিবাদী হচ্ছেন, তাদের ওপর চলছে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন। বিপদগ্রস্ত বহু নারী এখনও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সেফহোমে বসবাস করছেন।
এসব হলো বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকার অতিপরিচিত নিয়মিত শিরোনাম।
আকর্ষণীয় বেতনের আশায় দারিদ্র্য বিমোচনে একটুখানি সুখ সচ্ছলতার খোঁজে মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়া বাংলাদেশি নারীরা এই নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরছেন। কেউ ফিরছেন নির্যাতনের অভিজ্ঞতা নিয়ে, কেউ ফিরছেন কফিনবন্দি হয়ে। বেশ কিছুদিন ধরে এসব খবর প্রতিদিনের সংবাদমাধ্যমে আসছে।  

২০১৫ সাল থেকে দুই লাখেরও বেশি নারী শ্রমিক পাঠানো হয় সৌদি আরবে। তাদের মধ্যে নির্যাতনসহ নানা কারণে ৪০ হাজারের মতো নারী শ্রমিক সেখান থেকে ফেরত আসেন। পত্র-পত্রিকার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন  অনুযায়ী, ২০১৮ সালে প্রতিমাসে গড়ে ২০০ জন করে নারী শ্রমিক দেশে ফিরেছেন এবং নির্যাতনের শিকার হয়ে রিয়াদ ও জেদ্দার সেফহোমগুলোতে গড়ে ২০০ জন করে শ্রমিক আশ্রয় নিচ্ছেন। মধ্যপ্রাচ্য থেকে দিনে গড়ে ১১টি কফিন আসছে। এর মধ্যে নারীর সংখ্যাই বেশি। ২০১৬ সাল থেকে গত জুন পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্য থেকে ৩১১ জন নারী শ্রমিকের লাশ এসেছে বাংলাদেশে। তাদের অধিকাংশই এসেছেন সৌদি আরব থেকে। এরমধ্যে ৫৩ জনের মৃত্যুর কারণ আত্মহত্যা, ১২০ জনের মৃত্যুর কারণ স্ট্রোক এবং ৫৬ জনের মৃত্যুর কারণ দুর্ঘটনা বলে জানিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ।

জানা গেছে ২০১১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত প্রবাসী নারীরা দৈহিক মানসিক নির্যাতন ও যৌনতায় বাধ্য করাসহ বিভিন্ন বিষয়ে নানা অভিযোগ করলেও এগুলো নিষ্পত্তির সংখ্যা হতাশাজনক। 

২০১৫ সালের আগে বেশ কিছুদিন বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেওয়া বন্ধ রেখেছিল সৌদি আরব। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সৌদি সরকারের বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেওয়া চুক্তি হয়। সে চুক্তি অনুযায়ী একজন নারী শ্রমিক ও দু’জন পুরুষ শ্রমিক এই অনুপাতে বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে শ্রমিক পাঠানোর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। চুক্তিটি এমন সময়ে সম্পাদিত হয়েছিল, যখন নারী শ্রমিকের ওপর দৈহিক ও যৌন নির্যাতনের কারণে ফিলিপাইন সৌদি আরবের নারী শ্রমিক পাঠানো নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল। নেপাল নারীদের গৃহকর্মী হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করতে যাওয়া অবৈধ ঘোষণা করেছিল এবং মধ্যপ্রাচ্যে নারী শ্রমিক পাঠানো বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিল ইন্দোনেশিয়া ও শ্রীলংকা।

এসব হলো পুরনো কথা। নতুন কথা হলো নাজমা বেগম নামের বাংলাদেশের এক নির্যাতিতা ও ধর্ষণের শিখার গৃহকর্মীর লাশ সৌদিমর্গে পড়ে ছিল একমাস। ধর্ষণের শিকার আরেক গৃহকর্মী রিয়াদের এক বাড়ি থেকে পালিয়ে দূতাবাসে চলে আসেন। এরপর সেখানে একটি আশ্রয়কেন্দ্রে থাকেন চার মাস। অবশেষে দেশে ফিরে আসেন সরকার ও উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানের সহায়তায়। উপহার হিসেবে নিয়ে আসেন ধর্ষণজনিত কারণে এক কন্যাশিশুকে। এরকম আরও হাজার ঘটনা। কয়েকজন তো তাদের জীবনের করুণ কাহিনি বলতে গিয়ে লজ্জা ভুলে বলেই ফেললেন, প্রতিনিয়ত রাতভর বাড়ির পুরুষদের দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হতো তাদের। প্রতিবাদে কিছুই বলার থাকতো না।

দাসপ্রথার প্রবর্তক সৌদি জাতি বাংলাদেশি গৃহকর্মীদের ক্রীতদাসী মনে করে এবং এর জন্য তাদের কঠিন বিচারের মুখোমুখি হতে হয় না বলেই তাদের এই ঔদ্ধত্য। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ দেশে আইন এত কঠিন যে, চুরি করলে সেখানে হাত কেটে দেওয়া হয়, ধর্ষণের কারণে শিরশ্ছেদ করা হয়। তারপরও তাদের এই ঔদ্ধত্যের কারণ কী? এর বিচার হয় না কেন?

একটি কারণ হতে পারে, সেফহোম বা আশ্রয়কেন্দ্রের এসব নির্যাতিতা ও ধর্ষণের শিকার গৃহকর্মীকে আইনের সামনে গৃহকর্তার অপরাধ প্রমাণ করা সম্ভব হচ্ছে না। মামলা এস্টাবলিশ হতে হলে ধর্ষণের শিকার নারীর দেশে ফিরতে বিলম্ব হবে বলে দ্রুত দেশে ফিরে আসার জন্য তারা আর আইনি প্রক্রিয়ায় থাকতে চান না। সেফহোমগুলোর উচিত তাদের আইনি প্রক্রিয়া থেকে মুখ ফেরানোর মানসিকতা রোধ করা। যে কারণে তারা ফেরেন তা হলো, হতদরিদ্র এসব গৃহকর্মী সেফহোমে থাকার সময় তাদের আর কোনও আয়ের পথ থাকে না। বাড়িতে টাকা পাঠাতে পারেন না। ফলে তাদের পরিবার অনাহারে থাকে। সেফহোম কর্তৃপক্ষ যদি বিচারে যত দেরিই হোক না কেন এই সময়ের জন্য তাদের আর্থিক সাহায্য দিতো, তবে এমনটি হতো না। 

২০১৫ সালের সেই সময়ে সৌদি আরবে নারী শ্রমিক পাঠানোর চুক্তির সার্থকতা নিয়ে আমরা সাফল্যের গর্ব বোধ করেছিলাম। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বৃহৎ শ্রমবাজারে নারী শ্রমিকসহ শ্রমিক পাঠানোর সিদ্ধান্ত দুরভিসন্ধি ছিল বলবো না। উদ্দেশ্য অবশ্যই মহৎ ছিল। তবে এর সফলতার চেয়ে কুফলতার দৃশ্যটিই এখন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। এর কারণ হিসেবে যা চিহ্নিত করা হয়, তা অনেকটা এরকম—

১. নারী গৃহকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যথোপযুক্ত ব্যবস্থা না নিয়েই কর্মী পাঠানো শুরু করা। নিয়োগকর্তা ও সে দেশের সরকার থেকে নারীকর্মীর নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নিতে না পারা।

২. নির্যাতনকারীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিতে না পারা এবং এ ব্যাপারে আমাদের দেশের সরকারের দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ না করে নমনীয় নীতি গ্রহণ করা।

মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাসী কর্মজীবী নারীর ওপর যৌন হয়রানিসহ নানা বৈষম্য বছরের পর বছর ধরে চলছে। এখানে নারীরা আন্তর্জাতিক শ্রম আইন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অসহায় শিকার।

এখন প্রয়োজন সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যে যেসব দেশে বাংলাদেশের নারী শ্রমিক পাঠানো হবে, সেসব দেশের সরকারের সঙ্গে এই মর্মে চুক্তিবদ্ধ হতে হওয়া যে, তারা যেন কোনোভাবে নির্যাতিত না হন। নির্যাতিত হলে নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধে সে দেশের সরকার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নেবে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। 

শুধু তাই নয়, প্রবাসী নারীদের কে কোথায় আছেন, তার পূর্ণাঙ্গ ডাটা সে দেশে আমাদের দূতাবাসের কাছে থাকতে হবে এবং তারা কেমন আছেন তার তদারকি নিয়মিত করতে হবে। এর জন্য প্রতিটি দেশে আমাদের দূতাবাসে একটি বিভাগ থাকা দরকার, সেখানে প্রবাসী বাংলাদেশিদের হিসাব মতো তাদের এই সেবা দেওয়ার জন্য যত লোকবল প্রয়োজন, তত লোকবল সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। আমার জানা নেই, বাংলাদেশ সরকারের এমন ব্যবস্থা আছে কিনা। যদি না থাকে তবে অন্তত সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যে নারী গৃহকর্মীদের রক্ষার জন্য অতি দ্রুত এমন ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

আর কোনোদিন এদেশের কন্যা জায়া জননী যেন গৃহকর্মীর চাকরি নিয়ে প্রবাসে গিয়ে নির্যাতিতা না হন, যৌন হয়রানির শিকার না হন, ধর্ষণের শিকার গৃহকর্মীর চিৎকারে মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমি যেন আর কেঁদে না ওঠে, গৃহকর্তার মাধ্যমে তথাকথিত ‘হামিল’ বা গর্ভবতী হয়ে যেন তাদের দেশে না ফিরতে হয়, কফিনে দেশে ফিরতে না হয়, আমাদের দেশের সরকার সে বিষয়ে এখনই যথাযথ ব্যবস্থা নেবে, সেটাই প্রত্যাশা। 

লেখক: কথাসাহিত্যিক

/এমএমজে/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ