বাগদাদির করুণ পরিণতি

Send
আনিস আলমগীর
প্রকাশিত : ১৪:০৫, নভেম্বর ০৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০৮:৫০, নভেম্বর ০৫, ২০১৯

আনিস আলমগীরআরও কয়েকবার বাগদাদিকে হত্যার কথা মিডিয়ায় এসেছিল। কিন্তু তার ক’দিন পরেই আবু বকর আল বাগদাদি যখন আত্মপ্রকাশ করেন, তখন সবই মিথ্যা প্রতিপন্ন হয়। বাগদাদি মারা গেছেন কিনা এবারও তাই সন্দেহ ছিল অনেকের, বিশেষ করে ঘোষণাটি যখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মুখ থেকে আসে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত হয়েছে, সত্যিই সত্যিই মার্কিন সেনা অভিযানে বাগদাদির মৃত্যু হয়েছে। ইব্রাহিম বিন আওয়াদ বিন ইব্রাহিম আল-বাদরি আল-রাধউই আল-হুসেইনি আল-সামারাই, সংক্ষেপে যিনি আবু বকর আল বাগদাদি, তিনি আর বেঁচে নেই। তার সংগঠন ইসলামিক স্টেটও বাগদাদির মৃত্যুকে স্বীকার করে তার উত্তরসূরি হিসেবে আবু ইব্রাহিম আল-হাশেমি আল-কুরাইশিকে নিযুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছে।
কুর্দি বাহিনীর এক চৌকস গুপ্তচর আইএসের পোশাক পরে বাগদাদির ঘরে ঢুকে তার অন্তর্বাস চুরি করে এনেছিল। চুরি করা অন্তর্বাস ফরেনসিক ল্যাবে পরীক্ষা করে ডিএনএ টেস্টের কাজে লাগানো হয়। ২৬ অক্টোবর ২০১৯ মার্কিন অভিযানে বাগদাদিকে হত্যার পর ডিএনএ’র সঙ্গে মিলিয়ে গোয়েন্দারা নিশ্চিত হযন তারা এবার বাগদাদিকে নির্মূল করতে পেরেছে।

মৃত্যুর পর বাগদাদিকে সমাহিত করা হয়েছে সমুদ্রে। আমেরিকা আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা করার পরও সমুদ্রে ভাসিয়ে দিয়েছিল। আমেরিকার ধারণা ছিল, স্থলভাগে তাদের সমাহিত করা হলে তাদের সমাধি অনুসারীদের কাছে অনুপ্রেরণা লাভের কেন্দ্রে রূপান্তরিত হবে। ধারণাটা মিথ্যা নয়।

আমেরিকা বাগদাদির মাথার মূল্য ২৫ মিলিয়ন ডলার ঘোষণার পর তিনি সিরিয়ার উত্তর-পূর্ব সীমান্ত থেকে উত্তর-পশ্চিমের ইদলিবে এসেছিলেন। ইদলিব প্রদেশ এখন ইসলামিক স্টেটের নিয়ন্ত্রণে নেই। ইদলিব এখন সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে হায়াত তাহেরির আল-শামস নামের একটি জঙ্গি প্রতিষ্ঠান এবং আল-কায়দাসহ প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদবিরোধী আরও কয়েকটি জঙ্গি বিদ্রোহী গ্রুপ। সিরিয়ার সরকারি বাহিনী ইদলিবকে এখনও পুরোপুরি কব্জায় নিতে পারেনি। বাগদাদি উত্তর-পশ্চিম ইদলিবে আশ্রয় নিয়েছিলেন সম্ভবত অধিক নিরাপত্তার প্রয়োজনে।

২০১০ সালে একজন আল-কায়েদা নেতা হিসেবে ইরাকে বাগদাদির অভ্যুদয় ঘটলেও তিনি শেষ পর্যন্ত ইসলামিক স্টেট নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। টাইমস এবং ইকোনমিস্ট পত্রিকার প্রতিবেদন অনুসারে, বাগদাদির প্রতিষ্ঠিত খেলাফতের আয়তন ছিল বেলজিয়াম রাষ্ট্রের সমান। সিরিয়ার বিরাট এলাকা এবং সিরিয়া সীমান্ত থেকে ইরাকের মসুল পর্যন্ত ইরাকি এলাকাও তার খেলাফতের অন্তর্ভুক্ত ছিল। মসুলের তেলক্ষেত্র এবং রিফাইনারি তার কব্জায় ছিল। শেষ পর্যন্ত মসুলের তেলক্ষেত্র এবং রিফাইনারি তার আয়ের উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বাগদাদি তুরস্কের সহায়তায় কম মূল্যে বহু রাষ্ট্রের কাছে তেল বিক্রি করেছেন। এরদোয়ানের পরিবার এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিল।

সম্ভবত নেতাদের লেজুড়বৃত্তির কারণে বিশ্ব মুসলিম একতাবদ্ধ হয়ে মুসলিম বিশ্বের বার্নিং ইস্যুগুলো সম্পর্কে কোনও একক সিদ্ধান্ত এবং অ্যাকশনে যেতে পারছেন না, না হয় সাম্প্রতিক দুটি ঘটনা মুসলমানদের মধ্যে প্যান ইসলামিক স্পিরিট কত প্রচণ্ড, তার প্রমাণ মেলে।

আফগানিস্তানে সোভিয়েত উপস্থিতির পর সমগ্র মুসলিম বিশ্ব থেকে যুবকেরা আফগানিস্তানে উপস্থিত হয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নকে আফগান ছাড়তে বাধ্য করেছিল। আবার বাগদাদি যখন ঘোষণা দেন ইসলামিক স্টেটের শাসনব্যবস্থা হবে ইসলামের প্রাথমিক যুগের খেলাফতের মতো, তখন মুসলিম বিশ্বের হাজার হাজার যুবক সিরিয়া গিয়ে বাগদাদির খেলাফত বাহিনীতে যোগদান করেছিল।

অষ্টাদশ শতাব্দীতে জামাল উদ্দিন আফগানি প্যান ইসলামিক মুভমেন্টের বার্তা নিয়ে মুসলিম বিশ্বের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়িয়েছেন। আফগানি তার বার্তা নিয়ে অটোম্যান সাম্রাজ্যে প্রবেশ করলে অটোম্যান সুলতান তাকে গ্রেফতার করে কারাগারে রেখেছিলেন। এবার প্যান ইসলামিক বাস্তব স্পিরিট সৃষ্টিকারী বাগদাদিকে খতম করার ব্যাপারে বর্তমান অটোম্যানদের কৃতী সন্তান এরদোয়ান সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। বাগদাদির বহু ভুলত্রুটি ছিল তবে প্যান ইসলামিক স্পিরিট সৃষ্টিতে তার ভূমিকা ছিল অতুলনীয়। ইসলামিক বিশ্বকে রক্ষা করতে হলে ভবিষ্যতে বাস্তবতার ভিত্তিতে এই প্যান ইসলামিক জাগরণের পুনরায় প্রয়োজন হবে। তবে প্যান ইসলামিক স্পিরিটের অবমাননা করেছেন বাগদাদি নিজেই। ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের মেয়েদের দাসী বানানো, হত্যা, গলাকাটা, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বাগদাদি ইসলাম ধর্মকে বিশ্বের কাছে অন্যরূপে তুলে ধরে তার অনুসারীদেরও হতাশ করেছেন।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সিরিয়া থেকে আমেরিকার সেনা প্রত্যাহারের সব প্রস্তুতি নিয়েছিলেন, কিন্তু তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের অনুরোধে তিনি তা করতে বিলম্ব করেন। বাগদাদির অবস্থানস্থলে বোমা মেরে ধ্বংস করা এবং বাগদাদিকে হত্যা করার পরামর্শ দেন এরদোয়ান। বাগদাদির মুভমেন্ট তুরস্কের গোয়েন্দাদের নজরদারিতে ছিল। অবশ্য আমেরিকার গোয়েন্দারাও তার গতিবিধির প্রতি কড়া নজর রেখেছিল। বাগদাদিকে হত্যা করার ব্যাপারে তুরস্ক ও আমেরিকা পরস্পরকে সহযোগিতা করেছে। এরদোয়ান তড়িঘড়ি করে আমেরিকা সফরের আয়োজন করেছেন। তুরস্ক কামাল আতাতুর্কের পর থেকেই আমেরিকার উপগ্রহ হিসেবে কাজ করে চলছে।তারা এমন বিশ্বস্ততার পরিচয় দিয়েছে যে আমেরিকা তার পারমাণবিক বোমা পর্যন্ত তুরস্কের কাছে আমানত রেখেছে।

এরদোয়ান কোনও কোনও সময় কিছু কিছু ব্যতিক্রমী কর্মকাণ্ড করলেও এবার বাগদাদিকে নির্মূল করার ব্যাপারে সাহায্য করে উত্তম প্রতিদান আমেরিকাকে প্রদান করেছেন। আমেরিকার মানুষ ট্রাম্পের বিরুদ্ধে মুনাফেকির অভিযোগ তুলেছিল। কারণ, আমেরিকা সিরিয়ার ডেমোক্র্যাটিক ফোর্সেস এবং কুর্দিদের অসহায় রেখে সিরিয়া ত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা ছিল। এখন ট্রাম্পের জন্য এটা বলার সুযোগ মিলে গেলো যে, সিরিয়া ত্যাগের ভান করেছিলাম বাগদাদিকে নির্মূল করার জন্য।

বাগদাদিকে নির্মূল করার পর সিরিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য গত ২৯ অক্টোবর থেকে জেনেভায় সব বিবদমান পক্ষের অংশগ্রহণে শাসনতন্ত্র রচনার যে বৈঠক হচ্ছে তা ফলপ্রসূ হলে এবং রচিত শাসনতন্ত্রের ভিত্তিতে সিরিয়ার শাসন কাঠামো সাজানোর কাজ শুরু হলে সিরিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা দেখা দেবে। গত আট বছরের গৃহযুদ্ধে সিরিয়ার মতো একটি প্রাচীন জনপদ বিরান হয়ে গেছে। সিরিয়ার জনগণ এখন উদ্বাস্তু হয়ে দেশে দেশে ঘুরছে। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী যুদ্ধ বন্ধের ঘোষণা দিয়েছেন। আমেরিকা সৈন্য প্রত্যাহারের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রেখেছে। জেনেভায় সব পক্ষ একমত হলে সিরিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সময়ের ব্যাপার মাত্র।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।
anisalamgir@gmail.com

 

/এসএএস/এমএমজে/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ