সড়ক ডিজিটালাইজেশন

Send
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
প্রকাশিত : ১৫:০৪, নভেম্বর ০৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:০৬, নভেম্বর ০৬, ২০১৯

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮’ আইনটি নতুন। বহুল আলোচিত এই আইনটি প্রণয়নের এক বছরেরও বেশি সময় পর বিধি প্রণয়ন না করেই এটি বাস্তবায়ন হলো। পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের বাধার মুখে এতদিন আইনটি কার্যকরে যায়নি সরকার।
নতুন এ আইনে সব ধরনের সাজা বাড়ানো হয়েছে। নতুন আইনে ট্রাফিক সংকেত ভঙ্গের জরিমানা ৫০০ থেকে বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ১০ হাজার, হেলমেট না পরলে জরিমানা ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা করা হয়েছে। সিটবেল্ট না বাঁধলে, মোবাইল ফোনে কথা বললে চালকের সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে। বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে কাউকে আহত করলে তিন লাখ টাকা জরিমানা ও তিন বছরের জেল হতে পারে। নতুন আইনে চালকদের লাইসেন্স পেতে অষ্টম শ্রেণি, সহকারীকে পঞ্চম শ্রেণি পাস হতে হবে। ড্রাইভিং লাইসেন্সের বিপরীতে ১২ পয়েন্ট রাখা হয়েছে। আইন ভঙ্গে জেল-জরিমানা ছাড়াও লাইসেন্সের পয়েন্ট কাটা যাবে। পুরো ১২ পয়েন্ট কাটা গেলে লাইসেন্স বাতিল।
সড়কে গাড়ি চালিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হত্যা করলে ৩০২ অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। সড়কে বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালালে বা প্রতিযোগিতা করার ফলে দুর্ঘটনা ঘটলে তিন বছরের কারাদণ্ড অথবা তিন লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। আদালত অর্থদণ্ডের সম্পূর্ণ বা অংশবিশেষ ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারবে। মোটরযান দুর্ঘটনায় কোনও ব্যক্তি গুরুতর আহত বা প্রাণহানি হলে চালকের শাস্তি দেওয়া হয়েছে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের জেল ও সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা।

এগুলো সবই ইতিবাচক দিক এবং প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ দিতে হয়, দেরি হলেও এই আইন কার্যকর করে তিনি শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও জাতির কাছে দেওয়া তার কথা রেখেছেন। এখন বাস্তবায়ন নির্ভর করছে যাদের হাতে তারা কতটা আন্তরিকতার সঙ্গে, কতটা অঙ্গীকারের সঙ্গে, সততার সঙ্গে এই আইন প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন করবেন, সেটা দেখার বিষয়।

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে ৫৫ ব্যক্তির প্রাণহানি হচ্ছে। বুয়েটের এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষণা বলছে, দেশে প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় গড়ে ১২ হাজার মানুষ নিহত ও ৩৫ হাজার আহত হন। এই পটভূমিতে নতুন এই আইন সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে বলে সবাই আশা করছে। কিন্তু আমার কেবলই মনে হচ্ছে আমরা একটা সুযোগ হয়তো হাতছাড়া করেছি।

আমরা যারা দেশের বাইরে যাই তারা কী দেখি? সেটা দক্ষিণ এশিয়া হোক বা পূর্ব এশিয়া হোক, পশ্চিমা উন্নত দেশ হোক বা মধ্যপ্রাচ্য হোক, সড়কে ট্রাফিক পুলিশকে কোথাও কি এত গলদঘর্ম হতে দেখি রাস্তায় শৃঙ্খলা আনতে? কোনও ট্রাফিক পুলিশই চোখে পড়ে না। এর কারণ সিস্টেম। এই যে এত এত জরিমানার বিধান এলো, তার জন্য কত পুলিশ, কত ম্যাজিস্ট্রেট লাগবে দেশজুড়ে, তা নিয়ে কি ভাবছি আমরা? অথচ আমরা বিদেশে কী দেখি, রাস্তায় কেউ সিগন্যাল না মানলে, নির্ধারিত গতির চেয়ে বেশি দ্রুত চালালে বা অন্যকোনও অপরাধ করলে তার ঠিকানায় ঠিক চলে যায় জরিমানা বা সমনের কাগজ। সরাসরি পুলিশের সঙ্গে দেখা হওয়ার সুযোগই নেই।

ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে বা আইন প্রয়োগকারীর সঙ্গে গাড়িচালকের দেখা হওয়া মানেই দুর্নীতির পথ খুলে যাওয়া। সরকারেরও ব্যয় বাড়ে লোকবল ও অন্যান্য ব্যবস্থাপনায়। স্পিড এনফোর্সমেন্ট সিস্টেম, সড়কে শৃঙ্খলাসহ সুশাসনে আইনকে সহজ যেমন করতে হবে, তেমনি এটিকে বাস্তবায়নযোগ্য করতে হলে এই ডিজিটালাইজেশনের কোনও বিকল্প নেই। সারাদেশে মাত্র ২৪ হাজার সড়ক, অথচ আজও সামান্য পরিমাণের এই সড়ককে ডিজিটাল সিস্টেমের আওতায় আনা গেলো না। আনা যাবে না, তা নিশ্চয়ই নয়।

এই আইন ঠিকমতো বাস্তবায়ন করতে গেলে একটি বড় ঝামেলা হবে মামলার দীর্ঘসূত্রতা। মামলা দায়ের থেকে শুরু করে নিষ্পত্তি পর্যন্ত লম্বা সময় এবং সাক্ষ্যগ্রহণে জটিলতার মীমাংসা করা না গেলে আইনের সুফল থেকে সাধারণ মানুষ বঞ্চিত হবে। আমরা জানি একটা মামলায় বিচার হয়, আপিল হয়, রিভিউ হয়। সব মিলিয়ে অনেক সময় লেগে যায়। ততদিনে ঘটনাটা আর সেভাবে থাকে না। এখানেই আসলে প্রযুক্তির ভূমিকা।

শুধু আইন কড়া করলেই হবে না। মানুষের সচেতনতা বাড়াতে হবে—এই কথাটি সবাই বলে, তবে তা বহুল ব্যবহারে জীর্ণ। সড়কে এমন ব্যবস্থা থাকবে যে, মানুষ জানবে কোন আইন ভঙ্গ করলে তাকে সাজা পেতেই হবে। আর এজন্য রোড ইঞ্জিনিয়ারিং কতটা উন্নত, সেটাও বিবেচ্য। ভালো জেব্রা ক্রসিং নেই, রাস্তা পারাপারের বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি যেখানে, ট্রাফিক পুলিশ নিজেই যেখানে সিগন্যাল সিস্টেম মেনে নগরে, হাইওয়েতে সড়ক ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত থাকে না, সেদেশে শুধু পথচারীদের জরিমানা করা আর দোষারোপে কোনও প্রকৃত সমাধান নেই।

একটি বিষয় হলো ডাটা সংগ্রহ। বাংলাদেশে সড়ক নিরাপত্তা ও দুর্ঘটনার কোনও ডাটা নেই, পরিসংখ্যান নেই সেভাবে। গণমাধ্যমে দুর্ঘটনার যেসব খবর আসে, তা প্রকৃত সংখ্যার চেয়ে অনেক কম। পুলিশ ও সড়ক কর্তৃপক্ষের কাছে কিছু তথ্য হালনাগাদ থাকতেই হবে, যেমন—হাইওয়ে এবং শহরাঞ্চলে গাড়ির গড় গতি, সিটবেল্ট ব্যবহারের প্রবণতা, নেশা করে গাড়ি চালানোর তথ্য, দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা ও আহতদের চিকিৎসা দ্রুত দেওয়ার ব্যবস্থা ইত্যাদি। ডাটা শুদ্ধ থাকলে দুর্ঘটনা কমবেই।

যারা ব্যক্তিগত বা গণপরিবহনের মালিক, তাদেরও প্রযুক্তি ভাবনা থাকতে হবে। গাড়ি নিরাপত্তায় সিটবেল্ট বাঁধা, এয়ারবেগ, শিশুর জন্য আলাদা নিরাপদ সিট ও বেল্ট, মাউন্টেড ব্রেক লাইট এবং ইলেকট্রনিক স্ট্যাবিলিটি কন্ট্রোল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে।

দুনিয়াজুড়ে এখন স্মার্ট ভেহিক্যালের ছড়াছড়ি। চালক গাড়ি নিয়ে কোন পথে আছে, কত গতিতে চালাচ্ছে, সবই দূর থেকে বা সদর দফতর থেকে মনিটর করা সম্ভব। জরুরি প্রয়োজনে চালক ও তার সহকারীও অফিসের সঙ্গে বা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। এই কানেকটিভিটি নিরাপত্তার বোধ অনেক বাড়িয়ে তুলবে। নানা ধরনের অ্যাপের সাহায্যে সারা পৃথিবীতেই ডিস্ট্র্যাকটেড ড্রাইভিং নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে।

সরকারের সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের মিশন ও ভিশনে বলা আছে, উন্নয়ন, সম্প্রসারণ ও রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে টেকসই মহাসড়ক অবকাঠামো গড়ে তোলার জন্য ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা সম্প্রসারণ করা হবে। আমরা মনে করি কাজটা শুরু করা দরকার এখনই। কেন্দ্র থেকে প্রান্ত সর্বত্র সড়কজুড়ে নিয়ম ভাঙার খেলা বন্ধ করতে হলে শুধু আইন নয়, নির্ভর করতে হবে প্রযুক্তির ওপর।

লেখক: প্রধান সম্পাদক, জিটিভি ও সারাবাংলা

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ