বরাবর, প্রধানমন্ত্রী

Send
সারওয়ার-উল-ইসলাম
প্রকাশিত : ১৪:১৬, নভেম্বর ০৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৫৪, নভেম্বর ০৯, ২০১৯

সারওয়ার-উল-ইসলামশিক্ষানুরাগী মানুষ সমাজের আলোকবর্তিকা। সমাজকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করার ক্ষেত্রে তাদের অবদানকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্ম।
এখনও দেশের বিভিন্ন জেলায় এমন অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেগুলো সেই আলোকবর্তিকাতুল্য মানুষের নামেই সমুজ্জ্বল। সেই সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দূর থেকে শিক্ষার্থীরা ছুটে আসে পড়াশোনার জন্য। পঞ্চাশ-ষাট, আবার কোনও কোনও প্রতিষ্ঠান প্রায় একশ বছরের পুরনো। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এখনও আলোকবর্তিকাদের শিক্ষায় শিক্ষিত কিছু শিক্ষক আছেন, যারা প্রকৃত অর্থেই শিক্ষার্থীদের জ্ঞান দিতে চান।
তারা শিক্ষাকে বাণিজ্যে পরিণত করেননি। নিজেরা সচ্ছলভাবে জীবনযাপন করতে না পারলেও শুধু টাকার পেছনে ছোটার জন্যে প্রাইভেট-কোচিং করে বেড়ান না। আর সেই সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিচালনা কমিটিতেও কিছু মানুষ এখনও আছেন যারা নিজেদের আখের গোছানোর জন্য নির্বাচন করে পোস্টার ব্যানার ছাপিয়ে পরিচালনা কমিটিতে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক হন না। তাদের এলাকার মানুষ জোর করেই কমিটিতে থাকতে অনুরোধ করেন।
তাদের মতো সোনার মানুষেরা নিজের পকেট থেকে টাকা খরচ করে বা সরকারের কোনও বড় কর্তাদের ম্যানেজ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্যে ছোটাছুটি করেন। নিজের উন্নয়নের কথা তারা ভুল করেও ভাবেন না।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ঠিকমতো শিক্ষকেরা পড়াশোনা করাচ্ছেন কিনা, ছাত্রছাত্রীদের কোনও সমস্যা হচ্ছে কিনা, এসব বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ-খবর রাখেন তারা।

তবে খুবই হতাশ হওয়ার বিষয়, বর্তমানে দেশের অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই চলে থাকে জনপ্রতিনিধিদের পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণে। আবার যে সব প্রতিষ্ঠান খুব নাম করে ফেলেছে পড়াশোনার দিক থেকে, অভিভাবকেরা স্বপ্ন দেখেন সেখানে নিজের সন্তানকে পড়াশোনা করানোর, সেগুলো প্রত্যক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ সরকারের প্রভাবশালী নেতারা। সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে নিজের কব্জায় রাখতে পারলে আয়ের একটা পথ খুলে যাবে। কারণ, অনেক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীরা ভর্তি হয়। ভর্তি ফরম বিক্রি হবে হাজার হাজার। ফরমের মূল্য কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিলেই তো কাড়ি কাড়ি টাকা চলে আসে। আর ভর্তি হওয়ার টাকা চার-পাঁচ গুণ বাড়িয়ে দিলে কয়েক কোটি টাকা। মাসিক বেতন বাড়িয়ে দিলেও অভিভাবকেরা পড়াতে বাধ্য। অভিভাবকেরা ভাবেন—যেহেতু প্রতিষ্ঠান ভালো ফল করে, টাকা যায় যাক, ছেলেটা বা মেয়েটা তো জ্ঞান লাভ করছে— এই সন্তুষ্টি নিয়ে হাজার হাজার টাকা দিয়েও ভর্তি করিয়ে ফেলে। তাই কোনও প্রতিবাদ করেন না অভিভাবকেরা।

এরপর সংসদ সদস্য উদ্যোগ নেন, ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আরও কিছু শাখা খোলার। শাখা খুললেই শিক্ষার্থীরা হুড়মুড়িয়ে ভর্তি হতে আসবে। প্রয়োজনে অন্য যেসব স্কুল রয়েছে, অপেক্ষাকৃত দুর্বল, পড়াশোনার মান খারাপ, সেগুলোকে চাপ সৃষ্টি করেন নাম বদল করে ওই নামকরা স্কুলের শাখা করার জন্য। কখনও সফল হন, যদি স্কুল কমিটিতে তার অনুগত বা রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা থাকেন। আর না হলে এলাকাবাসীর চাপে পেরে ওঠেন না। তখন প্রতিশোধ হিসেবে সেই দুর্বল স্কুলের সুযোগ সুবিধা বা সরকারি অনুদানের ব্যাপারে খুব একটা খেয়াল রাখেন না সংসদ সদস্য। কারণ একটাই—ওই নামকরা স্কুলের শাখা করতে আগ্রহী না হওয়া। এই হচ্ছে আমাদের বর্তমানের স্কুল কমিটির পরিচালনা কমিটিতে জনপ্রতিনিধিদের হস্তক্ষেপের নমুনা।

ঢাকা শহরে এমন অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেগুলো কোনও না কোনও স্থানীয় সংসদ সদস্যের আয়ত্তে আছে। যেখান থেকে বছরে তাদের কোটি কোটি টাকা আয়। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিচালনা কমিটির মেয়াদ শেষ হলে ব্যাপকভাবে প্রচারণা চালিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পোস্টার-ব্যানার-লিফলেটে সয়লাব হয়ে যায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কমিটিতে থাকতে পারলেই লাখ লাখ টাকা আয়ের পথ খুলে যাবে।

কমিটির সদস্য হতে পারলেই প্রতিটি সভায় হাজির হলে খামে করে টাকা পাওয়া যায়। এছাড়া বাৎসরিক আয়-ব্যয়ের সময় কিছু অর্থকড়ি নাড়াচাড়া করা যায়। কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বহুতল ভবন নির্মাণের সময় ঠিকাদারি কাজ বাগিয়ে নিয়ে কোটি কোটি টাকার তসরুপ করার সুযোগ আসে। সে জন্য পরিচালনা কমিটির নির্বাচনে ব্যাপক আয়োজন চলে। চলে বিভিন্ন ধরনের রাজনীতি। ওপর থেকে ফোন-টোন করিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়া, না নেওয়া বা বসে যাওয়ার তদবিরও চলে। চলে হুমকি-ধামকিও। সে এক এলাহি কাণ্ড!

বিষয়টা এমন যেন ‘সোনার হাঁস’ কিনে আনা হয়েছে। ডিম দেবে আর সেই ডিম স্কুল পরিচালনা কমিটির সদস্যরা ভাগ করে নেবেন। সুতরাং আদা-জল খেয়ে নির্বাচন করবে না কেন তারা?

এখন কথা হচ্ছে স্কুল-কলেজের পরিচালনা কমিটিতে কেন স্থানীয় সংসদ সদস্যকে থাকতে হবে? আর কেন ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান সেই সংসদ সদস্যের অনুগত হয়ে কাজ করবে? তা হলে কি প্রধানদের মেরুদণ্ড বিক্রি হয়ে গেছে জনপ্রতিনিধিদের কাছে? নাকি সরকারের সাহায্য সহযোগিতা পাওয়ার জন্য সংসদ সদস্যকে পরিচালনা কমিটিতে রাখা? ঠিক আছে তাই যদি হয় তা হলে তাকে বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে রাখা যেতে পারে। কিন্তু স্কুলের আয়-ব্যয়ে কেন তাকে থাকতে হবে বা তার নির্বাচিত প্রতিনিধিকে রাখতে হবে? তা হলে কি ওই স্কুলকে সংসদ তার আয়ের একটি উৎস হিসেবে দেখছেন?

সমাজে কি আর কেউ নেই স্কুল দেখাশোনা করার? তা হলে কেন শিক্ষানুরাগীর তকমা লাগানো সংসদ সদস্যদের? বলা যেতে পারে শুধু ‘টু-পাইস’ কামানোর ধান্দায় নিজেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কমিটিতে জড়িত রাখা।

আরেকটি ব্যাপার আছে, যখন কোনও স্কুল নাম করে ফেলে তখন তার একাধিক শাখার প্রয়োজন হয়ে পড়ে মানুষের সুবিধার জন্য, কিন্তু সেই সব শাখায় ভালো শিক্ষকের তো দরকার। তা না হলে সুনাম নষ্ট যায় ধীরে ধীরে। 

আবার এমনও দেখা গেছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে খালি জায়গা আছে, সেই জায়গাটা থাকলে ভালো হয়, পড়াশোনার পরিবেশ ধরে রাখার জন্য শান্ত নিরিবিলি থাকাটাই সমীচীন। কিন্তু তা না করে সংসদ সদস্যের উদ্যোগে সেই জায়গায় মার্কেট গড়ে তোলা হয় বা দোকানপাট বানিয়ে ভাড়া দেওয়া হয়। বলা হয়, এ থেকে যে আয় হবে তা দিয়ে স্কুলের প্রয়োজনে খরচ করা যাবে। কিন্তু আদতে যা হয় সেটা হলো মার্কেট করে দলীয় লোকজনদের বরাদ্দ দিয়ে টাকা পয়সা কামানোর ধান্দা খোঁজা। সবকিছুতেই আসলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সামনে রেখে অর্থ উপার্জনটাই মূল কথা। অর্থাৎ বলা যেতে পারে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে বাণিজ্যকীকরণ।

আমাদের প্রধানমন্ত্রী বর্তমানে নিজের দলের ভেতর থেকে শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছেন। এইসব তথাকথিত শিক্ষানুরাগী সংসদ সদস্যের ব্যাপারে কঠোর হওয়া গেলে জনগণ শুদ্ধি অভিযানকে মর্যাদার আসনে নেবে। তা না হলে বলে বেড়াবে লোক দেখানো অভিযান। সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে এ অভিযান প্রয়োজন আজ। খুঁজে বের করা দরকার গত কয়েক বছরে কত টাকা আয় হয়েছে এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। কত টাকা সংসদ সদস্য নিয়েছেন, কীভাবে নিয়েছেন, তার হিসাবও বের করা দরকার। এটা করা গেলে রাজধানীসহ দেশের ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার পরিবেশ ফিরে আসবে। নইলে শিক্ষাকে পণ্য করে সরকারের জনপ্রতিনিধিরা কোটি কোটি টাকা কামিয়ে নেবে। আর সাধারণ মানুষ সরকারের সমালোচনা করে যাবে। ধীরে ধীরে সরকারের সব অর্জন এসব জনপ্রতিনিধির জন্য ম্লান হয়ে যাবে।

শিক্ষানুরাগী মানুষ এখনও সমাজে আছেন। যারা চান স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসায় সুষ্ঠু পরিবেশ বিরাজ করুক। সেখানে রাজনৈতিক আলোচনার চেয়ে পড়াশোনা বেশি হোক, কীভাবে ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনার প্রতি মনোযোগ বাড়ানো যাবে সেই চিন্তা করে গেলেই প্রকৃত মেধাবীরা বের হতে পারবে প্রতিবছর। নাহলে তাদের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করলে পরোক্ষভাবে ওই  সংসদ সদস্যদের ফায়দা হাসিল হবে। আর তাদের অনুগত শিক্ষক বা অধ্যক্ষরা বাড়ি গাড়ি বানিয়ে শান-শওকতে চলাফেরা করবে। পড়াশোনার জন্য অভিভাবকেরা লাখ লাখ টাকা খরচ করেই যাবে। প্রকৃত মেধাবী থেকে দেশ বঞ্চিত হবে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, অচিরেই এইসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের অর্থলিপ্সু দৃষ্টি সরানোর জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিন।  

লেখক: ছড়াকার ও সাংবাদিক

 

/এসএএস/এমওএফ/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ