behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

কে যে আমায় ঘরের বাহির করে

তসলিমা নাসরিন॥১৫:২৩, নভেম্বর ১৫, ২০১৫

tasleemaআমার যে কী হয় বুঝি না। লোকেরা বলে আমি নিশ্চয়ই পাগল। পাগল না হলে হঠাৎ বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ি কেন? বেরিয়ে রাস্তায় হাঁটি, খামোকাই হাঁটি। আমার খুব হাঁটতে ইচ্ছে করে। আমার বিয়ে হয়েছে বছর তিনেক আগে, ভাল ছেলে দেখে বাবা বিয়ে দিয়েছেন, ছেলের টাকা পয়সা আছে। ছেলের গাড়িও আছে, টয়োটা স্প্রিন্টার এইটটি এইট মডেল। গাড়ির রংও খুব সুন্দর। মেটালিক গ্রে। স্বামী আমাকে বলে- ‘বাইরে বেরোলে গাড়ি নিয়ে বেরিও’। আমি নিই না। পায়ে হাঁটবার আনন্দ যে অনেক তা আমি জানি বলেই নিই না। স্বামী প্রায়ই গাল ফুলিয়ে থাকে। বলে-‘তোমাকে তো আমি বাইরে যেতে বাধা দিচ্ছি না। কিন্তু গাড়িটা নেবে ত!’ একদিন বলি- ‘হাঁটতে কিন্তু বেশ লাগে’।

-‘কী যে বল তুমি, গাড়ি ছাড়া চলবে কেন?লোকে কী বলবে বল তো?’

-‘লোকে আবার কী বলবে! আমাকে গাড়ি চড়তেই হবে, লোকের কাছে এমন কোনও শর্ত দিয়েছি?’

-‘তুমি না দাও, আমি তো দিয়েছি!’

-‘তুমি? আমার জন্য তুমি শর্ত দেবে কেন?’

-‘বারে!তুমি আমার বউ না?’

-‘ও বউ হলে বুঝি স্বামী যা করে তাই করতে হয়?’

-‘কী যে বল, তুমি স্ট্যাটাস মেইনটেইন করবে না?’

-‘সে তো তোমার স্ট্যাটাস’।

-‘আমার স্ট্যাটাস কি এখন তোমার স্ট্যাটাসও নয়?’

-‘তা হবে কেন? আমাদের তো কস্মিনকালেও এত টাকা পয়সা ছিল না। আমাদের বলতে আমার বাবা কাকা দাদা এদের’।

-‘তোমাদের থাকবে কেন? তোমার বাবা ছিলেন সাধারণ চাকুরে। আর আমার বাবা বড় ব্যবসায়ী ছিলেন। অনেকে বলেছেও অবশ্য এত বড় ফ্যামিলির ছেলে হয়ে এত নিচে নামল কেন। আমি বলেছি মেয়েকে আমার ভাল লেগেছে’।

-‘আচ্ছা, আমাকে আসলে তোমার ভাল লেগেছে কেন শুনি?’

-‘বাহ দেখতে তুমি কত সুন্দর। তোমার ঠৌঁট, চোখ, চুল……’

-‘আর?’

-‘আর একটা জিনিস খুবই ভাল লেগেছে’।

-‘কী বল তো?’

-‘সেদিন নিজের হাতে রান্না করলে না? চমৎকার রান্না। ঠিক আমার মায়ের রান্নার মত’।

-‘আর?’

-‘আর…..আর…’

-‘কিছু খুঁজে পাচ্ছ না?’

মানুষ কখনও অচল হয় না, একা হয় না। জগতে মানুষের চেয়ে শক্তিমান আর কী আছে?

তোফাজ্জল হাসে। সঙ্গে আমিও। আসলেই ও আর কিছু খুঁজে পাচ্ছে না। একটি মেয়েকে ভাল বলতে হলে আর কী বলা যায় তার রূপ ও রান্নার প্রসংশা ছাড়া? ও আমার রান্নায় ওর মাকে খুঁজে পেয়েছে। আমি যদি ওর কোনও কিছুতে আমার বাবাকে খুঁজতে যাই, পাব? হ্যাঁ পাবই তো। বাবা বলতেন-‘রাতে বাইরে বেরোবি না। লক্ষ্মী হয়ে থাকবি। লোকে যেন ভাল বলে তেমন ভাবে চলবি’।তোফাজ্জলও ঠিক একই রকম করে বলে। বলে- ‘একা কখনও বাইরে বেরোবে না। আমার সঙ্গে ছাড়া। খুব জরুরি হলে মুহিতকে নিও’।

মুহিত ওর ছোট ভাই। বয়স বারো। যদি বলি-‘মুহিতকে নেব কেন? আমি কি একা পথ চিনি না?’

-‘তা চেন হয়ত। কিন্তু লোকে তো বলবে যে এই বাড়ির বউ একা বের হয়েছে’।

-‘লোকে বলবে কেন? বউদের কি একা বাইরে বেরোতে নেই?’

-‘ভাল বউরা একা বেরোয় না। স্বামী নয়ত শাশুড়ির সঙ্গে বেরোয়।‘

-‘আমি যদি একা বেরোই, তবে কি আমাকে খারাপ বউ বলবে?’

তোফাজ্জল চুপ হয়ে যায়। কপালে বিরক্তির ভাঁজ তার। সে বুঝে পায় না একুশ বছরের একটি মেয়ের কী এমন বাইরে কাজ! অনার্স পড়ত, শ্বশুর বাড়ি থেকে বলা হয়েছে, যথেষ্ট লেখাপড়া হয়েছে, আমাদের এতেই চলবে।

ওঁদের যখন এতেই চলে, আমার বাবা আপত্তি করেননি। বলেছেন-‘এই মেয়ে এখন আপনাদের। আপনাদের মনের মত করে একে গড়ে নেবেন’।

ওঁদের মনের মত করে আমাকে গড়বেন ওঁরা। তেমন তো গড়েই নিচ্ছিলেনই। হঠাৎ আমিই বললাম আমি বাইরে বেরোব। বাইরে? শুনে আঁতকে উঠলেন আমার স্বামী শ্বশুর শাশুড়ি সবাই। কিন্তু বাইরে যাবার শখ আমার ফুরোয় না।

বলি-‘এই হাঁটব এদিক ওদিক’।

  -‘ঠিক আছে তোফাজ্জলের সঙ্গে হাঁটো’।

  -‘না আমি একা হাঁটব’।

  -‘একা হাঁটবে? পাগল হয়ে গেছ?’ তোফাজ্জল ছিল কাছে, সে বলে।

  -‘হ্যাঁ পাগল হয়েছি’।

  -‘যতসব। একে হেমায়েতপুরে পাঠানো উচিত। ঘরের বউ, তার শখ হয়েছে বাইরে একা হাঁটবার। কে যে কুবুদ্ধি দিচ্ছে!’

  -‘আমাকে কেউ এই কুবুদ্ধি দেয়নি। আমি নিজে থেকেই ভাবছি। মুহিত কেমন একা একা এই বয়সে বাইরে ঘোরে। আমারও ইচ্ছে করে’।

  -‘মুহিত তো ছেলে। ও তো ঘুরবেই। ওর সঙ্গে তোমার সাজে?’

রাতে রাতে তোফাজ্জল আমাকে বোঝায়। আমি বলি-‘কেন সাজবে না? ও বারো বছর বয়স হয়ে যা খুশি করবে আর আমি একুশ বছর হয়েও পারব না?’

তোফাজ্জল হা হা করে হেসে আমাকে তার শরীরের কাছে টানে। বলে- ‘বোকা মেয়ে, মুহিত তো ছেলে!’

-‘তাতে কী, আমিও তো মেয়ে’।

-‘মেয়ে বলে মনে হয় খুব গর্ব তোমার?’

-‘বাহ গর্ব হবে না কেন? আমার তো বেশ ভাল লাগে’।

-‘কী ভাল লাগে? মেয়ে হওয়া?’

-‘হ্যাঁ। মেয়েদের শরীর আশ্চর্য সুন্দর দেখতে। আর মেয়েরা অনেক কিছু পারে’।

-‘কী পারে?’ তোফাজ্জল হেসে জিজ্ঞেস করে।

-‘বাচ্চা হওয়াতে’।

তোফাজ্জল হেসে ওঠে। এমন সুরে হাসে যেন সে একটু অবুঝ খুকির সঙ্গে কথা বলছে। বলে-‘মেয়েরা কি একা একা বাচ্চা হওয়াতে পারে?’

-‘যেভাবেই পারুক, পারে তো! এ কি কম শক্তি? মেয়েরা আসলে খুবই শক্তিমান’।

তোফাজ্জল হেসে এবার আমার চিবুক নেড়ে বলে-‘বোকা মেয়ে। আমি এখন তোমার শরীরে কিছু না করলে বাচ্চা হবে? আমি ছাড়া তোমার কোনও শক্তি আছে বাচ্চা হওয়াবার? এই প্রশ্নের উত্তর দাও তো তুমি!’

আমি আসলে একটু বোকা ধরনেরই বোধ হয়। বাবা আমাকে বিয়ে দেবার আগে বলেছিলেন-‘মেয়ের শিগরি বিয়ে দিয়ে দেওয়াই ভাল। পাগলের মত আচরণ করে। বিয়ে যদি পরে আর না হয়, এখনই হয়ে যাক’।

আমি ফুঁসে উঠতাম। বলতাম-‘বিয়ে দেবে দাও। কিন্তু আমাকে পাগল বলছ কেন?’

আমি নাকি উদাস বসে থাকি। একা একা মানুষ এত দীর্ঘ সময় কাটাতে পারে না। আমি কাটাই। আমার কোনও বন্ধু নেই। ক্লাসের মেয়েদের সঙ্গে মিশি না আমি। রাতে ছাদে বসে তারা গুনি। বাইরে একা একা বেরিয়ে পড়ি। বিয়ে দিলেই নাকি ঠিক হয়ে যাব। একদিন রাত দশটায় বাড়ি ফিরলাম। বাড়ি সুদ্ধ লোক তেড়ে এল। জিজ্ঞেস করল, -‘কোথায় ছিলি?’

বললাম-‘এই তো শহরেই’।

-‘শহরেই মানে?’

-‘শহরটা ঘুরে ফিরে দেখলাম’।

আমার হঠাৎ হঠাৎ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়াকে লোকে বিচার করল আমাকে জিনে ধরছে। একা বসে থাকি বলে অনেকে ধারণা করল- আমার নিজস্ব জিন আছে। আমি জিনের সঙ্গে কথা বলি। কিন্তু সবাই খুব অবাক হয় খুব একটা পড়াশুনো না করেও আমার পরীক্ষার ফল কেন ভাল হয়? অনেকে বলে জিন নাকি আমার পরীক্ষা দিয়ে দেয়। তা না হলে যে মেয়ে ঘুরে বেড়ায়, পরীক্ষার আগেও ছাদে একা শুয়ে থাকে, তার এত ভাল ফল হবে কেন? জিনের আশংকা করেই আরও আমার তড়িঘড়ি বিয়ে দেওয়া হয়। আমি তোফাজ্জলকে আগে দেখিনি। বিয়েতে আপত্তিও করিনি। দেখার কী আছে, পুরুষেরা কি একজন আরেকজনের চেয়ে খুব আলাদা? বিয়ে হয়ে যাবার পর আমার ভেতরে আবার সেই ইচ্ছেটা জেগে ওঠে। বাইরে বেরোবার। হা হা করে ওঠে শ্বশুর বাড়ির সবাই। তোফাজ্জল যেতে চায় আমার সঙ্গে, মুহিতকে দিতে চায়। আমি বলি-‘আমি কাউকে নেব না। একা যাব’।

বিয়ের দুমাস পর শ্বশুর বাড়ির লোকেরা বলল আমি পাগল। আমি আপত্তি করি না। পাগল হলে ক্ষতি কী, পাগল হওয়া খুব ভাল জিনিস। সংসারে পাগল হওয়া সহজ কথা নয়।

একদিন অনেক রাতে তোফাজ্জল আমার ঘুম ভাঙ্গিয়ে বলে-‘তুমি কি বরাবরই এমন কম কথা বল? বিয়ের পর আমার সঙ্গে মোট কতগুলো শব্দ তুমি খরচ করেছ, আমি গুনে বলতে পারব’।

-‘তুমি আসলে কী বলতে চাইছ, কাপড় খুলতে হবে?’

-‘সবই তো বোঝই’।

তোফাজ্জল আমার সারা শরীর চুমু খায় আর বলে-‘আচ্ছা তুমি বাইরে যেতে চাও কেন এত বল তো? কী কর বাইরে গিয়ে?’

-‘মানুষ দেখি’।

‘কেবলই মানুষ? তোমার বাড়ির লোকেরা বলল তুমি নাকি গাছ দেখ। আকাশ দেখ। গাছের ফুল পাতা দেখ। তোমার ভেতরে একজন কবি নাকি বাস করে?’

-‘মিথ্যে কথা। আমি মানুষ দেখি’।

তোফাজ্জল হেসে বলে-‘বোকা’।

আসলেই মানুষ দেখি আমি। সেদিন মানুষ দেখতে আমার মনে হয়েছে তোফাজ্জল যে বলেছিল সে ছাড়া আমার বাচ্চা হতে পারবে না,  এটা ঠিক নয়। জগতে এত মানুষ, যে কাউকে স্পর্শ করে আমি বাচ্চা হওয়াতে পারি। তোফাজ্জল কেন ভাবে যে সে ছাড়া আমার জরায়ু অচল? মানুষ কখনও অচল হয় না, একা হয় না। জগতে মানুষের চেয়ে শক্তিমান আর কী আছে? বিশেষ করে নারীর মত শক্তিমান! নারীই পারে মানব জাতটাকে টিকিয়ে রাখতে। আর বাচ্চা কাচ্চার জন্ম না দিয়ে জগতটাকে নিশ্চিহ্ন করে দিতেও পারে।

লেখক: কলামিস্ট

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ