behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

বিচার না চাওয়া একজন পিতা

জহিরুল হক মজুমদার।।১৬:৫৩, নভেম্বর ১৫, ২০১৫

Jahurul Haqনৃশংসতার পর নৃশংসতা। রক্তের পর রক্ত, রক্তের আগে রক্ত। চাপাতি, গুলি। আহমেদুর রশিদ টুটুল, তারেক রহিম এবং রনদীপম বসুর ওপর হামলার সংবাদের আঘাত সামলে উঠার আগেই, গোটা নগরী স্তম্ভিত হয়ে গেছে ফয়সল আরেফিন দীপন এর হত্যার সংবাদে।

দীপন নেই। ঘাতক চাপাতির আঘাতে না ফেরার দেশে চলে গেছে সে। সূর্যাস্তের পর ঘনায়মান অন্ধকারকে আরও অন্ধকার করে দিয়ে দীপন চলে গেছে। হতভম্ব পিতা দাঁড়িয়ে আছেন সন্তানের রক্তাক্ত লাশের পাশে। তিনি আমাদের শ্রদ্ধেয় সহকর্মী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক।

টেলিফোনে দীপনকে না পেয়ে তার পিতা জাগৃতি’র অফিসে গিয়ে দেখেন তালা বন্ধ বাইরে থেকে। আর লোকজন ডেকে এনে তালা খুলতেই দেখতে পান, রক্তাক্ত দীপন পড়ে আছে মেঝেতে। স্বজনদের তিনিই প্রথম জানান দেন, দীপনকে ওরা মেরে ফেলেছে। তাঁর সামনেই ধরাধরি করে বের করা হয় দীপনের লাশ, মাথা শরীর থেকে প্রায় আলাদা।

আহা, হতভাগ্য পিতা। পৃথিবীর কয়জন পিতা সন্তানের মৃত্যু সংবাদের প্রথম ভগ্নদূত হন? আপনি সেই হতভাগ্যদের একজন। এই দৃশ্য দেখার পর আমরাও হতভাগ্যদের সারিতে নিজেদের আবিষ্কার করি। সন্তানের রক্তাক্ত লাশ দেখে আপনি শোকে পাথর ছিলেন। কিন্তু আপনি স্থিতধী শিক্ষকের মতই বলেছেন, ‘আমি এই হত্যার বিচার চাই না। অল্প কয়েকজনকে ফাঁসি দিয়ে কী হবে। শুভবুদ্ধির উদয় হোক’। 

কেউ পারতো না, কিন্তু আপনি পেরেছেন। মহাকাব্যের রাবণও পুত্র হারিয়ে বিলাপ করে। আপনি মহাকাব্যের কোন চরিত্র নন, আপনি আমাদের সহকর্মী, একজন সাধারণ পিতা।  

আপনি আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একজন সহকর্মী। মতের ভিন্নতা সত্ত্বেও আপনি আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের আটপৌরে জীবন ভাবনা, বেতন সংকট আর উপাচার্যের তোষণ বা সমালোচনার সংস্কৃতির মধ্যে আপনি ‘বাংলাদেশকে’ হাজির করেন। ‘স্বভাবন’ স্বার্থপরতা থেকে আপনি আমাদের ‘স্বদেশ’ ভাবনার দিকে চালিত করেন, যদিও আপনার সঙ্গে স্বদেশ এবং রাজনীতি ভাবনা নিয়ে মতের দ্বিমত রয়েছে আমার এবং আরও অনেকের।

কলাভবন লাউঞ্জে বসে দেশ নিয়ে আলাপ করেন আপনি অতি সাধারণ পোশাকে। সাধারণ কাপড়ের প্যান্ট আর মোটা খদ্দরের ঘিয়ে রঙের ফুলহাতা শার্ট আপনাকে দিয়েছে অসাধারণ সারল্য। নিজের চিন্তার নিঃসঙ্গতা, অন্যদের সঙ্গে অমিলের নিঃসঙ্গতা আপনি কাটিয়েছেন এই রকম বলে যে –রামমোহন রায় যখন ‘আত্মীয় সভা’ করেছিলেন তখন তিনি ক’জন লোক পেয়েছিলেন?  

‘উনিশ শতকের বাংলা’ অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হকের প্রিয় আলোচনার বিষয়। এবিষয়ে তিনি অনুভব এবং বলার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সাবলীল। তাঁর বাসার ড্রয়িং রুম থেকে কলাভবন লাউঞ্জ সবসময়ই তিনি বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনায় মুখর। তিনি কি উনিশ শতকের কলকাতার মতই একটি নবজাগরণ আশা করেছিলেন ঢাকায়? যেমনটি হয়েছিল কলকাতায়। তিনি কি এই শহরের রাস্তায় খুঁজে বেড়িয়েছেন বিদ্যাসাগর,  ডিরোজিও কিংবা মাইকেল মধুসূদনের মুখ? তিনি যেমন লোক নিশ্চয়ই তিনি খুঁজেছেন।

কিন্তু এই ঢাকা শহরেই গত শতাব্দীর তিরিশের দশকে ‘বুদ্ধির মুক্তি’ আন্দোলন করতে গিয়ে কাজী আব্দুল ওদুদ এবং আবুল হোসেনকে পাড়ার সর্দারদের কাছে ‘ধর্মবিরোধী’ হিসেবে মাফ চেয়ে কলকাতা নিবাসী হতে হয়েছিল। তারপর দীর্ঘ সাংস্কৃতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক সংগ্রামের ভেতর  দিয়ে বাংলাভাষা এবং বাংলাদেশ নিয়ে আমাদের স্বাধীনতা।

ষাট দশকের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক আন্দোলন এবং একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে সমাজে প্রতিক্রিয়াশীল চিন্তাধারার ব্যাপক সংকোচন ঘটেছিল। সমাজের মূল্যবোধের পরিবর্তন হয়েছিল। ধর্মীয় প্রতিক্রিয়াশীলতা এবং ধর্মের রাজনীতির কবর রচিত হয়েছিল।

আওয়ামীলীগের প্রতিপক্ষ এবং বঙ্গবন্ধুর নিন্দুকেরা স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকারকে যতই অব্যবস্থাপনা, আইন শৃঙ্খলার অবনতি কিংবা রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী করুন না কেন, একথা জোর দিয়ে বলা যায় যে সেই সময় ধর্মীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল এবং প্রতিক্রিয়াশীলরা মাথা উঁচু করতে সাহস পায়নি।

বঙ্গবন্ধুর হৃদয়বিদারক হত্যাকাণ্ডের পর এই দেশে প্রতিক্রিয়াশীলরা আবার মাথাচাড়া উঠে। উর্দিওয়ালা দুই জেনারেল জিয়া এবং এরশাদ সত্তরের দশকের শেষ এবং গোটা আশির দশক জুড়ে এই একাত্তরের পরাজিত শক্তি এবং ধর্মীয় প্রতিক্রিয়াশীলদের রাজনীতিতে, সমাজে এবং অর্থনীতিতে পুনর্বাসন করেন। পাকিস্তানি নাগরিক এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী, গণহত্যার সমর্থক শাহ আজিজ, জিয়াউর রহমানের মন্ত্রী হন। ডা. আলীম চৌধুরীর খুনি এবং রাজাকার  মাওলানা মান্নান হন এরশাদের মন্ত্রী। এর সঙ্গে ১৯৭৬ সালে পুরনো ‘ইসলামী ছাত্র সংঘ’, যে সংগঠনটি পুরোটাই আলবদর বাহিনী ছিল,  তারা নতুন ‘ইসলামী ছাত্র শিবির’ নামে আবির্ভূত হয়। নিষিদ্ধ ঘোষিত ‘জামায়েতে ইসলামী বাংলাদেশ’ আবার রাজনীতিতে ফিরে আসে সামরিক জিয়া সরকারের বিশেষ একটি আইনের অধীনে।

জামায়াত এবং শিবিরের উর্দি পরা গুরু জেনারেল জিয়া এবং এরশাদ আধুনিক অস্ত্রমুখী  হলেও  জামায়াত শিবির বেছে নেয় মধ্যযুগীয় ছুরি, চাপাতি এবং রগ কাটার রাজনীতি। এই রগকাটার রাজনীতিরই ধারাবাহিকতা হচ্ছে আজকের ঘাতক চাপাতির উৎস। এরা একই লোক হয়তো।  

এইভাবেই তিরিশের দশকের ‘বুদ্ধির মুক্তি’ আন্দোলনের নেতাদের শাস্তির মাধ্যমে যে কালো চাদরের বুনন শুরু হয়েছিল গোটা দেশকে ঢেকে দেওয়ার জন্য, তার থেমে যাওয়া বুনন আবার শুরু হয়েছে।

অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক এর চিন্তাকে অনেকেই তাদের রাজনীতির স্বপক্ষের মনে না করলেও তিনি সবসময়ই মুক্তচিন্তার মানুষ, সমাজের কল্যাণকামী মানুষ এবং মৌলবাদ এবং ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা বিরোধী একজন মানুষ বলেই আমরা তাঁকে জেনে এসেছি।

তাঁর বেদনার্ত সময়ে তিনি যে ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন, যে ক্ষমাশীলতা আর উদার মনোভাবের পরিচয় দিয়েছেন তা তাঁকে অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

ভাবতে অবাক লাগে পুত্রের রক্তে ভেজা লাশের পাশে দাঁড়িয়ে একজন বয়োজ্যেষ্ঠ অধ্যাপকের দেশের এবং সমাজের প্রতি ভালবাসাকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করছেন একজন রাজনীতিবিদ, যিনি আওয়ামীলীগের দলীয় মুখপাত্র। এই রকম রাজনৈতিক হ্রস্বতা অতীতে কোনও রাজনীতির লোকের আচরণে দেখিনি।

আওয়ামীলীগ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মাধ্যমে, জামায়াতের সঙ্গে সাময়িক ঐক্যের দাগ মুছে ফেলে একাত্তরের চেতনা এবং সুবিচারের ধারণা প্রতিষ্ঠিত করছে দেশব্যাপী একটি প্রায় যুদ্ধের মাধ্যমে। একাত্তরের শহীদদের পরিবারগুলো বেদনা মুছে ফেলার  অবসর পাচ্ছে। গোটা জাতিই সুবিচারের প্রাপ্তির আশার আলোয় আলোকিত।

এইরকম একটি পরিবেশে আওয়ামী লীগের মতো ঐতিহ্যবাহী দলের মুখপাত্রের এই রকম মন্তব্য মানানসই কিনা এই প্রশ্ন অনেকের মনেই জাগা স্বাভাবিক।

 যে মা তার সন্তান হারান তিনি বাংলাদেশটাকেই হারিয়ে ফেলেন। যেখানে তাঁর সন্তান নিরাপদ নয় তা কখনও মায়ের দেশ হতে পারে না। এই কথা একজন পিতার ক্ষেত্রেও সত্য। সত্য ভাইয়ের ক্ষেত্রে, সত্য বোনের ক্ষেত্রে।

অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক একজন ব্যতিক্রমী পিতা, যিনি সন্তান হারিয়েও নিজের দেশকে হারাতে চাননি। তাই তিনি শুভবোধের উদয় চেয়েছেন।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ