behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

মিয়ানমারনামা ও সু চির বিজয়

আনিস আলমগীর॥১১:২১, নভেম্বর ১৫, ২০১৫

Anis Alamgirদেশটির নাম ছিল বার্মা। ১৯৮৯ সালে সামরিক জান্তা দেশটির নামকরণ করে মিয়ানমার। রাজধানীর নামও পরিবর্তন করে। রেঙ্গুনকে করেন ইয়ানগুন। এখন রাজধানী নেইপিদো। দেশটির আয়তন ৬,৭৬,৫৭৮ বর্গ কিলোমিটার। লোক সংখ্যা ৫ কোটি ৩২ লাখ (২০১৩ সালের আদমশুমারী)। ভোটার প্রায় ৩ কোটি। পূর্বে দেশটি ভারত উপমহাদেশের অংশ ছিল। ১৯৩৬ সালে শাসন কাজের সুবিধার জন্য ব্রিটিশ সরকার বার্মাকে ভারত থেকে পৃথক করে নতুন রাষ্ট্র গঠন করে। গভর্নর জেনারেলও ছিল পৃথক।

১৮৮৫ সালে ইঙ্গ-বার্মা যুদ্ধে বার্মার রাজার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে দেশটিতে ঔপনিবেশিক শাসন আরম্ভ হয়েছিল। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি দেশটি ব্রিটিশের কাছ থেকে পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন করেছিল। মিয়ানমারে ১০০টি জাতিগোষ্ঠী রয়েছে। তারা জনসংখ্যার ৩০ শতাংশ। অর্থাৎ তারাও প্রায় ১.৫০ কোটি। নেতাদের আন্তঃকলহের কারণে দেশের রাজনৈতিক অবস্থা অস্থির হয়ে উঠলে ১৯৬২ সালে জেনারেল নে-উইন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন। ১৯৯২ সাল পর্যন্ত নে-উইন ক্ষমতায় ছিলেন। ১৯৯২ সালে নে উইনের স্থালভিষিক্ত হন থেইন সেইন ।

১৯৮৮ সালে জেনারেল নে-উইনের  বিরুদ্ধে মিয়ানমারে গণঅসন্তোষ সৃষ্টি হয় এবং গণবিক্ষোভ আরম্ভ হয়। তখন অং সান সুচি মিয়ানমারে ফিরে আসেন এবং ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন। এতদিন অং সান সু চি এক ইংরেজকে বিয়ে করে লন্ডনেই অবস্থান করছিলেন। মাঝে সু চি জাতিসংঘের সেক্রেটারী জেনারেল উ-থান্টের আনুকূল্য পেয়ে কিছুদিন জাতিসংঘে চাকরি করেছিলেন। উ-থান্ট বার্মারই লোক। সু চির বাবার বন্ধু ছিলেন।

১৯৯০ সালে নে-উইন মিয়ানমারে সাধারণ নির্বাচনের ব্যবস্থা করেন। সু চির ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। কিন্তু সামরিক জান্তা ভোটের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে সু চিকে গৃহবন্দি করেছিলেন। আবার ২০১০ সালে সামরিক জান্তা নির্বাচনের আয়োজন করে। সে নির্বাচনে সামরিক জান্তা সমর্থিত দল ইউএসডিপি জয়ী হওয়ার দাবি করে। এনএলডি উক্ত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেননি। ১৯৯০ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত অং সান সুচি গৃহবন্দি ছিলেন। ২০১২ সালে আলাপ আলোচনার মধ্য দিয়ে স্থির হয় যে, ধীরে-ধীরে সামরিক জান্তা গণতান্ত্রিক পন্থায় দেশকে ফিরিয়ে আনবেন। তখন সুচিও সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেয়। সেই প্রতিশ্রুতি অনুসারে ২০১২ সালে ৪৫টি উপনির্বাচনে অং সানের দল অংশগ্রহণ করেছিল। ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি ওই  উপনির্বাচনে ৪৩টি আসনে জয়লাভ করে। সু চি নিজেও নির্বাচিত হন। সেই থেকে পশ্চিমারা অবরোধ তুলে নেয়। ২০১২ সালে রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত দাঙ্গা শুরু হয়। ১৯৯১ সালে গৃহবন্দি অবস্থায় নোবেল কমিটি অং সান সু চিকে নোবেল প্রাইজ  দেয়।

২০১৫ সালে প্রতিশ্রুত সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। ৮ নভেম্বর এর নির্বাচনে অং সান সুচির ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি এবং সামরিক জান্তার ইউনিয়ন সলিডারিটি ডেভেলাপমেন্ট পার্টিসহ ৯০টি দল অংশগ্রহণ করে। প্রার্থীর সংখ্যা ছিল ৬ হাজার। পার্লামেন্টের উচ্চ ও নিম্ন কক্ষে বেসামরিক লোকদের মোট আসন সংখ্যা ৪৯৮টি। ২৫% আসন সামরিক বাহিনীর জন্য সংরক্ষিত।

৮ নভেম্বর এর ঐতিহাসিক নির্বাচনে এ পর্যন্ত ঘোষিত ফলাফলে প্রতিনিধি পরিষদে সু চির দল পেয়েছে ২৩৮ আসন। আর জাতীয় পরিষদে দলটি জয়ী ১১০টি আসনে। আর সেনা সমর্থনে থাকা ইউনিয়ন সলিডারিটি ও ডেভেলপমেন্ট পার্টি প্রতিনিধি পরিষদে ২৮টি এবং জাতীয় পরিষদে ১২টি আসন জয়ী। ১৩ নভেম্বর দুপুর পর্যন্ত মিয়ানমারের ইউনিয়ন নির্বাচন কমিশন ৮০ শতাংশের বেশি আসনের আনুষ্ঠানিক ফল ঘোষণা করে। এতে উচ্চ ও নিম্নকক্ষ মিলিয়ে ৮৫ শতাংশ আসন পেয়েছে এনএলডি। সংসদের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের ৪৪০ আসনের মধ্যে ৩৩০টিতে ভোট হয়। আর উচ্চকক্ষ জাতীয় পরিষদের ২২৪টি আসনের মধ্যে ভোট হয় ১৬৮টিতে।

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক দল নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য নিয়ে এসেছিল সামরিক জান্তা। পর্যবেক্ষকেরা বলেছেন, নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ হয়েছে। ১৯৯০ সালের ঘটনার পুনরাবৃত্তি অবশ্য অনেকে আশা করছেন না সত্য কিন্তু সামরিক বাহিনী ১৯৬২ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৫৩ বছর নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী হয়ে দেশ পরিচালনা করেছেন। তারা ক্ষমতা সহজে হস্তান্তর করতে সম্মত হবেন কি না তা এখনও দৃঢ়ভাবে বলার সময় আসেনি। অবশ্য সামরিক জান্তার প্রধান থেইন সেইন বলেছেন, তারা নির্বাচনি ফলাফল মেনে নেবেন এবং ১৯৯০ সালের ঘটনা পুনরাবৃত্তি হতে দেবেন না। অং সান সু চিও তার সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জেতার বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে সকল পক্ষকে আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছেন।

সামরিক জান্তা যে শাসনতন্ত্র রচনা করেছে, তাতে বলা আছে (১) ২৫% আসন সামরিক বাহিনীর জন্য সংরক্ষিত থাকবে (২) যারা বিদেশি নাগরিককে বিয়ে করেছেন তারা প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না (৩) প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও সীমান্ত নিরাপত্তায় সেনাবাহিনীর ভূমিকা থাকবে। শাসনতন্ত্রই সামরিক বাহিনীকে এসব ক্ষমতা দিয়েছে। সামরিক বাহিনী বিরাট আর্থিক সুবিধা ভোগ করে থাকে। কোনও গণতান্ত্রিক সরকার সাধারণ মানুষকে বঞ্চিত করে সামরিক বাহিনীকে এত রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা দিতে পারে না। সামরিক বাহিনী পূর্ব থেকেই আতঙ্কিত। গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে তাদের প্রদত্ত সুযোগ সুবিধা অব্যাহত থাকে কিনা এই বিষয়টা নিয়ে। মিয়ানমারে অবসরে যাওয়া সামরিক বাহিনীর সদস্যরাও প্রচুর রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য পেয়ে থাকেন। মিয়ানমারে সামরিক বাহিনীর জনবল ৩ লাখ। রাষ্ট্রীয় বাজেটের বিরাট অংশ ব্যয় হয় সামরিক খাতে। যে কারণে ১৯৬২ সাল থেকে মিয়ানমারে সামরিক খাতের উন্নয়ন ছাড়া উল্লেখযোগ্য অন্য কোনও উন্নয়ন হয়নি।

ইরাবতী নদীর উভয় তীর খুবই উর্বর। প্রচুর ধান উৎপাদন হয়। ধান উৎপাদনের মুল চালিকা শক্তি ছিল বাঙালিরা। কিন্তু ১৯৬২ সালে সামরিক জান্তা সব বাঙালিকে বিতারিত করে দেয়। সবকিছু রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে এনে সামাজিক কাঠামো পরিবর্তনের চেষ্টা করে। কিন্তু পরিপূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়। যে মিয়ানমার খাদ্যে সয়ংসম্পূর্ণ ছিল এবং বিদেশে খাদ্য রফতানি করত, এখন মাঝে মাঝে তারাই খাদ্যের সংকট মোকাবেলা করে। মিয়ানমারে প্রচুর গ্যাস এবং খনিজ সম্পদ আছে। মিয়ানমার পর্বত সংকুল এলাকা। প্রচুর জলবিদ্যুৎ উৎপাদনেরও সুযোগ রয়েছে। জাতি-গোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ সমস্যাও রয়েছে। রোহিঙ্গা ও কারেন্ট—এরা বিদ্রোহী।

অং সান সুচির দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাচ্ছে দেখে সেনাপ্রধানও তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন নির্বাচনি ফলাফল মেনে নেওয়ার পুনঃপ্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তিনি সুচির আহ্বানের পরিপ্রেক্ষিতে আলোচনায় বসার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। সুচির কথাবার্তায় মনে হচ্ছে যে, তিনি প্রেসিডেন্ট হতে খুবই আগ্রহী নন। তবে সামরিক বাহিনীর কাকেও প্রেসিডেন্ট করতে চাইলে এনএলডি তা মেনে নেবে বলে মনে হয় না। পরিপূর্ণ গণতন্ত্রের পথে ফিরে আসতে মিয়ানমারের আরও পথ পাড়ি দিতে হবে। অং সান সুচি নিজেকে গান্ধীবাদী মানুষ বলে অনেকবার উল্লেখ করেছে। ক্ষমতার প্রতি প্রচণ্ড কোনও লোভ নেই তার। প্রেসিডেন্ট পদের জন্য শাসনতন্ত্র সংশোধনের বিষয় নিয়ে কোনও বিতর্ক হয়তো তিনি তুলবেন না। তবে সামরিক বাহিনীর কাকেও প্রেসিডেন্ট পদে তিনি মানবেন বলে মনে হয় না। সব পর্যালোচনা করে মনে হয় ক্ষমতা হস্তান্তরে মিয়ানমারে ব্যাপক জটিল কোনও পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে না।

লেখক: সাংবাদিক ও শিক্ষক

anisalamgir@gmail.com

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ