behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

ফ্রান্সের ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’ ও বাংলাদেশ

নাদীম কাদির॥১৮:০০, নভেম্বর ১৬, ২০১৫

Nadim Qaderবাংলাদেশে নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত এবং দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য ব্যবহৃত সন্ত্রাসবাদী কৌশলগুলোর ওপর একটি নিবন্ধ লিখেছিলাম। যখন কিনা এ ধরনের হামলার জন্য পশ্চিমাদের বিশেষ করে ব্রিটেন এবং যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করা হচ্ছে। এটি লেখার সময়ই হঠাৎ করে প্যারিসে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটল। যখন লিখছি, তখন পর্যন্ত এই হামলায় ১২৯জন নিহত হয়েছেন।

১৯৯৯ সালের পর থেকে আমি নভেম্বরকে ব্ল্যাক মান্থ বলে অভিহিত করি। যার অন্যতম কারণ, এ মাসেই আমি মাকে হারিয়েছিলাম। এখন ফ্রান্সও একটি ব্ল্যাক ফ্রাইডে পেল।

কয়েক সপ্তাহ আগে ঢাকায় দিনে-দুপুরে চাপাতির আঘাতে আমার বইয়ের প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপন হত্যার প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়েছিলাম। কেউ কেউ বলছিলেন, এটা তথাকথিত ইসলামিক স্টেটের কাজ। কিন্তু প্রমাণের ভিত্তিতে আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, এটা মৌলবাদী জামায়াতের কাজ।  

এই প্রসঙ্গে কথা বলার আগে আমি উল্লেখ করতে চাই, ইরাক আগ্রাসন ও  সাদ্দাম হোসনকে ক্ষমতাচ্যুত করার বিষয়ে টনি ব্লেয়ার দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, আমি এ জন্য দুঃখিত, আমরা যে গোয়েন্দা তথ্য পেয়েছিলাম, তা ভুল ছিল। ইরাকের ওই যুদ্ধই আইএসের উত্থানের কারণ কি না, প্রশ্ন করা হলে ব্লেয়ার বলেন, এমন দাবির পক্ষে ‘সত্যের উপাদান’ রয়েছে।

বর্তমানে বিশ্ব এবং বিশ্বের মানুষগুলো শুধু মৃত্যুভয়ে দিন কাটাচ্ছে না। এ সব হত্যকাণ্ডের পেছনে কে দায়ী, সে বিষয়েও ভাবতে হচ্ছে।

আমি দীপন হত্যার তীব্র নিন্দা জানাই। একইসঙ্গে ইসলামের নামে প্যারিসে হত্যাযজ্ঞেরও তীব্রনিন্দা জানাচ্ছি।

প্রাধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরবারই বলে আসছেন, এ ধরনের সন্ত্রাসী কার্যকলাপ চালিয়ে আসছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও তাদের মিত্র জামায়াত ইসলামী। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও লন্ডনে স্বেচ্ছানির্বাসনে থাকা তার পুত্র তারেক জিয়া সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে এই সন্ত্রাসীদের মদদ দিয়ে আসছেন। রাজনীতি ও মানবাধিকারের নামে এ ধরনের প্রশ্রয় কখনও সন্ত্রাসবাদ বন্ধ করতে পারে না।

সম্প্রতি এক নিবন্ধে ভারতীয় সাংবাদিক সুবীর ভৌমিক প্রশ্ন তোলেন, এ ধরনের  সন্ত্রাসী কার্যকলাপ কি বাংলাদেশে আইএস করছে না কি সরকারকে ব্যর্থ প্রমাণ করার জন্য এসব ঘটানো হচ্ছে? তার প্রশ্ন, কেন সম্প্রতি সময়ে এ ধরনের সহিংসতা বেড়ে চলেছে? এ সবের একমাত্র কারণ ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াত ও বিএনপি নেতাদের বিচার করা। তিনি আরও বলেছেন, ইতালি ও জাপানির হত্যায় তথাকথিত আইএস-এর দায় স্বীকার ধর্মযুদ্ধে লিপ্তদের কাজ হতে পারে না। যদি তাই হতো, তাহলে হত্যার শিকার হতেন আমেরিকান বা রাশিয়ানরা।

স্থানীয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো এ হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পারে এমন সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি তিনি। তিনি লিখেছেন, এই মুহূর্তে আইএস কি এ এলাকায় এমন কিছু করেছে? যদি তারা মধ্যপ্রাচ্য শিয়াদের তাজিয়া মিছিলে হামলা না করে তবে তারা বাংলাদেশে শিয়াদের তাজিয়া মিছিলে হামলা করবে কেন? কেন তারা বাংলাদেশেকে বেছে নেবে? আইএস নেতারা কি বাংলাদেশে শিয়া উপস্থিতির বিষয়টি জানে ?

সাংবাদিক সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা উল্লেখ করেছেন সম্প্রতি বাংলাদেশে সর্বোচ্চ সংখ্যক পাকিস্তানি ভ্রমণ করেছেন। তাদের সঙ্গে এসব সন্ত্রাসী হামলার সম্পর্ক থাকতে পারে। তারা এখানে আটকেপড়া তথাকথিত ‘পাকিস্তানি’ তথা বিহারিদের উপস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে। যারা কিনা বাংলাদেশের নাগরিকত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। আর ইসলামাবাদও তাদের ফিরিয়ে নিতে রাজি নয়। তারা বরাবরই বিএনপি জামায়াতকে সমর্থন দিচ্ছে বলেই ধারণা করা হয়।

এই জামায়াতীরা ১৯৭১ সালে মিলিশিয়া গঠন করে গণহত্যা চালিয়েছে আর যুদ্ধের শেষ দিকের ১৪ দিনে ১১৬ জন বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করেছে। পুরো যুদ্ধের সময় বিভিন্ন ঘটনায় আরও অনেক বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করেছে তারা।

২০০১-২০০৬ সালে বিএনপির শাসনামলে সন্ত্রাসবাদীদের উত্থান ঘটে। তারা ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে এসব সন্ত্রাসী কার্যক্রমে লিপ্ত করে।

শেখ হাসিনা প্যারিসে হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওঁলাদকে পাঠানো এক শোকবার্তায় তিনি সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে ও জঙ্গিবাদী সহিংসতা দমনে একযোগে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেন।

শেখ হাসিনা ধর্মীয় সহিংসতা ও জঙ্গিবাদ বন্ধ করে একটি সেক্যুলার বাংলাদেশ গড়তে যুদ্ধ করে যাচ্ছেন। তিনি বলেছেন, সন্ত্রাসীরা সন্ত্রাসী। তাদের বর্ণ নেই, ধর্ম নেই, সভ্য সমাজে তাদের কোনও স্থানও নেই। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবিরোধী যুদ্ধে আমরা ঐক্যবদ্ধ।  

একজন মুসলিম হিসেবে ইসলামের নামে তথাকথিত আইএস-এর এ ধরনের সহিংসতা আমি মেনে নিতে পারি না। আমি লজ্জিত। ইসলাম পরম সহিষ্ণুতার ধর্ম, সম্প্রীতি ও শান্তির ধর্ম। এখানে এ ধরনের হত্যকাণ্ডের কোনও জায়গা নেই। আইএস-এর এসব কর্মকাণ্ড মূলত ইসলামকে কলঙ্কিত করছে।

প্যারিসে হামলার পর আমার ভাতিজাদের মধ্যে একজন আমাকে বলেছে, সে তার নামের পেছনে ইসলাম আর ব্যবহার করে না। মানুষজন নাকি ভ্রূ-কুঁচকে তাকায়। আমি এখানে কোনওপক্ষকে দোষ দিচ্ছি না। কারণ ইসলাম জঙ্গিদের দারা আক্রান্ত, যারা কিনা হত্যায় আনন্দ খুঁজে পায়। তারা ভুলে যায় তাদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ইসলামের সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে এমনকি মুসলিম বিশ্বও বিভক্ত হয়ে পড়ছে।

গার্ডিয়ানের এক খবরে বলা হয়েছে, ইসলামোফোবিয়া বাড়ছে। যার মানে ব্রিটেনে সকল ধর্মে বিশ্বাসী মানুষদের মধ্যে যে সম্প্রীতি রয়েছে তা ভেঙে পড়তে পারে।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ধর্মনিরেপক্ষ নীতির ওপর ভিত্তি করে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্ম। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হত্যকাণ্ডের পর সামরিক শাসক জেনারেল জিয়াউর রহমান ধর্মকে রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত করেন। তিনি রাজনীতিতে ধর্মীয় গোড়ামি ও পাকিস্তানপন্থীদের সম্পৃক্ত করেন। এতে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশের রাজনীতি পুরোপুরি বদলে যায়। তার উত্তরসূরি এইচ এম এরশাদ ও খালেদা জিয়া সে ধারা অব্যাহত রাখেন। খালেদা জিয়া এক ধাপ এগিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধী ও মৌলবাদী জামায়াত নেতাদের শিল্প ও সমাজকল্যাণমন্ত্রী বানান।

১৯৯৬ সালে প্রায় ২২ বছর পর বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনেন। সব ধর্মের মানুষকে সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করে সেক্যুলার বাংলাদেশ গড়া প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু হয়।

পাঁচ বছর পর ২০০১ সালে আবার  চরমপন্থী ও মৌলবাদীদের পৃষ্ঠপোষকতায় ক্ষমতায় আসেন খালেদা জিয়া। ২০০১-২০০৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিল বিএনপি ও তার প্রধান মিত্র জামায়াত। এরপর ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পথটা শেখ হাসিনার জন্য খুব সহজ ছিল না।  

এত ইতিহাস বলার অন্যতম কারণ যখন প্যারিসে আক্রমণ হলো সমগ্র বিশ্বই ফ্রান্সের সমর্থনে এগিয়ে এলো। কিন্তু বাংলাদেশে ব্লগার ও বিদেশি হত্যাকাণ্ডসহ সন্ত্রাসী আক্রমণ বিশ্বে ততটা নিন্দিত হয় না। ফ্রান্সে ব্ল্যাক ফ্রাইডের আগে তারা শক্তিশালী পদক্ষেপ নিয়ে পাশে দাঁড়ায়নি।

তখন বিতর্ক শুরু হয়েছে যে এটা কি গোয়েন্দা ব্যর্থতা, এটা কি আইএস এর কাজ নাকি নয়। কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কী করেছে? দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে ধর্মনিরপেক্ষতা বজায় রাখতে এবং সন্ত্রাসমুক্ত রাখতে ফ্রান্সের মতো বাংলাদেশেরও শক্ত সমর্থন প্রয়োজন।

সম্প্রতি সময়ে লন্ডনভিত্তিক অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধী রাজনীতিক নেতা হিসেবে অন্ধভাবে প্রচার করছে। তারা বিএনপি-জামায়াত নেতাদের মৃত্যদণ্ড মাফ করার সুর তুলেছে। মানবতাবিরোধী অপরাধীদের মতো অ্যামনেস্টিও বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ তুলেছে!  এইভাবে তারা মৌলবাদী জঙ্গি ও নিকৃষ্ট অপরাধীদের উৎসাহিত করে যাচ্ছে।  

শেখ হাসিনা যখন তার দেশে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ও ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন, তখন বিশ্ব তথাকথিত ‘ভ্রান্ত গণতন্ত্র’ ও মানবাধিকার লংঘনের অভিযোগ করে আসছে। বিধ্বংসী অস্ত্র না থাকা সত্ত্বেও ইরাক আগ্রাস কি মানবাধিকার লংঘন নয়?  

কোন গণতন্ত্র পারফেক্ট? বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্রের দেশ হয়েও গরুর মাংস খাওয়ার অপরাধে মুসলিম হত্যা? ওহ ! এটাই গণতন্ত্র ও মানবাধিকার!

ফ্রান্স, ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বশক্তিগুলোকে দ্বিতীয়বার চিন্তা করতে হবে তারা কি শেখ হাসিনার অধীনে ধর্মনিরপেক্ষ ও সন্ত্রাসমুক্ত বাংলাদেশ চায়, না কি বিএনপি-জামায়াতের অধীনে তালেবান?

শেখ হাসিনা মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদের শেকড় উৎপাটনে এখন যুদ্ধ করছেন। তাই এখনই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়।পশ্চিমাদের ক্ষমাহীন জঙ্গিবাদবিরোধী যুদ্ধে তাকে অবশ্যই সমর্থন দিতে হবে।

বিশ্বকে বুঝতে হবে, বাংলাদেশ যত ক্ষুদ্র দেশই হোক, এটা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ, যেখানে  জঙ্গিগোষ্ঠীকে সমর্থন দিয়ে আসছে বিএনপি-জামায়াত। তাদের প্রকশ্যে-গোপনে সব ধরনের  সহযোগিতা করছে।

পারফেক্ট ডেমোক্রেসি কিং ধর্মীয় সন্ত্রাসের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ? তারা কি বাংলাদেশকে আইএস দেশ হিসেবে দেখতে চায় ?

লেখক: সাংবাদিকতায় জাতিসংঘের ড্যাগ হ্যামারসোল্ড স্কলার এবং লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রেস মিনিস্টার।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ