behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

আমি চুড়ি পরি, তবে স্বেচ্ছায়

উদিসা ইসলাম০৩:২৪, ডিসেম্বর ১০, ২০১৫

Udisaব্যক্তির ব্যবহার্য জিনিস দিয়ে তার বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করার এক ধরনের রেওয়াজ আছে। আর লৈঙ্গিক বিচারে বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ- সে তো বটেই। নারী কোমল, তাকে হালকা কাজ দিতে হবে, নারীরাই রান্না করে, নারীরাই সাজগোজ করে, পরিপাটি পুরুষ নারীর মতো, বাসার রান্না করবে নারীরা আর পুরুষ করবে চাকরি। এই কাজ বিভাজন এই সমাজই করেছিল একসময়। আর সেটাকে নারীর দীর্ঘ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ভাঙতে হয়েছে এবং সেই ভাঙাটা সমাজ কখনও মেনেছে এবং কখনও মানেনি। কিন্তু সমাজের মধ্যে পুরুষতান্ত্রিকতার যে বীজ রয়েছে সেটা উপড়ে ফেলা সম্ভব হয়নি কখনওই।

সম্প্রতি পৌরসভা নির্বাচনে সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে প্রার্থীদের জন্য নির্বাচনি প্রতীক চুড়ি, চকলেট, পুতুল, ফ্রক, কাঁচি, ভ্যানিটি ব্যাগ, মৌমাছি, আঙুর, গ্যাসের চুলা ও হারমোনিয়াম দেখে মুখ দিয়ে কেবল একটি শব্দ বের হয়ে এসেছে: ‘আবার’? গত সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও এই একই কাজ হয়েছিল। সেসময় প্রতিবেদন করতে গিয়ে প্রার্থীদের সাথে কথা বলতে গিয়ে দেখেছি তারা কেউ খুশি নন তাদের জন্য নির্ধারণ করে দেওয়া প্রতীক নিয়ে। কিন্তু কী নিরুপায় ভাবেই না তাদেরকে মেনে নিতে হয়েছিল। এবারের পৌরসভা নির্বাচনেও একই কাজ হলো।

মনে আছে, সেই কবে বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন আমাদের বলে গেছেন, ভগিনীগণ! চক্ষু রগড়াইয়া জাগিয়া উঠুন- অগ্রসর হউন! বুক ঠুকিয়া বল মা, আমরা পশু নই। বল ভগিনী, আমরা আসবাব নই। বল কন্যে, আমরা জড়াউ অলংকার-রূপে লোহার সিন্দুকে আবদ্ধ থাকিবার বস্তু নই; সকলে সমস্বরে বল আমরা মানুষ। কিন্তু শতবছর ধরে সেই চক্ষু কেবল নারীরা রগড়াইলে যে হবে না, সাথে নারী পুরুষ নির্বিশেষে পুরুষতান্ত্রিকতাকেও জলঞ্জলি দিতে পারতে হবে সেটা ভুলে যাওয়ায় এখনও একটু চোখ বুজলেই মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে পুরুষতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণা। আর অবধারিতভাবে যার স্বীকার হতে হয় নারীকে।

নির্বাচন কমিশনের প্রতীক বরাদ্দের ধরন দেখে মনে হয়েছে তারা নারীদের কী রূপে দেখতে চান বা দেখেন সেটারই প্রতিফলন মাত্র। প্রতীক দেখলে মনে হবে নারীরা কেবল রান্নাঘরে কাজ করেন আর সন্তান লালনপালন করেন আর নিজেদের সাজিয়ে রাখেন। এ ধরনের প্রতীকের কারণে অনেকেই নারীদের ছোট করে দেখার সুযোগ পান। চায়ের দোকানে যখন নির্বাচনি লড়াই নিয়ে তুমুল আলাপ তখন কিনা নারীদের কেবল প্রতীকের কারণে হাসির বস্তুতে পরিণত হতে হয়। যদিও প্রতিনিয়ত নারীরা তাদের যোগ্যতার প্রমাণ দিচ্ছেন।

এই ধরনের প্রতীক নারী ও নারী আন্দোলনের জন্য অবমাননাকর। এটুকু বলে ক্ষ্যান্ত দেবার সময় এখন আর নেই। ধারাবাহিক আন্দোলন করতে হবে যাতে আগামীতে এ ধরনের হাস্যরসের সুযোগ কমিশন না পায়। এমনকি নারীনেত্রীরা নিজেদের তাগিদে প্রতীকের তালিকা তৈরি করে দিতে পারে কমিশনের কাছে। তাদের বুঝিয়ে দেওয়া উচিত এই কারণে আমরা প্রতিবাদ করছি কারণ আপনারা যারা দায়িত্ব পালন করছেন তারা নারীর সমতা, ক্ষমতায়ন বিষয়ে কোনও ধারণা রাখেন না।

এত সহজে কমিশনকে দুষছি এই কারণে যে গত সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সময় আমার কথা হয় নির্বাচন কমিশনারদের সাথে। অফিসকে আপত্তির জায়গার কথা জানাতে তারা বলেছিলেন, আসলে ঠিক হয় নাই। বিষয়টা খেয়াল করা দরকার ছিল। আর মাত্র কয়েক মাস পর তারা একই কাজ করলেন। এবং গত দুইদিন জরুরি অনেক আলাপ ছাপিয়ে নারীর প্রতীকটাকে নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হলো আমাদের। আগামী নির্বাচনে ঠিক করে দেওয়া হবে বলে কমিশন সেসময় জানালেও এবার তারা একেবারেই নির্লিপ্তভাবে বলেছেন কাউকে খাটো করার জন্য এটা করা হয়নি। তার অর্থ হলো, তাদের মননে মগজে আসলে যে পুরুষতন্ত্র বাস করে সেটার মধ্যে নারীর যে চিত্রায়ন তার সঙ্গে বিরোধপূর্ণ কিছু তাদের নজরে আসে না।

আর আসে না বলে না দেখেই নির্বাচন কমিশনারদের একজন দাবি করেন, প্রতীক নিয়ে সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সময় সমালোচনার পর এবার কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। তবে আসেন দেখি কী পরিবর্তন আনা হয়েছে। সিটি করপোরেশনের নারীর জন্য বরাদ্দকৃত প্রতীকের মধ্যে রয়েছে ঝুনঝুনি, প্রেসার কুকার, ভ্যানিটি ব্যাগ, শিল পাটা, পিঞ্জর, কেটলি, দোলনা, বোয়াম, টিস্যু বক্স, মোড়া, স্টিল আলমারি, পান পাতা, মোড়া, ফ্রাইংপ্যান জাতীয় জিনিস।

মোদ্দাকথা হলো, এই সমাজ যেভাবে নারীকে দেখতে অভ্যস্ত প্রশাসনও তার বাইরে নয়। তারা সমাজের সেই অভ্যস্ততাকেই টিকিয়ে রাখতে চায়। কিন্তু যারা টিকে থাকুক সেটা চান না তারা কি তাদের দায়িত্বটুকু পালন করছেন ঠিক মতো? যদি করতেন তাহলে কেবল সাংবাদিক, প্রতিবেদন, টকশোতে কেন এই আলাপ উঠবে। এ আলাপের পাশাপাশি নারীনেত্রীদের সুনির্দিষ্টভাবে প্রতিবাদ বিবৃতির পাশাপাশি আইনত ব্যবস্থা নেওয়ারও সুযোগ আছে। নাকি কমিশনের মতো তারাও মনে করেন নারীর জন্য রান্নাঘরই উপযুক্ত জায়গা? নাকি তারা আজও অজান্তেই বিশ্বাস করেন, নারী ফ্রাইপ্যানে রান্না করবেন আর ঝুনঝুনি দিয়ে বাচ্চাকে ঘুম পাড়াবেন, সেখানে পুরুষতান্ত্রিকতা খোঁজার দরকার নেই।

কিন্তু ভুলে গেলে চলবে কেন এদেশে নারীদের বাইরে বের হয়ে আসা, নারীর নিজের খোলসের ভেতর বন্দি না থাকার পেছনে সরকারের নানা উদ্যোগের পাশাপাশি এদেশের সুশীল সমাজের ভূমিকা ছিল অসামান্য। নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে বলেই সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক উন্নয়নের সর্বক্ষেত্রে তাদের অবদান স্বীকার করে নেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের সরকার প্রধান নারী, বড় দুটি বিরোধী দলের প্রধান নারী। সংসদের মাননীয় স্পিকার নারী, সংসদের সরকার দলীয় উপনেতা নারী, কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের কৃষিমন্ত্রী নারী এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী নারী, বিশ্বাবিদ্যালয়ের উপাচার্য নারী। সেইদেশে একইসময় একইসাথে এধরনের বৈষম্যমূলক আচরণ হতাশাজনক।

পাঠক- চুড়ি ফিতা টিপ, ফ্রক কিছু নিয়েই আমার কোনও আপত্তি নেই। আমি চুড়ি পরি, পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে টিপ পরি কিন্তু সেটা স্বেচ্ছায়। আমি নারী বলে আমাকে এসব ব্যবহার করতেই হবে বা আমি নারীর তথাকথিত বৈশিষ্ট্য ভাঙব বলে এসব আমি পরিহার করতেই হবে এর কোনওটিরই পক্ষপাতি আমি নই। সেটা আমার ব্যক্তিস্বাধীনতার জায়গা। কিন্তু রাষ্ট্র সরকার সমাজ যখন সেই বৈশিষ্ট্যগুলো নারীর জন্য নির্ধারণ করে এবং নারীর ওপর চাপিয়ে দেয় তখন আমাদের এগিয়ে যাওয়া রহিত হয়। এই প্রতীকগুলো কেবল নারীর জন্য বরাদ্দ না রেখে ধর্ম বর্ণ লিঙ্গ নির্বিশেষে যদি ফ্রক প্রতীক বরাদ্দ দেন তাতে আমার আপত্তি নেই। কিন্তু তখনও রুচিবোধ নিয়ে আমার আপত্তি থাকবেই।

লেখক: সাংবাদিক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ