Vision  ad on bangla Tribune

জ্বালানির বিকল্প চিন্তা দরকার

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী১১:৫৮, ডিসেম্বর ১২, ২০১৫

Bakhtiar Uddin Chowdhury৩০ নভেম্বর থেকে প্যারিসে কপ-২১ শীর্ষ সম্মেলন শুরু হয়েছে। ১৯৬টি দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানরা জলবায়ু বিষয়ক এ সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন। সম্মেলন চলছে দু’সপ্তাহ। বিশ্বের উষ্ণতা রোধকল্পে বায়ুমণ্ডলে কার্বন -ডাই-অক্সাইড হ্রাস করার ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছার আশা পোষণ করে অংশগ্রহণকারী রাষ্ট্রগুলো। বাংলাদেশ থেকে বন ও পরিবেশমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটা প্রতিনিধিদল সম্মেলনে অংশ নিয়েছে।

বিশ্বের উষ্ণতা বাড়লে যে কয়টি দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশ তার অন্যতম। জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জোট ক্লাইমেট ভারনাবেরল ফোরাম সম্মেলনে দাবি উত্থাপন করেছে যে এ শতাব্দীতে দেড় ডিগ্রি সেলসিয়ামের মধ্যে তাপমাত্রা বৃদ্ধির পরিমাণ সীমাবদ্ধ রাখতে হবে অন্যতায় অনুন্নত দেশগুলো এবং দ্বীপ-রাষ্ট্রসহ প্রায় ১০০টি দেশের অস্তিত্ব বিপন্ন হবে। জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল বান কি মুন ও এ দাবির প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। ক্ষতিগ্রস্ত রাষ্ট্রগুলো আইনগত বাধ্যবাধকতাসহ একটি চুক্তির প্রত্যাশ করছে এ সম্মেলনেই।

প্যারিসের লে বুর্জ কনফারেন্স সেন্টারে চলমান জলবায়ু সম্মেলনের ওইসিডি আয়োজিত এক সেমিনারে বাংলাদেশ বলেছে আগামী ১৫ বছরে জলবায়ু পরিবর্তনের ধ্বংসলীলা থেকে ৪ কোটি মানুষকে বাঁচাতে বাংলাদেশের সাড়ে ৫ লাখ কোটি টাকা প্রয়োজন। অন্যথায় বিপন্ন হবে মানুষের জীবন আর ধ্বংস হয়ে যাবে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা সম্মেলনে নিজ উদ্যোগে কার্বন কমানোর পরিকল্পনাও তুলে ধরেন। বাংলাদেশ বলেছে তারা নিজস্ব অর্থায়নে ৫% আর আন্তর্জাতিক সহায়তায় পেলে ১৫% কার্বন নিঃসরণের কমানো সম্ভব হবে।

যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, জাপানসহ বিশ্বের ৬৬ শতাংশ কার্বন নিঃসরণকারী ১০টি শিল্পন্নত দেশ ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণের যে প্রস্তাব দিয়েছে তাতে হিসাবে ফাঁকি রয়েছে বলে মন্তব্য করেছে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। ১৭টি আন্তর্জাতিক সংস্থা যৌথভাবে আইএনডিসি বিষয়ে একটি পর্যালোচনা প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে শিল্পোন্নত দেশগুলো যে পরিমাণ কার্বন নিঃসরণের অঙ্গীকার করেছে তা বাস্তবায়ন করলেও এ শতাব্দীর শেষে বিশ্বের তাপমাত্রা ৩ শতাংশের চেয়েও বেশি বাড়বে। অথচ তাপামাত্রা ২ শতাংশের নিচে রাখতে না পারলে বিশ্বের অবস্থা করুণ হবে। সংস্থাগুলো বিশ্বের প্রধান কার্বন নিঃসরণকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, রাশিয়াকে ২০৮০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনার পরামর্শ দিয়েছে।

উদীয়মান অর্থনীতির দেশ চীন, ইন্দোনেশিয়া এবং কেনিয়াকে দুই তৃতীয়াংশ কার্বন নিঃসরণ কমানোর কথা বলেছে অক্সফাম, অ্যাকশন এইড, কেয়ার, ক্রিশ্চিয়ান এইডসহ ১৭টি সংস্থা। বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল সম্মেলনে বলেছেন চীন এবং আমেরিকার মতো কার্বন নিঃসরণকারী দেশ সম্মেলনে যে অঙ্গীকার করেছেন তা খুবই দুঃখজনক। তারা কার্বন নিঃসরণে নিয়ন্ত্রণের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে গরিবদেশগুলোর পক্ষে অস্তিত্ব রক্ষা কঠিন হয়ে পারবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয় প্রতিক্রিয়া কোনও দেশে সীমাবদ্ধ নয়। এটা সারা বিশ্বকে বিপর্যস্থ করবে। শক্তি উৎপাদন খাতে কোনও মিরাকল না ঘটলে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় খুব বেশি উন্নতির প্রত্যাশা করা যায় না। পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ব্যবহারের ওপর উন্নত অনুন্নত সব দেশকেই গুরুত্ব প্রদান করতে হবে। এ উদ্যোগটা সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে গ্রহণ করা জরুরি।

শিল্প উন্নতদেশগুলো জলবায়ুবান্ধব জ্বালানি উৎপাদনে পাইলট প্রজেক্ট এর সূচনা করে জ্বালানি উৎপাদনের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির প্রকৌশলী মার্ক জে জ্যাকবলন নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেছেন- বিশ্ব আগামী ২০৫০ সালের মধ্যেই নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে সক্ষম হতে পারে তবে এ জন্য দরকার উন্নত, অনুন্নত, উন্নয়নশীল দেশেগুলোর জোরালো উদ্যোগ।

মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস ও প্যারিসে আছেন। তিনিও দীর্ঘদিন ব্যাপী বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনের ব্যাপারে নিজের উদ্বিগ্নতার কথা প্রকাশ করে আসছেন। তিনি প্যারিসে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনে অন্যান্য ধনীদের সঙ্গে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ ২০টি দেশ জ্বালানিখাতে মৌলিক গবেষণার কাজে তাদের বিনিয়োগ দ্বিগুণ করার কথা বলেছেন।

পশ্চিমা বিশ্ব অর্থাৎ ইউরোপীয় ইউনিয়ন, রাশিয়া আমেরিকা, কানাডার প্রচুর জ্বালানির প্রয়োজন শুধু শিল্পন্নোয়নের জন্য নয়, তাদের জনজীবনকে প্রবাহমান রাখতেও হাজার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হচ্ছে। জ্বালানি মানবসভ্যতার সঙ্গে অঙ্গা-অঙ্গিভাবে জড়িয়ে গেছে এবং দিন দিন জ্বালানির চাহিদা বাড়ছে। সুতরাং জ্বালানির জন্য নতুন নতুন এমন সোর্স গবেষণা করে বের করতে হবে যেগুলো পরিবেশবান্ধব হবে। আশার কথা আমেরিকায় বাতাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। আবার দেশটির বর্তমানে ৫% বিদ্যুৎ আহরণ করছে সোলার পাওয়ার থেকে।

বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ। তার প্রচুর জ্বালানির প্রয়োজন। বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার বিদ্যুতের জন্য তিনটি বড় প্রজেক্ট-এর কাজে হাত দিয়েছে। রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প, মংলা ও মাতারবাড়ী তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র। তিনটি কেন্দ্রই পরিবেশবান্ধব নয়। বাংলাদেশের উচিৎ ভারত, নেপাল, ভুটান প্রয়োজনে মিয়ানমারকে নিয়ে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য একটা কনসোর্টিয়াম গঠনের উদ্যোগ নেওয়া। নেপাল, ‍ভুটান এবং মিয়ানমারে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রচুর উৎস রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্যোগ নিলে এমন একটা কনসোর্টিয়াম গঠন হয়ত সম্ভব হবে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য এখন থেকেই উদ্যোগী হতে হবে। সোলার সোর্স-এর ব্যাপক ব্যবহারের উদ্যোগ নিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো বড় বড় দালানগুলোতে সোলার এনার্জির প্রচলন করতে হবে। পল্লীবিদ্যুৎতায়নের মতো সোলার বিদ্যুৎ সম্প্রসারণেও একটা সরকারি সংস্থা ধীরে ধীরে কাজ আরম্ভ করা প্রয়োজন।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কলাম লেখক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

samsung ad on Bangla Tribune

লাইভ

টপ