behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

ফিনিশ সাংবাদিকের নিরাপত্তার গল্প

হারুন উর রশীদ১৪:৫২, ডিসেম্বর ০১, ২০১৫

Harun Ur Rashidফিনিশ সাংবাদিক পাইভি কসকিনেন এবং টনি মাত্তা। তাদের সঙ্গে আমার পরিচয় ভারতীয় সাংবাদিক কল্পনা প্রধান ও চঞ্চল ভট্টাচার্যের মাধ্যমে। আর সেই সূত্র ধরে গত মাসে ঢাকায় আসা এই দুই ফিনিশ সাংবাদিক বাংলাদেশ সম্পর্কে এক নতুন ধারণা নিয়ে গেছেন। কিন্তু তাদের এই নতুন ধারণা পাওয়া এত সহজ ছিল না। কারণ তাদের মগজে গেঁথে ছিল, ‘বাংলাদেশ এমন এক দেশ, সেখানে জঙ্গি তৎপরতা দিনে দুপুরে দেখা যায়। আর বিদেশিরা সারাক্ষণ গুলির মুখে আছেন।’

পাইভি এবং টনি দু’জই থাকেন ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিঙ্কিতে। তারা কাজ করেন সেখানকার বহু পুরনো টেলিভিশন চ্যানেল ওয়াইএলই টেলিভিশনে। প্যারিসের এবারের জলবায়ু সম্মেলন নিয়ে আগাম প্রতিবেদনের জন্য তারা বাংলাদেশকেই বেছে নেয়। এরসঙ্গে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প এবং ব্লগার হত্যা ও জঙ্গি তৎপরতার বিষয়টিকেও তারা তাদের প্রতিবেদন পরিকল্পনায় রাখে। আর এটিই তাদের প্রথম বাংলাদেশে আসা।

তারা ঢাকায় আসেন নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে। তবে আসার আগের এক সপ্তাহে তারা প্রায় প্রতিদিনই আমার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন, বিশেষ করে পাইভি। পাইভি বার-বার তখন জানতে চায় বাংলাদেশ তাদের জন্য নিরাপদ কিনা। তারা চলাফেরা করতে পারবেন কিনা। বিদেশিরাতো হামলার শিকার হয়েছে, তারা কোথাও গেলে আবার হামলার শিকার হবেন কিনা। আমি বার বার তাদের আশ্বস্ত করে বলেছি তোমরা যেমন ভাবছো বাংলাদেশ তেমন নয়। যা ঘটেছে তার জন্য আমরা দুঃখিত। কিন্তু এখানে বিদেশিরা নিরাপদ। বাংলাদেশে এমন পরিস্থিতি হয়নি যে সবাইকে কাজ না করে নিরাপত্তার নামে ঘরে বসে থাকতে হবে।

১০ নভেম্বর সন্ধ্যায় তারা ঢাকায় আসেন। পরের দিনই তারা খুলনা যাবেন। তাদের প্রতিবেদনের পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হলো হোটেলেই। আর জানালাম আমি তাদের সঙ্গে যেতে পারছি না। তাদের সঙ্গে যাবে সাংবাদিক বাধন অধিকারী এবং নাজমুল হুদা।

পরদিন খুলনা যাওয়ার আগে টঙ্গিতে আমি নিজেই তাদের একটি পোশাক কারখানায় নিয়ে যাই। সেখান থেকে বাধন ও নাজমুল তাদের খুলনা নিয়ে গেল। খুলনায় তাদের তিনদিন কাজ করার কথা ছিল জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে। প্রথমদিন কাজ শেষে তারা হোটেলে ফিরে সন্ধ্যায় আমাকে জানাল, ‘উই আর হ্যাপি, এভরিথিং ইজ গুড’। পাইভি খুলনার নানা বিষয়ে প্রশংসা করল। আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।

কিন্তু একঘণ্টা পরই আবার ফোন। তারা জানাল খুলনায় তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। সকালেই তারা ঢাকা চলে আসবে। খুলনায় তারা থাকবে না। কথা বলার সময় পাইভি ছিল বেশ ভীত। আমি কারণ জানতে চাইলে বলল, ‘নাজমুল তাদের সঙ্গে তোলা ছবি ফেসবুকে দিয়েছে। নাজমুলের ফেসবুক ফ্রেন্ড চার হাজারের বেশি। তাদের ছবি এখন অনলাইনে ছড়িয়ে পড়বে। আর সেই ছবি ধরে তাদের ওপর হামলা হতে পারে।’

আমি নাজমুলকে বলে তাদের ছবি নাজমুলের ওয়াল থেকে সরিয়ে ফেললাম। কিন্তু তাতেও কাজ হলো না। তারা এখন নাজমুলকেই জঙ্গিদের সহযোগী হিসেবে সন্দেহ করা শুরু করল! বাধনও তাদের বোঝানোর চেষ্টা করল। কাজ হলো না। তারা রাতেই রুম পরিবর্তন করল। এবং সকালে রওয়ানা দিয়ে ঢাকা চলে এল।

হয়তো নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণেই ফিনিশ সাংবাদিক পাইভি বেশ কিছু আপত্তিকর মন্তব্যও করে তখন।

ঢাকা আসার পর তাদের সবাইকে নিয়ে আমি কথা বলি এবং বোঝাতে সক্ষম হই ফেসবুকে নাজমুল তাদের সঙ্গে তোলা ছবি আপ করেছে শুধু ফেসবুক প্রীতির কারণেই। তারপরও থেকে যায় অনেক কিছু।

এরপর তারা ঢাকায় তাদের প্রতিবেদন তৈরির কাজ শুরু করেন। ঢাকা থেকে গাজীপুর। ঢাকা থেকে সাভার। ঢাকা থেকে টঙ্গী এভাবে চলে টানা ছয় দিন। আর নিরাপত্তার কারণে তারা ঢাকার হোটেলও পরিবর্তন করে খুলনা বসেই।

ওদের কাজ শেষে আমি প্রতিদিন হোটেলে গিয়ে কথা বলি। নতুনভাবে ওদের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া সাংবাদিক জামান মণ্ডলের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখি সার্বক্ষণিক। আমি লক্ষ্য করি পাইভি আর টনি যেন আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছে। তাদের ধারণায় পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। তারা ঢাকায় প্রতিদিনের কাজের অভিজ্ঞতা আর নানা ঘটনা নিয়ে গল্পও বাড়িয়ে দিয়েছে। যখনই দেখা হয় তখনই মোবাইল ফোন থেকে তাদের পরিবারের ছবি দেখায়। ছবি দেখায় ফিনল্যান্ডে তাদের কর্মস্থলের। আর আমি মাঝে মাঝেই জানতে চাই নিরাপত্তার কোনও সমস্যা আছে কিনা। তারা শুধু একটি কথাই বলে, ‘নাউ উই আর হ্যাপি।’

নিরাপত্তা ইস্যুতে হোটেল সোনারগাঁ-এ গেস্টদের হোটেল রুমে নেওয়ায় নিষেধাজ্ঞা চলছে। কিন্তু তাদের তোলা ফুটেজ-এর লগশিট তৈরি এবং অনুবাদের জন্য জামানকে ওদের রুমে নেওয়া প্রয়োজন। আমার সামনেই তারা যখন হোটেলের রিসিপশন ডেস্কে একথা জানাল তখন তারা রাজি হলো না। পাইভিকে তারা নিরাপত্তার বিষয়টি বোঝাল। কিন্তু এবার পাইভি উল্টো আচরণ করল। সে বলল, ‘আমার নিরাপত্তা আমি ভাল বুঝব। এখানে আমি নিরাপত্তার কোনও হুমকি বোধ করছি না।’ তারপরও রাজি হয় না হোটেল কর্তৃপক্ষ। এরপর পাইভি আর টনি হোটেল ছেড়ে দেওয়ার হুমকি দিলে তারা জামানকে তাদের রুমে নিয়ে যেতে অনুমতি দেয়। আর আমি শুধু মুচকি হাসলাম।’

এরমধ্যেই ফ্রান্সে জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটে। ভোরেই আমাকে হোটেল থেকে ফোন করে পাইভি। আমি তাকে জানাই আমরাও খবরটা জানি। কথা হয় বিশ্বব্যাপী জঙ্গি এবং আইএস নিয়ে। পাইভি বলল এখন ইউরোপ আমেরিকাই সবচেয়ে বেশি অনিরাপদ। দেখলাম সাইট-এর রিটা কাটৎজ-এর তথ্য সে তেমন বিশ্বাস করে না। তার ধারণা ব্যবসা বাড়াতে রিটা আইএস-এর নামে ভুয়া খবরও ছড়ায়।

ওদের যাওয়ার দিন ঘনিয়ে এল ২০ নভেম্বর সকালে। ঢাকা থেকে দিল্লি হয়ে ওদের ফ্লাইট। আগের দিন রাতে কাজ শেষে আমার সঙ্গে বসল। শুরুতেই নানাভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল পাইভি আর টনি। আর বার বার ‘সরি’ বলল খুলনার ঘটনার জন্য। নাজমুলকেও সরি বলল। আফসোস করল ‘সামান্য’ ঘটনায় তাদের খুলনা ছাড়া ঠিক হয়নি। তারা খুলনায় পুরো তিনদিন না থেকে ভুল করেছে। আমার কথা শোনা উচিৎ ছিল!

এক পর্যায়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ল পাইভি । তার চোখের কোণায় পানি চিক চিক করছে। আমার হাত চেপে বলল, ‘বাংলাদেশ ইজ আ গ্রেট কান্ট্রি। দ্য পিপল আর গ্রেট। আই মিস আন্ডারস্টুড অ্যাট ফার্স্ট।’

পরদিন দিল্লি পৌঁছে পাইভি আমাকে মোবাইল ফোনে মেসেস দেয়, ‘আই এম অন দ্য ওয়ে টু মাই কান্ট্রি উইথ দ্য সুইট মেমোরি অব বাংলাদেশ।’

পাইভি দেশে ফিরে আমাকে মেইল করেছে। বলেছে আবার তারা বাংলাদেশে আসবে। আমি মজা করে জানতে চেয়েছি - হোয়াট এবাউট দ্য সিকিউরিটি। পাইভিও সোৎসাহে জবাব দিয়েছে, ‘আই অ্যাম মোর সিকিউরড ইন বাংলাদেশ দ্যান মাই কান্ট্রি।’

লেখক: সাংবাদিক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ