behind the news
IPDC  ad on bangla Tribune
Vision  ad on bangla Tribune

আমরা পাকিস্তানকেই অস্বীকার করছি

প্রভাষ আমিন১৮:০৮, ডিসেম্বর ০১, ২০১৫

Probhash Aminপাকিস্তানের ঔদ্ধত্য সীমা ছাড়িয়েছে। এমনিতে এক দেশের রাষ্ট্রদূতকে যে দেশে আছেন, সে দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ডেকে পাঠানো অস্বাভাবিক নয়, বরং সাধারণ কূটনৈতিক শিষ্টচার। সেই হিসেবে পাকিস্তানে নিযুক্ত বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার মৌসুমী রহমানকে ডেকে পাঠানোকে সাধারণ কূটনৈতিক শিষ্টাচার হিসেবেই বিবেচনা করা যেত। কিন্তু ডেকে পাকিস্তান যা বলেছে তা শুধু কূটনৈতিক শিষ্টাচার বহির্ভুতই নয়, চরম মিথ্যাচার এবং আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ। পাকিস্তান একাত্তরে বাংলাদেশে গণহত্যার দায় অস্বীকার করেছে। এই অস্বীকারের মাধ্যমে পাকিস্তান একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের বাইরে রাখার অপচেষ্টা করছে। অপরাধীদের বিচার না করা, তাদের রক্ষার চেষ্টা করা, আড়াল করাও আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ।

একাত্তরে পাকিস্তান যা করেছে, তার জন্য বাংলাদেশের জনগণের কাছে তাদের নতজানু হয়ে ক্ষমা চাওয়া উচিত। ভুল স্বীকার বা ক্ষমা চাওয়ার মধ্যে কোনও গ্লানি নেই। বিশ্বের একাধিক দেশ এখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নিজেদের ভূমিকার জন্য অনুতপ্ত। সাম্প্রতিক ইরাক যুদ্ধ ভুল ছিল বলে স্বীকার করেছেন টনি ব্লেয়ার। আর পাকিস্তান নিজেদের অপরাধ স্বীকার করা বা ক্ষমা চাওয়া তো দূরের কথা, উল্টো অস্বীকার করছে।

রাজনৈতিকভাবেও পাকিস্তানকে ঘৃণা করার, গালাগাল করার যথেষ্ট পয়েন্ট আছে। কিন্তু সেটাকে পাশে রেখে আমরা যদি শুধু তাদের মিথ্যাচারের কথাই তাহলে শেষ হবে না। পাকিস্তান ছাড়া বিশ্বের আর সবাই জানে একাত্তর সালে পাক হানাদাররা এ দেশে কী করেছে। মাত্র ৯ মাসে তারা ৩০ লাখ মানুষকে হত্যা করেছে, ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম লুটেছে। শহীদ বা নির্যাতিত নারীদের সংখ্যা নিয়ে কেউ কেউ মিউ-মিউ করে সন্দেহ প্রকাশ করলেও একাত্তরে যে পাকিস্তানিরা বাংলাদেশে বর্বরতম, নিষ্ঠুরতম গণহত্যা হয়েছে, তা নিয়ে কালকের আগে কেউ অস্বীকার তো দূরের কথা, সন্দেহও করেনি। এখনও পাকিস্তানের এই অস্বীকৃতি বিশ্বের কেউ বিশ্বাস করেনি। ৪৪ বছর আগের কথা হলেও মানুষ কিছুই ভোলেনি। এখনও মুক্তিযোদ্ধারা বেঁচে আছে, এখনও দেশি-বিদেশি যুদ্ধাপরাধীরা বেঁচে আছে, শহীদ পরিবারের সদস্যদের কান্না এখনও আমাদের বেদনার্ত করে, নির্যাতিত নারীদের হাহাকার এখনও আমাদের গ্লানিতে ডোবায়, পাক হানাদারদের বর্বরতার চিহ্ন হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে আছে একাত্তরের যুদ্ধশিশুরা। এরপরও পাকিস্তান একাত্তরের গণহত্যার দায় অস্বীকার করে কিভাবে। চক্ষুলজ্জা বলেও তো একটা বিষয় আছে। আর একাত্তরে গণহত্যার প্রমাণ পেতে পাকিস্তানের বাইরে তাকানোর দরকার নেই।

এখন আমাদের পাল্টা আক্রমণে যেতে হবে। বারবার দাবি তুলতে হবে। বলতে হবে, পাকিস্তান তুমি গণহত্যাকারী, তুমি পরাজিত, তুমি অপরাধী, তুমি চুক্তির বরখেলাপকারী, তুমি দেনাদার; বড় কথা তোমাদের মানায় না। আমাদের সামনে তোমরা মাথা নিচু করে থাকবে।

একাত্তরে পরাজয়ের পর জুলফিকার আলি ভুট্টো বিচারপতি হামুদুর রহমানের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করেছিল। সেই কমিশনের রিপোর্ট দেখলেই পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সত্যটা জানতে পারবে। হামুদুর রহমান কমিশনের রিপোর্টে পাকিস্তানি সৈন্য ও তাদের এদেশীয় দোসরদের যুদ্ধাপরাধের বিস্তারিত বিবরণ আছে। সেই রিপোর্টে কয়েকজন সামরিক কর্তার কোর্ট মার্শালে শাস্তির সুপারিশ ছিল। কমিশন পাকিস্তানি সেনাদের নৃশংসতা, অবাধ নিষ্ঠুরতা ও অনৈতিকতা তদন্তে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন আদালত বা কমিশন গঠনেরও সুপারিশ করেছিল। কিন্তু পাকিস্তানিরা আজ যেমন অস্বীকার করছে, তখনও আড়াল করেছে। হামুদুর রহমান কমিশনের কোনও সুপারিশই বাস্তবায়িত হয়নি। গঠিত হয়নি কোনও আদালত, বিচার হয়নি মানবতাবিরোধী অপরাধের। পাকিস্তান না করলেও বাংলাদেশ যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে ইতিহাসের দায় মেটাচ্ছে, জাতিকে গ্লানিমুক্ত করছে, তখন কান্নার রোল পড়েছে পাকিস্তানে। বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে; এ নিয়ে আমাদের নিকট প্রতিবেশী ভারত বা মিয়ানমারের বলার কিছু নাই; কিন্তু হাহাকার শুরু হয় এগারোশ মাইল দূরের পাকিস্তানে। তাদের এই প্রতিক্রিয়াই প্রমাণ করে বাংলাদেশে ঠিক যুদ্ধাপরাধীদেরই বিচার হচ্ছে।

পাকিস্তানের সাম্প্রতিক অন্যায় প্রতিক্রিয়ায় বারবার ১৯৭৪ সালের নয়াদিল্লি চুক্তির রেফারেন্স দিয়ে বলা হয়, বাংলাদেশ যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা করে দিয়েছে। এরচেয়ে বড় বিভ্রান্তি আর কিছু নেই। একাত্তরে বিজয়ের পর বাংলাদেশ আত্মসমর্পণ করা পাক হানাদারদের মধ্যে ১৯৫ জনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনে। এই ১৯৫ জন এবং তাদের এদেশীয় দোসরদের বিচারের জন্য ১৯৭৩ সালে প্রণয়ন করা হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন। কিন্তু ভুট্টো এই যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে 'পাগলা কুত্তা' হয়ে যায়। পাল্টা হিসেবে ভুট্টো পাকিস্তানে আটকা পড়া বাঙালিদের জিম্মি করে। ভুট্টোর পরামর্শে চীন বাংলাদেশের জাতিসংঘের সদস্যপদ প্রাপ্তির আবেদনে ভেটো দেয়। মুসলিম বিশ্বও চাপ দেয় বাংলাদেশকে। সবচেয়ে বড় কথা ভারত দিনের পর দিন এই যুদ্ধবন্দিদের ভরণপোষণ করে ক্লান্ত। তাই তারাও চাচ্ছিল দ্রুত প্রত্যাবাসন। এত চাপ সামাল দেওয়ার সক্ষমতা ছিল না শিশুরাষ্ট্র বাংলাদেশের। তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাংলাদেশকে ১৯৭৪ সালের ত্রিদেশীয় চুক্তিতে সই করতে বাধ্য হয়েছিল। একজন সিনিয়র ডিপ্লোম্যাট বঙ্গবন্ধুর সাথে তার ব্যক্তিগত আলাপচারিতার রেফারেন্স দিয়ে আমাকে বলেছেন, এই চুক্তি নিয়ে মনক্ষুণ্ন ছিলেন বঙ্গবন্ধু স্বয়ং। তিনি যেভাবে চেয়েছিলেন, বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল সেভাবে করতে পারেনি। কিন্তু তারপরও নয়াদিল্লি চুক্তিতে যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা করে দেওয়ার কথা নেই। খালি ১৯৫ পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীর বিচার বাংলার মাটিতে করার অবস্থান থেকে সরে এসেছিল, বিচার করার অবস্থান থেকে নয়। কথা ছিল ভুট্টো পাকিস্তানের মাটিতে এদের বিচার করবে। কিন্তু করেনি। নয়াদিল্লি চুক্তির ১৩ নং ধারায় বলা হয়েছে 'পাকিস্তানের ওইসব বন্দি যে মাত্রাতিরিক্ত ও বহুমাত্রিক অপরাধ করেছে, তা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবনা এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এবং গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত। এই ১৯৫ জন পাকিস্তানি বন্দি যে ধরনের অপরাধ করেছে সে ধরনের অপরাধের অপরাধীদের দায়ী করে আইনের মুখোমুখি করার ব্যাপারে সর্বজনীন ঐকমত্য রয়েছে।’ এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন পাকিস্তানের তখনকার পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আজিজ আহমেদ। এমন ঐকমত্যের পরও পাকিস্তান বলবে, তারা একাত্তরে গণহত্যা করেনি?

তারা যখন একাত্তরের গণহত্যার দায় অস্বীকার মতো পর্যায়ে চলে গেছে, মনে হয় আমাদেরও সময় এসেছে পাকিস্তানকে অস্বীকার করার।

পাকিস্তান বরং তাদের কৃতকর্মের জন্য বাংলাদেশের জনগণের কাছে ক্ষমা চেয়ে বিচার করার কথা বলে ১৯৫ যুদ্ধাপরাধীকে নিয়ে গিয়েছিল। সেই চুক্তিতে স্থানীয় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যাপারে কোনও কথাই ছিল না। তাহলে স্থানীয় যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি হলে পাকিস্তান ১৯৭৪ সালের চুক্তিকে ঢাল হিসেবে দাঁড় করায় কোন যুক্তিতে? তারচেয়ে বড় কথা তিন দেশের কোনও দেশই ১৯৭৪ সালের বহুল আলোচিত চুক্তি সংসদে অনুমোদন করেনি। তাই সে চুক্তি মানার বাধ্যবাধকতা নেই।

গত সপ্তাহে এক লেখায় পাকিস্তানের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেই বিভিন্ন অমীমাংসিত ইস্যু সমাধানের কথা বলেছিলাম। কিন্তু তারা যখন একাত্তরের গণহত্যার দায় অস্বীকার মতো পর্যায়ে চলে গেছে, মনে হয় আমাদেরও সময় এসেছে পাকিস্তানকে অস্বীকার করার। পাকিস্তান তাদের প্রতিক্রিয়ায় বলেছে, বাংলাদেশ নাকি পাকিস্তানের মানহানি করছে। এই লাইনটি পড়ে অনেকক্ষণ হেসেছি। মান থাকলে তো হানির প্রশ্ন! পাকিস্তানের মতো একটি ব্যর্থ, নষ্ট, সন্ত্রাসী রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক রাখা না রাখায় কিচ্ছু যায় আসে না। বরং পাকিস্তানি চরেরা কূটনৈতিক সুরক্ষা নিয়ে বাংলাদেশে নানা অপকর্ম করে বেড়াচ্ছে। পাকিস্তানের সাথে সীমান্ত নেই, বাণিজ্যও তেমন নেই। তাই এই কলঙ্কের সাথে সম্পর্ক রাখতে হবে কেন! দুষ্ট গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভালো।

পাকিস্তান বলেছে, আমরা বিশ্বাস করি পাকিস্তানের জনগণ বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ থাকতে চায়। তারা আরও বলেছে, দুই দেশের জনগণ শুধু সম্পর্ক বজায় রাখতেই চায় না, বরং দুই দেশের বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন আরও সৃদুঢ় করতে চায়। পাকিস্তান মনে করে, বাংলাদেশ এই ভাবাবেগকে সম্মান দিচ্ছে না। খুব ভালো করছে দিচ্ছে না। তবে পাকিস্তানের জনগণের কথা জানি না, বাংলাদেশের জনগণ পাকিস্তানকে ভাই মনে করে না। তাই ভ্রাতৃত্বের বন্ধন দৃঢ় করা তো দূরের কথা আমরা আসলে বন্ধন ছিন্ন করতে চাই।

তবে আমাদের ন্যায্য দাবিগুলো তুলে ধরতে হবে বিশ্বসভায়। প্রথম দাবি, ১৯৫ যুদ্ধাপরাধীকে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেওয়া হোক। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দোসরদের সাথে আমারা তাদেরও বিচার করবো। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে আটকে পড়া পাকিস্তানিদের ফিরিয়ে নিতে হবে। আর তৃতীয়ত আমাদের পাওনা ফিরিয়ে দিতে হবে। ২৩ বছরের বঞ্চনার ন্যায্য হিস্যা বুঝিয়ে দিতে হবে। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে থাকা স্বর্ণ এবং ৭০-এর ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য আসা বৈদেশিক সাহায্যের মেরে দেওয়া টাকা ফেরত দিতে হবে। আমি জানি, এতদিন পর এই দাবি আদায় করা কঠিন। কিন্তু দাবি ছাড়া যাবে না। কোনও বিশ্বসভায় বা রাস্তাঘাটে পাকিস্তানের কারও সাথে যতবার দেখা হবে, ততবারই বলতে হবে, আমরা কিন্তু তোমাদের কাছে এত হাজার কোটি টাকা পাই। আমার ধারণা, আমরা এসব দাবি তুলতে পারি বলেই পাকিস্তান আগ বাড়িয়ে ঝগড়া করতে এসেছে। এখন আমাদের পাল্টা আক্রমণে যেতে হবে। বারবার দাবি তুলতে হবে। বলতে হবে, পাকিস্তান তুমি গণহত্যাকারী, তুমি পরাজিত, তুমি অপরাধী, তুমি চুক্তির বরখেলাপকারী, তুমি দেনাদার; তাই বড় কথা তোমাদের মানায় না। আমাদের সামনে তোমরা মাথা নিচু করে থাকবে। গলা উঁচু করে কথা বলবে না। নইলে আমাদের পাওনা দিয়ে বিদায় হও। পাকিস্তান এবং তাদের দোসরদের কোনও ক্ষমা নেই। এই হোক বিজয়ের মাসের অঙ্গীকার।

লেখক:  অ্যাসোসিয়েট হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ।

probhash2000@gmail.com

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Global Brand  ad on Bangla Tribune

লাইভ

IPDC  ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ