behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

নামেই ডিজিটাল, বাস্তবে অ্যানালগ!

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা১১:৩৫, ডিসেম্বর ০২, ২০১৫

Ishtiaque Rezaবলা হয়েছিল, সাময়িক কিন্তু দুসপ্তাহ পার হয়ে গেছে। বাংলাদেশে বন্ধ রয়েছে ফেসবুক, ভাইবার, হোয়্টসঅ্যাপসহ বেশ কিছু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও জামায়াত  নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের ফাঁসির রায় বাস্তবায়নের প্রাক্কালে এগুলো বন্ধ করা হয়।

ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো এখন আর শুধু চ্যাটিং বা সাধারণ যোগাযোগ কাজে ব্যবহৃত হয় না। বিভিন্ন ধরনের ব্যবহার- উপযোগিতার কারণে জীবনের প্রায় সব কিছুতেই যুক্ত হয়ে আছে এসব মাধ্যম। ‘এ যেন বিনামেঘে বজ্রপাত’— বলছিলেন একজন, যিনি বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার কাছে একটি ভাড়াবাড়ি নিয়ে শুরু করেছেন অনলাইন-বাণিজ্য। বলেন, কেউ আর সার্চ ইঞ্জিন দিয়ে কোথায় অনলাইন শপিং হয় তা খোঁজে না, প্রায় সব ক্রেতাই তৈরি হয় ফেসবুকে একটা অ্যাকাউন্ট খুলে।

এমন অবস্থা সবার। নিশ্চল হয়ে গেছে অনলাইনভিত্তিক লেনদেন। বিশেষত সামাজিক যোগাযোগের জনপ্রিয় মাধ্যম ফেসবুক লেনদেনে বিপর্যয় নেমেছে। দুসপ্তাহ ধরে মাধ্যমটিতে কোনও লেনদেন হচ্ছে না। যারা বিকল্প উপায়ে ফেসবুকে ঢোকার চেষ্টা করছেন তারাও ইন্টারনেটের গতি কম থাকায় ব্যর্থ হচ্ছেন।

যে সরকার নিজেকে দাবি করে ডিজিটাল সরকার বলে, সেই সরকারের আমলে ই-কমার্স-এর এমন ধস কেউ ভাবতে পারেনি। আগেই বলেছি, ফেসবুক এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যমই নয়, এর মাধ্যমে বিপুল অংকের লেনদেনও হচ্ছে। যে মুহূর্তে মানুষ অনলাইন লেনদেন জনপ্রিয় হয়ে উঠতে শুরুই করেছিল তখনই ফেসবুকসহ জনপ্রিয় ১০টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধ করে দেওয়া হলো। মানুষ যানজট এড়াতে, সময় বাঁচাতে লেনদেনের বেছে নেয় ফেসবুকসহ বেশ কিছু অনলাইন মাধ্যমকে। আর সেখানেই এলো এমন কুঠারাঘাত।

সরকার যদি মনে করে, যোগাযোগের কারণে সন্ত্রাস বাড়ে, তাহলে সবার আগে মোবাইল ফোনই বন্ধ করে দিতে হবে।

বৃহত্তর স্বার্থে মানুষ প্রথমে এটা মেনে নেয়। মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের সময় সন্ত্রাসের দোহাই দেওয়ায় মানুষ মনে করেছিল, বিষয়টি সাময়িক। কিন্তু এতটা সময় পার হওয়ার পর এখন ভিন্ন কিছু ভাবতে শুরু করেছে সবাই। তবে কি এখানে মোবাইল কোম্পানিগুলোর ষড়যন্ত্র আছে? আছে ক্ষমতার কেন্দ্র থাকা প্রভাবশালী ভিওআইপি মাস্তানদের কারসাজি। মানুষ নানাকিছু ভাবছে, ভাবতে পারে, এটাই স্বাভাবিক।

ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধ করে সন্ত্রাস আর সহিংসতা বন্ধের সরকারি কল্পকাহিনীর মধ্যেই বগুড়ায় শিয়া মসজিদে সশস্ত্র হামলা হয়েছে, একজন মারা গেছে। সরকারের কিছু নতুন মুখ বারবার সাঈদীকে চান্দে দেখা যাওয়ার গুজব ছড়িয়ে নাশকতার গল্প বলার চেষ্টা করছেন। তারা বিষয়টি তলিয়ে দেখলেই বুঝতে পারবেন, সেই নাশকতা আর সহিংসতা ফেসবুক থেকে হয়নি। গ্রামের মসজিদে মাইকিং করে, মোবাইলে মেসেজিং করে ছড়ানো হয়েছিল। ফেসবুকে বরং সেই অপপ্রচারের বিরুদ্ধের সাইবার লড়াই করেছে দেশের তরুণ-তরণীসহ সব শ্রেণি পেশার মানুষ। সত্য বলতে কি সরকার যদি মনে করে, যোগাযোগের কারণে সন্ত্রাস বাড়ে, তাহলে সবার আগে মোবাইল ফোনই বন্ধ করে দিতে হবে।

পত্রিকা পড়ে জানা গেল, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ই-কমার্সের মাধ্যমে বছরে প্রায় ১০০ কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে। তবে এই পরিসংখ্যান শুধু বেসিস সদস্যভুক্তদের। বর্তমানে বেসিসে তালিকাভুক্ত সদস্য ৯০০ ছাড়িয়েছে। এর বাইরে ব্যক্তি উদ্যোক্তা ও ক্ষুদ্র পর্যায়ে আরও অনেক ই-কমার্স চালু আছে। ফেসবুকে আলাদা পেইজ খুলে যারা অনলাইন ব্যবসা করছেন, তারা প্রায়  ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী।

এদেশটি হয় উদ্যোক্তাবিরোধী কিংবা যতই ডিজিটালের গল্প বলুক, সেই অর্থে এই সরকারের লোকজনের অনেকেরই মন-মানসিকতা একদম অ্যানালগ কিংবা এরা আসলে অ্যানালগ-ডিজিটাল। যারা সন্ত্রাস আর সহিংসতা করবে, তারা যথেষ্ট দক্ষ তথ্য প্রযুক্তি লাইনে। সরকার একটি বন্ধ করলে, ওদের আরও অজস্র বিকল্প লাইন জানা আছে। তারা দক্ষ এবং একই সঙ্গে মরিয়া। সমস্যা হচ্ছে, গরিব উদ্যোক্তার, সাধারণ শিক্ষার্থীদের, যাদের অনলাইনেই অনেক কিছুর জন্য নির্ভর করতে হয়। অনলাইন-ভিত্তিক বড় কোনও লেনদেন ফেসবুকের মাধ্যমে হয় না। তবে ফেসবুকে প্রচারণা ও ক্যাম্পেইন চালানো হয়। এভাবে বন্ধ অবস্থা চলতে থাকলে ব্যবসাটি বন্ধ হয়ে যাবে। এতে নতুন করে উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন কেউ দেখবে না।

বিকল্প পথে দুই-একজন চেষ্টা করছেন, কিন্তু ইন্টারনেটের গতি শ্লথ, ফেসবুকেও গ্রাহকের দেখা নেই সেভাবে। বাংলাদেশে ই-কমার্স আসলে ফেসবুকের কারণে এফ-কমার্সে পরিণত হয়েছে। ই-বাণিজ্যের অর্ধেকই হয় ফেসবুকের মাধ্যমে। স্টার্ট-আপ বিজনেস বা উদ্যোক্তা জগতে প্রবেশের জন্য বিশ্বব্যাপী এখন এক নম্বর প্লাটফর্ম ফেসবুক। আমাদের সদাশয় সরকার বাহাদুরও সবাইকে উপদেশ দেন, চাকরি না খুঁজে উদ্যোক্তা হোন, চাকরিজীবী না হয়ে মানুষকে চাকরি দিন। তো, সেই সরকার নতুন উদ্যোক্তাদের কি অসাধারণ এক উপহার দিয়ে চলেছেন—এসব মাধ্যম বন্ধ রেখে! যে সরকার তারুণ্যের শক্তি দেখে দেশের ভবিষ্যতের জন্য, সেই সরকারই তারুণ্যের আকাঙ্ক্ষাকে অবহেলা করে এসব বন্ধ করে দিয়ে।

ভারতের সিলিকন ভ্যালি আজ আউটসোর্সিংয়ের জন্য বিখ্যাত। বলা হচ্ছে, গাজীপুরের আইটি পার্কও বিশ্বব্যাপী পাবে সেই পরিচিতি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আইটি সেক্টরকে এগিয়ে নিতে যতটা আগ্রহী, মনে হচ্ছে কিছু লোক আরও আগ্রহী লাগাম টেনে রাখতে। গত মঙ্গলবার রাজধানীতে এক তথ্য প্রযুক্তি মেলায় অর্থমন্ত্রী বলেছেন, তথ্য প্রযুক্তির অবাধ ব্যবহারের মধ্য দিয়ে ব্যাপক হারে দুর্নীতি প্রতিরোধ করা সম্ভব। জাতীয় অর্থনীতিতে তথ্যপ্রযুক্তির অবদান বলতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, তথ্য প্রযুক্তি খাতের আগ্রগতি দেশকে উন্নত দেশগুলোরে সাথে প্রতিযেগিতায় টিকতে সহায়তা করবে। মুখে একরকম বলছি আমরা, করছি ঠিক তার উল্টোটা। বাংলাদেশ যে আজ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে, এর জন্য তথ্যপ্রযুক্তির অবদান কি হিসাব করবেন যারা বন্ধ করেছেন তারা?

সব দেশের মতো এদেশেও ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইউটিউব, টুইটার, ভাইবার বেশ জনপ্রিয় অ্যাপ্লিকেশন, যা দিয়ে মানুষ অর্থনৈতিকভাবে উপকৃত হচ্ছে; বিশেষত তরুণ উদ্যোক্তারা। হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবারবিহীন প্রবাসে থাকা বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়স্বজনের কি অহরহ খোঁজ নেওয়া যায়? হয়তো বা সেখানেই কারও কারও সমস্যা, এসব ফ্রি কলের সুযোগ বন্ধ করে নিজেদের বাণিজ্য বাড়াতেই কি এসব বুদ্ধি? আর সরকারে থাকা কিছু লোকের টুপাইস আয়ের পথ সুগম করার উপায় এটি? বিশ্বাস করতে চাই না। কিন্তু মানুষের মন অনেক সৃজনশীল, কত কিছুই না ভাবতে পারে সে!

সামাজিক মাধ্যম বন্ধ না রেখে নিজেরা সক্রিয় হোন এ মাধ্যমে, নজরদারি বাড়ান কারা এর অপব্যবহার করছে তাদের ওপর! প্রশ্ন উঠে, সরকার কেন মানবতাবিরোধী অপরাধীদের পক্ষাবলম্বনকারী কিছু ছিঁচকে সাইবার সন্ত্রাসীকে  ভয় পেল? যে জনগণ প্রতিনিয়ত লড়াই করছে তাদের ওপর কোনও আস্থা নেই সরকারের? সৃজনশীল আর উদ্যোমী মানুষ যেমন বিকল্প ব্যবহার জানে, তেমনি এসব সিদ্ধান্তের ভেতর কী ধরনের সৃজনশীল অপকর্ম আছে, তাও মনোজগতে তৈরি করে নিতে পারে।  

লেখক: পরিচালক বার্তা, একাত্তর টেলিভিশন

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ