behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

বন্ধুহারা হচ্ছে পাকিস্তান

আনিস আলমগীর২০:৫৪, ডিসেম্বর ০৪, ২০১৫

Anis Alamgir‘কমিশন উপলব্ধি করে যে, নির্বিচারে হত্যা ও লুটপাট শুধু  পাকিস্তানের শত্রুদের  খোরাক দিয়েছে।  এই রূঢতার কারণে আমরা পূর্ব পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন হারিয়েছি। ১৯৭১ সালের ২৭ ও ২৮ মার্চ  ফিল্ড রেজিমেন্ট সিও লেফটেনেন্ট জেনারেল ইয়াকুব মালিকের নেতৃত্বে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট গণহত্যা তেমনই একটি উদাহরণ হিসেবে দেখা উচিত, যেখানে একজন অফিসারের একটি আঙুলের ঝাঁকুনিতে হত্যা করা হয়েছিল ১৭ জন বাঙালি অফিসার এবং ৯১৫ জন মানুষকে।’—এটি পাকিস্তানের তৈরি রিপোর্টের বিবরণ। পাকিস্তান আর্মি কেন ১৯৭১ সালের যুদ্ধে পরাজিত হয়েছিল, সেটা খুঁজে বের করার জন্য যুদ্ধের পরপর ১৯৭১ সালের ২৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান সরকার একটি কমিশন গঠন করেছিল। পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি হামদুর রহমানের নেতৃত্বে যে কমিশন হয়, তার রিপোর্টের কয়েকটি লাইন উল্লেখ করলাম মাত্র।

এরপরও যদি পাকিস্তানিরা বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত হাই কমিশনারকে ডেকে বলেন, পাকিস্তান ১৯৭১ সালে কোনও গণহত্যা করেনি, তাদের জন্মগতভাবে মিথ্যেবাদী বলা হয়তো কম বলা হবে। আসলে পাকিস্তানের জন্মটাই মনে হচ্ছে আজন্মের পাপ। সে পাপের বোঝা বহন করতে করতে এরা জাহান্নামের দ্বারপ্রান্তে। সারাবিশ্বে তারা ঘৃণিত জাতি হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে। পাকিস্তান সৃষ্টির মাঝে প্রক্রিয়াগত ভুলছিল। সেই কারণে তৎকালীন দূরদৃষ্টি সম্পন্ন রাজনৈতিক নেতারা বলেছিলেন, দেশটা সিকি শতাব্দীর ওপরে টিকবে না। সিকি শতাব্দী পার হওয়ার আগেই ভেঙে জন্ম নিয়েছে বাংলাদেশের।

মাওলানা আবুল কালাম আজাদকে ‘শো বয় অব কংগ্রেস’ বলতেন মুসলিম লীগের নেতারা। অপমান সহ্য করেও তিনি তার মতপথ থেকে কখনও সরে যাওয়ার চেষ্টা করেননি। জমিয়তে ওলামায়ে হিন্দ-এর সভাপতি মাওলানা হোসেন আহাম্মদ মাদানীও (রা.) একই অভিমত পোষণ করতেন। তিনি বারবার বলেছেন, কিছু মুসলমানকে নিরাপদ করার জন্য কিছু মুসলমানকে অনিরাপদ করা যায় না। তখন ভারতীয় মুসলমানদের অন্যসব কথা শোনার বা গুরুত্বসহ বিবেচনা করার অবকাশও হয়নি।

উত্তর প্রদেশের মুসলমানেরা বা বিহারের মুসলমানেরা জানতেন যে, উত্তর প্রদেশ বা বিহার পাকিস্তান হবে না। তবু তারাও ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ বলে ময়দান গরম করেছেন। আবেগের কাজ এমনই হয়। মূলত পাকিস্তানের সৃষ্টি ছিল সাম্প্রদায়িক সমস্যার ভ্রান্ত সমাধান। মাওলানা আবুল কালাম আজাদ বাস্তবতা উপলব্ধি করেই বলেছিলেন, In future India will be faced with the class problem not communal disputes, the conflict will be between capital and labour (India wins Freedom).

মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, মাওলানা হোসেন আহাম্মদ মাদানী, মাওলানা হযরত মোহানীরা চেয়েছিলেন মুসলামনেরা শাসনতান্ত্রিক রক্ষা ব্যুহ তৈরি করে অখণ্ড ভারতে থাকুক। তাদের কথার মাঝে যুক্তি থাকলেও কিন্তু মুসলিম লীগ তা কর্ণপাত করেননি। তারা ভবিষ্যৎ ইতিহাসকে প্রসারিত দৃষ্টি নিয়ে দেখার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু জিন্নাহ্ তার পাকিস্তান দাবিকে সাধারণ মানুষের কাছে আবেগের বিষয় করে তুলতে পেরেছিলেন। সুতরাং ১৯৪৭ সালে তিন মাওলানা হেরেছেন আর জিন্নাহ্ জিতেছেন। এটি ছিল অযুক্তির কাছে যুক্তির পরাজয়। সাম্প্রদায়িকতার কাছে অসম্প্রদায়িকতার পরাজয়।

পাকিস্তান সৃষ্টি হলো। পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনীতির কুশীলবেরা হলেন সবাই ভূস্বামীর সন্তান। পূর্ব-বাংলা হলো কৃষকের বস্তি। পশ্চিম পাকিস্তানিরা তাদের অবেহলার চোখে দেখতেন। অ-সম্মান করতেন। একবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে আইয়ুব খান পূর্ব-বাংলার লোকদের নমশুদ্র বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। অথচ আইয়ুব খান ছিলেন হাজারা জেলার লোক। প্রাচীনকালে হাজারা ছিল বিরান পাহাড়ি জনপথ। কান্দাহারের রাজার মেয়ে গান্ধারীকে ভারতীয় এক রাজকুমার বিয়ে করেছিলেন। পথে দস্যুদের আক্রমণের ভয়ে গান্ধারীর পালকি পাহারা দেওয়ার জন্য কান্দাহারের রাজা দেড় হাজার লাঠিবহদ্দার দিয়েছিলেন। আর তারা হাজারা জেলায় পৌঁছলে ওলাওঠা দেখা দেয়। কিছু সুস্থ লাঠিবহদ্দার গান্ধারীকে নিয়ে ভারতে চলে যায়। অবশিষ্টরা হাজেরায় থেকে যায় এবং হাজেরা জেলায় বসতি স্থাপন করে। হাজারা জেলার ইতিহাস পড়লে দেখা যায়, তারাই হাজেরার আদি বাসিন্দা। আইয়ুব এই লাঠিবহদ্দারের সন্তান কোনও আরবের কোরাইশ বংশীয় লোক নন। পশ্চিমাদের জুলুম অত্যাচারে আর্থিক শোষণ বৈষম্যের কারণে পূর্ব-বাংলার লোকেরা উৎকণ্ঠার মধ্যে পড়ে গেলেন দেশ সৃষ্টির পর পরই।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আসলে ফ্রান্সের জোয়ান অব আর্কের মতো। তিনি ইতিহাসের বরপুত্র। ইতিহাস তাকে সৃষ্টি করেছিল ঐতিহাসিক ভুল সংশোধনের জন্য। বাঙালি দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধ করে ৩০ লাখ লোকের প্রাণের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন করল। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানিরা আত্মসমর্পণ করেছিলেন। পাকিস্তানিরা কিন্তু এ পরাজয়ের আত্মগ্লানি থেকে এখনও মুক্ত হতে পারেননি। পাকিস্তানি বাহিনী ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কিছু বিশ্বাসঘাতক বাঙালিকে দিয়ে আল-বদর, আল-শামস্, রাজাকার বাহিনী গঠন করেছিলো। তারা কিন্তু পাকিস্তানি সেনা বাহিনীরই অংশ। বর্তমান সরকার তাদের বিচারের ব্যবস্থা করেছে।

কাদের মোল্লা, কামরুজ্জামান, আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে রায়ে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়েছে। তাদের ফাঁসিও কার্যকর করা হয়েছে। পাকিস্তান তাদের ফাঁসি কার্যকর হওয়ার তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। প্রকৃত পক্ষে তারা বাংলাদেশে অবস্থান করলেও, ছিলেন পাকিস্তানেরই অনুগত বন্ধু। তাদের দিয়ে পাকিস্তান বহু কাজ করিয়েছে। ভারতের বিদ্রোহীদের কাছে যে দশ ট্রাক অস্ত্র পাঠানোর চেষ্টা করা হয়েছিল, তাতে প্রত্যক্ষভাবে তারাই মদদ যুগিয়েছিলেন।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর পাকিস্তান তাদের বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা জায়গা সৃষ্টি করে দেওয়ার প্রাণপণ প্রয়াস চালায় এবং সকলকামও হয়। মানবতাবিরোধী অপরাধী হিসেবে তাদের একে একে সবার ফাঁসি হয়ে গেলে, বাংলাদেশে পাকিস্তান বন্ধুহীন হয়ে পড়বে। সম্ভবত পাকিস্তানের প্রতিবাদের ভাষাটা এজন্যই হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়েছে। পাকিস্তানের ইন্টিলিজেন্ট এজেন্সি আইএসআই খুবই শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। যাদের ফাঁসি হয়েছে বা যারা ফাঁসির অপেক্ষায় আছেন, তারা সবাই বাংলাদেশে আইএসআই এর শক্তিশালী লোক। এ রকম একটা টিমের অবসান হলে বাংলাদেশে তার অবলম্বন খুঁজে পেতেও মুশকিলে পড়বে পাকিস্তান। সম্ভবত সালাউদ্দীন কাদেরের গোপনে দ্বৈত নাগরিকত্ব ছিল। রাওয়ালপিন্ডিতে তাদের ঘরবাড়িও রয়েছে। গোলাম আযম তো পাকিস্তানি পাসপোর্ট নিয়েই বাংলাদেশে ফিরেছেন ৭৫-এর পর। বলার অপেক্ষা রাখে না, তারও দ্বৈত নাগরিকত্ব ছিল।

বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীতে পাকিস্তান ফেরত অফিসার আর অবিশষ্ট নেই। এখন যারা আছেন, তারা সবাই বাংলাদেশ প্রজন্মের লোক। ধীরে ধীরে পাকিস্তান যদি তার লিংক হারিয়ে ফেলে, তবে তাদের ইভিল ডিজাইন বাস্তবায়নের পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে।  অবশিষ্ট থাকবে কিছু সংখ্যক আলেম আর জঙ্গি—যাদের সঙ্গে আইএসআই-এর সংযোগ রয়েছে। সে বিষয়েও সরকার উত্তম তৎপরতা চালালে তাও বন্ধ হতে বাধ্য। বাংলাদেশ সরকার কূটনৈতিক পর্যায়ে যা প্রয়োজন তা করেছে, তা করবে। এই মুহূর্তে তার অধিক কিছু বাড়াবাড়িতে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।

লেখক: সাংবাদিক ও শিক্ষক

anislamgir@gmail.com

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ