Vision  ad on bangla Tribune

সহিংসতা রোধে ফেসবুক বন্ধ হলে স্বাগত জানাই

সালেক উদ্দিন১৪:২৫, ডিসেম্বর ০৫, ২০১৫

Salek Uddin৬ ডিসেম্বর ঢাকায় আসছেন ফেসবুক এশিয়া অঞ্চলের পলিসি অ্যাডভাইজার। এর আগে ১৮ নভেম্বর থেকে বাংলাদেশে ফেসবুকসহ বেশ কয়েকটি অ্যাপস বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মূলত শীর্ষ দুই যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি কার্যকর হওয়ার আগে বা পরে দেশে যেন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয় সে জন্যেই। পরবর্তীতে ৩০ নভেম্বর বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ফেসবুক কর্তৃপক্ষকে আলোচনায় বসার জন্য চিঠি দেওয়া হয়। সেই চিঠির সাড়া দিয়েই ফেসবুক কর্তৃপক্ষ ঢাকায় আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ফেসবুক বন্ধের ব্যাপারে সংবাদ মাধ্যমে বেশ কিছু লেখালেখি দেখলাম। কেউ কেউ লিখেছেন, ফেসবুক কেন্দ্রিক গড়ে ওঠা অনেক ক্ষুদে ব্যবসায়ীরা রাস্তায় বসে যাচ্ছে। কেউ লিখেছেন, ‘ফেসবুক বন্ধ নাকি নিষিদ্ধ?’ তাদের বক্তব্য ছিল- ফেসবুক বন্ধ করে দেওয়ার পরও অনেকে বিকল্প পথে ফেসবুকে ঢুকছে। কেউ লিখেছেন, সরকারি দলের অঙ্গ সংগঠনগুলোর ফেসবুকে নিয়মিত পোস্টের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। ওদিকে ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী এ বিষয়ে একের পর এক সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেছেন, যারা বিকল্প পথে ফেসবুকসহ বন্ধ করা অ্যাপস ব্যবহার করছেন তারা সরকারের নজরদারিতে আছেন। আবার তিনি এটাও বলছেন, ট্রাফিক কম হলে মনিটর করা সহজ হয়। ফলে আমরা সহজেই বুঝতে পারছি কারা কোথায় কী করছে। এ জন্যে আমরা ফেসবুক ও কিছু অ্যাপস বন্ধ রেখে মনিটর করছি।

বিলম্বে হলেও প্রতিমন্ত্রী এটাও বলছেন যে, ফেসবুক ব্যবহারের মাধ্যমে এ দেশের অনেক নারীই লাঞ্চিত হচ্ছেন। ফেসবুকে অবলীলায় পোস্ট করা হচ্ছে আমাদের সামাজিকতায় বেমানান ও আপত্তিকর ছবি, ভিডিও ও বিভিন্ন তথ্য যা আমাদের বিব্রত করছে।

শেষ কথাগুলো শোনে আমাদের মনে হয়, এই সব অনাচার বন্ধের জন্যে ফেসবুক যদি কিছুদিন বন্ধ থাকে থাকুক। তারপরও ফেসবুক আমাদের কাছে শুদ্ধ হয়ে আসুক। বৃহত্তর স্বার্থের জন্য ক্ষুদ্রতর স্বার্থ তো ত্যাগ করতেই হবে।

আবার তিনি যখন লেখেন ‘দেশের মানুষের জীবন রক্ষার চেষ্টা করার জন্য ক্ষমাপ্রার্থী’ শিরনামের ফেসবুক বন্ধের যৌক্তিকতা সম্পর্কে লিখেন যে, ‘এই কারণে শীর্ষ দুই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায়ের আগে বা পরে দেশে বড় ধরনের কোনও নাশকতা ঘটেনি। নাশকতার পরিকল্পনাকারী অনেককেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধ রাখার জন্য গ্রেফতার করা সম্ভব হয়েছে’। তার এই বক্তব্য, বিকল্প পথে ফেসবুক ব্যবহারকারীদের নজরদারিতে রাখা, ফেসবুকসহ কিছু অ্যাপস বন্ধ রেখে সরকারের মনিটরিং ইত্যাদি কি একটি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় না যে, ফেসবুক বন্ধের মাধ্যমে দেশের সামাজিকতা রক্ষা, নারী অবমাননা রোধ ইত্যাদি যাই বলা হোক না কেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে প্রতিহত করাই ছিল ফেসবুক বন্ধের প্রধানতম লক্ষ্য।

আর দশজন আশাবাদী মানুষের মতো আমিও আশা করছি এক সময় প্রমাণিত হবে- আমার এই ধারণা ভুল।

এদিকে প্রথম আলোর পরামর্শক সম্পাদক কামাল আহমেদের ২ ডিসেম্বর প্রকাশিত ‘দেয়ার’স নো ভাইব, এভরিথিং ইজ ডাউন’ লেখায় তিনি এক জায়গায় উল্লেখ করেছেন- সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যবহার করে জঙ্গি ইসলামপন্থী গোষ্ঠী আইএস বিশ্বজুড়ে সদস্য সংগ্রহ করেছে এবং সন্ত্রাস ছড়াতে সাধ্যমতো চেষ্টা করেছে, এ জাতীয় যথেষ্ট প্রমাণ থাকার পরও প্যারিসের সাম্প্রতিক প্রাণঘাতী হামলার পরও বিশ্বের কোনও দেশ সামাজিক যোগাযোগের নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দিয়েছে এমন কথা শোনা যায়নি। তিনি আরও লিখেছেন যে, বিশ্বের অধিকাংশ নারী-শিশুর নিরাপত্তার জন্য ইন্টারনেটে পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণের আলাদা ব্যবস্থা আছে। ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারীদের জন্য পর্নোগ্রাফিক কনটেন্ট বিতরণের ক্ষেত্রে কঠোর ফিল্টারিং ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক। সেটি করার ক্ষেত্রে সরকার কতটা তৎপর সেটা অবশ্য খুব একটা দৃশ্যমান নয়।

সর্বশেষ ২ ডিসেম্বর সাংবাদিকদের প্রশ্নোত্তরে ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী যে কথাগুলো বললেন তা আমাদের অনুপ্রাণিত করেছে। তিনি তার বক্তব্যে বলেছেন, এ দেশের ৭৩ শতাংশ নারী এখন সাইবার সহিংসতার শিকার। ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কোনও চুক্তি না থাকার কারণে বিষয়টি নিয়ে তাদেরকে অভিযোগ করলেও তারা গুরুত্ব দেয় না। আপত্তিকর কনটেন্ট নজরে আনার পর যাতে দ্রুততার সঙ্গে সাড়া দেয় সে বিষয়ে কীভাবে তারা সহযোগিতা করতে পারেন, কত দ্রুততার সঙ্গে অভিযোগগুলো আমলে নিতে পারে মূলত সেই বিষয়ে চুক্তির জন্য ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। এছাড়া আলোচনার অন্তর্ভুক্ত থাকবে- ধর্মীয় সম্প্রদায় ও ধর্মানুভূতিতে আঘাত হানা হচ্ছে এমন বিষয়, আর্থ সামাজিক অবস্থায় কোনটা মানহানিকর, সহিংসতাময় আর কোনটা মানহানিকর, সহিংসতাময় নয় সে বিষয়গুলোও।

যদিও এ বিষয়ে ‘‘দেয়ার’স নো ভাইব, ইভরিথিং ইজ ডাউন’’ লেখায় লেখক বলেছেন- সেপ্টেম্বর মাসের হিসাব অনুযায়ী বিশ্বে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৫০ কোটির মতো। আর বাংলাদেশে এটি ব্যবহার করে ১ কোটি ৭০ লাখ লোক। ফেসবুকের কাছে যে বাজারের আকার ১ শতাংশেরও কম, সেই বাজারের পক্ষে দর-কষাকষিতে কেউ সফল হলে আমরা নিশ্চয়ই তাকে অভিনন্দন জানাবো।’

আমরা লেখকদের এই সংশয়ের সঙ্গে একমত হতে চাই না। কারণ ফেসবুক বাংলাদেশের এই বিষয়টিকে আমলে না নিলে, এত দ্রুত আলোচনার জন্য আসত না। ফেসবুক চুক্তি সংক্রান্ত ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী সর্বশেষ যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেখানে উল্লেখ করেছেন- নারী ও শিশুর জন্য অবমাননা কর, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানতে পারে, সামাজিক অবক্ষয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে, সহিংসতা ছড়াতে পারে এমন আপত্তিকর কনটেন্ট ফেসবুক থেকে দ্রুততার সঙ্গে অপসারণের বিষয়ে ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে চুক্তি অপরিহার্য।

আমার ধারণা এ দেশের মানুষ প্রতিমন্ত্রীর এই প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানাবে। আর একইসঙ্গে দাবি করবে- শুধু ফেসবুক নয় ইন্টারনেটে পর্নোগ্রাফির নিয়ন্ত্রণ করা হোক। পর্নোগ্রাফি কন্টেন্ট কঠোরভাবে ফিল্টারিং এর ব্যবস্থা করা হোক।

সামাজিক অবক্ষয় রোধে যা কিছু করণীয় তা করার অধিকার রাষ্ট্রের অবশ্যই আছে। সমালোচকরা যাই বলুক উদ্দেশ্য যদি মহৎ হয় তবে ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা ও চুক্তির ব্যাপারে নমনীয় হওয়ার কোনওই কারণ আমরা দেখি না। তাছাড়া একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক বাজার যতো বড়ই হোক তার মধ্যে ১ কোটি ৭০ লাখ কনজ্যুমারের অবস্থান অবশ্যই কম নয়।

একটি নতুন ও ভালো কাজের উদ্যোগ নিলে যদি বুঝে না-বুঝে চারদিক থেকে সমালোচনায় কেউ জড়িত হয়, তবে সে ধরেই নিতে পারে তার কাজ অর্ধেকই হয়ে গেছে। এদিক থেকে ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী বহুদূর এগিয়ে আছেন। এখন শুধু দেখার বিষয়, কাজটি তিনি কত সুন্দর ফিনিশিং দিতে পারেন।

যে যাই বলুক প্রতিমন্ত্রীকে আমরা এই মর্মে সাহস দিতে পারি যে, যেকোনও অপপ্রচার কিছু সময়ের জন্য কিছু মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারে, দীর্ঘ সময়ের জন্য বেশি মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারে না।

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও কলামিস্ট

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

samsung ad on Bangla Tribune

লাইভ

টপ