behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

কোন পথে হাঁটছে আমেরিকা?

আহসান কবির১৩:৫৩, ডিসেম্বর ১৪, ২০১৫

Ahsan Kabirপুরোনো এবং বহুল প্রচলিত কথাটা দিয়েই লেখাটা শুরু করা যেতে পারে। আমেরিকা যার শত্রু তার বন্ধুর প্রয়োজন হয় না! তবু আমেরিকার বন্ধুত্ব পেতে মরিয়া যেন হাতে গোনা চার পাঁচটি বাদে পৃথিবীর সব দেশ। ২০১৫ সালের শেষে এসে আমেরিকার রিপাবলিকান পার্টির সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প নামের এক ব্যক্তির (এর আগে অনেক জঘন্য ও মানবতাবিরোধী কাজের জন্য আমেরিকা হাজার বার নিন্দার সম্মুখীন হয়েছে কিন্তু এমন হয়তো কখনও হয়নি ) একটা অশ্লীল উক্তির জন্য আমেরিকা যেভাবে আলোচনায় এসেছে তার একটা সুদূরপ্রসারী প্রভাব হয়তো ভবিষ্যতেও থেকে যাবে। তবে ট্রাম্পের কথায় আসার আগে আমেরিকা সম্পর্কে প্রচলিত কিছু কথা মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া যেতে পারে।

এক. শয়তান বলে যদি সত্যি সত্যি কিছু থাকে তাহলে তার নাম আমেরিকা! পারমানবিক বোমা মেরে জাপানের দুটো শহরের লাখ লাখ মানুষ মেরে ফেলা শুধু আমেরিকার পক্ষেই সম্ভব।

দুই. সাপ আর ব্যাঙ, বন্ধু কিংবা শত্রুকে একই সঙ্গে চুমু খাওয়ার রেকর্ড একমাত্র আমেরিকার।

তিন. পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সংঘাত ও রাজনৈতিক অচলাবস্থা, জ্বালাও-পোড়াও আর ভাঙচুর অবস্থা কার্যকরী রাখার আমেরিকার যে রেকর্ড তা ভবিষ্যতে আর কেউ ভাঙতে পারবে বলে এই পৃথিবীর মানুষ মনে করে না! আমেরিকা একসময়ে পানামার কুখ্যাত একনায়ক ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে সমর্থন দিয়েছিল আবার এই আমেরিকাই একটি দেশের সার্বভৌমত্বে ন্যূনতম ভদ্রতা না মেনে নরিয়েগাকে ধরে এনে তাদের দেশে বিচারের সম্মুখীন করেছিল। বিশ্ব মানবতা বা ভদ্রতাকে থোড়াই কেয়ার করে এরা, যখন তখন গ্রানাডা, পানামা কিংবা সিরিয়া ইরাকে সৈন্য নামিয়ে হামলা চালাতে পারে। সিআইএ ও আমেরিকার ষড়যন্ত্রে বিশ্বখ্যাত নেতাদের যেভাবে হত্যা করা হয়েছে তা আর কখনও হবে কিনা সন্দেহ আছে। হতে পারে সেটা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কিংবা চিলির আয়েন্দে, কবি লোরকা কিংবা ঘানার প্যাট্রিস লুমুম্বার মতো বিশ্বমাপের নেতা! লিবিয়া আর ইরাককে কার্যত দোযখ বানানোর পর এখন সিরিয়াকে সেদিকে নেওয়ার পাঁয়তারা করছে আমেরিকা।

চার. গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দেবতা আর সব মত ও পথের সহাবস্থানের মোড়ল খ্যাত আমেরিকার পক্ষেই সম্ভব বর্ণবাদের পক্ষে থাকা।দক্ষিণ আফ্রিকা আর রোডেশিয়ায় (বর্তমান জিম্বাবুয়ে) বর্ণবাদ টিকিয়ে রাখতে ইংল্যান্ডের পাশে আমেরিকার শক্ত অবস্থান ছিল। তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সামরিকতন্ত্র টিকিয়ে রাখার একমাত্র গডফাদার হচ্ছে আমেরিকা। হতে পারে সেটা আফ্রিকা কিংবা এশিয়ার কোনও দেশ। বিশ্বজুড়ে আমেরিকা আসলে এমন এক বন্ধু যাকে অন্যরা বন্দুক মনে করে। মানুষের চেয়ে বন্দুক কিংবা বোমা আমেরিকার খুব প্রিয়! আমেরিকা সম্ভবত সে পথেই হাঁটছে। নাহলে ট্রাম্প এভাবে কথা বলবে কেন?

পাঁচ. গণতন্ত্রের কথিত দেবতা আমেরিকার খুব প্রিয় রাজতন্ত্র। অটোম্যান সাম্রাজ্যের পতনের পর মধ্যপ্রাচ্যের অনেকগুলো দেশে রাজতন্ত্র চেপে বসে যাদের একমাত্র গডফাদার আমেরিকা। সৌদি আরব, কাতার, ওমান, জর্ডান কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক চোখে পড়ার মতো। ইসলামি মৌলবাদী অভিযোগে সারা পৃথিবীতে যারা নিন্দার ঝড় কুড়াচ্ছে সেই আইএস (ইসলামিক স্টেট) সৌদি আরব আর কাতারের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধান এবং আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে উঠেছে। আসলে সৌদি আরবের শিয়াবিরোধী মনোভাবের সশস্ত্র বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে আইএস। একারণে লিবিয়া ও ইরাককে আমেরিকা যেভাবে ধ্বংস করতে চেয়েছে, যেমন করে আগ্রাসন চালিয়েছে সিরিয়াতে, তেমন করে আমেরিকা আইএস বিরোধী অভিযান চালাতে চায়নি। যদিও আইএস এর বাহ্যিক বহিঃপ্রকাশ আমেরিকাবিরোধী।

ছয়. আমেরিকার লেবাসটা যত সুন্দর, তারাই শ্রেষ্ঠ বলে তাদের প্রচার প্রপাগান্ডা যতোটা আধুনিক, তাদের সাম্রাজ্যবাদী চরিত্র ততোটাই কলঙ্কিত। পাকিস্তানিরা যেমন এদেশের প্রত্যেক হিন্দুকে শত্রু এবং বিধর্মী বা কাফের মনে করতো আমেরিকাও যখন যাকে শত্রু বা কাফের বানানোর দরকার মনে করে সেটা নিমেষেই বানিয়ে ফেলে! ইরাকের সাদ্দাম হোসেন একদা ফুলে ফেঁপে উঠেছিল আমেরিকার কল্যাণেই! আবার সেই সাদ্দামের জন্যই তারা ইরাক আক্রমণ করে দেশটাকে প্রায় ধ্বংসস্তুপে পরিণত করে ফেলেছে। জাপানিরা পার্ল হারবার আক্রমণ করার পর  ফ্রাংকলিন রুজভেল্ট আমেরিকাতে বসবাসরত জাপানিদের জন্য এক নির্দেশ জারি করেছিলেন। এই নির্দেশ মোতাবেক ১৯৪২ সালে প্রায় সোয়া লাখ জাপানিকে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে ঢোকানো হয়েছিল। গরু মেরে জুতা দানের মতো ১৯৮৮ সালে আটককৃত জাপানিদের কাছে আমেরিকান কংগ্রেস ক্ষমা চায় এবং প্রত্যেককে বিশ হাজার ডলার ক্ষতিপূরণের ঘোষণা দেয়!
সাত. আমেরিকানদের অনেকেই বলে থাকেন অরিজিনাল বা আমেরিকার আদিবাসী বলে কিছু যাদুঘরেও নেই! আমেরিকা থেকে নাকি তাদের আদিবাসীরাই গায়েব হয়ে গেছে। এখন যারা আছে তারা সবাই বসবাসকারী, আমেরিকান নন!
এবার ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথায় আসা যাক। রিপাবলিকান পার্টির সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী এই ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনও মুসলমানকে আমেরিকাতে ঢুকতে দেওয়া হবে না! তিনি আরও ঘোষণা দিয়েছেন—আমেরিকার সব মুসলমানদের নামের তালিকা করতে হবে এবং মসজিদগুলো যেহেতু সন্ত্রাসের আখড়া, প্রয়োজনে মসজিদ বন্ধ করে দেওয়া হবে!

সারা আমেরিকা তথা বিশ্বজুড়ে ট্রাম্পকে নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে। কেউ কেউ তাকে হিটলার কিংবা মুসোলিনির সঙ্গেও তুলনা করেছেন। কেউ কেউ ট্রাম্পের কথাকে আমেরিকার মূল্যবোধ পরিপন্থী বললেও আমেরিকাতে ট্রাম্প এর জনপ্রিয়তা ক্রমশঃ বাড়ছে। কারণ আমেরিকাতে সস্তা স্ট্যান্ডআপ কমিটি খুবই জনপ্রিয়! এই সস্তা অশ্লীল জনপ্রিয়তার ওপর ভর করে ট্রাম্প মনোনয়ন পেয়ে যেতে পারেন। না পেলেও তিনি নাকি স্বতন্ত্র ইলেকশন করবেন। হয়তো তিনি আমেরিকার প্রেসিডেন্টও বনে যেতে পারেন। যে চরিত্র এখন আমেরিকার, যে চরিত্র একজন বারাক ওবামার, নর্থ সাউথের যুদ্ধে জিতে দাসদের মুক্ত করে দিয়ে যে মূল্যবোধের ওপর আমেরিকাকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন আব্রাহাম লিংকন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে ঠিক তার উল্টো পথে হাঁটা শুরু করবে আমেরিকা!

সম্ভবত জঙ্গিবাদের মতো সাম্রাজ্যবাদের শেষ সম্বল হচ্ছে বর্ণবাদ। আমেরিকানরা যেমন ফান করে বলে আদিবাসীরা তাদের দেশের যাদুঘরেও নেই ঠিক তেমনি সেখানে অশ্বেতাঙ্গ অভিবাসী মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। হতে পারে সেটা বাদামি মেক্সিকান কিংবা স্প্যানিশ, আফ্রিকার কালো মানুষ কিংবা এশিয়ান, আরব মুসলমান কিংবা চীন, জাপান বা কোরিয়া থেকে আমেরিকাতে সেটেল্ড হওয়া মানুষ। দুই দশকের ভেতর বর্ণবাদী শ্বেতাঙ্গদের হাত থেকে আমেরিকার ক্ষমতা চলে যাবে অশ্বেতাঙ্গদের হাতে! সেকারণে অশ্বেতাঙ্গ মানুষের ওপর বর্ণবাদী মানসিকতার আমেরিকানদের ভয় আর ঘৃণা বাড়ছে, তাদের নেতৃত্ব দেওয়ার সাহস করছে ট্রাম্পের মতো অশ্লীল স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ান।

ভাবতে অবাক লাগে আমেরিকা এক সময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে স্বাধীনতা পেয়েছিল! এই আমেরিকাতে একদা আব্রাহাম লিংকন নর্থ সাউথের যুদ্ধে জড়িয়েছিলেন, কালো মানুষেরা আব্রাহাম লিংকনের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। এই ঘটনার বহু বছর পর আমেরিকার এক কালোত্তীর্ণ গায়ক বব মার্লে গেয়ে উঠেছিলেন- বাফেলো সোলজার/ ইন দ্য ওয়ার ফর আমেরিকা/ বাফেলো সোলজার/ ইন দ্য হার্ট অব আমেরিকা/ ফাইটিং ইন এ রাইভাল/ ফাইটিং ফর সারভাইভাল!
বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে এই পৃথিবীর বহু সময় গত হয়েছে। নিহত হয়েছেন লাখ লাখ মানুষ। বব মার্লের গানে আছে- ইফ ইউ নো ইউর হিস্ট্রি/ নোবডি হেল্পস ইউ টু থিংক এহেড! যারা আজো মানুষের সঙ্গে আছে, যারা আজো মানুষের কথা বলে, যারা আজো মানুষের জন্য সুন্দর অ্যামেরিকা চায়, যারা বহু ধর্ম আর বর্ণ নির্বিশেষে মুক্ত মানুষের আমেরিকা চায়, সম্ভবত শকুন আর শেয়ালের খাদ্য হবে তাদের হৃদয়!

অন্ধ আর অশ্লীল স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ান ডোনাল্ড ট্রাম্প আজকাল বেশি বেশি দেখবে এটাই স্বাভাবিক। সুন্দরী প্রতিযোগিতার পৃষ্ঠপোষকতা করে, প্রতি বছর গার্লফ্রেন্ড কিংবা স্ত্রী বদলে ফেলার পরেও ট্রাম্প এর জনপ্রিয়তায় কোনও ভাটা পড়বে না। সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির বড় নিয়ামক ক্যাসিনো আর ডেভলভিং ব্যবসায় ট্রাম্প তার ব্র্যান্ড নামটা আরও বেশি প্রতিষ্ঠিত করে ফেলবে। বর্ণবাদী আমেরিকার তাতে কিছু যাবে আসবে না।
আমেরিকার এক বিখ্যাত লেখকের মন্তব্য দিয়ে লেখাটা শেষ করা যাক। এই লেখকের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, ট্রাম্প এর ব্যাপারে তিনি কোনও প্রতিক্রিয়া জানাবেন কিনা। লেখক উত্তর দিয়েছিলেন, এর চেয়ে আমার পোষা কুকুরটা নিয়ে সময় কাটানো অনেক ভালো!

লেখক: রম্যলেখক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ