মুক্তিযুদ্ধে নারীর ইতিহাস কেবলই নির্যাতনের!

Send
উদিসা ইসলাম
প্রকাশিত : ২৩:০০, ডিসেম্বর ১৫, ২০১৫ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:০২, ডিসেম্বর ১৫, ২০১৫

Udisa Islamমুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে নারীর অবদান বলতে মোটা দাগে যে বিষয়টির দিকে নজর দেওয়া হয় তাহলো, ২ লাখ নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। আর তার আগেই ৩০লাখ শহীদকে স্মরণ করি আমরা। মানে নারীর অবদানে সবার আগে আসে তার প্রতি যে নির্যাতন, তারা সহ্য করতে বাধ্য হয়েছেন, সেই বিষয়টি। কিন্তু অনেকক্ষেত্রে এই নির্যাতন সহ্য সে রাজনৈতিক কারণেও হয়েছে, যেন তার ঘরের মানুষ নির্যাতনের শিকার না হয়, সেই দিকটা বিবেচনায় নেওয়া হয় না।

আর এই নির্যাতনের ইতিহাসের পেছনে নারীর যে ইমেজ দাঁড়ায়, তা তার মুক্তিযোদ্ধার ইমেজকে এতটাই ঢেকে ফেলে যে, ৪৪বছর লাগে সেটা পুনরুদ্ধার করতে। সম্প্রতি বীরাঙ্গনাদের মুক্তিযুদ্ধের সম্মান দেওয়া হয়েছে। এর আগে নির্যাতনের শিকার নারী মানেই তার পরিচয় ছিল বীরাঙ্গনা, কিন্তু সেটা বীরের সমান মর্যাদার নয়।

`ইস্ট পাকিস্তান: দ্য অ্যান্ড গেম’ বইটিতে লেখক ব্রিগেডিয়ার সিদ্দিকী লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির আব্দুল্লাহ খান নিয়াজির একটি বিতর্কিত উক্তি ফাঁস করেন। যেখানে একাত্তরে সংঘটিত ধর্ষণের ঘটনাগুলোর সাফাই গাইতে জেনারেল নিয়াজি উচ্চারণ করেছিলেন পৃথিবীর জঘন্যতম কয়েকটি লাইন, ‘আপনি এ রূপ আশা করতে পারেন না যে, সৈন্যরা থাকবে, যুদ্ধ করবে এবং মুত্যু বরণ করবে পূর্ব পাকিস্তানে, আর যৌন চাহিদা নিবারণ করতে যাবে ঝিলামে (ঝিলাম পাঞ্জাব প্রদেশের সর্ববৃহৎ নদ)। আর পুরো যুদ্ধজুড়েই নারীর প্রতি এ ধরনের ইঙ্গিত এবং যুদ্ধপরবর্তী সময়ে সেটাকেই একমাত্র ভোগান্তি হিসেবে সামনে আনা হলে, নারীর বীরত্ব মুছে যায় ‘লাঞ্ছনা’ ঢাকতে গিয়ে।

গবেষক ব্রাউনমিলার যখন বলেন, একাত্তরের ধর্ষণ নিছক সৌন্দর্যবোধে প্রলুব্ধ হওয়া কোনও ঘটনা ছিল না। পাকসেনারা কেবল ঘটনাস্থলে তাদের পৈশাচিকতা দেখিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, প্রতি একশ জনের মধ্যে অন্তত দশ জনকে ক্যাম্প বা ব্যারাকে নিয়ে যেত সৈন্যদের জন্য। রাতে চলত আরেক দফা নারকীয়তা।  এ সব বিবরণ আমাদের ব্যথিত করেছে কিন্তু আমাদের মনে হয়নি এই আঘাত বুলেটের আঘাতে আহত মুক্তিযোদ্ধার মতোই আঘাত। এতে সেই নারীকে এমন কোনও তকমা দেওয়া ঠিক হবে না, যা আগামী দিনে তাকে সমাজে মাথা উঁচু করে থাকতে দেবে না।  ৪৪বছর পর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেটাই প্রমাণিত হয়েছে। বীরাঙ্গনাদের একটি বড় অংশ পরিচয় গোপন করেছেন, কেউ দেশত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন,  কেউ মানবেতর জীবনযাপন করলেও আর কোনওদিনই পরিবারের মুখোমুখি হতে পারেননি।

সম্প্রতি একাধিক বীরাঙ্গনার মুখোমুখি হয়ে, কথা বলে, তাদের যাপিতজীবন এর কথা শুনে মনে হয়নি, তারা কেউ এই পরিচয় স্বস্তিতে ধারণ করতে পেরেছেন। তাদেরই একজন শেফালি। যিনি বলেন, আমাকে বাঙ্কার থেকে বের করার পরপরই আমি এই সমাজের বাইরের মেয়ে। এজন্য যে নামেই ডাকেন আমার জীবনে পরিবর্তন আসবে না। ৪৪ বছর আগে রাজাকার শয়তানেরা আমাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। তাতে আমার যে ক্ষতি আর ৪৪বছর পর যদি কেউ একদিনে মুক্তিযোদ্ধা বানাতে চান, তাতেও আমার লাভ হবে না।  ফলে আমি এসব নিয়ে ভাবতে চাই না। আমরা দেশের জন্য কিছু একটা করতে চেয়েছি। কিছু না করতে পেরে শরীরের ওপর দিয়েই নির্যাতন সহে গেছি। আর এখন কেউ দেশ নিয়ে ভাবে না।

মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের (বর্তমানে ছাত্রশিবির) রংপুর জেলা কমিটির সভাপতি,  কুখ্যাত আল-বদর বাহিনীর রংপুর শাখার কমান্ডার এটিএম আজহারুল ইসলাম ৭০ জনের একটি সশস্ত্র আল-বদর স্কোয়াডের নেতৃত্ব দিতেন। সেই স্কোয়াডের ঘাঁটি ছিল রংপুরের টাউন হল এলাকায়। আজহারুল এবং তার সহযোগীরা পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তাদের চাহিদার কথা মাথায় রেখে ভয়-ভীতি দেখিয়ে এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের নারীদের নিয়ে যেতেন টাউন হল গণ নির্যাতন কেন্দ্রে। সেখানকার বর্ণনা পাওয়া যায় মালতির কাছ থেকে যিনি ২১দিন ছিলেন সেখানে। অসীম ধৈর্য নিয়ে রাজাকারদের মজিয়ে রাখতেন, যেন কমবয়সী মেয়েদের প্রতি অত্যাচারের মাত্রা কম হয়। তিনি বলেন, এই নৃশংসতা দেখে যে কেউ স্তম্ভিত হয়ে যাবেন। রাতভর মেয়েরা কাঁদত কিন্তু শব্দ হওয়া যাবে না। সেই গুমরে ওঠা কান্নার শব্দ আজও ভুলিনি। তিনি বলেন, কেউ আমাদের বিন্দুমাত্র সম্মান দিয়েছেন বলে আমি বিশ্বাস করি না। ঘরে গেছি, হিন্দু বাবা-মা চলে গেছে ভারতে। স্বামী ঘেন্নায় মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। সমাজ অচ্ছুত বলে এলাকাচ্যুত করেছে।

মালতির কষ্ট একা তার নয়। বীরাঙ্গনাদের মূল অভিযোগ তাদের দেওয়া এই খেতাবটি। তাদের বক্তব্য থেকে পাওয়া অভিমত হলো, যখন একজনকে দেখিয়ে বলা হচ্ছে, এই-এই কারণে তিনি বীরাঙ্গনা, তখন সেই কারণগুলো ধারণে এ সমাজ প্রস্তুত কিনা, তাতো জানতে হবে।

স্বাধীনতার ৪৪বছর পর এসে যখন তাদের মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য মুক্তিযোদ্ধা বলা হচ্ছে তখন আসলেই কি তারা ফিরে যেতে পারবেন আগের জায়গায়?

মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদানকে কখনও স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। যেটা দেওয়া হয়েছে, সেটা আসলে সম্মানিত করতে পারেনি নারীদের। কারণ কেবল নির্যাতনের কথাটাই বারবার উঠে  এসেছে। কিন্তু যে নারী ইনফর্মার হিসেবে কাজ করেছেন, যে নারী এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের পথ দেখিয়ে দিয়েছেন হারিকেনটা আঁচলে লুকিয়ে, যে নারী অতি কষ্টে সুগন্ধ যেন না ছড়ায়, সেই রিস্ক নিয়ে ভালো তরকারি দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের এক বেলা খাইয়েছেন, তাদের আপনি কী বলবেন? তারা কেন মুক্তিযোদ্ধা নন। এছাড়া  শরণার্থী শিবিরে নারীরা চিকিৎসা দিয়েছেন, নারীরা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের রাজনৈতিক প্রথম পাঠ দিয়েছেন সম্মুখ সমরের উপযোগী করে গড়ে তুলতে।

শব্দের নিজস্ব কোনও অর্থ নেই। আমরা শব্দের ওপর অর্থ আরোপ করি। আর যে কারণে মুক্তিযোদ্ধার মানে দাঁড়িয়েছে, সেই সব পুরুষ, যারা  দেশের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করেছেন। আর বীরাঙ্গনার মানে দাঁড়িয়েছে সেই সব নারী,  যারা ক্যাম্পে বা বাইরে ধর্ষণ ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। বীরাঙ্গনা শব্দটি নারী মুক্তিযোদ্ধাদের চিহ্নিত  করার ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হতে পারত। কিন্তু যখন একটা সংজ্ঞায়ন সম্পন্ন হয়েছে, তখন নারীরা সমাজে আরেক ধরনের অত্যাচারের মুখোমুখি হতে বাধ্য হয়েছেন। ব্যক্তি যে নামে চিহ্নিত হলে তার সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা জন্মাবে, সে কেন চাইবে ওই নামে পরিচিত হতে? ফলে অনেকেই চাননি। এ না-চাওয়াকেও সম্মান দেখানো আমাদের দায়িত্ব।

লেখক: সাংবাদিক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ