আমাদের একটি দেশ আছে

Send
মাসুদা ভাট্টি
প্রকাশিত : ১২:৩৬, ডিসেম্বর ১৬, ২০১৫ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৩২, জানুয়ারি ২৩, ২০১৬

Masuda-Vatti-Cইতিহাস তার নিজের গরজেই সামনে এগুনোর পথ করে নেয়। এই এগুনোর পথে তুচ্ছাতিতুচ্ছ ঘটনাও ইতিহাসের চোখ এড়ায় না, কোথাও না কোথাও ঠিক সেটা গ্রন্থিত হয়ে থাকে। এই বছর পাঁচেক আগেও আমরা ভাবতে পারিনি যে, বাংলাদেশে এমন একটি বিজয় দিবস একদিন আসবে- যেদিন এ দেশের শত্রু এবং মিত্র দু’পক্ষই চিহ্নিত হয়ে যাবে। দেশের মুক্তিকামী সাধারণ মানুষ সেই বিজয় দিবসে কোনওরকম দ্বিধা ছাড়াই বলতে পারবে যে, এই মুক্তি আমার, এই স্বাধীনতা আমার, এই দেশ আমার।

একাত্তরের ৯ মাস যারা দেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন, যেসব নারী পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে ধর্ষিত হয়েছেন, যারা উদ্বাস্তু হয়ে অন্য দেশে আশ্রয় নিয়েছেন, দেশের ভেতরে যারা অবরুদ্ধ জীবনযাপন করেছেন, হাতের মুঠোয় প্রাণ নিয়ে তারা নিশ্চয়ই তখন প্রতিমুহূর্তে ভেবেছেন- কবে আসবে স্বাধীনতা? কবে পাওয়া যাবে মুক্তি, একটি স্বাধীন দেশ। যারা বলেন, ৯ মাস খুব কম সময় একটি দেশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য তারা আসলে ভুলে যান যে, ৯ মাস আসলে ৯ কোটি বছর, কারণ সেই অবরুদ্ধ জীবনে সমস্ত আকাঙ্ক্ষা এই একটি শব্দের কাছে গিয়ে জড়ো হয়েছিল। তারপর যখন ’৭৫ এলো তার হন্তারক চেহারাটি নিয়ে তখন থেকে মানুষ আসলে ভুলেই গিয়েছিল, স্বাধীনতা শব্দটি আসলে কি? কিংবা মুক্তি কিসে আসে? কারণ এর পরবর্তী ইতিহাস আসলে স্বাধীনতাবিরোধীদের উল্লাসের ইতিহাস, বাড়াবাড়ির ইতিহাস, মুক্তিযোদ্ধাদের লাত্থি খাওয়ার ইতিহাস, রাজাকারদের মন্ত্রী হওয়ার ইতিহাস এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপরীতমুখী ধারার দেশ ও রাজনীতি পরিচালনার ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধকে ইতিহাসের এই কালো বোরকা থেকে মুক্ত করার যে অধ্যায়ের কথা শুরুতেই বলেছি তা আমাদের জীবদ্দশায় হবে সেটা যেমন আমরা বিশ্বাস করতে পারছি না তেমনই এই দ্বিতীয় বিজয়কে আমরা ধারণই বা করতে পারছি ক’জনে?

বিশ্বময় যখন বাংলাদেশের অভাবনীয় উন্নয়ন এবং এগিয়ে যাওয়া নতুনতর বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে তখন আমরা দেশের ভেতর কি নিয়ে নিন্দা-মন্দের রাজনীতি করছি? প্রথমত, আমরা ক্রমাগত আঘাত হানছি এই উন্নয়ন প্রক্রিয়ায়। শুধু তাই নয়, আমাদেরে অনেকের রাজনীতি সচেতনভাবেই আঘাত হানছে সেই পক্ষটিকে যারা জীবন, স্বার্থ এবং রাজনীতিকে পুরোপুরি বাজি রেখে বাংলাদেশকে স্বাধীনতাবিরোধীদের হাত থেকে মুক্ত করতে চাইছে। একসময় আমাদের অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকই বলেছেন যে, বাংলাদেশকে স্বাধীনতার পক্ষ ও বিপক্ষে ভাগ করে ফেলা হয়েছে। এখনতো এটা নিশ্চিত যে, আসলে এই বিভাজনটা সত্যিই জরুরি ছিল। কারণ যখন নিদানকাল উপস্থিত হয় তখন এই পক্ষ ও বিপক্ষই আমাদের বুঝিয়ে দেয় যে, আসলে কে বাংলাদেশের ভালো চায় আর কে চায় না। এই পক্ষ ও বিপক্ষ চিহ্নিত না হলে আমাদের পক্ষে সামনে এগুনোটা কত দুরূহ হতো সেটা একবার ভেবে দেখার অনুরোধ জানাই সকলকে।

৪৪তম বিজয় দিবসের দিনে দাঁড়িয়ে একবার চোখ বন্ধ করে ভেবে দেখুনতো, যে বাংলাদেশে আপনি দাঁড়িয়ে আছেন ১৯৭১ সালে যদি দেশটা স্বাধীন না হতো, তাহলে ব্যাপারটা কেমন হতো? আচ্ছা ঠিক আছে অতোটা নেতিবাচক চিন্তা আপনাকে করতে হবে না, একবার ভাবুনতো, এখনও এ দেশের ক্ষমতা স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার, আল-বদর ও তাদের ‘স্ট্র্যাটিজিক অ্যালায়েন্স’-এর সমন্বয়ে গঠিত জোটের হাতে। ভাবুন, ব্যক্তি হিসেবে আপনি মুক্তিযুদ্ধ, বাঙালিত্ব এবং অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে বিশ্বাসী হয়েও এই স্বাধীনতাবিরোধীদের রাজত্বে স্বাধীনতার সুখ, মুক্তির উল্লাস কতটা উপভোগ করতে পারতেন? গত সাতবছর ধরে যদি এই পক্ষটি ক্ষমতায় থাকতো তাহলে আজকের বাংলাদেশকে আপনি চিনতে পারতেন কি? মুক্তিযুদ্ধ যেমন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ছাড়া আমরা ভাবতে পারি না, স্বাধীনতার জন্য যেমন আমাদের তাঁর কাছে নত হতে হয়ে দাঁড়াতে হয় তেমনই আজকে দেশকে শত্রু-মিত্র চেনানোর জন্য তার কন্যা শেখ হাসিনার প্রাপ্য প্রশংসাটুকু আমাদের দিতেই হবে। আমি নিশ্চিত, এখানে এসে অনেকেই মনে মনে লেখককে ‘আওয়ামী লীগের দালাল’ হিসেবে কষে গালাগাল দিচ্ছেন। অথচ, নিজের ভেতরেই আপনার বোঝার কথা যে, আমার বলা কথাটি আসলে কতখানি সত্য।

বাংলাদেশকে নিয়ে, বাংলাদেশের ভবিষ্যতকে নিয়ে ভাবতে হলে এই সত্যকে মাথায় রেখেই ভাবতে হবে, এই সত্যকে এড়িয়ে ভাবতে গেলেই বিপত্তি বাধবে। কেন বাধবে তা বিস্তারিত আরেকদিন আলোচনা করব, আজ শুধু এ কথাটিই বলতে চাই যে, বাংলাদেশের শত্রু ছাড়া কারও পক্ষে এই সত্যকে অস্বীকার করার উপায় নেই।

১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বর আমরা কেবল স্বাধীন বাংলাদেশকেই পাইনি, সেই সঙ্গে বাঙালি জাতির ওপর অর্পিত হয়েছিল একটি মহান দায় ও দায়িত্বও। এখন আসুন, নিজেকে প্রশ্ন করে দেখি আমরা, সেই দায় ও দায়িত্ব আমরা কতটুকু পালন করেছি? দেখুন, ব্যক্তিগত অর্জন এক সময় সমষ্টির হয়ে দাঁড়ায়, যেমনটি হয় ব্যক্তিগত লোকসান সমষ্টির ক্ষতির কারণ। বাকীদের কথা বলব না, আমাদের মতো যারা আশির দশকে বড় হয়েছেন তারা এখন চল্লিশ পেরুচ্ছেন, বাংলাদেশের বয়সের প্রায় সমান তাদের বয়স। একটি সশস্ত্র যুদ্ধের ভেতর দিয়ে যে দেশেরই জন্ম হোক না কেন, ইতিহাস বলে সেসব দেশের প্রথম পাঁচ দশক বহু রকমের নেতিবাচক ঘটনার ভেতর দিয়েই কাটে। বিশেষ করে, অস্ত্র হাতে যুদ্ধ যারা করেছেন তাদের অনেকেই ব্যক্তিগত লাভের বিষয়টি নিয়ে ভাবতে ভাবতে এক সময় আবিষ্কার করেন যে, দেশের জন্য জীবন বাজি রাখলেও দেশ তাকে কী দিয়েছে? কিন্তু বাংলাদেশে কেবল এই অপ্রাপ্তিই ডালপালা মেলেনি বরং একটু আগেই যেকথা বলছিলাম, এদেশে স্বাধীনতাবিরোধী ধারাটি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বেড়েছে তীব্রভাবে। তাদের দৌরাত্মে পুরো আশির দশক, আমাদের শিশুকাল, বুদ্ধির ব্যাপ্তিকাল ভয়াবহভাবে আহত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ আর বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে কোনওভাবেই আমাদের ভেতরে শেকড় গাড়তে দেওয়া হয়নি।

পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পনের স্থানটি গভীর গর্ত করে মুছে ফেলা হয়েছিল। আমরা জানতে পারিনি, ভারতের মতো বন্ধু রাষ্ট্রের অবদানের কথা। এই সামান্য উদাহরণে আমাদের এই অজ্ঞ করে রাখার প্রক্রিয়ার গভীরতা বোঝানো সম্ভব নয়, আমার মতো যারা সেই সময়ে বড় হয়েছেন তারাই কেবল জানেন একটি জাতির সেই আত্মহননের ইতিহাসের খবর। কিন্তু দুঃখজনক সত্যি হচ্ছে আজও সেই ধারাবাহিকতা থেকে আমাদের মুক্তি ঘটেনি। এখনও দেশের নামকরা বিদ্যায়তনের শিক্ষকদের কেউ কেউ ছেলেমেয়েদের বলেন, ১৯৭১ আসলে ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধ, ভারত ষড়যন্ত্র করে পাকিস্তান ভেঙে দুই টুকরো করে দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে এই ঘটনাটি যিনি বলেছেন, তিনি ভয়ে ভয়ে বলতে চেয়েছেন যে, এই বিখ্যাত মেয়ে-স্কুলটির শিক্ষিকার বিরুদ্ধে তিনি কোনও ব্যবস্থা নিতে পারছেন না কারণ তাতে যদি তার মেয়েকে এই শিক্ষক ফেল করিয়ে দেন? আসুন, একবার ভেবে দেখি, কোনটা জরুরি? ভুল শিক্ষা পেয়ে মেয়ের বেড়ে ওঠা? জাতি-ইতিহাসের ভুল পাঠ? নাকি সামান্য মার্কের চিন্তা না করে এর তীব্র প্রতিবাদ জানানো? উদাহরণটি ছোট হলেও, এই চিন্তাকেই যদি আমরা বিস্তৃত করি তাহলে ব্যক্তির অবস্থান থেকে সমষ্টিকে বিচার করা সম্ভব, ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই অবস্থানকেই আমরা এভাবে ভেবেচিন্তে বের করতে পারি।

মাত্র ৪৪ বছরের মাথায় বাংলাদেশের এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবনে যে অভাবনীয় পরিবর্তনটি এসেছে তা শুধু সম্ভব হয়েছে একটি বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ বলেই। এবং তার সঙ্গে এ কথাটিও সত্য যে, স্বাধীন দেশকে স্বাধীনতার পক্ষে টিকিয়ে রাখার কাজটিও এ দেশেই হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির আপোসহীনতার কারণেই। আগেই বলেছি যে, আমরা চাইলেই নিন্দার ঝাঁপি খুলে বসতে পারি, গণতন্ত্র নেই বা গেলো গেলো বলে গলা শুকাতে পারি, পারি বাম-রাজনীতির সম্পূর্ণ রঙিন চিন্তা-চেতনা থেকে শেখ মুজিব বিদ্বেষী হতে এবং সেইসঙ্গে শেখ হাসিনার চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করতে। সমালোচনা থাকতেই পারে এবং থাকাট জরুরিও, কিন্তু সেটা অযৌক্তিক বিদ্বেষে গড়ালে তা কেবল আমাদের কুচুটে চরিত্রকেই ঔজ্জ্বল্য দেয়, কাজের কাজ কিছু হয় না। আসলে সবার আগে আমাদের উপলব্ধিতে আসা জরুরি যে, আমরা একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ এবং তারপর আমাদের চেতনায় এই কথাটিকে স্থান করে দেওয়া উচিত যে, এ দেশের স্বার্থবিরোধী, স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার, আল-বদর ও তাদের রাজনৈতিক দোসররা বিস্মৃয়মান হতে হতে তারা এখন মরীয়া হয়ে দেশের ক্ষতি করতে চাইছে। এবার তারা সফল হলে বাংলাদেশের অবস্থা সিরিয়া কিংবা আফগানিস্তান হওয়াটা ঠেকানো যাবে না। সাকা চৌধুরী বা মুজাহিদের ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পরে তাদের পরিবারের সদস্যদের যে মনস্তাত্তিক অবস্থান আমরা কয়েকদিন ধরে টেলিভিশনে দেখেছি, পত্রিকায় পড়েছি তার সঙ্গে যারা সহমত পোষণ করেন তাদের সংখ্যা যে কম নয় তাও এই বিজয় দিবসে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে আমাকে। এবারের বিজয় দিবসে আসলে আমাদের কর্মসূচি হওয়া উচিত দেশের ভেতরে এই মনস্তত্তে বিশ্বাসীদের মানসিক বিকার দূর করার কাজে হাত দেওয়া। সে জন্য একেবারে শুরু থেকেই শুরু করতে হবে। এই দায় কেবল রাষ্ট্র, সরকার বা আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনার একার নয়, এ দায় আপনার, আমার, আমাদের সকলের।

শেষ করার আগে বলতে চাই যে, ইউরোপে সিরিয়া তথা মধ্যপ্রাচ্য থেকে হাজার হাজার শরণার্থী এসে জড়ো হয়েছে। তাদের জীবন যে কতটা মানবেতর সে কথা উল্লেখের অপেক্ষা রাখে না। ইউরোপের চক্ষুলজ্জা সত্ত্বেও তাদের জীবনের দুর্দশা বর্ণনারও অতীত। তাদের অনেকেই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম কিংবা গণমাধ্যমে প্রায়ই বলেন যে, তারা কিংবা তাদের দেশের রাজনৈতিক শক্তিগুলো বুঝতেই পারেনি যে, তাদের একটি স্বাধীন দেশ ছিল। নিজেদের স্বার্থ ও রাজনৈতিক উচ্চাভিলাসের বলি দিয়ে সেসব স্বাধীন সার্বভৌম দেশগুলোকে তারা নরকে পরিণত করেছেন এবং লাখ লাখ মানুষকে বানিয়েছেন শরণার্থী। আজকে ২০১৫ সালের বিজয় দিবসের দিনে দাঁড়িয়ে একজন ক্ষুদ্র লেখক হিসেবে এ কথা আমার পাঠককে বলতে চাই যে- আসুন, আমরা আবারও গর্বিত হই, গর্বভরে বলি, আমাদের একটি দেশ আছে, একটি স্বাধীন, সার্বভৌম দেশ, বাংলাদেশ। এই দেশকে রক্ষা করার দায় ও দায়িত্ব আর কারো নয়, আপনার, আমার, আমাদের।

সবাইকে বিজয় দিবসের লাল-সবুজ শুভেচ্ছা।

লেখক: কবি ও কলামিস্ট।

ইমেইল: masuda.bhatti@gmail.com

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ