behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

উদ্দীপনাও মূলধনের মতো

আনিস আলমগীর১২:১৩, ডিসেম্বর ১৯, ২০১৫

Anis Alamgirবিশ্বব্যাংকের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. কৌশিক বসু ১৩ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বাংলাদেশ ব্যাংক আয়োজিত গণবক্তৃতায় বক্তব্য রেখেছেন। বাংলাদেশের মানুষের জন্য ড. কৌশিক বসুর বক্তব্যটা খুবই উদ্দীপনাময়। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ হতে পারে এশিয়ান টাইগার। বাংলাদেশের জিডিপি চলতি বছরে হবে ৬.৫ শতাংশ, আগামী বছর এটি হবে ৬.৭ শতাংশ। এটা প্রায় চীনের কাছাকাছি ।

এমন খবর শুনলে কোন দেশপ্রেমিক বাঙালির হৃদয় নেচে উঠবে না। সত্যি বাংলাদেশ ব্যাংক এ গণবক্তৃতামালার আয়োজন করে একটা উত্তম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। কারণ অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটা বাস্তবচিত্র হয়তো আমাদের অনেক অর্থনীতিবিদই জানেন, কিন্তু ড. কৌশিক বসুর মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তির মুখ থেকে শুনলে নিশ্চয়ই জাতির উদ্দীপনা বেড়ে যাবে।

জেদি উদ্দীপনাও মূলধনের মতো। ড. কৌশিক বসুর প্রশংসা শূন্যগর্ভ হতে পারে না সে কারণে। আমরা সাধারণ মানুষেরা অর্থনীতির কঠিন তত্ত্ব না বুঝলেও উন্নয়নের বিষয়টা অনুভব করতে পারি। একসময় বাংলাদেশের জন্য দাতাদেশ ও এজেন্সিগুলোর একটা এইড-কনসোটিয়াম ছিল। বাজেট প্রণয়নের আগে তারা প্যারিসে মিটিং এ বসতেন। আমাদের অর্থমন্ত্রীও প্যারিসে যেতেন। অনেক নিধানপত্র দেওয়ার পর দাতারা আমাদের অর্থমন্ত্রীকে বলতেন তোমাদেরকে এ টাকা দেওয়া হবে। আর আমাদের অর্থমন্ত্রী করজোড় মিনতি করে কিছু বাড়ানো যায় কিনা তার চেষ্টা করতেন। এখন এইড-কনসোটিয়াম আর নেই, আমাদের অর্থমন্ত্রীও বাজেট দেওয়ার পূর্বে আর প্যারিসে যান না।

এই অর্থবছরে (২০১৫-২০১৬) আমাদের অর্থমন্ত্রী বাজেট দিয়েছেন দুই লাখ কোটি টাকার। ক’দিন আগে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সাহেব বলেছেন, আগামী অর্থবছরের বাজেট নাকি হবে তিন লাখ কোটি টাকার। নিশ্চয়ই উন্নয়ন হয়েছে, না হলে এইড-কনসোটিয়ামে যে ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে যেতাম তা ফেলে দিলাম কেন? আগে আমরা সাহায্যের জন্য প্রার্থী হতাম, দাতাদের দুয়ারে দুয়ারে যেতাম, এখন দাতারা আমাদের কাছে আসে সম্মানের সঙ্গে জিজ্ঞেস করে টাকা পয়সার প্রয়োজন আছে কিনা?

ড. কৌশিক বসু বলেছেন, পদ্মা সেতুর কাজ শুরু করে বাংলাদেশ তার সক্ষমতার প্রমাণ রেখেছে। পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংক ১২০ কোটি ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। যথাসময়ে চুক্তিও হয়েছিল। কিন্তু যখন বিশ্বব্যাংক বললো- ‘পদ্মা সেতুতে দুর্নীতি হচ্ছে, আমরা অর্থপ্রদান বন্ধ করে দেব।’ তখন আমাদের প্রধানমন্ত্রী বললেন- যেখানে কোনও টাকাই এখনও দেওয়া হয়নি সেখানে দুর্নীতি হলো কীভাবে? তখন তারা বললেন- ‘দুর্নীতির পরিকল্পনা হয়েছে।’ আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন- বিশ্বব্যাংক-এর টাকার প্রয়োজন নেই। আমরা আমাদের নিজস্ব অর্থায়নে এই সেতু করবো। এখন ২৯ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের সেতুটির কাজ চলছে। ২০১৮ সালে, আল্লাহ চাহেতো সেতুর কাজ শেষ হলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ঊর্ধ্বকাশে উঠবে।

কৌশিক বসু ধনবাদী অর্থনীতিবিদ। তিনি ‘উড়ন্ত অর্থনীতি’র স্তরে বাংলাদেশের অবস্থানের কথা বলেছেন। এটি উন্নয়নে ধনবাদী অর্থনীতির দ্বিতীয় স্তর ভেদ করার পর্যায়ের স্তর। আশাব্যঞ্জক কথা। বসু সাহেব উন্নয়নের অব্যাহত গতি নিশ্চিত করার জন্য কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। বসু একজন প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ, যার রয়েছে বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। সূতরাং তার পরামর্শগুলো বিবেচনায় এনে কার্যকরণের ব্যবস্থা নিতে হবে।

জনাব বসু বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন। বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হলে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, আর ব্যবসায়িক নৈতিকতা অপরিহার্য। বিদ্যুৎ আর গ্যাস এর নিশ্চিত ব্যবস্থাও প্রয়োজন। না হয় বিনিয়োগ কারও জন্য অপেক্ষা করবে না, অন্যত্র চলে যাবে। শিল্পায়ন ও স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধির জন্য বিদ্যুৎ ও গ্যাস অপরিহার্য হয়ে দেখা দিয়েছে। সুতরাং এই দুই খাতে বিশেষ নজর প্রদান করতে হবে। দুর্বল অবকাঠামো এবং ধীর গতির আমলাতন্ত্রকে এখানকার উন্নয়নের প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন ড. কৌশিক বসুও।

সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকে উৎসাহিত করলে ডোমেস্টিক প্রয়োজন মিটানো সম্ভব। অভ্যন্তরীণ প্রয়োজনেও হাজার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দরকার। আর ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে কনসোটিয়াম করে ভুটান ও নেপালে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনেরও ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। নেপাল ও ভুটান জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎস রয়েছে। এ দুটি দেশ জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে তাদের উৎসাহের কথা জানিয়েছে অনেকবার। বিনিয়োগের পরিবেশ নিশ্চিত করতে যেসব অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন তা দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি বলেছে- ২০১৩ সালে বাংলাদেশ থেকে ৭৬ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে। অথচ বিনিয়োগের অবকাঠামোগত সাপোর্ট ফেলে উদ্বৃত্ত পুঁজির মালিকরা টাকা পাচার না করে বিনিয়োগে উৎসাহিত হতো। বাংলাদেশের শিল্প উদ্যোগতারা বার বার বলেছেন যে, তারা গ্যাস ও বিদ্যুতের নিশ্চিত ব্যবস্থা পেলে আরও বহুশিল্প গড়ে তুলবেন।

আমাদের শিল্প উদ্যোগতারা খুবই সিরিয়াস লোক। ২০১৪ সালে খালেদা জিয়ার জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলনের সময় দেখেছি তারা তাদের উৎপাদনও অব্যাহত রেখেছিলেন আবার লোডকরা ট্রাক মিলিটারি প্রহরায় চট্টগ্রাম বন্দরে নিয়ে রফতানিও নিশ্চিত করেছিলেন। দেশপ্রেমহীন রাজনীতিবিদদের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডকে তারা ব্যর্থ করে দিয়েছিলেন। আমার মনে হয় পানগাঁও যে কন্টেইনার বন্দর স্থাপন করা হয়েছে তাকে আরও উন্নত ও আরও প্রযুক্তিপূর্ণ করে রাখা দরকার যেন প্রয়োজনে ঢাকা ও ঢাকার আশপাশের শিল্প কারখানার এক্সপোর্ট ও ইমপোর্ট যেকোনও দুর্যোগে নিশ্চিত রাখা যায়। কেন না বেগম জিয়ার মন্ত্রী মেজর হাফিজ উদ্দীন ২০১৪ সালে তাদের জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলনের সময় বলেছিলেন ‘বার্ষিক পরীক্ষা’ দুই মাস পরে হলে অসুবিধা কি? আবার তারা কোনওদিন বলে বসবে- এক্সপোর্ট দুই মাস পরে হলে অসুবিধা কি?

কৌশিক বসু বৈষম্য প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন- অর্থনৈতিক বৈষম্য কমাতে হলে ধনীদের ওপর যথাযথ কর আরোপ করতে হবে এবং যথাযথভাবে তা সংগ্রহ করে দরিদ্রদের স্বাস্থ্যের জন্য, শিক্ষার জন্য, ব্যয় করতে হবে। বেশি বৈষম্য কোনওকালে কোনও সমাজকে স্থির রাখে না। পুঁজির এক তরফা কেন্দ্রীয়করণ নাগরিক সমাজকে অনেক সময় বিক্ষুব্দ করে তুলে। সুতরাং পুঁজির সঙ্গে নাগরিক সমাজের ওয়েলফেয়ার সম্পর্কে এক অলিখিত চুক্তি থাকবে যা দৃঢ়ভাবে বাস্তবায়িত করবে সরকার। তাতে সামাজিক নিরাপত্তাও নিশ্চিত হবে সমাজে রাজনৈতিক অস্থিরতাও থাকবে না।

লেখক: সাংবাদিক ও শিক্ষক

anisalamgir@gmail.com

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ