behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

মোদির দুর্দিন

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী১৩:৩২, ডিসেম্বর ২২, ২০১৫

Bakhtiar Uddin Chowdhuryবড় দেশ ভারত। এটা স্রেফ দেশ নয়। এটা উপমহাদেশ। সহিষ্ণুতার সংকট হলে প্রলয় ঘটে এখানে। হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান, শিখ, পারসিকসহ অসংখ্য ধর্ম বিশ্বাসীদের আবাসস্থল ভারত। এ কারণেই বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের কথা বলতেন জাতীয় নেতৃবৃন্দরা। জাতিকে তারা সহিষ্ণুতার সবক দিয়েছেন বার বার। অসহিষ্ণুতা এখানে সংকট তৈরি করে বড় আকারে। ভারতে অসহিষ্ণুতার বিষ ছড়ায় সংঘ পরিবার। রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ, বজরং দল, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, হিন্দু মহাসভা, শিবসেনা এরাই হচ্ছে সংঘ পরিবারের সদস্য। ভারতীয় জনতা পার্টি এদের রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম।

গত লোকসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পাটি সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেয়ে সরকার গঠন করেছে। নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী। নরেন্দ্র মোদি আগে গুজরাট রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। নরেন্দ্র মোদি আরএসএস-এর ক্যাডার ছিলেন কিশোর বয়স থেকে। ২০০১ সালে নরেন্দ্র মোদি যখন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন তখন এক ভয়াবহ দাঙ্গা হয়। আর ওই দাঙ্গায় দুই হাজার মুসলমান প্রাণ হারায়। নরেন্দ্র মোদি আর জনতা পাটির সভাপতি অমিত শাহা এখনও ওই মামলার আসামি।

গত লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি ৩০% ভোট পেলেও এককভাবে বিজেপি ২৮৪ সিট পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিলো। এবার বিজেপি ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে সংঘ-পরিবার সক্রিয় হয়েছে। সবখানে তারা তাদের হাত প্রসারিত করেছে। তাতে সমাজ অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে। এতে মোদি নির্বিকার। এতে ধীরে ধীরে মোদির পায়ের নিচের মাটি সরে যাচ্ছে। গত মাসে গুজরাটে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হয়েছে। গুজরাটে মোদি ১২ বছর মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। গুজরাটের উন্নয়নে মোদির দক্ষতার কথা প্রচার করে লোকসভায় তারা ভোট চেয়েছিলেন। কিন্তু ১৮ মাসের মাথায় গুজরাটের মানুষ মোদির কথা বিস্মৃত হয়ে গেছে। সম্ভবত গুজরাটের মানুষ  অসহিষ্ণুতাকে পছন্দ করেনি। গুজরাটের ৩১ জেলা পরিষদের মাঝে কংগ্রেস পেয়েছে ২৪টি আর ২৩০টি তালুক পঞ্চায়েত এর মাঝে কংগ্রেস পেয়েছে ১৩২টি।

১৮ মাস পরের নির্বাচনে গুজরাটের এ অবস্থা, সারাদেশে লোকসভার নির্বাচন হলে নরেন্দ্র মোদির অবস্থা কী হবে! দিল্লি বিধানসভার নির্বাচনেও বিজেপি হেরেছে। আসন পেয়েছে মাত্র ৩টি আর বিহার বিধানসভায় নরেন্দ্র মোদি ৫৪টি জনসভা করার পর সিট পেয়েছেন মাত্র ৫৬টি। মধ্য প্রদেশে লোকসভার একটা উপ-নির্বাচন হয়েছে— সে উপ-নির্বাচনেও কংগ্রেস জিতেছে ৮৯ হাজার ভোটের ব্যবধানে। সোনিয়া গান্ধী বা রাহুল গান্ধী ওই নির্বাচনের কোনও কিছুতেই অংশ নেননি অথচ মুখ্যমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহানসহ বিজেপি নেতারা জান প্রাণ দিয়ে লড়েছেন তাদের প্রার্থী নির্মলাকে জিতিয়ে আনার জন্য। গত লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি প্রার্থী এ আসনেই এক লাখ আট হাজার ভোটের ব্যবধানে জিতেছিলো। এবার কিন্তু গো-হারা হেরেছেন। এ কয়টা নির্বাচনে দেখা যাচ্ছে জনসমর্থন খুব দ্রুতই কংগ্রেসের দিকে চলে যাচেছ। গুজরাটের বিধান সভার উপ-নির্বাচনেও কংগ্রেস জিতেছে।

নরেন্দ্র মোদি যখন বহির্বিশ্বে সফরে যান তখন তার কথাবার্তায় মনে হয় তিনি আধুনিক ধ্যান-ধারণা বহন করেন কিন্তু ভারতে ফিরে আসলে মনে হয় সবই যেন বিস্মৃত হন। সংঘ-পরিবারের তালে তাল মিলিয়ে কথা বলেন। সংঘ-পরিবার প্রাচীনত্বের ধারক বাহক। ১৯২৫ সালে সংগঠনটির জন্মের পর থেকে তারা সনাতনকে আঁকড়ে ধরে পড়ে আছেন। কালের লিখন পাঠ করতে তারা অক্ষম, আধুনিক ধারণা পোষণ করতে জানেন না। তারা নিজেরা নিজেকে প্রতিবন্ধী করে রেখেছেন। তাদেরকে নিয়ে উন্নয়নের পথে চলা-প্রগতির পথে চলার স্বপ্ন দেখাও আরেক প্রতিবন্ধী ধারণা। সংঘ পরিবারটা হিন্দু সমাজটাকে বিকলাঙ্গ করে তুলছে। ঘৃণার পাঠ দিতে দিতে সমাজটা একসময় এমন হবে যে পিতা ও পুত্রকে ঘৃণা করবে। সংঘ পরিবারের নাকি ৬০ লাখ কর্মী আছে। খাকি হাফ প্যান্ট আর সাদা শার্ট তাদের বিধিবদ্ধ পোশাক—এ মানুষগুলোর মৌলিক শিক্ষাই হচ্ছে বেদ-গীতা পুরাণই আদি-অভ্রান্ত আর অবশিষ্ট যা আছে সবই ভ্রান্ত।

ইতিহাস-বিজ্ঞান-স্বাস্থ্যপাঠ সবই নাকি বেদে আছে। বেদ অবলম্বন করে চললে নাকি জীবনে আর কিছু লাগে না। দুনিয়ার সবকিছুকে ঘৃণা করার যে মন্ত্র ৬০ লাখ মানুষের মাথায় তারা ঢুকিয়ে দিচ্ছেন তাতে এরা তো আধুনিক জ্ঞানকেও উপেক্ষা করবে।

নরেন্দ্র মোদি বোম্বেতে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত বিজ্ঞান সম্মেলনে বলেছেন প্রাচীন ভারতে শৈল চিকিৎসার এতো চমৎকার উন্নতি নাকি হয়েছিলো যে তখনকার শৈল চিকিৎসকরা সুনিপুণভাবে হাতির মাথা এনে গণেশের মাথায় প্রতিস্থাপন করেছিলেন। আরেকজন বলেছেন, এমন আকারের প্লেইন আবিষ্কার তখনকার বৈজ্ঞানিকরাই করেছিলেন যাতে নাকি কয়েক হাজার লোক বহন করা সম্ভব হতো। এসব কথা কোনও জটাদারী মহন্ত যদি বলে তবে কারও কিছু বলার ছিল না কিন্তু এসব কথা যখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বা অর্থমন্ত্রী জেটলির মুখ দিয়ে বের হয় তখন ভারতের সাধারণ লোক চিন্তিত না হয়ে পারে না।

ভারতের সাধারণ লোক নরেন্দ্র মোদিকে ক্ষমতায় বসিয়েছে চীনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়ে উঠার জন্য, প্রাচীন কল্পকাহিনীর ইতিহাসের বাস্তবতা প্রমাণের জন্য নয়। গৌতম বুদ্ধের পিতৃকুল ও মাতৃকুল রাজবংশ ছিলো। পাশাপাশি রাজ্য। বৌদ্ধ সাহিত্যে আছে, দুই রাজ্যের মধ্যখানে বহমান নিরঞ্জনা নদীর পানি বণ্টন নিয়ে একবার নাকি বিরোধ হয়েছিলো এবং বিরোধ এমন পর্যায়ে পৌঁছে ছিলো যে, যুদ্ধ যে কোনও মুহুর্তে ঘটে যেতে পারতো। তখন বুদ্ধ জেতবন বিহারে অবস্থান করছিলেন। সেখান থেকে তিনি আকাশ মর্গে গিয়ে নিরঞ্জনা তীরে পৌঁছে উভয়ের বিরোধ মিটিয়ে ছিলেন। কিন্তু বৌদ্ধরা আজ পর্যন্ত বলেনি যে আকাশ মর্গে পথ অতিক্রমের জন্য বুদ্ধ প্লেন ব্যবহার করেছিলেন। বৌদ্ধরা মনে করেন, বুদ্ধের আধ্যাত্মিক উন্নতি এমন হয়েছিলো যে আকাশপথে পরিভ্রমণ তার জন্য কঠিন ছিলো না।

সলমন যে আকাশ পথে বিচরণ করতেন তা নিয়েও ইহুদি এবং খ্রিস্টানদের একই মত। হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থগুলো প্রাচীন মনীষীরাই রচনা করেছিলেন। প্রাচীন মনীষীরাতো রক্ত মাংসেরই মানুষ। মনুসংহিতা রচনা করেন মনু। মনুওতো মানুষ ছিলেন। মনুসংহিতায় ২৬৮৪টি শ্লোক। মনু-সংহিতা হচ্ছে হিন্দুদের জীবন বিধান। মনু তার সহিংতায় সমাজটাকে বিভক্ত করে এমন অবস্থায় নিয়ে গেছেন যে আধুনিককালে এসে গান্ধী প্রাণপণ চেষ্টা করেও সে বিরোধ মেটাতে পারেননি। হিন্দুদের মধ্যে জনপ্রিয় মত হচ্ছে গীতা রচনা করেছিলেন সংকরাচার্য। তিনি মহাভারতের মধ্যখানে এটা জুড়ে দিয়েছিলেন। যেন এ মহাকাব্যটা অধ্যয়নকালে গীতা মানুষের দৃষ্টিগোচর হয়। একথাটা যুক্তিগ্রাহ্য। না হয় এত বড় যুদ্ধের সময় উভয় পক্ষ যুদ্ধ স্থগিত করে ধর্মালোচনা করবেন কেন?

ভগবান একটা না দুইটা এ সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য কেউ কোনও ভোটের আয়োজন করে না। যেটা নিয়ে ভোট হয় না সেটা নিয়ে রাজনীতিও চলে না। সুষমা স্বরাজ বলেছেন, অচিরেই নাকি গীতাকে ‘জাতীয় গ্রন্থ’ ঘোষণা করা হবে। আমি আগেই বলেছি ভারতের সব ধর্মীয়গ্রন্থ রচনা করেছেন মনীষীরা। মনীষীরাও মানুষ। ভুল-ভ্রান্তি মানুষের থাকাই স্বাভাবিক। গান্ধী, তিলক, অরবিন্দ প্রমুখ রাজনীতির লোকেরাও গীতাভাষ্য রচনা করেছেন। গান্ধী বলেছেন যেসব শ্লোকের সঙ্গে আমি একমত হতে পারিনি তা আমি বর্জন করেছি। একমত হতে না পারাইতো ত্রুটি। যে গ্রন্থে ত্রুটি-বিচ্যুতি রয়েছে তা কেন জাতীয় গ্রন্থ হবে? যে ভারতে কোনও জাতীয় গ্রন্থ এতোদিন ছিলো না সেটা না থাকলে ভারত তো দরিদ্র হবে না। বহুজাতির দেশে ‘গীতাকে’ জাতীয় গ্রন্থ ঘোষণা করে বিতর্ক তোলার প্রয়োজন কি?

নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর ‘হিন্দু সেনা’ গঠন করা হয়েছে। এটা হিন্দু তালেবান। এযাবত তারা তিনজন ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করেছে। কর্ণাটকের রাজ্য সরকার টিপু সুলতানের জন্মজয়ন্তী পালন করার সিদ্ধান্ত নেয়। টিপু মহীসুরের সুলতান ছিলেন। তিনি ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন আজীবন। কর্ণাটকের রাজ্য সরকার কংগ্রেসের। বিরোধী বিজেপি ও সংঘ পরিবার প্রশ্ন উপস্থাপন করেছেন টিপু হিন্দু ও খ্রিস্টানদের অত্যাচার করেছে, হত্যা করেছে নির্বিচারে। সুতরাং তার জন্মজয়ন্তী পালন করা চলবে না। এ নিয়ে দাঙ্গা হয়েছে; দশজন মুসলমান মেরেছে দাঙ্গাবাজেরা। শেষ পর্যন্ত হাইকোর্ট পর্যন্ত গিয়েছে টিপুর জন্মজয়ন্তীর বিষয়টা। হাইকোর্ট বলেছেন টিপুর বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ মিথ্যা। টিপু জাতীয় বীর। শেষ পর্যন্ত রাজ্য সরকারের উদ্যোগে টিপুর জন্মজয়ন্তী ঘটা করে পালন করা হয়েছে।

২১৬ বছর পর আচমকা কংগ্রেসের টিপুকে মনে পড়ল কেন? বিজেপি কংগ্রেসের আগে কর্ণাটক রাজ্যে ক্ষমতায় ছিলেন। তখন তারা বহুভাবে টিপুকে কলঙ্কিত করেছেন। পাঠ্যপুস্তকে টিপুকে হিন্দু হত্যাকারী বলে চিত্রিত করেন তারা। অথচ টিপু ছিলেন একজন খাঁটি ধর্মনিরপেক্ষবাদী সুলতান। মহীসুরের যুদ্ধে টিপুর সেনাবাহিনীতে মুসলমানের চেয়ে হিন্দুর সংখ্যা ছিলো দ্বিগুণ। টিপুর সঙ্গে বীরের মতো ব্রিটিশের সঙ্গে যুদ্ধ করে তারা মরেছেন। অথচ টিপুকেই এতোদিন তারা কলঙ্কিত করেছেন অহেতুক। হাইকোর্ট যথাযথই বলেছেন, হিন্দু মুসলমানের সম্পর্কের ব্যাপারে সমগ্র তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট দেখেছে এতে টিপুর কোনও পাপ ছিলো না।

এ যাবত পাঁচশত সুশীল সমাজের লোক তাদের সরকারি খেতাব ফিরিয়ে দিয়েছেন। অমর্ত্য সেন বলেছেন নরেন্দ্র মোদি যতোদিন ক্ষমতায় থাকবেন তিনি ততোদিন আর ভারতে আসবেন না। নরেন্দ্র মোদি নির্বাচনি প্রচারে বলেছিলেন ‘আসছে দিন’। সত্যই দিন এসেছিলো। তবে এদিন কারও প্রত্যাশায় ছিলো না। নরেন্দ্র মোদি প্রাচীন পথ ছেড়ে আসার চেষ্টা না করলে কখনও আর তাকে দিয়ে ভারতীয়রা অন্যকিছু প্রত্যাশা করবেন না।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

bakhtiaruddinchowdhury@gmail.com

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ