behind the news
Vision  ad on bangla Tribune

শহীদের সংখ্যা নিয়ে খালেদা জিয়ার শঙ্কা!

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা১২:০৫, ডিসেম্বর ২৩, ২০১৫

Ishtiaque Rezaবিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন মানবতাবিরোধী অপরাধী সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী। তার ফাঁসি কার্যকরের আগে-পরে দলটির খুচরা পর্যায়ের কয়েকজন নেতা কিছু প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তবে, এবার আসল প্রতিক্রিয়া এসেছে খোদ চেয়ারপারসন থেকেই। দলের প্রধান খালেদা জিয়া এবার সরাসরি মুক্তিযুদ্ধকেই আঘাত করেছেন। সোমবার (২১ ডিসেম্বর) রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে খালেদা জিয়া বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক আছে।

অনেকে অবাক হয়েছেন, অনেকে হননি তার এমন বক্তব্যে। যারা অবাক হয়েছেন, তারা কেন হয়েছেন, সেটি একটি প্রশ্ন। যারা হননি, তারা জানেন এটাই খালেদা জিয়ার রাজনীতি। মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কিত করাই এই দলের দর্শন।

যারা অবাক হন, তাদের সামান্য একটু পেছেন নিয়ে যাব। মাত্র কিছুদিন আগে, গত ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে পত্র-পত্রিকায় পাঠানো  খালেদা জিয়ার বিবৃতিটি ছিল এ রকম: ‘১৪ ডিসেম্বর একটি বেদনাময় দিন, বাংলাদেশকে মেধা-মননে পঙ্গু করার হীন-উদ্দেশ্যে চূড়ান্ত বিজয়ের ঊষালগ্নে হানাদার বাহিনীর দোসররা দেশের প্রথিতযশা শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, বিজ্ঞানীসহ বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীদের নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল।’ দেখুন বিবৃতিতে খুব সচেতনভাবে শুধু হানাদার বাহিনীর দোসররা বলা হয়েছে, পাকিস্তানি বাহিনীর নাম গন্ধ নেই, যেন ওদের নাম নেওয়া মানা আছে কোনও এক মহল থেকে।

খালেদা জিয়া তুলেছেন, আর কারা প্রশ্ন তোলেন? উত্তর খুব সহজ। তারা হলেন পাকিস্তানি সেনা অফিসার ও তাদের এ দেশীয় দোসর রাজাকার, আল বদররা। সব রাজাকার ও পাকিস্তানি সেনা অফিসার তাদের বইতে ত্রিশ লাখ শহীদের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। খালেদা জিয়া যখন এ কথা বলছেন, তার কিছুদিন আগে পাকিস্তান মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের বিরোধিতা করে বলেছে, ১৯৭১ সালে  কোনও নিপীড়ন হয়নি, হত্যা হয়নি, ধর্ষণ হয়নি। এখন অপেক্ষায় আছে জাতি, কখন খালেদা জিয়া তেমন করেও বলবেন, একাত্তের কোনও ধর্ষণ হয়নি, হত্যা হয়নি, অত্যাচার নির্যাতন হয়নি।

১৯৮১ সালে ইউ এন ইউনির্ভাসাল হিউম্যান রাইটসের ডিকলারেশন বলছেন: মানব-ইতিহাসে যত গণহত্যা হয়েছে, এর মধ্যে বাংলাদেশের ১৯৭১-এর গণহত্যায় স্বল্পতম সময়ে এই সংখ্যা সর্বাধিক। গড়ে প্রতিদিন ৬,০০০ থেকে ১২,০০০ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। ... এটি হচ্ছে গণহত্যার ইতিহাসে প্রতিদিনের সর্ব্বোচ্চ হার।

এমন হাজারটি নথি দেওয়া যাবে। কিন্তু সত্য হলো, অংক করে সংখ্যা দিয়ে প্রমাণ করার প্রয়োজন নেই। এই বিতর্ক তারা জিইয়ে রাখতে চান, যারা বাংলাদেশ নামক স্বাধীন দেশের জন্মের বিরোধিতা করেছিলেন এবং আজও করে যাচ্ছেন। তাদের কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৭৫ সালে মুক্তিযুদ্ধের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার পর পরিকল্পিত প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে। যা এখনও চলছে।  ১৯৭৫ সালের পর যেভাবে জয় বাংলা স্লোগানের বদলে পাকিস্তান জিন্দাবাদের মতো বাংলাদেশ জিন্দাবাদ আমদানি করা হয়েছিল, তেমনি বিটিভি ও বাংলাদেশ রেডিওতে ‘পাকিস্তানি সেনাবাহিনী’-এর পরিবর্তে ‘হানাদার বাহিনী’ শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করে রাজাকার ও দালালদের দৃশ্যের আড়ালে নিয়ে যাওয়া হয়। বিএনপি এখনও সেই রাজনীতিই করছে।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত করা এবং মানুষকে, বিশেষ করে নতুন প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করার জন্য নতুন করে একটি গ্রুপ তৈরি হয়েছে, যারা মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। তবে, কিছু কথা বলতেই হয়।

নিরন্তর প্রোপাগান্ডার ফলে সৃষ্ট একটা বিভ্রান্ত প্রজন্ম তৈরি করেছে স্বাধীনতাবিরোধীরা। যে প্রজন্ম  মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা ও নির্মমতা প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পায়নি। তাদের জন্ম একটা স্বাধীন দেশে। সুতরাং তাদের জন্যে যুদ্ধটা হলো একটা ইতিহাস। আর ১৯৭৫ এরপর এই প্রজন্মকে প্রকৃত ইতিহাস থেকে দূরে রাখার কারণেই তাদের পক্ষে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার, আলবদর-আলশামস এবং শান্তিকমিটির নির্মম হত্যাকাণ্ড, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণের ব্যাপকতা উপলব্ধি করা সম্ভব হয় না।  

একটা যুদ্ধ তো শুধু কথামালা নয়, কাহিনী নয় এমনকি  শুধু ইতিহাসও নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে জাতির আত্ম-মর্যাদার প্রশ্ন। এ কোন শ্রেণি যারা আত্মমর্যাদা বিসর্জন দিয়ে পরাজিত শক্তির স্বার্থে লড়াই করে চলে? শহীদদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করে যারা আনন্দ পান, তাদের জন্য উত্তর হলো, সংখ্যাটা ৩০ লাখ নয়, এর চেয়েও বেশি। আর সংখ্যা যাই হোক তা দিয়ে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের বর্বরতাকে কমিয়ে দেখার সুযোগ আছে বলে মনে হয় না।

প্রকৃত শহীদের সংখ্যা ৩০ লাখ থেকে কম দেখালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস ভিন্নভাবে লিখিত হবে? শহীদের সংখ্যা কমলে কি দালাল-রাজাকারদের অপকর্মের দায় কমে যাবে? নাকি বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামের গুরুত্ব কমে যাবে? এই বিতর্কটা সৃষ্টির অগ্রগামীদের দলে নাম লেখালেন খালেদা জিয়া। বিতর্ক তুলে মানুষকে প্রকৃত ঘটনার থেকে আড়ালে নিযে যাওয়ার হীনচেষ্টার সঙ্গে আছে খুব সচেতনভাবে শহীদদের অপমান করা, শহীদদের স্বজনদের মনোজগতে কষ্টের বীজ বুনে দেওয়া।

স্বাধীনতার ঘোষক, শহীদের সংখ্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধী ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে যত বেশি বিভ্রান্তি তৈরি করা যাবে, দালাল-রাজাকারদের তত সুবিধা হবে, ততই তারা নিরাপদ অবস্থানে থেকে তাদের অবস্থান সুদৃঢ় করার সুযোগ পাবেন। এটি একটি দর্শন, এই দর্শন কিছুদিন পরপরই উসকে দেওয়া হয়।  

অনেকে বলছেন, কেন শহীদের সংখ্যা নামসহ প্রকাশ করা হচ্ছে না? সেই কাজ কখন করা হবে তা জানি না, তবে এ মুহূর্তের কাজ হলো, যারা বিতর্ক সৃষ্টি করেন, তাদের একটা তালিকা প্রকাশ করা। এ প্রজন্ম, আগামী প্রজন্মের প্রয়োজন আছে তাদের পরিষ্কারভাবে জানা। যারা জীবন দিয়েছেন দেশের জন্য, তাদের সংখ্যার চেয়ে বেশি প্রয়োজন বিরোধীদের সংখ্যা জানা। সেটা করাই পবিত্র দায়িত্ব।

লেখক: পরিচালক বার্তা, একাত্তর টেলিভিশন

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Global Brand  ad on Bangla Tribune

লাইভ

টপ