behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

সত্য বনাম গালি

গোলাম মোর্তোজা১৪:৩৬, ডিসেম্বর ২৩, ২০১৫

Golam Mortozaগান্ধীর অহিংস পথে থেকে নতুন সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে বলা হয় ‘সত্যাগ্রহ’। শব্দটি দিয়ে বোঝানো হয় সব সময় সত্যের প্রতি অবিচল থাকা, সত্যকে আঁকড়ে থাকা। সত্য’র কাছে মিথ্যা পরাজিত হবেই। অন্যায়-অনাচার-দুঃশাসনকে পরাজিত করে, সঠিক ও সত্য পথে থাকলে সমাজে মঙ্গল প্রতিষ্ঠা সম্ভব।

গান্ধীবাদীরা তা বিশ্বাস করেন। বর্তমান সমাজে, বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে এই বিশ্বাসের অবস্থাটা কেমন? সত্য-মিথ্যা, সত্যের পথে থাকার সুবিধা-অসুবিধা, মিথ্যা বা অন্যায়ের পক্ষে থাকার সুবিধা বা অসুবিধা নিয়ে কিছু কথা।

১. আলোচনা শুরু করি ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন দিয়ে। ভোটারদের ভোট দিতে হয়নি, সর্বোচ্চ ৫% মানুষ ভোট দিয়েছেন। এটা হলো দৃশ্যমান সত্য। সরকার বলেছে নির্বাচন ভালো হয়েছে। নির্বাচন কমিশন ৫% ভোটকে ৪০% করে দেখিয়েছে। যা ঘটেছে, যা দেখেছি তা যখন বলছি, মানে সত্য বলছি। তখন একদল আপনাকে বাহবা দিয়ে বলছে, সাব্বাশ, সাহস করে সত্য বলেছেন। আরেক দল বলছে, নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলে দেশ ও সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।

মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার এক দল বানচাল করতে চায়। সরকার সমর্থকরা গালি বর্ষণের প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে। 'বাঁশেরকেল্লা ' আর ' সিপি গ্যাং' এর মধ্যে কোনও পার্থক্য থাকে না। হয়ে যাই ‘গণতন্ত্র’ বিরোধী। আর ‘গণতন্ত্রপ্রেমিক’দের চিত্র দেখবেন? সাংবাদিক বোরহানুল হক সম্রাটের রিপোর্ট থেকে নেওয়া কয়েকটি তথ্য, ‘পাহাড় বাদে ৬১ জেলায় অনির্বাচিত জেলা পরিষদ প্রশাসক। ক্ষমতাহীন উপজেলা চেয়ারম্যান। বরখাস্ত চার সিটির মেয়র। বরখাস্ত ২৩ পৌর মেয়র। বাতিল ২৭ উপজেলা চেয়ারম্যান। রাষ্ট্র পরিচালনার মূল নীতি- ‘সকল স্তরে নির্বাচিত প্রতিনিধি নিশ্চিত হইবে’।এ কথা লেখার পর আপনি শুধু ‘গণতন্ত্র’ বিরোধী নন, আপনি দেশের ‘শত্রু’।’

২. ‘মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা কত, তা নিয়েও প্রশ্ন আছে’- খালেদা জিয়ার বক্তব্য বর্তমান সময়ে পুরোপুরি অপ্রাসঙ্গিক। বিশ্লেষণে দেখা যায়, তিনি মূলত মানবতাবিরোধী অপরাধী জামায়াতিদের বাঁচানোর জন্যে মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কিত করার প্রয়াসে এমন বক্তব্য রেখেছেন। জামায়াত এবং পাকিস্তানকে খুশি করতে, তার এই বক্তব্য। কারণ জামায়াত এবং পাকিস্তান কেউই স্বীকার করে না যে, মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছেন।

আপনি যখন খালেদা জিয়ার বক্তব্যের বিশ্লেষণ করছেন, সেই বিশ্লেষণে সত্য বেরিয়ে আসছে- তখনই আপনি সরকার বা আওয়ামী লীগের ‘দালাল’ উপাধি পেয়ে যাচ্ছেন। যারা আপনাকে এখন ‘দালাল’ বলছে চৌদ্দগোষ্ঠী উল্লেখ করে গালাগালি করছে, এই তারাই কিন্তু ৫ জানুয়ারি নির্বাচন বিষয়ক বিশ্লেষণের জন্যে আপনাকে বাহবা দিয়েছিল!

৩. শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার করছে। এটা শেখ হাসিনা সরকারের বড় সাফল্য। অত্যন্ত সাহসী পদক্ষেপ। দেশি-বিদেশি নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে এই বিচার প্রক্রিয়া চলছে। শহীদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলে খালেদা জিয়া মুক্তিযুদ্ধকে, মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্মান করছেন। এসব বিশ্লেষণ যখন করছি তখন সরকার, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী-সমর্থকরা বেজায় খুশি। খুব ভালো, খুব ভালো বলছেন।

যখন বলছি দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বলতে কিছু নেই। নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। কথা বলার অধিকার দিন দিন কমে আসছে। সারাদেশের মানুষের জীবন চরম নিরাপত্তাহীন। গুম-খুন-সন্ত্রাস ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করেছে। ছাত্রলীগ-যুবলীগের সন্ত্রাসে দেশের মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে।

আর্থিক দুর্নীতি অন্য যে কোনও সময়ের চেয়ে বেড়ে গেছে। দুর্নীতিবাজ এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড যারা করছে, সরকার তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না। তাদের ‘দায়মুক্তি’ দিয়ে দুর্নীতিতে উৎসাহিত করছে। এসব কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে হয়ে যাচ্ছি ‘জামায়াত-রাজাকার, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী’। একই গোষ্ঠী, একই ব্যক্তিকে কত অল্প সময়ের মধ্যে সম্পূর্ণ পরস্পরবিরোধী অভিধা দিচ্ছে!

যারা বলছিল সরকারের ‘দালাল’ তারা আবার বলছে সাব্বাস, সত্য বলেছেন। আরও একধাপ এগিয়ে বলছেন, ‘একমাত্র আপনিই এখন সত্য বলছেন!’

৪. পৌর নির্বাচনের এখনও কয়েকদিন বাকি। ইতিমধ্যে নির্বাচন কমিশন, নির্বাচনকে তামাশায় পরিণত করে ফেলেছেন। নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। যে কারও প্রার্থিতা বাতিল, এমনকি হয়ে যাওয়া নির্বাচনও বাতিল করার ক্ষমতা তাদের আছে। সেই নির্বাচন কমিশন বলছে, অভিযোগ আসলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আইন যে তাদের কতো ক্ষমতা দিয়েছে, সেদিকে তাদের সামান্যতম নজর নেই। তাদের নতজানুতার কোনও সীমা পরিসীমা থাকছে না। সাংবাদিকরা যাতে ভোট কেন্দ্রে ঢুকতে না পারেন, অর্থাৎ সত্য জানাতে না পারেন, সেই ব্যবস্থা করছে।

নির্বাচন কমিশন সর্বোচ্চ অযোগ্যতা-অদক্ষতার পরিচয় দিয়েছে ‘প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ’ কামনা করে। এই কাজটি করে নির্বাচন কমিশনাররা নির্বাচন কমিশনের মর্যাদাহানি করেছেন, অসম্মান করেছেন। কারণ এখানে প্রধানমন্ত্রীর কিছু করার নেই। প্রধানমন্ত্রী যেমন সরকার প্রধান, তেমনি তিনি একটি রাজনৈতিক দলেরও প্রধান। তিনি চাইবেন তার দলের প্রার্থীদের বিজয়। এতো সহজ হিসেব যখন নির্বাচন কমিশনাররা বুঝতে পারে না, তখন তাদের রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা নিয়ে এই পদে থাকার কোনও যৌক্তিকতা থাকে না। সামান্যতম আত্মসম্মানবোধ থাকলে তারা আর পদে থাকতেন না। এই বিশ্লেষণের সঙ্গে সঙ্গে সরকার পক্ষ আপনাকে বলছে ‘দালাল’। তাদের মুখের প্রশংসা উধাও। আর বিরোধী পক্ষ বলছে ‘আপনিই একমাত্র’ সত্যি বলছেন। আপনাকে অভিনন্দন, আপনাকে ধন্যবাদ।

৫. সীমান্তে প্রায় প্রতিদিন বিএসএফ গুলি করে মানুষ হত্যা করছে। ভারতের মানবাধিকারকর্মী বলছেন, ভারত সরকার বিএসএফকে গুলি করে মানুষ হত্যার নির্দেশ দিয়ে রেখেছে। তারা হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করছেন।

আমাদের সীমান্তরক্ষী বিজিবি প্রধান বলছেন, ‘বিএসএফ গুলি করে যেসব বাংলাদেশিদের হত্যা করছে, তাদেরও দোষ আছে।’ কী অমৃত বাণী!  দেশের মানুষের প্রতি কী মমতা!! দায়িত্ববোধ!!!

বিএসএফের হত্যাকাণ্ড, বিজিবি মহাপরিচালকের বক্তব্যের সত্য এবং সঠিক বিশ্লেষণ করলেই আপনি ‘ভারতবিরোধী’ আপনি ‘মুক্তিযুদ্ধবিরোধী’ আপনি ‘পাকিস্তানপন্থী’। একই সঙ্গে বিরোধী পক্ষের চোখে আপনি ‘দেশপ্রেমিক’ আপনি ‘সাহসী’।

৬. ব্যাংক, শেয়ারবাজার লুট, পাঁচশ কোটি টাকার কাজ দুই হাজার কোটি টাকায় করা, রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্র করে সুন্দরবন ধ্বংসের পরিকল্পনা, চা শ্রমিকদের দখলে থাকা জমি দখল করে বড়লোকদের দেওয়ার ষড়যন্ত্র নিয়ে কথা বললেই আপনি ‘দেশবিরোধী’ আপনি ‘উন্নয়নবিরোধী’।

৭. সত্য বলা এবং শোনার পরিবেশ বাংলাদেশে কখনও খুব বেশি অনুকূলে ছিল না। সেই পরিবেশ দিনে দিনে আরও কঠিন হয়ে পড়ছে। বর্তমান সময়ে তা অন্য যে কোনও সময়ের চেয়ে ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছে। পুরো দেশ দুইভাগে বিভক্ত। দু’পক্ষই শতভাগ আনুগত্য প্রত্যাশা করে। এই আনুগত্য তারা সুযোগ-সুবিধা, অর্থ-সম্পদ, পদ-পদবির বিনিময়ে ক্রয় করে, ক্রয় করতে চায়। সমাজে বিক্রেতারা সংখ্যাগরিষ্ঠ। তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রবল। যারা বিক্রি হন না, বিক্রি হতে চান না- তারা সংখ্যালঘু। তাদের শত্রু উভয়পক্ষই।

উভয়পক্ষের কাছে ‘শত্রু’ হওয়ার মধ্য দিয়ে একটি বিষয় প্রমাণ হয় যে, তারা ‘বিক্রি’ হয়ে যাননি। প্রমাণ হয় যে, তারা সত্য বলছেন। প্রমাণ হয় যে, এটাই সঠিক এবং সত্য পথ।

সত্য পথে থেকে অর্থ-সম্পদের মালিক হওয়া যায় না, হঠাৎ করে বড় ‘পদ-পদবি’ পাওয়া যায় না। অনেক ক্ষেত্রে ‘দেশে থাকা, টিকে থাকা’ কঠিন হয়ে পড়ে। তবে শত প্রতিকূলতার মধ্যেও পাওয়া যায় মানসিক প্রশান্তি। প্রাপ্তি এই একটিই ‘প্রশান্তি’। যা থেকে ‘বিক্রি’ হয়ে যাওয়াদের অবস্থান বহু দূরে।

লেখক: সম্পাদক, সাপ্তাহিক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ