behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

স্তন ক্যান্সার ও পুরুষের দায়!

ড. সীনা আক্তার১৮:৪৮, নভেম্বর ৩০, ২০১৫

Sina Akterস্তন ক্যান্সার এক মরণব্যাধি। নারীরাই মূলত এর শিকার হন। সময়মতো সঠিক চিকিৎসায় অনেকে টিকে থাকেন বটে কিন্তু এই ব্যাধি রোগী ও তার স্বজনদের শারীরিক, মানসিক এবং অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যন্ত করে দেয়। আমাদের দেশে গত দুই দশক আগেও স্তন ক্যান্সারের বিস্তার এমন ভয়াবহ ছিল না। অথচ ইদানিং প্রায়ই শোনা যায়, পরিচিত কেউ না কেউ এই রোগে আক্রান্ত হয়েছেন অথবা মারা গেছেন। সারাবিশ্বেই এই ঘাতক রোগের বিস্তার ঘটেছে। উন্নত দেশে সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবায় স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত অনেক নারী স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। সে তুলনায় আমাদের দেশে নারীদের অবস্থা দুর্ভাগ্যজনক।  সঠিক তথ্য, সময়মতো সুলভে চিকিৎসা, আর্থিক ও  মানসিক সহযোগিতা সবকিছুর অভাবে অধিকাংশ নারীই তীব্র অসহায় বোধ করেন। বলা হয়, প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যান্সার ধরা পড়লে সম্পূর্ণ সুস্থতার সম্ভাবনা থাকে। তাই এ রোগের আগমন সম্পর্কে নারীদের সচেতন থাকা জরুরি। তবে সবচেয়ে ভালো প্রতিরোধ ব্যবস্থা, যে সব কারণে ক্যান্সার হতে পারে, তা থেকে নিরাপদ দূরে থাকা।

ক্যান্সার বিশেষজ্ঞরা এখনও সুনির্দিষ্টভাবে বলতে পারছেন না স্তন ক্যান্সার ঠিক কী কারণে হয়, কিন্তু তারা এর জন্য দায়ী কিছু ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়কে চিহ্নিত করেছেন। যেমন, সাধারণত সেসব নারীর স্তন ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, যাদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের মধ্যে এ রোগের ইতিহাস আছে; অধিক বয়স বিশেষ করে ৫০ উর্ধ্ব বয়সী নারীর;  যারা অতিরিক্ত মদ্যপান করেন; যারা এক্স-রে ও সিটি স্ক্যানের রেডিয়েশন এবং এস্ট্রোজেন হরমোন প্রতিস্থাপন (Hormone Replacement Therapy) থেরাপি নিয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের অধ্যাপক, ড. মুনীরউদ্দিন আহমদের  সাম্প্রতিক লেখায় আরও জানা যায়, 'যেসব মহিলার স্বাভাবিক সময়ের আগে এবং স্বাভাবিক সময়ের পর ঋতুস্রাব শুরু ও বন্ধ হয়, তাদের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। কারণ, তাদের শরীরে এস্ট্রোজেন (Estrogen) অনেক বেশি সময় ধরে সক্রিয় থাকে। এস্ট্রোজেন স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। স্থূল মহিলারা স্বাভাবিক ওজনের মহিলাদের চেয়ে স্তন ক্যান্সারে বেশি আক্রান্ত হন। স্থূল মহিলাদের শরীরে এস্ট্রোজেন বেশি থাকে বলে ক্যান্সারের ঝুঁকিও বেশি।'

এস্ট্রোজেন (Estrogen/ oestrogen) হচ্ছে নারী হরমোন (female sex hormones) যা জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ির মূল উপাদান। যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য থেকে জানা যায়, (দুই ধরনের হরমোন) মেশানো বড়িতে যে এস্ট্রোজেন নামক হরমোন থাকে তা ব্রেস্ট ক্যান্সারের কোষগুলোকে উদ্দীপিত করতে পারে এবং অতিরিক্ত এস্ট্রোজেনের জন্য সম্ভাব্য স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়, যা অনেক নারীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে। এস্ট্রোজেন এবং প্রজেস্টোজেন নামের দুই ধরনের হরমোন মেশানো গর্ভনিরোধক বড়ি খাবার বড়ি নামে পরিচিত (The combined oral contraceptive pill (COCP) that contains two hormones-an oestrogen and a progestogen)।

১৯৯৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ৫৪টি সমীক্ষা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে যে এস্ট্রোজেন ও প্রজেস্টোজেন (oestrogen and progestogen) মেশানো জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি গ্রহণকারীরা যারা ১০ বছরের মধ্যে বড়ি গ্রহণ বন্ধ করেছেন তাদের মধ্যে স্তন ক্যান্সারের 'সামান্য উচ্চ ঝুঁকি' দেখা গেছে। শুধু  প্রজেস্টোজেন উপাদানে তৈরি বড়িও স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায় কিন্তু তা তুলনামূলকভাবে কম। এই কারণে উন্নত দেশে যে সব নারীর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের মধ্যে স্তন ক্যান্সারের ইতিহাস আছে, তাদের জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি অনুমোদন করা হয় না। অন্য কোনও পদ্ধতির পরামর্শ দেওয়া হয়।

চলতি বছরের অক্টোবর মাসে স্তন ক্যান্সার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিশ্বব্যাপী নানা কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে স্তন ক্যান্সার কী, কেন হয়,  কিভাবে মোকাবেলা করে সুস্থ থাকা যায়, ইত্যাদি বিষয়ে নারী ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে সচেতন করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু বহুল ব্যবহৃত জন্মনিয়ন্ত্রণের খাবার বড়ির সঙ্গে যে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি আছে তা প্রায়ই শোনা যায় না। আমাদের দেশে যেসব নারী জন্মনিয়ন্ত্রণের বড়ি সেবন করেন, তাদের অধিকাংশ স্বল্পশিক্ষিত এবং অনেকে অশিক্ষিত। জন্মনিয়ন্ত্রণের বড়ি সেবনে কড়া নিয়ম মেনে চলতে হয়, আমাদের নারীরা সঠিকভাবে সে নিয়ম মেনে চলেন তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। অধিকাংশ নারী হয়তো জন্মনিয়ন্ত্রণের  বড়ি থেকে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকির বিষয়টি জানেন না। সঠিক তথ্য থাকা মানে ক্ষমতা, নারীর ক্ষমতা। প্রয়োজনীয় তথ্যে নারীর পক্ষে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়ক হয়, অন্য জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি বিবেচনায় নিতে পারেন। তবে এ ব্যাপারে নারীর সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা এবং সহযোগিতা আছে কি?

জন্মনিয়ন্ত্রণে নারীরা অগ্রণী ভুমিকা পালন করেন বা করতে বাধ্য হন। আমাদের সমাজ পুরুষতান্ত্রিক, পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্র সবকিছুই পুরুষতান্ত্রিক মতাদর্শে চালিত হয়। এ অবস্থায় নারী-পুরুষের একান্ত বিশেষ সম্পর্ক পুরুষ কর্তৃত্বের বাইরে, এটা ভাবার কোনও কারণ নেই। মানে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি পছন্দের ক্ষেত্রেও পুরুষের কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের চর্চা দেখা যায়। নিজের অভিজ্ঞতায় জেনেছি অনেক নারী (দেশি-বিদেশি) বড়ি খেতে পছন্দ করেন না, অনেকে এতে যৌনক্ষমতা হ্রাস বোধ করেন কিন্তু বাধ্য হয়েই তাদের বড়ি খেতে হয় কারণ তাদের স্বামীরা জন্ম নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নিতে বা কনডম ব্যবহারে রাজি নয়। রাষ্ট্রের নীতি এবং সমাজ ব্যবস্থাও জনসংখ্যা রোধ করতে নারীকেই প্রথম টার্গেট করে, জন্ম নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নারীর ওপর চাপিয়ে দেয়। মন ভোলানো বিজ্ঞাপন, বর্ণিল প্রচার সবকিছু দিয়েই জন্ম নিয়ন্ত্রণের জন্য নারীকে মহিমান্বিত করা হয়! সুখী পরিবার গড়া এবং রক্ষা করা নারীর দায়িত্ব এবং এর জন্য  নারীর দরকার জন্ম নিয়ন্ত্রণ বড়ি! অন্যদিকে যৌনতা উপভোগ করবে পুরুষ এবং এর জন্য তার দরকার কনডম! এই হচ্ছে পুরুষতান্ত্রিক বার্তা!  অথচ শুধু  জন্ম নিয়ন্ত্রণ বড়ি সেবনে নারী-পুরুষ দুজনেই যৌনবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকতে পারেন। কিন্তু পুরুষের কনডম ব্যবহার জন্ম নিয়ন্ত্রণ এবং যৌনবাহিত রোগ থেকে দুজনকেই সুরক্ষা দিতে পারে। বিশেষ করে, নারীকে স্তন ক্যান্সারের 'সামান্য উচ্চ ঝুঁকি' থেকে রক্ষা করতে পারে। এটা ঠিক যে বিশ্বে বিপুল সংখ্যক নারী এই বড়ি খেয়ে দিব্যি সুস্থ আছেন। তবে উন্নত দেশে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন নারীদের সুস্থতার জন্য সহায়ক। অন্যদিকে, আমাদের অধিকাংশ নারী অপুষ্টিতে ভোগেন এবং অপ্রতুল স্বাস্থ্য সেবায় টিকে থাকেন। তাই ও্ই সব দেশের গবেষণায় জন্ম নিয়ন্ত্রণের বড়িতে স্তন ক্যান্সারের 'সামান্য উচ্চ ঝুঁকি' পাওয়া গেলেও আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে তা ভিন্ন হতে পারে। আমার অনুমান (Hypothesis) আমাদের দেশে স্তন ক্যান্সার বিস্তারের জন্য মূলত দায়ী এই জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি এবং অন্যান্য হোরমোন ভিত্তিক জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি। নারীর সুস্থতা নিয়ে কাজে করে এমন সংগঠনগুলো বিষয়টি অনুসন্ধান করে দেখবে, আশা করি।   

পরিশেষে, এ লেখা পড়ে জন্ম নিয়ন্ত্রণের বড়ি সেবনকারী কেউ যেন বড়ি খাওয়া বন্ধ না করেন, কারণ একমাত্র চিকিৎসকই এ বিষয়ে পরামর্শ দিতে পারেন। যারা ভবিষ্যতে জন্ম নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা করবেন তাদের জন্য এই লেখা সহায়ক হতে পারে। নারীর সুস্থতা মানে পরিবারের সুস্থতা এবং এর জন্য পুরুষের-স্বামীর সংবেদনশীলতা ও সহযোগিতা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। দেশের স্তন ক্যান্সার আক্রান্ত নারীদের ওপর একটা বস্তুনিষ্ঠ গবেষণা জরুরি মনে করি। কারণ এই গবেষণার ফলাফল দেশে স্তন ক্যান্সার রোধে পরিকল্পনায় সহায়ক হবে। সুস্থতার জন্য উপযু্ক্ত চিকিৎসার কোনও বিকল্প নেই। তাই সচেতনা বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোয় সুলভমূল্যে স্তন ক্যান্সারের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা আবশ্যক।

লেখক: সমাজবিদ

তথ্যসূত্র:
http://www.nhs.uk/news/2014/08August/Pages/Contraceptive-pills-may-double-breast-cancer-risk.aspx
http://www.breastcancer.org/research-news/study-questions-birth-control-and-risk

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ