Vision  ad on bangla Tribune

আমির, শাহরুখ এবং গো-মাতার সন্তানেরা

বখতিয়ার উদ্দিন চৌধুরী১২:৩০, নভেম্বর ২৮, ২০১৫

Bakhtiar Uddin Chowdhuryমকবুল ফিদা হুসেন জগৎখ্যাত দ্যা ভিঞ্চি ছিলেন না। তিনি জগৎ বিখ্যাত মোনালিসাও আঁকেননি। তবে তিনি যে ভারতের শ্রেষ্ঠ চিত্রশিল্পী ছিলেন এতে কারও দ্বিমত ছিল না। বিশ্ব দরবারে ভারত গর্ব করতে পারতো তাকে নিয়ে। তার কর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ ভারত সরকার তাকে পদ্মশ্রী, পদ্মভূষণ, পদ্ম বিভুষণ নামে রাষ্ট্রীয় খেতাবও দিয়েছে। কিন্তু শিবসেনার হুংকারে তিনি ভারত ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। ভারতের গুণীজনেরা তাকে করজোড়ে মিনতি করেছেন দেশ ছেড়ে না যেতে কিন্তু তিনি করজোড়ে বলেছেন শিবসেনার কর্মীরা তার গায়ের দিকে আসলে তা প্রতিরোধ করার শক্তি তার নেই। তার বয়স হয়েছে ৭৮ বছর।

ফিদা হুসেন শেষ জীবনে কাতারের নাগরিকত্ব নিয়ে জীবন অতিবাহিত করে লন্ডনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। শিবসেনার চোখে তার অপরাধ ছিলো- তিনি স্বরস্বতী দেবির উলঙ্গ মূর্তি এঁকেছেন। কলকাতার আনন্দবাজার গ্রুপ গুণীলোক নিয়োগ করে বেদ-পুরান ঘেটে বের করেছিলেন যে প্রাচীনকালে স্বরস্বতী উলঙ্গরূপীনিও ছিল। তারা তা তাদের ‘দেশ’ পত্রিকায় সবিস্তারে আলোচনা করে দেখিয়ে ছিলেন।

এখন শিবসেনা লেগেছে আমির খানের পেছনে। ভারতে গত কয়েকমাসের ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা নিয়ে সমালোচনায় করায় বলিউড অভিনেতা আমির খান তাদের রোষানলে পড়েছেন। মিডিয়ার খবরে বলা হয়েছে, এক অনুষ্ঠানে বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনি শঙ্কিত বলে মন্তব্য করেন। তার স্ত্রী কিরন রাও এজন্য প্রয়োজনে দেশ ছাড়তে চাইছেন বলেও জানিয়েছিলেন তিনি। এ মন্তব্যের জন্য যেমন ক্ষমতাসীন দল বিজেপির তোপের মুখে পড়েছেন আমির, তেমনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আর বলিউড পাড়ায়ও এ নিয়ে চলছে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা। এক পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে, ভারতে চলমান ধর্মীয় অসহিষ্ণুতায় শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন বলে যখন আমির মন্তব্য করেন, তখন ক্ষমতাসীন দল বিজেপির একজন সিনিয়র মন্ত্রী অরুন জেটলি ওই মঞ্চেই ছিলেন। আমির বলেন, তিনি এবং কিরন জীবনের পুরোটা সময়ই ভারতে কাটিয়েছেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রথমবারের মতো কিরন বলছেন, সন্তানদের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনে তাদের দেশের বাইরে যাওয়ার কথা ভাবা উচিত। এ মাসের শুরুতেই ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার প্রতিবাদ জানিয়ে বিজেপির তোপের মুখে পড়েছিলেন আরেক জনপ্রিয় বলিউড অভিনেতা শাহরুখ খান।

শাহরুখ এবং আমির উভয়ে বলিউডের অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং নির্ভরযোগ্য নায়ক। বিশ্বজুড়ে তাদের খ্যাতিও নগণ্য নয়। বোম্বে সিনেমার মুসলমান নায়ক দীলিপ কুমারেরও জগৎ জোড়া খ্যাতি ছিলো। বহু রাষ্ট্রীয় খেতাব পেয়েছিলেন তিনি। তার পরেই মুসলমানদের মধ্যে এখন শাহরুখ খান, আমির খান, সালমান খানরা রাজত্ব করছেন বলিউডে। বিছমিল্লাহ খাঁন ছিলেন মুরালীর সাধক। পদ্মশ্রী উপাধি দিয়ে ভারত সরকার তাকে সম্মানীত করেছিলেন। বেনারস শহরে গেলে কোনও রাস্তার নাম বলতে হয় না। বিছমিল্লাহ খাঁনের বাড়িতে যাব বলে রিকসায় উঠলে যথাস্থানে নিয়ে যাবে রিকসাওয়ালা। সুরের জগতে শাকিল বাদায়ুনিছিলেন রাজা। গানের বাদশা ছিলেন মুহাম্মদ রফি। গজলের রাণী ছিলেন শামশাদ বেগম। গত ৭৫ বছরব্যাপী এরাই ভারতীয় সাংস্কৃতির আকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্র। ভারতের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পর্যন্ত ঘুরে বেড়িয়েছেন এসব তারকারা। ভারতের নাম পৃথিবীর সব প্রান্তে ছড়িয়ে দিয়েছেন আরেক সুরকার-গায়ক এ আর রহমান। ভারতের লোক অতুলনীয় আদর সমাদরে রেখেছিলো তাদেরকে।

আজ শিবসেনার নেতা বলেছে আমিরের গালে যে চড় মারবে তাদেরকে তারা এক লক্ষ টাকা দেবে। হিন্দু মহাসভা বলিউডের বাদশা শাহরুখ খানের মাথা কেটে প্রকাশ্যে ঝুলিয়ে রাখার কথা বলেছে। ভারতীয় লোকসভার উপনেতা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং গত ২৬ নভেম্বর ২০১৫ লোকসভায় সংবিধান দিবসের সূচনা বক্তব্য বলেছেন ভারতের সংবিধান প্রণেতা আম্বেদকর জীবনকালে প্রতিকূলতার মধ্যদিয়ে অগ্রসর হয়েছেন কিন্তু তিনি কখনও ভারত ছেড়ে যাওয়ার কোনও কথা বলেননি। রাজনাথ সিং বিজেপির সভাপতি ছিলেন এবং বিজেপির শীর্ষনেতাদের অন্যতম। তিনি কেন বিস্মৃত হলেন জানি না- আম্বেদকর ভারত ছাড়েননি সত্য তবে তিনি হিন্দুধর্ম ত্যাগ করে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। রাজপূত্র গৌতমের বিদ্রোহ যেমন ছিলো হিন্দু মানসের বিরুদ্ধে আম্বেদকরেরহিন্দু ধর্ম ত্যাগের সিদ্ধান্তও ছিলো হিন্দু মানসের বিরুদ্ধে। গান্ধীকে যারা হত্যা করেছিলো তারাই এখন ভারতের ক্ষমতায়। গৌতম বুদ্ধের পর গান্ধীর মতো মহান ব্যক্তি ভারতে এখনও জন্মগ্রহণ করেনি। যারা মহাত্মা গান্ধীকে হত্যা করতে পারে তাদের কাছে শাহরুখ খান বা আমির খান কিছুই নয়। জীবনের ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে আমির খান যদি ভারত ছাড়ার চিন্তা মাথায় আসে বলেন- তাতে কোনও অপরাধ দেখিনা। যদি ভারতকে অসহিষ্ণু বলেন, সেটা যে অসত্য নয়, তার প্রতি আক্রমণাত্নক কথা বলে তার বক্তব্যের যথার্থতা প্রমাণ করছে।

নরেন্দ্র মোদি যখন গুজরাট রাজ্যের মূখ্যমন্ত্রী তখন গান্ধী নগরের বাড়িতে এক কংগ্রেস দলীয় লোকসভার মুসলিম সদস্যের বাড়ি আরএসএস-এর পাণ্ডারা ঘেরাও করেছিলো। তখন তিনি টেলিফোনে সোনিয়া গান্ধীর সাহায্য চেয়েছিলেন। সোনিয়া গান্ধী প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীকে অবহিত করে তার প্রাণ রক্ষার আবেদন জানিয়েছিলেন। কিন্তু অটল বিহারী সোনিয়ার আবেদনের সাড়া দেননি। আরএসএস এর পাণ্ডারা লোকসভার ওই সদস্যকে তার বাড়িতে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মেরেছিলো। এর নাম হচ্ছে বিজেপি-রাজ। অভিজ্ঞতা ভাল নয় বলে আজকের অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কেহ যদি ভারত ত্যাগের কথা বলে তা কখনও অপরাধ হতে পারে না।

এ পর্যন্ত ৭৫ জন সমাজের উচ্চস্তরের গুণীজন রাষ্ট্রীয় খেতাব বর্জন করেছেন। গো-মাংস, ঘর ওয়াপসী ইত্যাদি কর্মসূচি নিয়ে যে অস্থিরতা ভারতীয় সমাজে বিরাজ করছে সে অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে কোনও ভাবেই ভালফল ভয়ে আনবে না। ২০ কোটি মুসলমানের অস্তিত্ব কোনওভাবে কেউ মুছে ফেলতে পারে না। শংকরাচার্যের সময় বিশ্ব গ্লোবাল ভিলেজ - এর ধারণায় পৌঁছায়নি। ভারতের লোকসংখ্যাও এতো ছিলো না । সব মিলে পুরো ভারতে এক, দেড় কোটি লোক। সেখানে ৩০/৩২ লক্ষ ছিলো বৌদ্ধ। ৩৩টা মঠ গঠন করে শংকরাচার্য তাদের নিধন করার কর্মসূচি হাতে নিয়েছিলো। অধিকাংশ বৌদ্ধ বার্মা  (মিয়ানমার), সিংহল, আফগানিস্তানে পালিয়ে গিয়েছিলো। তবুওতো ভারতকে বৌদ্ধ শূণ্য করতে পারেনি।

ভারতের ত্রয়োদশ লোকসভার এক সদস্য সাহাবুদ্দিন বলেছিলেন যে আমাদেরকে আপনারা ভারতের মধ্যে আরেক পাকিস্তানের দাবি উত্থাপনে বাধ্য করবেন না। হায়দারাবাদের এক মৌলবাদী সংগঠন MIM মহারাষ্ট্রে গিয়ে নির্বাচন করে তিনটা আসনে জিতেছে। আরএসএস, শিবসেনার সঙ্গে তিনজন মুসলমান প্রতিদ্বন্ধিতা করেছিলো। সংঘ পরিবারের বোঝা উচিৎ তারা যত সম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়াবেন মুসলমানদের অবস্থান ততই ঐক্যবদ্ধ ও অনড় হবে। তারা সাম্প্রদায়িক চিন্তাতে বেশি বেশি ঝুকে যাবেন। তা ভারতের জন্য কখনই শুভ হবে না। পোকরান-২ এর বিস্ফোরন যখন অটল বিহারী  বাজপেয়ী ঘটায় তখন সংঘ পরিবার সারা ভারতে উল্লাসে ফেটে পড়ে। তারা বলাবলি শুরু করে- ইয়ে মহাভারত হ্যায়। ইয়ে দোসরা ভারত হ্যায়। দু’সপ্তাহ পরে যখন পাকিস্তান সমপর্যায়ের শক্তিশালী আণবিক বোমা ফাটালো তখন নিশ্চয়ই তারা উপলব্ধি করতে পেরেছে কোনও কিছুই ভারসাম্যহীন নয়। তখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন বিল ক্লিনটন। তিনি বলেছিলেন, two wrong cannot make a right.

একবার ভারতীয় ১ম লোকসভার সদস্য মওলানা হযরত মোহানী মুসলমানদেরকে গো-মাংস খাওয়া বন্ধ করে দিতে অনুরোধ করেছিলেন। কারণ হিসেবে তিনি বলেছিলেন, গো-মাতার সন্তানেরা যেখানে ঈশ্বরের সন্তান মানুষকে বলি দিয়ে রক্ত-উল্লাসে মেতে উঠতে দ্বিধা করে না সেখানে পশু পুজারীদের সঙ্গে কোনও বিরোধে না গিয়ে  মাংস ভক্ষণ ছেড়ে দেয়াই উত্তম।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক

bakhtiaruddinchowdhury@gmail.com

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ