Vision  ad on bangla Tribune

পরিমলদের জন্ম হতেই থাকবে

মুস্তাফিজ শফি১১:৫৪, নভেম্বর ২৭, ২০১৫

Mustafiz Shafiগত ২৫ নভেম্বর নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবসে একটি আলোচিত নারী নির্যাতনের ঘটনার রায় হয়েছে। ছাত্রীকে ধর্ষণের দায়ে রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুলের বসুন্ধরা শাখার বহিস্কৃত শিক্ষক পরিমল জয়ধরকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে আরও ছয় মাসের কারাদণ্ড  দেওয়া হয়েছে।

২০১১ সালের ২৮ মে ভিকারুননিসা নূন স্কুলের বসুন্ধরা শাখার পাশে একতলা ভবনের একটি কক্ষে ওই স্কুলের দশম শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণ করেন পরিমল। ওইসময় ছাত্রীর নগ্ন ছবিও মোবাইল ফোনে ধারণ করা হয়। ভিডিও প্রকাশের ভয় দেখিয়ে ১৭ জুন ফের ধর্ষণ করা হয় ওই ছাত্রীকে। ঘটনা   জানাজনি হলে শুরুতে স্কুল কর্তৃপক্ষ সেটা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে। তবে স্কুলটির সব ছাত্রীরা বিক্ষোভে ফেটে পড়লে সেটা আর সম্ভব হয়নি। এ ঘটনায় একই বছরের ৫ জুলাই ওই ছাত্রীর বাবা বাড্ডা থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। এতে পরিমল জয়ধর, অধ্যক্ষ হোসনে আরা ও বসুন্ধরা শাখার প্রধান লুৎফুর রহমানকে আসামি করা হয়। এর দুদিন পর (৭ জুলাই) পুলিশ পরিমলকে গ্রেফতার করে। ডিবি পুলিশ তদন্ত শেষে ওই বছর ২৮ নভেম্বর পরিমলের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়। আর প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ হোসেনে আরা ও লুৎফুর রহমানকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। প্রায় চার বছর ধরে বিচারকাজ চলার পর প্রাথমিক আদালত থেকে এই মামলার রায় পাওয়া গেলো। যেখানে বছরের পর বছর বিচার প্রক্রিয়া আটকে থাকে সেখানে চারবছর পরে হলেও একটি ঘটনার বিচার শেষ হয়েছে, আসামীর শাস্তি হয়েছে এটাকেও ছোট হিসেবে দেখলে চলবে না।

ঢাকার চার নম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক সালেহউদ্দিন আহমেদ যখন আদালতে রায় ঘোষণা করেন ঠিক তখনই ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে চলছিলো নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। সেখানে রায়কে স্বাগত জানিয়ে মানবাধিকারকর্মী ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা সুলতানা কামাল যথার্থই বলেছেন, ‘আজকে আমরা একটা বিচারের রায় পেয়েছি। ভিকারুননিসা নূন স্কুলে এক ছাত্রীকে লাঞ্ছিত করার জন্য যে শিক্ষককে অভিযুক্ত করা হয়েছিল, তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আমরা এই রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করছি। যারা বিচার-ব্যবস্থা পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন, তাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি। কিন্তু এর সঙ্গে এ-ও দাবি জানাচ্ছি যে, বিচার শেষ করার এই উদাহরণ টিকিয়ে রাখার দায়িত্বও কিন্তু তাদের। একটি মাত্র উদাহরণ দিয়ে তারা যেন এই সুযোগ না নেন যে, বিচার তো এখানটাতে হয়, বিচার এখানে করেছি।’

তিনি বলেন, ‘আমরা যেন সেই অবস্থা দেখতে পাই, যেখানে নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা ঘটলে তার অভিযোগ গঠন হয়, অভিযুক্ত দোষী প্রমাণিত হলে যেন শাস্তি পায়।’

সুলতানা কামালের এই শেষ কথা থেকেই শুরু করা যায়। একটি দুটি মামলার রায়ে শাস্তি  নিশ্চিত হলেও আমাদের বিচার বা বিচার প্রাপ্তির প্রক্রিয়াগুলো কি সে পর্যায়ে আছে? লক্ষ করুন, পরিমলের বিরুদ্ধে মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণেই বিচারক বলেছেন, 'এ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলেন পুলিশের পরিদর্শক এস এস শাহাদাৎ হোসেন ও পুলিশ পরিদর্শক মাহবুব এ খোদা। বিশেষ করে পরিদর্শক শাহাদাৎ এই মামলার তদন্তে চরম অদক্ষতা ও গাফিলতি দেখিয়েছেন। পুলিশ পরিদর্শক পদমর্যাদার দু’জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার এ ধরনের গাফিলতি কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তারা সঠিকভাবে তদন্ত করলে, বিচারপ্রার্থীর অভিযোগ সমর্থনের জন্য তা অধিকতর সহায়ক হতো। তবে, তাদের তদন্তের দুর্বলতার কারণে এ মামলার যে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি, তা বলা যায় না।' সৌভাগ্যবশত; এই মামলার ভিকটিম বিচার পেয়েছেন কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নারী নিযার্তন মামলাগুলো তদন্ত পর্যায়েই নষ্ট করে ফেলেন তদন্ত কর্মকর্তারা। এক ধরনের সুবিধা ভাগাভাগির কারণেও নির্যাতিত নারী বিচার পান না। কোনও কোনও ক্ষেত্রে বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘ করে তাদেরকে বিচারের জন্য অপেক্ষা করতেও নিরুৎসাহিত করা হয়। সামাজিক চাপে মামলা প্রত্যাহারের ঘটনাও ঘটে। আর এসবের সুযোগেই পরিমলরা বেপরোয়া হয়ে উঠে, নতুন নতুন পরিমলদের জন্ম হতে থাকে।

এই মামলার রায়ের পর পরিমলের বাবার একটি বক্তব্যও ঠাণ্ডা মাথায় আলোচনার দাবি রাখে। তার বাবা ক্ষিতিশ জয়ধর বলেছেন, ‌'আমার ছেলে নির্দোষ, আমরা ন্যায় বিচার পাইনি'। যেখানে শুধু বিচারকের রায় নয়. পরিমলের সব অপরাধ জনতার আদালতেও প্রমাণিত, সেখানে একজন বাবা কিভাবে তার ধর্ষক ছেলের পক্ষে কথা বলতে পারেন? আমরা জানি অপরাধী সন্তানকেও বাবা অস্বীকার করতে পারেন না। সন্তানের সব অপরাধের দায় নিয়ে তাকে নীলকণ্ঠ হতে হয়, সংশোধনের দায়ও নিতে হয়। আমরা পরিমলের বাবার মুখ থেকে সন্তানকে সংশোধন করার কোনও কথা শুনতে পাইনি। এদেশের বেশিরভাগ অপরাধীর বাবা-মায়ের মুখ থেকেই সেটা শুনতে পাওয়া যায় না। আসলে পরিবারে এবং সমাজে প্রশ্রয় আছে বলেই অপরাধ কমছে না। অপরাধীর সংখ্যা কম, সাধারণ মানুষের সংখ্যাই বেশি। কিন্তু তারা একাত্ব হয়ে দাঁড়ায়না বলেই অপরাধীরা নিজেদের শক্তিশালী মনে করে। আমরা যতক্ষণ পর্যন্ত না অপরাধের বিরুদ্ধে পরিবারে, সমাজে রাষ্ট্রে সংগঠিত না হবো, ততক্ষণ পর্যন্ত হাজার হাজার পরিমল জন্ম নিতেই থাকবে।  

লেখক:  কবি ও সাংবাদিক। নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক সমকাল।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ