মুক্তচিন্তা

Send
মাহমুদুর রহমান
প্রকাশিত : ১০:৩৪, নভেম্বর ২৭, ২০১৫ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৫৫, ডিসেম্বর ২৩, ২০১৫

Mahmudur Rahmanকথিত স্বপ্নরাজ্য ও মুক্তির চারণভূমি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। স্বাধীন মত-প্রকাশের দেশ, প্রচার মাধ্যমের স্বাধীনতার দেশ। প্যারিসের নিন্দনীয় সন্ত্রাসী হামলার পর সিএনএন-এর প্রচার দেখে বুঝতে কষ্ট হচ্ছে—ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রে ঘটেছে, না অন্য কোনও দেশে। ২৪  ঘণ্টার নিরবচ্ছিন্ন প্রচারে মনে হচ্ছিল, ১৩০ জন এবং তাদের হত্যাকারী ছাড়া অন্য কোনও খবর পৃথিবীতে নেই। বিধ্বংসী সমরাস্ত্রে সজ্জিত একের পর এক সাজোয়া বিমানের উড্ডয়ন ফরাসি জাতির মনোবলে যতটা ইতিবাচক প্রভাব রেখেছে, সাধারণ সিরীয় জনগণের মধ্যে ততটাই উৎকণ্ঠার জন্ম দিয়েছে। বিমানের ক্যামেরায় বন্দি হলো আইএস-এর ঘাঁটির লণ্ডভণ্ড চিত্র। মুক্তমনা প্রচার মাধ্যমের ক্যামেরাগুলোয় স্থান পেল না শতশত আবাল-বৃদ্ধের প্রাণনাশ কিংবা চিরতরে পঙ্গ হওয়া চিত্র।

অবলীলায় প্যারিস আক্রমণের অনুসন্ধানের খুঁটিনাটির তথ্য বেরিয়ে আসতে থাকে। এমনকি মূল হোতা এবং সঙ্গে থাকা নারীর মৃত্যুর বিভ্রান্তিকর তথ্যও। অথচ আজ পর্যন্ত ফিলিস্তিন শাসিত বেনিনে ইসরায়েলি হত্যাযজ্ঞের খবর মুক্তবিশ্বের প্রচার মাধ্যমের পর্দায় কখনও ভেসে আসেনি।

গণতন্ত্রের মধ্যমনি এই দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ৪৫ শতাংশ ভোট পড়লেই সবাই খুশি মনে ঘরে ফেরেন। তাদের নেতা যখন সিদ্ধান্ত নেন গাদ্দাফি, সাদ্দাম ও বাশার আল আসাদকে তাদের দেশের নেতৃত্বে রাখা যাবে না, সেটা গণতন্ত্রায়নের বাহবা পায়। এই গণতন্ত্র এবং মুক্ত প্রকাশের দেশ যেখানে অর্থনীতি নিয়ে ভুল তথ্য দেয়। এই একই দেশ যেখানে Patriot Act-এর আওতায় যেকোনও নাগরিক বিনা কারণে গ্রেফতার হতে পারেন, এমনকি গুম হয়ে যেতে পারেন। এ দেশ সত্যিকার অর্থেই স্বপ্নরাজ্য!

পাশাপাশি, ছায়াছবি ও গল্পের বইতে রাষ্ট্রপতি, প্রশাসন নিয়ে কল্পকথায় ষড়যন্ত্র নিয়ে মনোরঞ্জন করা হয়। তাদের কখনও রাষ্ট্রবিরোধী বা নিরাপত্তাবিরোধী দায়ে দুষ্ট করা হয় না।

ব্যক্তির একান্ত আশ্রয় এদেশে নিশ্চিত। কারণ, লেখক তথা চিন্তাশীল সমাজ তাদের পরিবার আর পোষা জীব-জন্তু নিয়ে নিভৃতে বসবাস করেন। তাদের বাড়িতে প্রচার মাধ্যমের আনাগোনা ব্যক্তি ও সামাজিকভাবে নিগৃহীত । দীপন হত্যার মতো নাড়িছেঁড়া ঘটনার পর কেউ তার বাবাকে অমন বিবেকবর্জিতভাবে নির্বোধ প্রশ্ন করার ধৃষ্টতা পেতো না। বিশেষায়িত সমাজ ব্যবস্থায়  কবি, কর্মজীবী, প্রাবন্ধিক, আইনজীবী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী তাদের নিজ ভুবনে বাস করেন, কথায়-কথায় বিবৃতি দিয়ে বেড়ান না। সর্বোপরি, তারা সব বিষয়ে কাজি নন। পরীক্ষায় কে প্রথম হলো, তার সাফল্য নিয়ে যেমন আতিশয্য দেখান না, তেমনি অকৃতকার্যের গ্লানি জনসম্মক্ষে তুলে ধরেন না। সেদেশের পত্রপত্রিকায় শিরোনাম প্রতিবেদনে নেতিবাচক-ইতিবাচকের ভারসাম্য থাকে, ভেতরের পাতাগুলো দেশের বেহাল অবস্থার বাইরেও বুদ্ধিদীপ্ত আলোচনায় মনোনিবেশ করে মানসিক ও জাগতিক মনন নিয়ে। যার মাধ্যমে অপ্রিয় শব্দ প্রয়োগ করে সর্বোচ্চ ব্যক্তির পিণ্ডি চটকাতে পারেন।

নিজ ব্যক্তিত্বের অভাবগুলো নিয়েই সে দেশের জনগণ সারা জীবন কাটিয়ে দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে যে পৃথিবী আছে, তারা অনেকেই জানেন না। তার বড় প্রমাণ তাদের জাতীয় খেলা বেসবল World Series. যে খেলায় অংশগ্রহণকারী দেশ মাত্র দুটি। একটি যুক্তরাষ্ট্র, অন্যটি কানাডা।

তারপরও অভাগা এই দেশ ছেড়ে সম্ভাবনার রাজ্যে গমনে যাদের স্বপ্ন, তারা হয়তোবা জীবনের মূল চাহিদা পূরণ করবেন; হয়তোবা পড়াশুনায় নতুন দিগন্ত ছোঁবেন। তারপরও রয়ে যাবে একই ধরনের একাকিত্ব, যার ভার বইবার শক্তি বয়সের সঙ্গে সঙ্গে লোপ পেয়ে যাবে। মুক্তমনের কথাগুলো লিপিবদ্ধ হওয়ার শেষ ভরসা বাংলাদেশের মিডিয়া। শ্রোতা, পাঠক সেই অভাগা দেশের মানুষ।

লেখক: সিএসআর এবং কমিউনিকেশন বিশেষজ্ঞ

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ