behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

যুদ্ধাপরাধী সাকা-মুজাহিদের সার্থক মৃত্যু!

ফজলুল বারী১৩:৫৩, নভেম্বর ২৬, ২০১৫

Fazlul Bariযুদ্ধাপরাধী সাকা চৌধুরী, আলী আহসান মুজাহিদের ফাঁসিকাষ্ঠে মৃত্যু সার্থক হয়েছে! কারণ বিচারে তাদের ফাঁসিতে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে তাদের প্রাণের রাষ্ট্র পাকিস্তান। যে রাষ্ট্রের পক্ষে সশস্ত্র সহিংস অবস্থান নিতে গিয়ে একাত্তরে তারা স্বজাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। নূতন চন্দ্র সিংহ-সহ হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেক লোকজন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকজন, বুদ্ধিজীবীদের হত্যার মাধ্যমে তারা তখন পাকিস্তানের পক্ষে বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয় ঠেকিয়ে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু তখন তা না পারলেও এখনও তারা যে বাংলাদেশে থেকে পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করছিল তার বিচারে তাদের ফাঁসিকাষ্ঠে মৃত্যুর পর পাকিস্তানের তীব্র প্রতিক্রিয়ায় আবারও প্রমাণিত হয়েছে। পাকিস্তানের সঙ্গে জীবনের শেষ মূহূর্ত অবধি তারা বেঈমানি করে নাই। পাকিস্তানও বেঈমানি করে নাই তাদের খাস বান্দাদের সঙ্গে। এটি শুধু সাকা-মুজাহিদ নয়, কাদের মোল্লা, কামারুজ্জামানের ফাঁসির পরও একই প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে পাকিস্তান! শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের মৃত্যুর পর পাকিস্তানে তারা গায়েবানা জানাজা পড়েও ‘আহা আমাদের প্রিয় লোকটি মরে গেল’ জাতীয় প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে দায়িত্ব পালন করেছে। এবার আরও সংঘবদ্ধ প্রতিক্রিয়া দেখালো বিশিষ্ট পাকি প্রেমিক সাকা-মুজা’র ফাঁসিতে মৃত্যুতে। সে অর্থে ফাঁসিকাষ্ঠে এই দুই শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীরও মৃত্যু সার্থক হয়েছে।

যাদের এখানে পাঁচ বছর ধরে প্রকাশ্যে বিচার চলছিল তাদের অপরাধ জানতে চিঠি লিখেছেন পাকিস্তানের বিয়ে পাগলা রাজনীতিক ইমরান খান! এসব সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশের পর বাংলাদেশের লোকজন ইমরান খানকে কী সব বলেছেন তা আর না বললাম। বাংলাদেশ ঢাকার পাকিস্তানি হাইকমিশনারকে ডেকে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে এসব আলগা দরদ আর না দেখাতে সতর্ক করেছে। বাংলাদেশ সরকারের অ্যাপ্রোচটি ছিল ভদ্র। নতুবা ঢাকার পাকি হাইকমিশনারকে বহিষ্কার করতে বলতাম। পাকিস্তানি মানবাধিকার নেত্রী আসমা জাহাঙ্গির অবশ্য আমাদের কথাটি অনেকটা বলে দিয়েছেন। আসমা বলেছেন, পাকিস্তানি প্রতিক্রিয়ায় প্রমাণ হয়েছে সাকা, মুজা এখানে তাদের চর ছিল।

এমন নানাকিছুর কারণে গুরুত্বপূর্ণ ছিল সাকা-মুজা’র ফাঁসি। পুরো বিচার প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে এর শুরুর দিন থেকে ফাঁসির মঞ্চে ঝোলার আগ অবধি হেন কাজ নেই যা এরা করে নাই! একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে যত দেশি-বিদেশি শক্তি বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ছিল তাদের প্রায় সব পক্ষকে তারা এই বিচারের বিরুদ্ধে কাজে লাগিয়েছে! এটা আমেরিকা, জাতিসংঘ, মানবাধিকার সংস্থা শুরু করে এদের কেউ মুক্তিযুদ্ধে আমাদের পক্ষে ছিল না। এদের কথা তখন শুনতে গেলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে গেছে দেখে তারা আমাদের পেছনে লাইন দিয়েছে! আবার বাংলাদেশের জাতিসংঘের সদস্যপদ পেতেও অনেক দিন লেগেছে। সারা দুনিয়াব্যাপী মানবাধিকারের বড় বড় বুলি কপচালেও এদের কেউ কখনও বলেনি বাংলাদেশের একাত্তরের গণহত্যার কুশীলবদের বিচারের আওতায় আনা উচিত। আর ৪৪ বছর অপেক্ষার পর আমরা যখন এই বিচার করতে লাগলাম তখন কথায় কথায় দাবি করা হয়েছে বিচারের তথাকথিত আন্তর্জাতিক মান! কিন্তু আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বলতে তারা কী বোঝে তা কোথাও খোলাসা করেনি! আর বাংলাদেশ পক্ষ এই মান নিশ্চিতকরণে এমন সময় লাগিয়েছে যে সাকা-মুজাহিদের বিচার শেষ করতে লেগেছে দীর্ঘ পাঁচ বছর! সুপ্রিমকোর্টের রায়ের পর রিভিউ’র নামেও সময়ক্ষেপণ করতে দিয়েছে!

রিভিউ খারিজের পর যুদ্ধাপরাধী মুজাহিদের স্ত্রী-পুত্রকন্যাদের মনে পড়লো রাষ্ট্রপতি তাদের অভিভাবক! এখন ফাঁসি হয়ে গেলে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার মামলায় মুজাহিদের অবস্থান কী হবে তা জানতে তারা রাষ্ট্রপতির কাছে যাবেন! আর এর আগে বারবার বলা হয়েছিল আগস্টের গ্রেনেড হামলা মামলা একটি ষড়যন্ত্র! তখন শেখ হাসিনাকে মারতে গ্রেনেড সব জ্বিনেরা ফেলে গিয়েছিল! বাংলাদেশের ফৌজদারি আইনে মৃত মানুষের বিচার হয় না। মৃত্যুর পর তার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত সব অভিযোগ তামাদি হয়ে যায়। যুদ্ধাপরাধী মুজাহিদের ফাঁসি হয়ে গেলে ২১ আগস্টসহ তার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত অন্য মামলাগুলোর অভিযোগনামাও তামাদি হয়ে যাবে, এটা জানতে কোনও আইন বিশেষজ্ঞ হবার দরকার পড়ে না। বিএনপি-জামায়াতের আইন পণ্ডিতরাও এসব জানেন। কিন্তু শুধু ফাঁসি বিলম্বিত করার ধান্ধায় এই কথাগুলো বলতে এক দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীর পরিবারকে সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাকক্ষ অপব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়েছে!

বিচারের শুরু থেকে পুরো বিচার প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে সব অপচেষ্টাই করেছে যুদ্ধাপরাধী সাকা চৌধুরী আর তার পরিবার। ট্রাইব্যুনালে বিচার চলাকালে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী তুরীন আফরোজকে হেন কোনও অশ্লীল কটূক্তি করা বাদ রাখেনি বিএনপির এই স্থায়ী কমিটির সদস্য। ট্রাইব্যুনালের আগেভাগে ফাঁসের ষড়যন্ত্রও ধরা পড়েছে। ‘পাগলের সুখ মনে মনে’র মতো সাকার মতো একজন চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীকে দলের নীতি নির্ধারণী স্থায়ী কমিটির সদস্য রেখেও নিজেদের ‘মুক্তিযোদ্ধাদের দল’ দাবি করতো বিএনপি! যুদ্ধাপরাধের মতো গুরুতর অভিযোগে তার বিচার চলছে দেখেও তারা তাকে স্থায়ী কমিটি থেকে বাদ দেয়নি! উল্টো সুপ্রিমকোর্টের রিভিউ খারিজের পরেও তার পক্ষ নিয়ে প্রেস কনফারেন্স করে সাকার মতো একজন ইতর টাইপের রাজনীতিককে ‘সুবোধ, স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের পাহারাদার’ তকমা দিয়েছে! অথচ এই যুদ্ধাপরাধী সাকা এমন ‘সুবোধ’ ছিল যে সে খালেদা-তারেককে জড়িয়ে ‘কুকুরের লেজ নড়াচড়া’, আর ‘বিবাহিতা বিধবার’ দল করা না করা জাতীয় বক্তব্য দিয়েছিল! আর সাকার ফাঁসির পর আবার জানা গেলো বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য ছিল ‘পাকিস্তানের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের পাহারাদার’!

রিভিউ খারিজের পর রাষ্ট্রপতির কাছে সাকা-মুজাহিদ ক্ষমা চাইবে কিনা এ নিয়ে দুই যুদ্ধাপরাধী আর তাদের পরিবার সময়ক্ষেপণের ধান্ধা নেয়! বিএনপির প্রেস কনফারেন্সে গয়েশ্বরের কাছ থেকে মাইক কেড়ে নিয়ে সাকার স্ত্রী বলেন, এ সিদ্ধান্ত সাকা নিজে নেবেন। মুজার পরিবার বলে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে মুজা আইনজীবীদের সঙ্গে পরামর্শ করতে চান! অথচ ওই পরিস্থিতিতে আইনজীবীর সঙ্গে দেখা করার কোনও সুযোগ ছিল না। জেল কর্তৃপক্ষ দেখা করতে গেলে দুজনেই বলেন ক্ষমা চাইবার বিষয়টি নিয়ে তারা এখনও সিদ্ধান্ত নেননি। দুই ম্যাজিস্ট্রেট এ নিয়ে কথা বলতে গেলে খবর বেরোয় তারা ক্ষমা চেয়ে আবেদন করছেন। ক্ষমা প্রার্থনার আবেদন জেলখানা থেকে যায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। সেখান থেকে আইন মন্ত্রণালয়, প্রধানমন্ত্রীর দফতর হয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে যায়। আর দুই পরিবার, বিএনপি-জামায়াত তখন থেকে বলতে শুরু করে তারা ক্ষমা চাননি! মৃত্যুর আগে আবার মিথ্যার আশ্রয় নেয় দুই যুদ্ধাপরাধী। সারা জীবন এরা দেশের মানুষের সঙ্গে মিথ্যাচার করেছে। এমনকি ফাঁসিতে মরার আগেও! যুদ্ধাপরাধী সাকার ছেলে জেলখানা থেকে বেরিয়ে এসে নির্লজ্জের মতো বলে বেড়ায় তার যুদ্ধাপরাধী বাপ নাকি বাঘ! বাঘতো বাংলাদেশের লোক হয়। যারা বাংলাদেশের পক্ষে থাকে তারা বাঘ হয়। যারা পাকিস্তানের পক্ষে থাকে তারা বড়জোর রামছাগল হয়। যাদের আজকের ফেসবুকীয় নাম ছাগু।

ফাঁসি বিলম্বিত করতে দুই যুদ্ধাপরাধীর পরিবারও অনেক কিছু করেছে! শেষ দেখায় একেক পরিবার সময় নিয়েছে ঘণ্টার বেশি! তাদের ভেতরে রেখেতো আর ফাঁসি কার্যকর করা যায় না। কিন্তু এই দেরি করাতে যা হয়েছে তা হয়েছে আরেক দৃষ্টান্ত! দেশের বহুল অপেক্ষা-প্রত্যাশার দুই শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি হয়েছে একসঙ্গে, এক মঞ্চে! এ যেন বিএনপি-জামায়াত জোটগত ফাঁসি! রাজনীতিতেও জোট, ফাঁসির মঞ্চেও জোট! দুই যুগের বেশি আগে আমরা যারা ঢাকার গুটিকয় সাংবাদিক এসব যুদ্ধাপরাধীর বিচার-ফাঁসির দাবিতে লেখালেখি শুরু করেছিলাম, শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে আন্দোলনে গিয়েছিলাম তারা কি সেদিন ভাবতে পেরেছিলাম একদিন এমন দুই শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি হবে একসঙ্গে, এক মঞ্চে? নিশ্চয় না।

এরজন্যেই বলি এই দুই ফাঁসি আমাদের চাওয়ার চেয়েও অর্জন দিয়েছে বেশি। এই প্রথম দেশের শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী তাদের একাত্তরের দোষ-অপরাধ স্বীকার করে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চেয়েছে! এতোদিন ‘কিছু করি নাই’, ‘দেশেই ছিলাম না, ‘বাংলাদেশে কোনও যুদ্ধাপরাধী নেই’, ‘যুদ্ধাপরাধও হয়নি’, ‘বিচার স্বচ্ছ-আন্তর্জাতিক মানের না’ এমন নানা দাবি করে গেলেও শেষ মুহূর্তে জানের ডরে তারা শেষ চেষ্টাটাও বাদ দেননি! মুক্তিযুদ্ধের দেশবাসীর দীর্ঘ দিনের অপেক্ষার বিচারকে যারা প্রশ্নবিদ্ধ করতে সবকিছুই করেছে মৃত্যু থেকে বাঁচতে তারা প্রাণভিক্ষার আবেদনের মাধ্যমে স্বীকার করেছে এই বিচার, আমাদের আন্দোলন ছিল ন্যায্য। অনেক অনেক সেলাম প্রিয় আম্মা শহীদ জননী জাহানারা ইমাম। অনেক অনেক কৃতজ্ঞতা প্রিয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কারণ দেশিবিদেশি সব রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে এই বিচার হচ্ছে-হয়েছে, ফাঁসিগুলো হচ্ছে-হয়েছে শেখ হাসিনার দৃঢ়তায়। বাংলাদেশের শহীদ পরিবারগুলোর কৃতজ্ঞতার শেষ নেই তার কাছে। এই বিচারের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের কাছে শেখ হাসিনা-খালেদা জিয়া দুই নেত্রীর পরিচয়ও আরেক নতুন মোড় নিয়েছে! শেখ হাসিনা মুক্তিযুদ্ধের শহীদ পরিবারগুলোর নেত্রী আর খালেদা জিয়া নেত্রী মুক্তিযুদ্ধ-বিরোধী রাজাকার পরিবারগুলোর! যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে-হয়েছে দেখে কৃতজ্ঞতায় কাঁদতে শহীদের সন্তানেরা শেখ হাসিনার কাছে যায়। আর সাকার মতো যুদ্ধাপরাধীর পরিবার যায় খালেদা জিয়ার কাছে! এটাকেই কি বলে মুক্তিযোদ্ধাদের দল! 

লেখক: অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী সাংবাদিক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ