behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

ফাঁসির নেপথ্যে যতকিছু...

গোলাম মোর্তোজা১৪:৩২, নভেম্বর ২৫, ২০১৫

Golam Mortozaদুই মানবতাবিরোধী অপরাধী সাকা-মুজাহিদের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে, রেশ কাটেনি। এই রেশ চলবে বহু বছর। আলোচনা-সমালোচনা, তর্ক-বিতর্ক চলছে সর্বত্র। চায়ের দোকান থেকে টকশো- আলোচনার বিষয় একটিই, মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার, ফাঁসি।

বহু বছর ধরে আমরা মানবতাবিরোধী অপরাধী হিসেবে অভিযুক্তদের রাজনীতি দেখে আসছি। সেই রাজনীতিতে তাদের শক্তির উৎস নিয়ে সব সময় প্রশ্ন ছিল, এখনও আছে।

বিচারিক প্রক্রিয়া, রায় কার্যকরের সময়ও, সেসব শক্তির নড়াচড়া লক্ষ্য করেছি। সবকিছু সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে না, কিছু হচ্ছে। একজন সংবাদকর্মী হিসেবে দীর্ঘ বছর ধরে এবং বর্তমানে যা ঘটছে, সে বিষয়ে কিছু পর্যবেক্ষণ।

সাকা-মুজাহিদের ফাঁসির ঘটনার নেপথ্যে যা ঘটেছে তার কিঞ্চিত বিশ্লেষণ-

১. মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার করা হবে, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। পরবর্তীতে এই সিদ্ধান্ত এককভাবে হাতে নিয়ে নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন শেখ হাসিনা নিজে। সংশ্লিষ্ট বা অন্য কোনও নেতা-মন্ত্রী জানছেন পরে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে তারা জানছেন গণমাধ্যম থেকে। সরকারের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও এমনই ঘটে।

২. সাকা-মুজাহিদের ফাঁসি কার্যকরের সময়ের, আগে-পরের সবকিছু এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর দু’জন গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা সাকার ঘনিষ্ঠ বন্ধু-সহযোগী। সাকার এক সময়ের ব্যবসায়িক অংশীদার, আইএসআইয়ের মিত্র হিসেবেও পরিচিত । তারা শেষ  মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা করেছেন সাকার পক্ষে। শেখ হাসিনার একক দৃঢ়তায় তারা সুবিধা করতে পারেননি।

৩. রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার সংবাদ যখন জানা গেল, তখন আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-মন্ত্রীরা ধারণা করেছিলেন, দুই উপদেষ্টার তদবির সফল হয়ে যাচ্ছে কিনা! কিন্তু তাদের কাছে সুনির্দিষ্ট কোনও সংবাদ ছিল না। একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা, মন্ত্রীর সঙ্গে কথা হয়েছিল সেদিন বিকেলে। তিনি জানতে চাইলেন আসলে কী ঘটছে? এবং বললেন, আমরা যেন চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রাখি।

আপনি কি জানেন? - প্রশ্নের উত্তরে হাসলেন। কানের কাছে এগিয়ে এসে বললেন, ‘একজন ছাড়া আর কেউ কিছু জানেন না।’ অন্য নেতা-মন্ত্রীরা জানেন যে না, তা সেদিনের এবং পরের দু’দিনের মন্ত্রীদের প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করলেও বোঝা যায়। রায় কার্যকরের সিদ্ধান্ত, নিরাপত্তা পরিস্থিতি, সারা দেশে বিজিবি নামানোর সিদ্ধান্ত- সবই নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এককভাবে। নিয়ন্ত্রণ এবং সার্বক্ষণিক সমন্বয়ের দায়িত্বও তিনি নিজে সরাসরি তত্ত্বাবধান করেছেন।

সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী বা অন্য কারও ওপর নির্ভর করেননি। রাতে যখন টানটান উত্তেজনা, মন্ত্রীকে তখন বাসায় বসে থাকতে দেখা যায়। একটি সাক্ষর করা ছাড়া তার কাছে আর কোনও সংবাদ ছিল না।

৪. আওয়ামী লীগের নেতা-মন্ত্রীরা যারা কথা বলেছেন, সবাই প্রায় কোনও কিছু না জেনে বলেছেন। অন্য মন্ত্রী-নেতাদের কাছে নিজের গুরুত্ব বাড়ানোর জন্যে, এমনভাবে কথা বলেছেন যে, তিনি সবকিছু জানেন। প্রধানমন্ত্রীর কাছাকাছি থাকেন, এমন দু’একজনকে এসব ভাব নিতে দেখা গেছে যে, সবই তিনি জানেন! আসলে তিনি বা তারা কিছুই জানতেন না প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের বিষয়ে।

ক্ষমা চাওয়ার প্রসঙ্গ নিয়েও কয়েকজন মন্ত্রীর কথায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। 'গোপনীয় ' 'রাষ্ট্রপতির অনুমতি' ছাড়া প্রকাশ করা যাবে না। অ্যাটর্নি জেনারেল ‘যাই লেখা থাকুক না কেন’ - সন্দেহজনক কথা বললেন। এরা না জেনে কথা বলে, উপকারের চেয়ে অপকার বেশি করেছেন। এখন ক্ষমা চাওয়ার কাগজ প্রকাশ না করলে সন্দেহ দূর হবে না। সরকারের উচিত প্রকাশ করেই প্রমাণ দেওয়া যে, সাকা -মুজাহিদ ক্ষমা চেয়েছিলেন।

৫. দীর্ঘ বছর ধরে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছে পাকিস্তান এবং মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশ সৌদি আরব, কুয়েতসহ কিছু দেশ। আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পরিচালিত হয়েছে ‘আইএসআই’ ভাবদর্শে এবং নির্দেশনায়।

বদলে যাওয়া বিশ্ব রাজনীতিতে বদলে গেছে আঞ্চলিক রাজনীতিও। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাকিস্তানের পরিবর্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ভারত। বাংলাদেশ এখন পুরোপুরি ঝুঁকে আছে ভারতের দিকে। ‘আইএসআই’য়ের পরিবর্তে ‘র’-এর ভাবাদর্শ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এদেশে। শেখ হাসিনা যে এতটা দৃঢ়তা দেখাতে পারলেন, পারছেন- তার কারণ ভারতের সমর্থন। ‘আইএসআই’য়ের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বাঁচানোর তৎপরতা চেয়ে, ‘র’-এর মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের পক্ষের তৎপরতা শক্তিশালী ছিল। সবদিক দিয়ে শেখ হাসিনার শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করেছেন তারা। পাকিস্তানের আইএসআইয়ের নিজেদেরই অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সৌদি আরব, কুয়েতসহ মুসলিম দেশগুলোও নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে পড়ছে দিন দিন। তাদেরও এখন মানবতাবিরোধী অপরাধীদের পক্ষে দাঁড়ানোর সময় নেই। তারপরও তারা গোলাম আযম, সাঈদীর পক্ষে ভূমিকা রেখেছে।

৬. শেখ হাসিনার পক্ষে ভারতের এই শক্ত অবস্থানের কয়েকটি কারণ-

ক. ভারতের নিরাপত্তায় বিঘ্ন ঘটানো বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আশ্রয় না দিয়ে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া।

খ. বাংলাদেশের চেয়েও ভারতের স্বার্থের প্রতি শেখ হাসিনা সরকারের গুরুত্ব দেওয়া।

গ. ট্রানজিটসহ বাংলাদেশের কাছে ভারতের যা যা চাওয়া, তার কোনও কিছু দিতেই বাংলাদেশের প্রশ্ন না করা বা গড়িমসি না করা।

৭. মানবতাবিরোধী অপরাধীদের দল জামায়াত এবং তাদের রাজনৈতিক শক্তির উৎস বিএনপির প্রতি ভারত নানা কারণে মনক্ষুণ্ন, ক্ষিপ্ত। উপরের যে কারণগুলোর কথা বললাম, তা ভারত সবসময় প্রত্যাশা করেছে। বিএনপি-জামায়াত সরকার ভারতকে সহায়তা করেনি। কিছু বিষয়ে ভারতকে অত্যন্ত বিরক্ত করেছে বিগত বিএনপি-জামায়াত সরকার।

ঘ. ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বছরের পর বছর ধরে আশ্রয় দিয়েছে। বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে অস্ত্রের যোগান যেতে দিয়েছে। ১০ ট্রাক অস্ত্র আটকের পর তা বড়ভাবে দৃশ্যমান হয়েছে।

ঙ. ১০ ট্রাক অস্ত্রের সঙ্গে সেই সময়ের শিল্পমন্ত্রী মতিউর রহমান নিজামী এবং হাওয়া ভবনের প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা ছিল। ভারতবিরোধী দাউদ ইব্রাহিমের সঙ্গে হাওয়া ভবনের একটা সম্পৃক্ততা তৈরি হয়েছিল, ‘র’-এর কাছে এসব তথ্য আছে বলে জানা যায়। বিএনপি-জামায়াতকে ভারত তার স্বার্থের পরিপন্থি শক্তি বলে মনে করে। আওয়ামী লীগকে মনে করে স্বার্থের অনুকূলের শক্তি। ফলে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার পক্ষে ভারতের দৃশ্যমান সমর্থন অব্যাহত রয়েছে। ফলে পাকিস্তান, তুরস্কের প্রত্যক্ষ চাপ, নানা সংস্থার তদবির-চাপ, শেখ হাসিনার জন্যে উপেক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে এই অঞ্চলে ভারতের মনোভাবই যুক্তরাষ্ট্রের মনোভাব। ভারত সম্পূর্ণরূপে পক্ষে থাকায় শেখ হাসিনা মানবতাবিরোধীদের বিচারসহ যে কোনও সিদ্ধান্ত দৃঢ়তার সঙ্গে নিচ্ছেন, নিতে পারছেন।

৮. সাকা-মুজাহিদের ফাঁসি কার্যকরকে কেন্দ্র করে বিএনপি পুরোপুরি দিক নির্দেশনাহীন হয়ে পড়েছে। দলীয়ভাবে বিএনপি এই রায়ের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে ফেলেছে। কোনও কোনও নেতা প্রকাশ্যে সাকা-মুজাহিদের পক্ষে, জামায়াতের পক্ষে অবস্থান নিয়ে কথা বলছেন। তারা আসলে কার পারপাস সার্ফ করছেন, সেটা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। দলীয় সমর্থকরা বুঝে উঠতে পারছেন না, তাদের কি করা উচিত। যেহেতু বিচার আওয়ামী লীগ সরকার করছে, সুতরাং তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াটা তাদের দায়িত্ব- ভেবে নিচ্ছেন অনেকে। ফেসবুকসহ সর্বত্র তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। বিএনপির ভেতরে থাকা ‘জামায়াতিরা’ বিশেষ করে কিছু সংখ্যক আইনজীবী বিএনপির ‘সিল’ ব্যবহার করে সাকা-মুজাহিদের পক্ষে কথা বলছেন। ফলে সামগ্রিকভাবে বিএনপির রাজনীতি আর জামায়াতের রাজনীতি যে এক হয়ে যাচ্ছে, বিএনপি যে বড়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে- নেতৃত্ব তা বুঝতেই পারছেন না।

লেখক: সম্পাদক, সাপ্তাহিক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ