ধর্ষক-খুনির বন্ধু ইমরান খান

Send
হারুন উর রশীদ
প্রকাশিত : ১২:২২, নভেম্বর ২৫, ২০১৫ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:০২, ডিসেম্বর ২৩, ২০১৫

Harun Ur Rashid_01খবরটি দেরিতে হলেও সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। সাকা-মুজাহিদের ফাঁসির পর আমরা জানলাম, এই দুই ঘাতকের পক্ষেও অবস্থান নিয়েছেন পাকিস্তানি সাবেক ক্রিকেটার এবং পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ নেতা ইমরান খান। তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে সাকা-মুজাহিদের ফাঁসির দণ্ড স্থগিতের জন্য চিঠি লিখেছিলেন।

দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন জানিয়েছে, ইমরান খান এই আবেদন জানিয়েছিলেন ১৯ নভেম্বর। আর সাকা-মুজাহিদের ফাঁসি কার্যকর হয় ২১ নভেম্বর দিবাগত রাতে। দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন একটু খোঁচা দিয়েই লিখেছে- পাকিস্তান সরকার ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পর উদ্বেগ এবং বিরক্তির কথা জানালেও ইমরান খান তার আগেই সক্রিয় হয়েছিলেন। দুদিন আগেই তিনি কাজ শুরু করেন। এমনকি পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীরও আগে। ফাঁসি কার্যকর হওয়ার এক ঘণ্টা পর উদ্বেগ প্রকাশ করে পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামী জানায়, ‘সাকা-মুজাহিদকে ভারতের নির্দেশে ফাঁসি দিয়ে হত্যা করা হয়েছে।’

ধর্ষক ও খুনিদের প্রতি ইমরান খানের এই প্রেম যে নতুন তা কিন্তু নয়। এর আগেই তিনি ঘাতকদের প্রতি তার খাঁটি প্রেমের প্রমাণ রেখেছেন। ২০১৩ সালের ১৪ ডিসেম্বর কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পর বলেছিলেন, ‘কাদের মোল্লা নিরপরাধ ছিলেন এবং তার বিরুদ্ধে কোনও অপরাধ প্রমাণ হয়নি।’ আর এ কথা তিনি বলেছেন কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পর পাকিস্তানের সংসদে। পাকিস্তানের সংসদে তখন এই ফাঁসির বিরুদ্ধে নিন্দা জানিয়ে প্রস্তাবও পাস হয়। ইমরান খানের সমর্থনে এই প্রস্তাব সংসদে উত্থাপন করেছিল পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামী।

এবার পাকিস্তান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিবৃতি দিয়েছে। বিবৃতিতে দুই ঘাতক-ধর্ষকের ফাঁসির ঘটনায় ‘পাকিস্তান মর্মাহত, শোকার্ত এবং বিরক্ত’ হওয়ার কথা জানিয়েছে। আর এবার ইমরান খান আরও লম্বা কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রীকে পাঠানো চিঠিতে। তিনি বলেছেন, পাক-ভারত উপমহাদেশ এবং বিশ্ব শান্তির জন্য নাকি সাকা-মুজাহিদের ফাঁসি স্থগিত করা দরকার ছিল। শুধু তাই নয়, তিনি সাকার পক্ষে ওকালতিও করেছেন। বলেছেন, ঘটনার সময় সাকা পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছিলেন, তাই তার পক্ষে কথিত অপরাধ সংঘটন সম্ভব ছিল না। ক্রিকেটার থেকে রাজনীতিবিদ এবং অতঃপর তিনি হলেন উকিল। ধর্ষক-খুনিদের উকিল।

তবে কাদের মোল্লার পর পাকিস্তান এবার সাকা-মুজাহিদকে নিয়ে যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে তার ‘সবক’ এরইমধ্যে বাংলাদেশ দিতে শুরু করেছে। পাকিস্তানি হাইকমিশনারকে সোমবার ডেকে একদফা সবকের পর এবার জানুয়ারিতে বাংলাদেশ পাকিস্তান পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠকও হবে না বলে জানা গেছে। ২০১০ সালে সর্বশেষ দুই দেশের মধ্যে পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠক হয়েছিল। কাদের মোল্লার ফাঁসির পর বাংলাদেশ পাকিস্তানকে একবার সবক দিলেও তাতে তেমন কাজ হয়নি। তাই এবার বাংলাদেশ বেশ শক্ত অবস্থানেই গেছে বলে মনে হচ্ছে।

এদিকে সাকা-মুজাহিদের জন্য পাকিস্তানের এতো দরদ খোদ পাকিস্তানেই সমালোচিত হচ্ছে। পাকিস্তানের মানবাধিকার নেত্রী আসমা জাহাঙ্গির সাকা-মুজাহিদের জন্য পাকিস্তানের ‘অতি আবেগ প্রদর্শনের’ সমালোচনা করে সোমবার বলেছেন, ‘এর মাধ্যমে পাকিস্তান সরকার নিশ্চিত করল ওই দুই ব্যক্তি রাজনৈতিক চর ছিলেন এবং পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করছিলেন।’

তাহলে এবার ইমরান খান কী বলবেন? তিনি যাদের নিরপরাধ বলছেন, তারা তো একাত্তরে পাকিস্তানের চর ছিলেন। তারা একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে খান-সেনাদের সহযোগী শক্তি হিসেবে হত্যা, ধর্ষণ ও লুটতরাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। আদালতের রায়েও তাই প্রমাণিত হয়েছে। খান-সেনাদের চরদের জন্য ইমরান খানের দরদ হয়তো স্বাভাবিক। কারণ তিনি নিজেও খান।

ইমরান খান তার দল তেহরিক-ই-ইনসাফকে পাকিস্তানের প্রগতিশীল ইসলামপন্থী দল দাবি করলেও তিনি মূলত পাকিস্তান জামায়াতের মুদ্রার আরেক পিঠ। কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পর পাকিস্তানের সংসদে জামায়াত যে নিন্দা প্রস্তাব তুলেছিল তাতে তিনি জামায়াতের সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। আর পাকিস্তান সংসদে প্রস্তাবের ওপর বক্তৃতায় ইমরান তখন কাদের মোল্লাকে নিরপরাধ ব্যক্তি হিসেবে দাবি করেন ।

আর এবার জামায়াতের আগেই তিনি সাকা-মুজাহিদের প্রাণ রক্ষায় ব্যাকুল হয়ে ওঠেন। কিন্তু কাদের মোল্লার সময় পাকিন্তানের সংসদে সেই আলোচনায় পিপিপি নেতা আব্দুস সাত্তার বাচানি বলেছিলেন, ‘কাদের মোল্লার বিচার বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। পাকিস্তানের উচিৎ হবে না তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে কথা বলা। যদি কোনও নিন্দা প্রস্তাব পাস করা হয় তাহলে তা হবে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের সামিল।’

কিন্তু পিপিপি নেতার বুঝতে ভুল হয়েছে। কারণ তিনি হয়তো জানতেন না ইমরান খানরা মোল্লা- সাকা-মুজাহিদদের পাকিস্তানি বলেই মনে করতেন।

ইমরান যাদের অনুসারী সেই পাকিস্তান জামায়াতের আমির সিরাজুল হক মনে করেন, ‘পাকিস্তান প্রীতির কারণেই আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে।’ ডন এর খবর অনুযায়ী, ‘রবিবার এক জনসমাবেশে এই জামায়াত নেতা বলেন, যারা পাকিস্তানি মতাদর্শের এবং যারা পূর্ব পাকিস্তানকে আলাদা চাননি, তাদের হত্যা করছেন প্রধামন্ত্রী শেখ হাসিনা ওয়াজেদ।’

তাহলে এবার বুঝুন ইমরান খানরা কী চায়। তারা চায়, পাকিস্তানের যারা লেজ এখনও বাংলাদেশে আছে তারা বেঁচে থাকুক। তারা যদি একাত্তরে হত্যা ধর্ষণ করেও থাকে তবুও তারা অপরাধ করেনি। কারণ তারা ইমরানদের সাধের পাকিস্তানের অখণ্ডতা চেয়েছিল। আর সেই স্বপ্ন হয়তো এখনও দেখেন!

ইমরান খান একজন ক্রিকেটার ছিলেন। ক্রিকেটকে বলা হয় ভদ্রলোকের খেলা। আর তাই ভদ্রতা এবং ভব্যতা বোঝাতে ক্রিকেট একটি প্রতিশব্দে পরিণত হয়েছে। তাই কেই অসভ্যতা করলে বলা হয়, ‘ইউর অ্যাটিটিউড ইজ নট ক্রিকেট।’ ইমরান খানও মগজে ক্রিকেট ধারণ করতে পারেননি। শরীরে হয়তো পেরেছেন। আসলে তিনি সেই খান সেনাদেরই বংশধর। তারা কখনও সভ্য হয় না। তাই ইমরান খান ঘাতকের পক্ষেই কথা বলছেন। বাংলাদেশে পাকিস্তানি লেজের জন্য তার প্রাণ কাঁদছে।

লেখক: সাংবাদিক

ইমমেইল: swapansg@yahoo.com

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ