behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

সাদামাটা মৃত্যু

তসলিমা নাসরিন১৩:৫০, নভেম্বর ২৪, ২০১৫

tasleemaসেদিন পঁচিশ বছর বয়সী এক মেয়ে আমার কাছে এসে তার জীবনের গল্প বললো। ও যা বলেছে তার সম্পূর্ণটাই এখানে উল্লেখ করছি:

‘দু’বোন আমরা। আমি কালো, আমার বড় বোন ফর্সা। লোকে বলে আমি ভাল বর পাবো না, মিতু পাবে। মিতুকে তাই বেশি লেখাপড়াও করতে হবে না। মা বলেছেন মিতুটা আইএ পাশ করলেই বিয়ে হয়ে যাবে। ওর জন্য ভাল ভাল ছেলেরা নাকি রীতিমতো লাইন দেবে। এসব গল্প শুনে মিতু বেশি খুশি হয়। ও ফর্সা বলে বাড়িতে ওর খাতিরও বেশি। আমার মামা কাকারা মিতুকে এটা ওটা গিফট করেন, বাইরে বেড়াতে নেন, আমাকে নানা ছল ছুতোয় বাদ দেন। মা কোথাও গেলে মিতুকে বলেন তৈরি হতে। আমাকে বলেন ঘরে থাকতে, বুঝি, ও ফর্সা বলেই ওর এত আদর। মা আমাকে কাঁচা হলুদ গায়ে মাখতে বলেন। ফর্সা হবার জন্য ফেয়ার এন্ড লাভলি কিনে দেন। কী যে অপমান লাগে আমার! একদিন বলেছিলাম- ‘নিগ্রো মেয়েরা তো আমার চেয়ে কালো। ওরা কত নাম করছে, জানো? লোকে ওদের জন্য পাগল।’

মা আমার কথায় কান দেন না। নিজে ফর্সা বলেই বোধহয় কালোর গুণগান বেশি শুনতে চান না। আমার বাবা কালো, আমি বাবার মতো দেখতে হয়েছি। হলে কী হবে, বাবাও ঠিক পছন্দ করেন না আমাকে। মিতুর বিয়ের জন্য ছেলে আসে। সেই ছেলেদের বংশ এবং বেতন বিচার করেই বাবার সময় পেরোয়। বাবা আরও বেশি স্বস্তি বোধ করেন এই ভেবে যে মিতুর বিয়েতে কোনও যৌতুক দিতে হবে না। পারলে বিয়ের খরচটাও ছেলেপক্ষ দিয়ে দিবে।

হলুদ মেখেও আমার রঙের কোনও উন্নতি হয়নি। যেমন ছিলাম তেমনই আছি। পাড়ার ছেলেরা আমাকে ‘কালার মা’ বলে ক্ষেপায়। আমার বড় রাগ হয়। মিতুর চেয়ে আমি পরীক্ষায় ভাল করি, ও একটা আস্ত গবেট। অংক সাড়ে এগারো পেয়েছে এইচ এস সির টেস্টে। তবুও বাবা ওকে তেমন ধমকান না। মা বলেন- ‘অংকের টিচারটাই আসলে খারাপ।’

মিতুর বিয়ে ঠিক হয়েছে এক বড়লোক ছেলের সঙ্গে। ছেলে আমেরিকায় থাকে। দেশে আসবে বিয়ে করতে। বিয়ে করেই বউ নিয়ে বিদেশ চলে যাবে। আত্মীয় স্বজনরা মিতুকে এখন থেকেই বলছে মিতু যেন বিদেশ গিয়ে তাদেরও বিদেশ নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করে। মিতু ঘাড় নেড়ে সবাইকে আশ্বাস দেয়। আমি মিতুর একবছরের ছোট, দেখতে মিতুর তুলনায় বেশি বয়স লাগে আমাকে। মা আমাকে সান্ত্বনা দেন- ‘দুঃখ করিস না। তোরও বিয়ে হবে।’

মিতুর বিয়ে হয়ে গেল। ওকে ঝকঝকে আয়নার মতো লাগছিল বিয়ের দিন। বিয়ের পর ও চলে গেল আমেরিকায়। আমেরিকায় পৌঁছে দু’দিন পরই ফোন। বাবা মা’র কাছে কান্নাকাটি। ছেলে ভাল নয়। কেন ভাল নয়? ছেলে এর আগে একটা বিয়ে করেছিল। ফিলিপিনের এক মেয়েকে। বউ আছে এখনও। বাচ্চাও আছে দুটো।

মিতু বাবা মাকে বলেছে- ‘আমাকে নিয়ে যাও এখান থেকে। এখানে মানুষ বাঁচে না। লোকটা একটা জানোয়ার। ইঞ্জিনিয়ার নয় সে, এক রেস্তোরাঁয় বাসন মাজে।’

আমাকে বলেছে- ‘ঋতু, জীবন যে এত কষ্টের হয়, আগে কখনও বুঝিনি।’

বাবা মা রাতে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন মিতুর জন্য। আমিও।

বিএ পরীক্ষা দেওয়ার পর পরিচয় হয় আমার মামার এক বন্ধুর সঙ্গে। লোকটি ইনসুরেন্সের দালাল। লিকলিকে। চোখদুটো বাজ পাখির মতো।

মামা বলেন- ‘মতিন বিয়ে করেনি। এর সঙ্গে ঋতুর বিয়ে দিলেই হয়। ওর তো আর বিয়ের ঘর আসছে না।’

বাবা মা হাঁফ ছেড়ে বলেন- ‘তাই ব্যবস্থা কর।’

আমাকে ধরে বেঁধে মতিনের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হল। বিয়ের রাতেই মতিন জিজ্ঞেস করল’- ‘কী কী দেবে তোমার বাবা?’

- ‘কী কী দেবে মানে?’

- ‘মানে টাকা পয়সা, খাট, ড্রেসিং টেবিল, আলমারি, গয়না, ফ্রিজ, কালার টিভি…’

- ‘এসব নেই তোমার?;

- ‘থাকলেই কী!’

- ‘যদি না দেয় এসব জিনিস?’

- ‘দেবে না কেন? দিতেই হবে।’

মতিনের বয়স আমার দ্বিগুণ। তবু সে তার আচার ব্যবহারে বুঝিয়ে দিয়েছে সে বিয়ে করে আমাকে ধন্য করেছে। আমাকে প্রায়ই সে বলে- ‘তোমার মামা এমন করে ধরল, কী করব!’

রাতে সে আমার সঙ্গে শোয়, কিন্তু ছোঁয় না আমাকে। বাবুল নামের এক কাজের ছেলে তার আগে থেকেই ছিল। গভীর রাতেই তার বিছানায় সে পা টিপে টিপে যায়। এক রাতে দুজনকে নগ্ন আবিষ্কার করলাম। সে রাতে আমাকে ভীষণ মারল সে। আমি চাকরি করে যে টাকা ঘরে আনি, মাসের প্রথম সপ্তাহেই সবটুকু গুণে নিয়ে যায় মতিন। বিয়ে হলে লোকে ভাল বলে। লোকে ভাল বলবে এই আশায় আমি সংসারের গা কামড়ে পড়ে থাকি। বাবা মা স্বজন পড়শী কাউকে আমার কষ্টের কথা বলি না। কালো মেয়ের বিয়ে হয়েছে এই ঢের, স্বামী সংসার নিয়ে অত সাধ আহ্লাদ তাকে মানায় না।

আমাকে এক রাতে গলা টিপে মেরে ফেলল মতিন। সন্ধে থেকে মদ খাচ্ছিল, আর বারবার বলছিল বাবার বাড়ি থেকে আমি যেন টাকা পয়সা আনি, যদি না আনতে পারি, আমি যেন তার বাড়িতে আর না ফিরি। আমি সোজা উত্তর দিয়েছি- ‘আমি পারব না বাবার কাছে টাকা চাইতে। তাছাড়া তোমার তো খুব অভাবও নেই।’

মতিন হা হা হাসল। ক্রুর হাসি। বলল- ‘অভাব আছে কী নেই সে আমি বুঝব, তোমার টাকা আনার কথা, টাকা আনবে।’

- ‘না আমি আনব না।’

- ‘আনতেই হবে।’

- ‘না আনলে কী করবে শুনি?’

- ‘তোকে মেরে কুত্তা দিয়ে তোর লাশ খাওয়াবো।’

- ‘ওকে। তাই কর।’

ব্যস। মতিন হাতের গ্লাসটি টেবিলে রেখে আমার গলা টিপে ধরল।

ভেবেছিলাম অনেকক্ষণ কষ্ট দিয়ে বুঝি ছেড়ে দেবে। কিন্তু না ছাড়ল না। ধরেই রাখল। এত তুচ্ছ কারণে ও আমাকে মেরে ফেলবে, ভাবতে পারিনি। ও বাবুলকে ডাকল। ফিসফিস করে বলল-‘শালী বোধহয় মরেই গেছে।’

বাবুল ভয়ে কাপল।– ‘কী হবে এখন?’

- ‘বস্তায় ভরে নদীতে ফেলে দিয়ে আয়।’

- ‘থানা পুলিশ?’

- ‘ও কিছু না। থানা পুলিশ আমার হাতে।’

মতিন তার গ্লাসটি আবার হাতে নিল। তার আঙুল বা চোখের পাতা সামান্য কাঁপল না’।

এবার আমি জিজ্ঞেস করলাম, কিন্তু তুমি তো বেঁচে আছো ঋতু! তুমি তো মরোনি।

মেয়েটি বললো, হ্যাঁ, ওরা আমাকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল, কিন্তু আমি মরিনি। মেরে ফেলতে চাইলেই মরবো কেন?

লেখক: কলামিস্ট

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ