দম্ভচূর্ণ!

Send
জাকিয়া আহমেদ১৩:১৩, নভেম্বর ২৩, ২০১৫

Jakia Ahmedআবার প্রমাণিত হলো, অন্যায়-অবিচার করে কেউ কোনওদিন পার পায়নি, পাবেও না। ইতিহাস আমাদের এমনই শিক্ষা দেয়।

প্রতাপশালী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের ফাঁসি সেই ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তি। এদের একজন বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা এবং আরেকজন ছিলেন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রী। মানবতাবিরোধী অপরাধে বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনও মন্ত্রীর ফাঁসি হওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম। আর এরই মধ্যে দিয়ে তাদের দম্ভ, অহংকার, অহংবোধ-সবই আজ অতীত হয়ে গেছে।

বাংলাদেশের রাজনীতির এক কদর্য চরিত্র সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী। যাকে মানুষ সাকা চৌধুরী নামেই বেশি চেনে। তিনি রাজনীতিতে বারবার আলোচনায় এসেছেন অশ্লীল-কদর্য-ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য দিয়ে। সংসদের বাইরে, সংসদের ভেতরে এমনকি মানবতাবিরোধেী অপরাধে তার বিচারকার্য চলাকালীন কোর্টের ভেতরে তিনি আলোচনায় এসেছেন তার অশ্লিল বক্তব্যের জন্য। মুসলীম লীগ নেতা ফজলুল কাদের চৌধুরীর ছেলে হিসেবে নিজেকে নিয়ে অহংবোধে আত্মতৃপ্তিতে ভুগতেন। তিনি ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটরকে বলেছিলেন, পার্সিকিউটর। এমনকি সেনাবাহিনী এবং বিচারপতিদের নিয়েও অসংযত- ঔদ্ধত্য কথা এবং বিকৃত অঙ্গভঙ্গি করতে দ্বিধা করতেন না সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী। ২০১০ সালের ১৬ ডিসেম্বর গ্রেফতার হওয়ার পর আদালতের নির্দেশে ৩০ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনালে হাজির করানো হয় সাকা চৌধুরীকে। বিচারকার্যের শুরু থেকে ২০১৩ সালের ১ অক্টোবর তার রায়ের দিন পর্যন্ত সাকা ছিলেন তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে। এমনকি, নিয়ম অনুযায়ী সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর আগে শপথ নেওয়ার কথা থাকলেও অহংকারী সাকা চৌধুরী শপথ নিতেন না।

সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে তদন্ত করতে যখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্তসংস্থা এবং প্রসিকিউটররা চট্টগ্রামে যান তখন সাকা সেখানে ছিলেন না। কিন্তু তদন্তের কথা শুনে তিনি চট্টগ্রাম ফিরে তার গুডসহিলের বাসায় সংবাদ সম্মেলন করেন এবং বলেন, ‘শুনেছি ঢাকা থেকে কারা নাকি এখানে পিকনিক করতে এসেছে, আমাকে জানিয়ে এলে তাদের জন্য ভালো আপ্যায়নের ব্যবস্থা করতাম।’ সাংবাদিকরা তাকে গ্রেফতারের প্রসঙ্গে যখন প্রশ্ন করেন, তখন সরকারকে কটাক্ষ করে সাকা চৌধুরী বলেছিলেন, ‘বর্তমান সরকার হলো গর্ভবতী নারীর মতো, একটু নড়াচড়া করলেই বিপদ।’

সাক্ষ্যগ্রহণ চলাকালীন সময়ে তিনি বারবার অট্টহাসিতে ফেটে পড়তেন, বিচারপতিদের ‘মাইলর্ড’ বলা থেকে বিরত থেকে বলতেন, ‘আমি ছয়বারের সংসদ সদস্য, আমি কেন মাইলর্ড বলবো।’ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তৎকালীন চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হককে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, ‘মিস্টার নিজামুল হক, ডোন্ট শো ইউর রেড আইজ!’ চট্টগ্রামের কুণ্ডশ্বরীর যে নূতন চন্দ্র সিংহ হত্যাকাণ্ডে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, সেই ব্যক্তি সম্পর্কে সাকা চৌধুরী বলেছিলেন, ‘তিনি মদ বিক্রি করতেন।’ এভাবেই সবাইকে তিনি হেয় করতেন। শুধু তাই নয়, তিনি হেয় করেছেন বাঙালি জাতির রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলা ভাষাকেও। বলেছেন, বাংলা আমার ভাষা না, আমার ভাষা চাটগাইয়া।

সাকা চৌধুরীর সাক্ষ্যগ্রহণের নির্ধারিত দিনে তার আইনজীবীরা প্রায়ই বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করতেন। তার কারণ হলো, কোর্টভবনের প্রবেশ পথে নির্ধারিত পাসের অতিরিক্ত মানুষ ঢুকতে চাইতো। এসব বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের বিচারপতিরা কথা বললে সাকা চৌধুরী তাদের বলেন, সব আইনজীবীকে এখানে ঢুকতে দিতে হবে, প্রয়োজনে পল্টন ময়দানে বিচার হবে, এখানে কোনও মিডিয়া ট্রায়াল হচ্ছে না যে আইনজীবীদের বাধা দেওয়া হবে।

এভাবেই প্রয়োজনে, বিনা প্রয়োজনে বিচারপতিদের বিব্রত করতে, বিচারকাজে বিলম্ব ঘটাতে, মিডিয়ার নজর কাড়তে সাকা তার ঔদ্ধত্য অব্যাহত রেখেছেন। তার চিৎকার-চেঁচামেচিতে বিব্রত হয়ে ট্রাইব্যুনাল তাকে কোর্টরুমে কোনও প্রকার কথা না বলারও নির্দেশ দিয়েছিলেন একসময়।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারকাজ চলার সময়ে তিনি বারবার আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্ট ৭৩ নিয়ে কটাক্ষ করেছিলেন। বলতেন, ‘আমি আইন বানাই, আমাকে আইন শেখাতে আসবেন না।’

২.

অপরদিকে বুদ্ধিজীবীদের রক্তে যার হাত লাল হয়ে ছিল, সেই মুজাহিদকে খালেদা জিয়ার সরকার সমাজকল্যাণমন্ত্রী বানিয়েছিলেন। যিনি বাংলাদেশের জন্মের বিরোধিতা করেছিলেন, সেই ব্যক্তির গাড়িতে উড়েছে আমার দেশের লাল সবুজ পতাকা। এটি ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের মুখে চপেটাঘাত। শুধু তাই নয়, স্বাধীন বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে ২০০৭ সালের ২৫ অক্টোবর বুক উঁচিয়ে বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশে কোনও যুদ্ধাপরাধী নেই। যারা বলেন, তারা কল্পনাপ্রসূত হয়ে বলেন, এটা তাদের বানোয়াট চিন্তা। তখন (৭১) থেকেই নেই, এখনও নেই। বাংলাদেশে কোনও স্বাধীনতাবিরোধী নেই। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি কখনও ছিলো না, এখনও নেই।’ অথচ ১৯৭১ সালে বাঙালির বিজয়ের কয়েকদিন আগে বদরবাহিনী প্রধান আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ঢাকার চকবাজারে আলবদর লেখা ব্যানার নিয়ে গাড়ি করে এসে বক্তৃতা দিয়েছিলেন জনসম্মুখে। সেদিন তিনি বলেছিলেন, ‘বুদ্ধিজীবী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’

২০১০ সালের ২৫ মার্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হওয়ার ছয়দিনের মাথায় মুজাহিদকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ‘একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস আপনি কোথায় ছিলেন, কী কী করেছেন? জবাবে মুজাহিদ বলেছিলেন, ‘এতদিন পর সেসব মনে নেই। পাস্ট ইজ পাস্ট।’

পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ৭১-এর মার্চে ঢাকার মোহাম্মদপুর ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইন্সটিটিউটে ক্যাম্প বসায়। সেখানেই পরে রাজাকার ও আলবদর বাহিনী ক্যাম্প করে। সেখানে নিয়মিত যাতায়াত ছিল মুজাহিদের। সে জায়গাটিই মূলত তাদের নির্যাতন সেল হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এখানেই বদরবাহিনীর কমান্ডার হিসেবে মুজাহিদ পাক সেনাদের সঙ্গে স্বাধীনতাবিরোধী বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের পরামর্শ করতেন। শুধু তাই নয়, বুদ্ধিজীবী নিধনের অভিযান পরিচালনা, পরিকল্পনাও হয় এখান থেকেই।

সাকা চৌধুরী এবং মুজাহিদ কখনওই তাদের স্বাধীনতাবিরোধী চক্রান্তের কথা স্বীকার করেননি। তবে সত্য সব সময়ই সত্য এবং কোনওদিনই কোনও সত্যকে মাটিচাপা দিয়ে রাখা সম্ভব নয়। তার অন্যতম প্রমাণ সাকা-মুজাহিদের প্রাণভিক্ষা চাওয়া। কারণ, সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অপরাধীকে কৃতকর্মের দায় স্বীকার করেই ক্ষমা চাইতে হয়।

সাকা-মুজাহিদ যতোই আস্ফালন করুক না কেন- অবশেষে তারা স্বীকার করে নিলেন, তারা স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের বিরোধিতা করেছিলেন। তাদের দম্ভ, তাদের অহংকার, তাদের অন্যায়-পাপ সব চূর্ণ হলো অবশেষে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে জানবে, সাকা-মুজাহিদ ক্ষমা চেয়েছে, জন্মের বিরোধীতার দায় স্বীকার করেছে, তাদের দম্ভ চূর্ণ হয়েছে।    ‍

লেখক: সাংবাদিক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

সম্পর্কিত সংবাদ

 
 
 
 

লাইভ

টপ