behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

ঔদ্ধত্যের পতন!

আনিস আলমগীর০২:১২, নভেম্বর ২২, ২০১৫

Anis Alamgirঅপকর্মের ৪৩ বছরের মাঝে একবার কল্পনাও করেননি তারা পরিণতি এমনই হবে। এতো কুকর্মের পরও যে দেশের মন্ত্রী হয়েছেন, এমপি হয়েছেন, রাষ্ট্রীয় পতাকা বহন করেছেন গাড়িতে, সে দেশে ফাঁসিতে ঝোলানোর চূড়ান্ত রায় আসবে কল্পনা করা যায়! কিন্তু সাকা-মুজাহিদের জীবনে বাস্তবেও তাই ঘটল। সে কারণেই হয়তো স্বজনদের সঙ্গে শেষ দেখাকালে তারা নিস্তব্ধ ছিলেন বলে খবর বেরিয়েছে। ছিলেন বাকহারা। সাকা-মুজাহিদ মাথা নত করবে না বলে তাদের পরিবারের সদস্যরা মিডিয়ায় এসে বাখোয়াজ করলেও শেষ পর্যন্ত ফাঁসিতে তোলার আগে এই দুই কুখ্যাত লোক রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা করেছিলেন, শেষ করুণার আশায়। কিন্তু, রাষ্ট্রপতি তাদের আবেদনে সাড়া না দেওয়ায় ফাঁসিতেই ঘটলো এই দুই অপরাধীর ঔদ্ধত্যের পতন।

আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল। আর সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য। আঠারো নভেম্বর ২০১৫ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট তাদের দু’জনের ফাঁসির আদেশের রিভিউ পিটিশন খারিজ করে ফাঁসি কার্যকর করার সব বাধা অপসারণ করে দিয়েছিল। এ দু’জন ছিলেন বাংলাদেশে সন্ত্রাসের মদদদাতা।

আজ ইসলামিক স্টেট (আইএস) আর আল-কায়দার উত্থানের পর সন্ত্রাস বিশ্বায়ন পর্বে এসে উপাস্থিত হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ সন্ত্রাসের মোকাবেলা করছে ১৯৭১ সাল থেকে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাঙালিদের থেকে তাদের দোসর খুঁজে বের করে তাদেরকে দিয়ে বাঙালিদের শায়েস্তা করার ব্যবস্থা করেছিল। তাদেরকে দিয়ে আল-বদর, আল-শামস, রাজকার বাহিনী তৈরি করে তাদের হাতেই বাঙালি নিধনের দায়িত্ব দিয়েছিল। সাকা-মুজাহিদরা ছিলেন তার অগ্রভাগে।

১৯৭১ সালে সাকা-মুজাহিদ ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের নিরীহ মানুষদের জন্য সাক্ষাৎ যম। হিন্দুদের হত্যা করা যেন এই দু’জনের অধিকারের মধ্যে পড়েছিল। চট্টগ্রামের রাউজান-গহিরার এমন কোনও হিন্দুপাড়া নেই যেটি সাকা এবং তার বাহিনীর নৃশংসতার শিকার হয়নি। শুধু কুণ্ডেশ্বরী ভবন নয়, জগৎমল্লপাড়া, ঊনসত্তরপাড়া, গহিরার পাড়ায় পাড়ায় তাই সাকার চূড়ান্ত রায়ে সন্তুষ্টি। ফাঁসিতে উল্লাস।

ফরিদপুরেও একই অবস্থা। আল-বদর বাহিনী প্রধান আলী আহসান মুজাহিদের ফাঁসির রায় শুধু ঢাকায় বুদ্ধিজীবীদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আনন্দ বন্যা এনেছে তা নয়, ফরিদপুর সদরের মাচ্চর ইউনিয়নের বাকচর গ্রামে মুজাহিদ বাহিনী ১৯৭১ সালের ১৩ মে হিন্দু সম্প্রদায়ের যে ৯ জন লোককে হত্যা করা হয়েছে, যে মহিলাকে ধর্ষণ করা হয়েছে- আনন্দ বন্যা তাদের স্বজনকেও ছুঁয়ে গেছে।

সাকা-মুজাহিদ দু’জন শুধু স্বাধীনতা যুদ্ধকালে হত্যা-খুনে মত্ত ছিলেন না, ’৭৫ পরবর্তী রাজনীতিতেও তারা একই কাজে লিপ্ত ছিলেন। সাকার বিরুদ্ধে ১১টা খুনের মামলা ছিল রাউজান থানায়। মেহেদি অনুষ্ঠান থেকে বরকে তুলে নিয়ে হত্যা করেছে তার লোকেরা। যে ছাত্রদল নেতা সাকার বিএনপিতে যোগদানের বিরুদ্ধে কথা বলেছে তাকে জীবন দিতে হয়েছে তার চট্টগ্রাম শহরের বাড়ির কাছে। পাহাড়ের ওপরে অবস্থিত সে বাড়িটি ১৯৭১ সালে ছিল তার আর তার বাবা ফজলুল কাদের চৌধুরী (ফকা চৌধুরী)-র তৈরি মুক্তিযোদ্ধা নির্যাতন কেন্দ্র। অবশ্য ছাত্রদল নেতাকে হত্যার অভিযোগে সাকাকে একদিন থানায় রাত কাটাতে হয়েছিল। সাকা ’৭৫ এর পর আবারও হিন্দুদেরকে নির্যাতন অব্যাহত রাখে তার নির্বাচনী এলাকায়। সেখানে অসংখ্য হিন্দু অত্যাচার নির্যাতনের শিকার হয়েছে, ভোটাধিকার হারিয়েছে। ২০০১ সালে খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এলে সাকা বাহিনী ধ্বংস করেছে ৩০০ বছরের প্রাচীন নোয়াপাড়ার মন্দির।

কী নির্মম! সাকার এই দুর্দিনে, তার চূড়ান্ত পরিণতির খবরে তার বাহিনী কিন্তু রাস্তায় নামেনি। একটি মিছিল করেনি। কারণ তারা জানে সাকা বেঁচে থাকলে হয়তো তাদের তিরস্কার করার সুযোগ পেতেন কিন্তু সাকাই যখন নেই- আনুগত্য কার জন্য? কে তাদের প্রটেকশন দেবে?

অন্যদিকে, মুজাহিদ ছিল আল-বদর বাহিনীর প্রধান। তারই নেতৃত্বে তার বাহিনী ১৯৭১ সালের ১৫ নভেম্বর থেকে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্বিচারে ঢাকা শহরে বুদ্ধিজীবী হত্যা করেছিল। আর ক’দিন সময় পেলে সম্ভবতো ঢাকা শহরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কোনও শিক্ষিত লোকই তারা জীবিত রাখতো না। তারা পরাজিত হচ্ছে এটা বুঝতে পেরে বাঙালি জাতিকে মেধাশূন্য করে ফেলার পারিকল্পনা নিয়েই এ কাজটা সুপরিকল্পিত ভাবেই করেছিল।

তখন পূর্ব-পাকিস্তানে (বাংলাদেশ) ১৯টি জেলা ছিল। প্রতিটি জেলায় আল-বদর বাহিনীর ইউনিট হয়েছিল। নিয়ম ছিল প্রতি ইউনিটের সদস্য সংখ্যা হবে ৩১৩ জন। এ সংখ্যাটা ছিল বদরের যুদ্ধে মুসলমানদের সৈন্য সংখ্যা। ধর্মীয় আবেগকে জড়িয়েছিল তারা তাদের অর্ধমের কাজে। আব্বাসীর খলিফারা অনেক সময় হেরেমে মহিলা রাখতো আর কেউ প্রশ্ন উত্থাপন করলে মিথ্যা হাদিস বলে তা বৈধ করার চেষ্টা করতো। আল বদর নেতা মুজাহিদদের অবস্থা হয়েছিল তাই।

বাংলাদেশের জন্মকালে যে লোকটি এই দেশটাকে মেধাশূন্য করে দিতে চেয়েছে সেই আল বদর বাহিনীর প্রধান মুজাহিদ ’৭৫ পরবর্তী রাজনীতিতেও সে ধারা অব্যাহত রেখেছিল। বাংলাদেশের রাজনীতিতে রগকাটার সংস্কৃতি, প্রতিপক্ষকে জবাই করে দেওয়ার সূচনা তারাই সূচনা করেছে। চট্টগ্রাম কলেজ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে জামাত-শিবিরের রাজনীতি সে ধারায় এগিয়েছে। পরে বিস্তার হয়েছে সারা দেশে। মুজাহিদ জামাত রাজনীতিতে এই রগকাটা ধারারই হোতা।

মুজাহিদের ভাগ্য অবশ্য সাকার চেয়ে ভাল। ফাঁসির চূড়ান্ত রায়ের খবরে তার দল জামায়াতে ইসলামী কিন্তু হরতাল ডেকেছে। তবে কোথাও তারা মিছিল বের করেছে সেটা চোখে পড়েনি। সাকা-মুজাহিদের অনুগামীরা কোথাও তাদের জন্য জমায়েত হয়েছে বা হতে চেয়েছে সে ধরনের কোনও খবরও চোখে পড়েনি। সন্ত্রাসের দুই মদদদাতা সাকা-মুজাহিদ হয়তো প্রতিবাদ বলতে সন্ত্রাসই বুঝে। গুপ্তহত্যা বুঝে। সরকারি সতর্কতার মুখে হয়তো তারা সেটির সুযোগ তেমন একটা পায়নি।

মুজাহিদের রিভিউ আবেদন প্রত্যাখ্যান করতে গিয়ে সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, মুজাহিদ দ্বারা সংঘটিত বর্বর নৃশংস ও নিষ্ঠুর অপরাধের সঙ্গে হিটলারের গ্যাস চেম্বারের গণহত্যা বা ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালাবাগের গণহত্যার সঙ্গে তুলনা করা যায়, যেখানে ব্রিটিশ-ভারতের আর্মি শত শত নিরীহ সিভিলিয়ানকে গুলিবর্ষণ করে হত্যা করেছে। রায়ে আরও বলা হয়, মুজাহিদের নির্মম আল-বদর বাহিনী তার দ্বারা প্ররোচিত হয়ে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছে। এটি ছিল ঠাণ্ডা মাথার নৃশংসতা।

কোর্ট বলেছে, ‘নিরস্ত্র মানুষকে খুন করা কি ইসলাম অনুমোদন করে? কোর্ট রায় প্রদানকালে আবেদনকারীর (মুজাহিদ) আল বদর বাহিনীর হাতে নিহত ব্যক্তিদের বিধবা স্ত্রী, সন্তান, স্বজনদের ৪৩ বছরের অসহ্য যন্ত্রণাকে বিবেচনায় নিয়েছে।...আল-বদর বাহিনীর কর্মকাণ্ড থেকে এটা প্রতীয়মান হয়, নতুন জন্মানো দেশটিকে পঙ্গু করার উদ্দেশ্যে বুদ্ধিজীবী হত্যার মতো নৃশংস অপরাধ সংঘটিত করা হয়েছে।’

সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ১৯৭১ সালের পুরোটা সময় চট্টগ্রামে ছিলেন। তাদের বাসায় ৬০/৭০ জন পাকিস্তানি মিলিশিয়া সার্বক্ষণিক থাকতো। সালাউদ্দিনের নিজস্ব কোনও বাহিনী ছিল না। সে ছোট ছোট অপারেশন চালানোর সময় মিলিশিয়া নিয়ে যেতো আর বড় কোনও অপারেশনের সময় পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর সদস্যদের তার সঙ্গে নিতো। সালাউদ্দিনের অপারেশন ছিল গণহত্যার মতো। সিদ্ধান্ত গ্রহণে আর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বড় নির্মম ছিল সাকা। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ক’দিন আগে সে পালিয়ে যায়। ফাঁসির হুকুম কার্যকর করতে আরও কোনও নির্মম পদ্ধতি থাকলে সে পদ্ধতিতেই তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া বাঞ্ছনীয় ছিল।

সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আবেদনের রায়ে, সর্বোচ্চ আদালত ১৯৭১ সালে সাকা বাংলাদেশে ছিল না তার এই দাবির সমর্থনে জমা দেওয়া সার্টিফিকেটগুলো নকল বলে জানায়। সাকা অনেক আগেই সার্টিফিকেটের জন্য আবেদন করেছে কিন্তু ২০১৫ সালের ১৬ নভেম্বরে আগে কেন সেটা আদালতে জমা দেওয়া হল না, আবার দেখা যাচ্ছে সেই সার্টিফিকেট ২০১২ সালে ইস্যু করা হয়েছে—আদালত সে প্রশ্ন তুলছে। পাকিস্তানস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে কেন সার্টিফিকেট সত্যায়িত করা হয়নি সে প্রশ্নও তুলেছে উচ্চ আদালত।

সুপ্রিম কোর্ট এছাড়াও বলেছে, ‘আসামি নৃশংস ও নারকীয়  এসব অপরাধের সময় শুধু শারীরিকভাবে উপস্থিত ছিলেন না বরং সক্রিয়ভাবে এসব হত্যাকাণ্ডে তার অংশগ্রহণ ছিল। সালাউদ্দিন কাদের তার এসব কাজের জন্য কখনও অনুতাপ বা অনুশোচনা দেখাননি বরং তিনি এই বিচার প্রক্রিয়ার প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশ করেছেন।

গত ৫ বছরে অনেক যুদ্ধাপরাধীর বিচার হয়েছে। ফাঁসিও হয়েছে। তবে এসবের মধ্যে সাকা এবং মুজাহিদের ফাঁসি শুধু যুদ্ধপরাধের বিচার নয়, যেন তার চেয়েও বেশি কিছু। এই দুই যুদ্ধাপরাধী শুধু ১৯৭১ সালে নয়, তারপরেও সন্ত্রাসের বাতিঘর হিসেবে কাজ করেছে। এরা পরাধীন বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করেনি শুধু স্বাধীন দেশে তাদেরকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করেছে। মুক্তিযুদ্ধকে কটাক্ষ করেছে।তাদের এমন শাস্তি এমনি এমনি হয়নি।

লেখক: সাংবাদিক ও শিক্ষক

anisalamgir@gmail.com

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ